কোরবানি এলে আমাদের মনে অনেক প্রশ্ন জাগে। তার মধ্যে একটি বড় প্রশ্ন হলো—আমাদের অমুসলিম প্রতিবেশী, বন্ধু বা সহকর্মীদের কি কোরবানির মাংস দেওয়া যাবে? অনেকে মনে করেন, এই মাংস শুধু মুসলমানদের মধ্যেই বণ্টন করতে হয়। কিন্তু আসলেই কি তাই? পবিত্র কোরআন এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিস এ ব্যাপারে কী সুন্দর ও উদার বার্তা দেয়? চলুন জেনে নিই আজকে আলোচনায়।
কোরবানি ইসলামের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত। এটি শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং মহান আল্লাহর প্রতি আনুগত্য এবং ত্যাগের এক অনন্য প্রতীক। পূর্ববর্তী উম্মতদের জন্য কোরবানির মাংস খাওয়ার কোনো নিয়ম ছিল না। তারা কোরবানি করে ময়দানে রেখে আসতেন এবং আসমানি আগুন এসে তা জ্বালিয়ে দিলে বোঝা যেত কোরবানি কবুল হয়েছে। কিন্তু মহান আল্লাহ প্রিয় নবীজি (সা.)-এর উম্মতের ওপর বিশেষ দয়া করে এই মাংস খাওয়া হালাল করে দিয়েছেন।
ইসলামের নিয়ম হলো—কোরবানির মাংস নিজে খাওয়া, পরিবারকে খাওয়ানো, আত্মীয়-স্বজনদের উপহার দেওয়া এবং গরিব-দুঃখীদের মাঝে বণ্টন করা।
আমাদের সমাজে অনেকেরই ভুল ধারণা আছে যে, অমুসলিমদের কোরবানির মাংস দেওয়া নিষিদ্ধ। অথচ ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে অমুসলিমদের—বিশেষ করে প্রতিবেশী, সহকর্মী বা কোনো অভাবী অমুসলিমকে কোরবানির মাংস দেওয়া সম্পূর্ণ বৈধ এবং এটি ইসলামের একটি সুন্দর আমল।
পবিত্র কোরআনের সুরা মুমতাহিনার ৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা স্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘দ্বীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদের স্বদেশ থেকে বের করে দেয়নি, তাদের প্রতি সদাচরণ ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না। আল্লাহ তো ন্যায়পরায়ণদের ভালোবাসেন।’
সাহাবিদের জীবনেও এর চমৎকার উদাহরণ রয়েছে। বিখ্যাত সাহাবি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.)-এর ঘরে যখনই কোনো পশু জবাই করা হতো, তিনি বারবার জিজ্ঞেস করতেন, ‘তোমরা কি আমাদের ইহুদি প্রতিবেশীকে গোশত পাঠিয়েছ?’ তিনি বলতেন, রাসুল (সা.) প্রতিবেশীর হকের ব্যাপারে এত বেশি তগিদ দিয়েছেন যে, আমার মনে হতো প্রতিবেশীকে হয়তো ওয়ারিশ বা উত্তরাধিকারীই বানিয়ে দেওয়া হবে!
এই হাদিস ও কোরআনের আয়াত প্রমাণ করে, প্রতিবেশী অমুসলিম হলেও তার সামাজিক হক রয়েছে। কোরবানি যেমন আল্লাহর সন্তুষ্টির মাধ্যম, তেমনি এটি পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও মানবিক সম্পর্ক বৃদ্ধিরও এক দারুণ সুযোগ। তাই কোরবানির মাংস অমুসলিমদের উপহার দেওয়া সম্পূর্ণ ইসলামসম্মত এবং এটি ইসলামের সহনশীলতারই এক অনন্য প্রতিফলন।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক