রাতের খাবার শেষ করে শোবার আগে আমরা দুজন গেলাল শ্বশুরালয়ের জলাশয়ের ধারে। রাত বারোটার মতো বাজে। তখনো অনেক নিশাচর পাখি ডেকে উঠছে আপন মনে। আমরা দেখলাম অন্য এক জলাশয়কে। নিশির অন্ধকারে হালকা করে দিচ্ছে চাঁদের মৃদু আলো। আকাশে কালো কালো মেঘ। বৈশাখী বাতাসে জলাশয়ের ঢেউ এসে ধাক্কা খাচ্ছে কূলে। সঙ্গে একটানা শোঁ শোঁ আওয়াজ। সে এক ঐশ্বরিক মুহূর্ত। একবার মাহফুজার দিকে তাকালাম। রূপসী রাতের প্রকৃত রূপ দেখতে হলে এরূপ যৌবতি নিশিতে নিঃশব্দে, নীরবে জলাশয়ের ধারে দীর্ঘ সময় বউ সঙ্গে থাকলে কার না ভালো লাগে!
-চুপচাপ কী ভাবছ?
-অবারিত প্রকৃতি আর তার রূপ নিয়ে ভাবছি।
-আমাকে দেখছ না-
-তোমাকে না দেখলে প্রকৃতি দেখা সম্পূর্ণ হবে! আমরা প্রথম রাত্রে একসঙ্গে রবি ঠাকুরের গান গেয়েছিলাম। আমিই শুরু করেছিলাম,
‘কথাছিল এক তরীতে কেবল তুমি আমি
যাব অকারণে ভেসে কেবল ভেসে
ত্রিভুবনে জানবে না কেউ আমরা তীর্থগাগী
কোথায় যেতেছি কোন দেশে সে কোন দেশে’...
মাহফুজা বলল, এভাবে আমরা কতদিন বসে কবিতা শুনেছি, গান গেয়েছি, সময়ক্ষেপণ করেছি তার ইয়াত্তা নেই। অনেক রাত হয়েছে, চলো ওঠা যাক।
-ঠিক আছে চলো।
এসেই শুয়ে পড়লাম। তার পর কখন যেন ঘুমিয়ে গেছি।
খন্দকারবাড়ির মসজিদ থেকে লুৎফর মৌলভীর আজানের সুর ভেসে এল। পূর্ব গগণে ঊষার পূর্বাভাস। সুপ্তিমগ্ন মাহফুজা। ঘরের পেছনে বেতসবন। পাশেই জলাশয়। সেখানে ডানা ঝাঁপটাচ্ছে এক ঝাঁক ডাহুক-ডাহুকী। কই মাছের দল জলাশয়ে ঘাই মরছে। যদিও বৈশাখের দাবদাহে সবকিছু পুড়ছে কিন্তু সকালটা আজ অন্যরকম। শ্বশুরবাড়ির জানালায় বসে অনেকদিন পর বৈশাখীর রূপ দেখছি একবার, আরেকবার মাহফুজার ঘুম জড়ানো মুখের দিকে তাকাচ্ছি। একটুও নড়ছে না সে। আজ তার কবুল বলার দিন। এই দিনটাকে সে খুব মনে রাখে। পঁচিশে বোশেখ এলেই তার মধ্যে এক ধরনের আনন্দ কাজ করে। তিন যুগ আগে এই দিনে তার সঙ্গে প্রথম দেখা হয়েছিল গাছপালাঘেরা এ বাড়িতে। স্মৃতি ধরে রাখতে মাঝে মাঝে আমাকে সঙ্গে নিয়ে সে কবির বকুল তলায় যায়। মাসের শেষে শুক্রবার অথবা শনিবারে।
আজ বৃহস্পতিবার। আজ সে কুঠিবাড়ি যাবে। এ জন্য আগেভাগেই কুঠিবাড়ির কাছাকাছি বাবার বাড়িতে এসেছে মাহফুজা। অবশেষে নয়নের পাতা নড়তে নড়তে খুলে গেল। এক রকম লাফিয়ে ওঠে মাহফুজা। দুহাত ওপরে তুলে আড়মোড়া ভাঙে। জানালার পাশে বসে গ্রীবা বাঁকা করে মাহফুজার দিকে কোমল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি। মাহফুজা আমার দিকে প্রসন্নমুখে তাকাল একবার। বালিশের ওয়াড় ঠিক করতে করতে বলল,
-আমাকে ডাকনি কেন?
-ঘুমোচ্ছিলে তাই ডাকিনি
-নামাজ পড়েছ?
-জি পড়েছি
নবারুণ উঠি উঠি করছে। চারপাশ ফর্সা হয়ে এসেছে। মাহফুজা বিলম্ব করল না। বিছানা ছেড়ে ওজু করে এসে নামাজ পড়ল। দীর্ঘ প্রার্থনা করল সে। জায়নামাজ গোছতে গোছাতে মাহফুজা বলল,
-আমাদের পথচলার তিন যুগ পূর্তি হলো আজ। মানে আছে তোমার?
-মনে থাকবে না কেন? তোমাকে তো আল মাহমুদের ‘সোনালী কাবিন’ আর রবি ঠাকুরের ‘গল্পগুচ্ছ’ বই দুটিও দিয়েছিলাম আজকের দিনেই। আজকালকার পোলাপানে এসব বই উপহার দেয় বলে মনে হয় না। কী অদ্ভুত কবিতা! কী চমৎকার গল্প! পুকুরপাড়ে পেয়ারা তলায় বসে রবি ঠাকুরের গান শোনাতে, মনে আছে তোমার?
-রবি ঠাকুর শিলেদা বসে যেসব কবিতা লিখেছিলেন সেগুলোই বেশি শোনাতাম তোমাকে। ‘দুই বিঘা’ কবিতা বারবার আবৃত্তি করে শোনাতাম।
-‘গীতাঞ্জলি’র মিষ্টি সুরের গীতি কবিতাগুলোও তো শোনাতে।
সেসব শুধুই স্মৃতি। সেসব দিনের কথা মনে পড়লে কেবলই বেদনাহত হই। ‘দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায় রইলো না/ সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি’...। যাক সেসব কথা। একটি রহস্যময় গল্প শোনাবে বলেছিলে!
রোদ্রোজ্জ্বল সকাল। নীলাকাশে মেঘের ওড়াওড়ি। বাড়ির পালানে আমরা দুজন হাঁটছি। চোখ ফেলে দেখি বড় বড় পুরাতন আমগাছগুলো এখন আর নেই। শাশুড়িকে আমি দেখিনি। শ্বশুর গত হওয়ার পরপরই গাছগাছালি সাবার করেছে বড় দুই ভাই। মাঠের জমি-জায়গাও বিক্রি করে শেষ করেছে। সরকারি চাকরি করেও লোভের অন্ত নেই। যেকোনোভাবে বোনদের ফাঁকি দিতে হবে। এখন বড় ভাই দুটো গ্রামেও থাকে না। তারা শহরের বাসিন্দা। কারও সঙ্গে সম্পর্কও নেই। ছোট এক শ্যালক থাকে গ্রামে। শ্বশুরের চেরাগটা সেই টিম টিম করে জ্বালিয়ে রেখেছে। আমার নিবুঝ নীরবতায় মাহফুজা মুখ খুলল। সে বলল,
-কী ভাবছ?
-এই বাড়িতে এক সময় ‘চাঁদের হাট’ বসত। পঁচিশে বোশেখ এলেই অত্মীয়-স্বজনে ঘর ভরে উঠত। হৃদয়ের মিলন হতো। আর আজ খাঁ খাঁ করছে বাড়ি। নানা জাতের ফল-ফুলের গাছে ঘেরা ছায়াঢাকা মায়াময় পরিবেশ ছিল। পুকুর ভরা মাছ, গোলা ভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু ছিল। এসব কিছুই দেখি না।
-থাক ওসব কথা। কষ্ট বাড়িয়ে লাভ কী? আল্লাহ আমাদের কম সুখে রাখেনি। তোমার দুটো ছেলে সরকারি চাকুরে। সুশিক্ষিত। মানবিক। এখন তো ছেলেরা বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকতেই চায় না। তোমার ছেলেরা এখনো তোমাকে ছাড়া চলতে পারে না। বাড়িতে বাচ্চা মানুষের মতো মা মা করে গলা ফাটায়। আর কী চাই বলো? আজকের শুভদিনে তুমি আমাকে একটি গূঢ় সত্য গল্প শোনাতে চেয়েছিলে। কখন শোনাবে?
শ্যালক বউ বিন্দু পেছন থেকে ডাকল। ঘরে এসে দেখি নানা রকম নাশতা। শিলেদার দই-মিষ্টি। তেলে ভাজা পিঠা। আলো চালের রুটি। দেশি মুরগির ঝোল। তালের রস। পায়েস। ওদের সঙ্গে নিয়ে আমরা দুজনে খেলাম। পাকা রাঁধুনি। সবগুলোই টেস্টি। শ্যালক বউয়ের রান্নার প্রশংসা করলাম।
আমার প্রশংসাসূচক কথা শুনে তার মুখটা খুশিতে ছলকে উঠল। শ্যালক বউ প্রগলভ। তার মুখে কিচ্ছু বাঁধে না। আমাদের সে কখনো লাইলি-মজনু, কখনো শিরি-ফরহাদ কখনো শাহজাহান-মমতাজ বানিয়ে ছাড়ে। আমরা নাকি কেউ কারও ছাড়া থাকতে পারি না।
বিন্দু খন্দকার ভারী মিষ্টি মেয়ে। শত কষ্টেও ওর মুখে হাসি লেগে থাকে। ওর কথা শুনে আমরাও হাসি। বিরাট বাড়িটাকে সে একাই গুছিয়ে রেখেছে। বাড়িতে মেহমান এলে ও খুব খুশি হয়। শ্বশুরের পাঁচ মেয়ের সন্তান-সন্ততি, নাতি-পুতি সবাই বিন্দুর কাছে আসে। সেও সাদরে গ্রহণ করে তাদের।
নাশতা শেষ করে বিন্দুকে বলি,
-তুমি কি আমাদের সঙ্গে শিলেদা যাবে?
-না ভাই, আপনারা ঘুরে আসুন। বাড়িতে অনেক কাজ। ছোট ছোট বাচ্চাদের নিয়ে খুব বিপদে আছি। কাজের লোকও পাওয়া যায় না। দুপুরের পরপরই চলে আসবেন। একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করব।
-ঠিক আছে বিন্দু। মাহফুজা তুমি পোশাক বদলাবে না, এ পোশাকেই যাবে?
-এ বয়সে আর কী পোশাক বদলাব? যা পরেছি তাতেই চলবে। বাইরে যেতে হলে তো সব সময় বোরকা পরেই বের হই। আজও তাই বেরোব।
মাহফুজা বরাবরই পোশাকসচেতন। সে ভীষণ মাজির্ত পোশাক পরে। কালচার বোঝে। তবে নিজস্ব রুচিতে। সভ্যতা বোঝে তার মতো করে। এসব ব্যাপারে আমি কখনো নাক গলাইনি। তিন যুগে তার সঙ্গে আমার কোনো ছবি ছিল না। কদিন আগে ছোট ছেলে রোহান আমাদের যৌথ একটি ছবি অনুনয়-বিনয় করে তুলেছে।
শিলেদা সম্পর্কে মাহফুজার আলাদা আবেগ। আমরা পথে নামি। একটি পাখিভ্যানে আমরা কুঠিবাড়ির উদ্দেশে চলছি। আমরা যতই অগ্রসর হচ্ছি ততই নিরাভরণ প্রকৃতি আমাদের হাতছানি দিচ্ছে। দেখতে পাই পদ্মার উঁচু পাড়, শুনতে পাই নদীর স্রোতের কলধ্বনি। শিলাইদহের পুরো অবয়বজুড়েই রবি ঠাকুরের ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ কবিতার প্রতিফলন দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। মনও ভালো হয়ে গেল কতিপয় পঙ্ক্তি স্মরণ করে- ‘জাগিয়া উঠেছে প্রাণ/ ওরে উথলি উঠেছে বারি, ওরে প্রাণের বাসনা প্রাণের আবেগ রুধিয়া রাখিতে নারি’।
পাখিভ্যান এসে ঠেকেছে কুঠিবাড়ির প্রধান ফটকে। ওখানে সবাই আমার পূর্ব পরিচিত। বিশ্বকবির জন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে আলোচক থাকার সুবাদে কাস্টডিয়ানসহ সবাই আমাকে চেনে। তারা আমাকে ভেতরে নিয়ে গেল। প্রবেশ পথের ফুলের গাছগুলো হেলে-দুলে যেন স্বাগত জানাচ্ছে। মাহফুজা বলল, সকালে তেমন ভিড় নেই। পঁচিশে বোশেখ বলে কথা! বেলা বাড়বে আর মেলাও ভরে উঠবে। তখন আর কথাও বলতে পারবে না। চলো আমরা বকুলতলায় গিয়ে বসি। কবে থেকে বলছ প্রেমের গল্প শোনাবে, আজ না শুনে আর ছাড়ছিনে।
মাহফুজার মনটায় প্রথম যৌবনের চঞ্চলতা। সে দৌড়ে গিয়ে এক কিশোরীর হাত থেকে একগুচ্ছ বকুল ফুল কিনে এনে রবি ঠাকুরের ‘বোষ্টমী’র মতো আমার হাতে দিয়ে মাথা উঁচু করে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করল।
ইতিউতি অবলোকন করে দেখলাম পাশে কেউ নেই। মাহফুজাকে তুলে বুকে আগলে ধরলাম। ওর চোখ বেয়ে আনন্দাশ্রু নামল। ওর একটি হাত মুষ্টিবদ্ধ করে রবি ঠাকুরের বকুলতলায় গিয়ে বসলাম। অদূরে মাদুর পেতে একজন বাউল একতারা বাজিয়ে শিলাইদহের লোককবি গগন হরকরার গান গেয়ে চলেছে- ‘আমি কোথায় পাব তারে/ আমার মনের মানুষ যে রে...’।
মাহফুজা এবার নাছোড়। তিন যুগ ধরে তাকে বলে আসছি তোমাকে একটি রহস্যময় প্রেমের গল্প শোনাব। সে দীর্ঘ অপেক্ষায় আছে। বহুবার সে শুনতে চেয়েছে। বলা হয়ে ওঠেনি। বড়ুরিয়ার বাসা থেকে বেরোনোর সময় তাকে বলেছি, শিলাইদহ গিয়ে গল্পটা শোনাব। আজ সে অধীর অপেক্ষায় কুঠিবাড়ির পুকুরঘাটে বকুলতলায় বসে আছে।
-মাহফুজা, গল্পটা তাহলে শুনবেই।
-হুম। অবশ্যই শুনব।
-তাহলে শোনো, আশির দশকের কথা। আমি তখন হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা দেব। শিক্ষক-শিক্ষার্থী মিলে কলেজ থেকে বনভোজন করতে যাবে শিলাইদহ কুঠিবাড়িতে। সে দলে নাম লেখালাম। ফেব্রুয়ারির কোনো এক সকালে রওনা দিলাম সবাই। কাঁচা রাস্তা। হেঁটে যেতে হবে। মালপত্র সব ঘোড়ার গাড়িতে। ছেলেমেয়েরা দল বেঁধে যে যার মতো হাঁটছে। রাস্তার দুধারে মাঠজুড়ে চৈতালী ফসলের সমারোহ। মৃদু-মন্দ হাওয়া এসে চুল উড়িয়ে এলোমেলো করে দিচ্ছে। শিকরামপুর ছেড়ে ভবানীপুর, তার পর নাউথি। হাঁটছি আর হাঁটছি। হাঁটতে হাঁটাতে শিলাইদহের কাছাকাছি গ্রাম আড়পাড়ায় এসে গাছের ছায়ায় দাঁড়ালাম। যেখানে দাঁড়ালাম তার পাশেই একটি বিরাট বড় বাড়ি। রাস্তার ধারে পাকা প্রস্রাবখানা। অনতিদূরে বাথরুম। দুই পাশে দুটো পুকুর। বাড়িটা বেড়া দিয়ে ঘেড়া। মেয়েদের গোসল করার জন্য পুকুরের মাঝ পর্যন্ত বেড়া দেওয়া। বাড়িতে প্রচুর গাছগাছালি। আম, জাম, লিচু, নারিকেল, তাল, বেল, পেয়ারা, কামরাঙা, জলপাই, পানিফল। কী নেই বাড়িতে? অভিজাত একটি বাড়ি। আমি, আনছার আর অরুণ দাঁড়িয়ে দম নিচ্ছি। বাড়িটা আনছারের পূর্ব পরিচিত। কথা প্রসঙ্গে আনছার বলল, এ বাড়ির কর্তা একজন খান্দানি পীর। কলকাতার আলিয়ায় পড়েছেন। শিক্ষকতা করতেন। ভদ্রলোক আনছারের বাবার পীর। আনছার জানাল, কৈশোরে বাবার সঙ্গে পাকা লিচু নিয়ে সে বহুবার এসেছে এ বাড়িতে। কিন্তু ওই খানকাঘর ছাড়া ভেতরে ঢোকার অনুমতি কারও নেই। পীর সাহেব ছাড়া কাউকে চেনে না সে। আনছার আমার দিকে কেন যেন তাকিয়ে বলল,
-জানো কবি, শুনেছি এ বাড়িতে এখনো অবিবাহিত দুটো মেয়ে আছে। এসএসসি দেবে অথবা দিয়েছে। আনছারের মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে বললাম, এ বাড়ির দুটো মেয়ের যেকোনো একটিকে বিয়ে করা যায় না?
আনছার মৃদুভাষী। সে দুষ্টুমির স্বরে বলেছিল, বলে দেখতে পার। তবে সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। অরুণ তো হেসেই কুটিকুটি। তাচ্ছিল্য করে বলেছিল,
-‘কুঁজেরও মন কয় চিৎ হয়া শুতি’। ওর কথা শুনে আমার গা জ্বলে যাচ্ছিল।
-আড়পাড়ার কোন বাড়ির কথা বলছ? এ গাঁয়ে আমার আব্বা ছাড়া কেউ তো পীর নেই। তার পর কী হলো?
-তার পর পীরবাড়ির দুটো অদেখা মেয়ের কল্পিত ছবি বুকে ধারণ করে শিলাইদহ গেলাম। হলুদ বিকেলে ঘরে ফেরার পালা। যে যার মতো হাঁটছে।
ফেরার পথে আবার পীর বাড়িতে দাঁড়ালাম। আমার ইচ্ছেতেই আনছার আর অরুণ দাঁড়াল। যদি কোনোভাবে মেয়ে দুটোকে এক নজর দেখা যায়। পানি পিপাসায় বুকটা শুকিয়ে গেছে। চিৎকার করে ডাকাডাতিতে ছোট্ট একটি মেয়ে বেড়িয়ে এল। ভারী সুন্দর দেখতে মেয়েটি। নাম জিজ্ঞেস করলাম। মেয়েটি বলল, আমার নাম মিতা। আমি বললাম, পানি খাওয়াবা আমাদের। মিতা বলল, খানকা ঘরের বেঞ্চে বসুন। আমি পানি আনছি।
তকতকে ঝকঝকে কাচের জগে করে পানি নিয়ে এল মিতা। আমরা খেলাম। এবার ফেরার পালা। কিন্তু কোথায় পীরবাড়ির মেয়েরা! এত সহজে যে এ বাড়ির মেয়েদের দেখা পাওয়া যাবে না সে বোধটুকুও লোপ পেয়েছিল আমার। বুকের ভেতর পীরবাড়ির মেয়ে দুটোর কল্পিত ছবি নিয়ে সেই যে ফিরেছি, তার পর আর ওই বাড়ির কথা মনে নেই।
-গল্পে রহস্য আছে, প্রেম কই? তার পর কী হলো?
-তার পর ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে দুটি বছর গত হয়েছে। আমি বেসরকারি একটি ব্যাংকে চাকরি নিয়ে মানিকগঞ্জের সিংগাইর থানার বায়রায় চলে যাই। চলছে ভালোই। গ্রাম দেখি, সদস্যদের কাজ দেখি। প্রকল্প দেখি, তা তুলে ধরি ব্যাংক পরিচালিত পত্রিকায়। প্রশিক্ষণকাল চলছে। ম্যানেজার আমাকে কোনো কাজের আদেশ করেন না। এর পেছনে একটি কারণ আমি বুঝেছিলাম।
-কী কারণ?
-সেটাই তো বলছি। খুব সকালে ব্যাংকে গেছি। গিয়ে দেখি ম্যানেজার ব্যাংক-সহকারী জ্যোতিকে জড়িয়ে ধরে চুমো খাচ্ছে। আমাকে এত সকালে ব্যাংকে দেখে দুজনেই বিব্রত হলো। লজ্জায় লাল হয়ে উঠল দুজনের মুখ। আমি কী করব ভেবে পাচ্ছি না। মাথা নিচু করে আমার চেয়ারে বসে পড়লাম। জ্যোতি আপা বেরিয়ে গেল কিস্তি তুলতে। ম্যানেজার কাছে ডেকে বলল,
-ছোট ভাই জ্যোতিকে আমি ভালোবাসি। তুমি যা দেখেছে কাউকে বলো না।
-জি স্যার।
তার পর থেকে জ্যোতি আপা ফেরার পথে আমার জন্য নিয়ে আসে চকলেট আর ম্যানেজার বিকেলে বায়রা বাজারে ডেকে নিয়ে নাশতা করান।
-এই কি তোমার গূঢ় গল্প, রহস্যময় গল্প, সত্য গল্প?
-তাহলে শোনো সেই গল্প। হঠাৎ বাবা মানিকগঞ্জে আমার কাছে গিয়ে হাজির। গিয়ে বললেন, তোমার বিয়ে ঠিক করেছি। বাবার কথা শুনে লজ্জা পাচ্ছিলাম। তাকে জিজ্ঞেস করার সাহস হলো না, কোথায় কার সঙ্গে বিয়ে ঠিক করেছেন। বাবা ম্যানেজারের কাছে গিয়ে তিন দিনের ছুটি নিলেন। চলে এলাম বাড়িতে। বাড়িতে এসে শুনলাম শিলাইদহে বিয়ে ঠিক হয়েছে। পরদিন সকালে বাবা, বড় দুলাভাই, আনছার, অরুণকে সঙ্গে নিয়ে শিলেদার উদ্দেশে রওনা দিলেন। পায়ে চালানো ভ্যান এসে ঠেকল পীরবাড়ির সামনে। বাড়ির গেটের দিকে বাবাকে এগিয়ে যেতে দেখে বুকের মধ্যে নড়েচড়ে উঠল। এ বাড়ির মেয়েকে তো আমি বিয়ে করতে চেয়েছিলাম! স্রষ্টা কি শুনেছিলেন আমার কথা?
-তার পর?
-পীরবাড়ির রীতি অনুযায়ী আমাকে তোমার সামনে উপস্থিত করা হলো। আমার সামনে এসে হাওয়ার মতো যে ভুবনহারা হাসি তুমি দিলে তা দেখে যেন ছালছাবিলও হেসে উঠল। আর আমিও গন্ধমের লোভে আটকে গেলাম।
-তার পর?
-তার আর পর নেই...। সেদিনের পর থেকে, হে মাহফুজা তুমি আমার/ ‘তোমায় আমায় দেখা শতবার’।