ঢাকা ১৬ ফাল্গুন ১৪৩০, বৃহস্পতিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
Khaborer Kagoj

পেঁয়াজের দাম এক বছরে আকাশচুম্বী

প্রকাশ: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২:১১ পিএম
পেঁয়াজের দাম এক বছরে আকাশচুম্বী
খবরের কাগজ গ্রাফিকস

আড়তে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৯৫-১০০ টাকা কেজি। পাইকারিতে ১০০-১০৬ টাকা। সেই পেঁয়াজ খুচরা বাজারে ভোক্তাদের কিনতে হচ্ছে ১০০-১১০ টাকা কেজি। খুচরা বাজারের এই দাম গত বছরের তুলনায় কেজিতে ৮০ টাকা বা ২০০ শতাংশ বেশি। কারণ গত বছর এই সময়ে পেঁয়াজ ৩০-৪০ টাকা কেজি বিক্রি হয়েছে। 

বিক্রেতারা বলছেন, মুড়িকাটা শেষ পর্যায়ে। ১৫ দিনের মধ্যে হালিকাটা (সিজন) পেঁয়াজ উঠে যাবে। তখন দাম ৪০-৫০ টাকায় নেমে যাবে। রমজান মাসে অর্ধেকে নেমে যাবে দাম। আলুও বেশি দামে ভোক্তাদের কিনতে হচ্ছে। কারণ বর্তমানে ৩৫ টাকা কেজি আলু বিক্রি হলেও গত বছরের এই সময়ে ২২-২৫ টাকা কেজি খুচরা পর্যায়ে বিক্রি হয়েছে। কেজিতে বেড়েছে ১৫ টাকা বা ৬০ শতাংশ। 

তবে বছরের ব্যবধানে ডিমের দাম তেমন বাড়েনি। বর্তমানে ১৩৫ টাকা ডজন বিক্রি হচ্ছে। গত বছরেও সামান্য বেশি দামে ক্রেতাদের ডিম কিনতে হয়েছে। 

রবিবার (১১ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে সংশ্লিষ্ট বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এবং সরকারি সংস্থা টিসিবির ওয়েবসাইট ঘেঁটে এমনই তথ্য পাওয়া গেছে।

দেশে পর্যাপ্ত পেঁয়াজ উৎপাদন হলেও ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ ঘোষণা করলে বাংলাদেশে বাড়তে থাকে দাম। এই দাম কেজিতে ২০০ টাকাও হয়েছে। বাধ্য হয়ে সরকার দেশি পেঁয়াজের কেজি ৬৫ টাকা বেঁধে দিলেও তার ধারেকাছে নেই। মুড়িকাটা পেঁয়াজের দাম বাড়ার পর ৮০-৯০ টাকায় নামে। কিন্তু হঠাৎ করে এ সপ্তাহে বেড়ে যায়। খুচরা পর্যায়ে ভোক্তাদের কেজিতে ১২০-১৩০ টাকায় কিনতে হয়েছে। বিভিন্ন মোকাম থেকে রাজধানীতে আমদানি কমে যাওয়ায় এভাবে হঠাৎ করে দাম বেড়ে যায় বলে বিক্রেতারা জানান।
 
তবে গতকাল আবার ঢাকার বিভিন্ন বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহ বেড়ে গেলে দাম কেজিতে ১০-২০ টাকা কমে। এর ফলে আড়ত থেকে খুচরা পর্যায়ে কম দামে বিক্রি হতে দেখা গেছে। দামের ব্যাপারে জানতে চাইলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারের মিনহাজ ট্রেডার্সের মো. খলিল খবরের কাগজকে বলেন, পেঁয়াজের দাম কমেছে। আড়তে এক কেজি পেঁয়াজের দাম এখন ৯৫-১০০ টাকা, যা আগের দিন ১১০-১১৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে। তবে মেহেরপুরের পেঁয়াজ আরও কম দামে ৭০ টাকায় কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। আড়তে কমায় পাইকারি পর্যায়েও কমেছে দাম। প্রতি পাল্লা ৪৫০-৫৩০ টাকা বা ৯০-১০৬ টাকা কেজিতে বিক্রি করা হচ্ছে বলে পাইকারি বিক্রেতারা জানান।
 
সেই দামের পেঁয়াজ ঢাকার বিভিন্ন বাজারে ১০০-১১০ টাকা কেজিতে বিক্রি করা হচ্ছে বলে খুচরা বিক্রেতারা জানান। জানতে চাইলে মোহাম্মদপুরের টাউন হল বাজারের রফিক বলেন, ‘১০০-১১০ টাকায় পেঁয়াজের কেজি বিক্রি করা হচ্ছে; যা আগের দিন ১১০-১২০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। আড়তে বেশি দাম। তাই আমাদেরও বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।’ এদিকে কারওয়ান বাজারে এই দামে পেঁয়াজ বিক্রি করা হচ্ছে বলে বিক্রেতারা জানান। এই বাজারের খুচরা বিক্রেতা হালিম, লিটন, তুহিনসহ অন্যরা জানান, আগের দিন ১১০-১২০ টাকা কেজি বিক্রি করা হলেও গতকাল রবিবার ১০০-১১০ টাকায় বিক্রি করা হয়। সরবরাহ বেশি হলে দাম আরও কমবে।
 
তবে বিভিন্ন বাজারে পেঁয়াজের দাম কমলেও পাড়া-মহল্লা বা অলিগলিতে তেমন কমেনি। গতকালও মোহাম্মদপুরের স্বপ্নধারা হাউজিং বাজারে এক কেজি পেঁয়াজ ১৩০ টাকায় কিনতে হয়েছে বলে আসিফ নামের একজন ক্রেতা জানান। 

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সূত্র জানায়, দেশে পেঁয়াজের চাহিদা ২৫ লাখ টনের মতো। তবে রমজানে পেঁয়াজের চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। এই মাসে প্রায় পাঁচ লাখ টন লাগে। বর্তমানে ১০০-১২০ টাকা কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হলেও টিসিবি বলছে, গত বছরের এই দিনে ৩০-৪০ টাকা ছিল। বছরের ব্যবধানে কেজিতে বেড়েছে ৮০ টাকা বা ২০০ শতাংশ। 

পেঁয়াজের উৎপাদন বেশি হলেও এত দাম কেন? জানতে চাইলে আড়তদার খলিল বলেন, রমজান মাসের আগেই নতুন পেঁয়াজ উঠে যাবে। তখন দাম কমে যাবে। ৪০-৫০ টাকায় নেমে যাবে। অন্যান্য আড়তদারও একই তথ্য জানান। তারা বলছেন, দেশে প্রচুর পেঁয়াজের উৎপাদন হয়েছে। মুড়িকাটার মৌসুম শেষ হওয়ায় কয়েক দিন থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ায় দাম বেড়ে গেছে। তবে রবিবার আবার সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় দাম কমতে শুরু করেছে। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে পেঁয়াজের দাম অর্ধেকে নেমে যাবে। 

পেঁয়াজের পথেই রয়েছে আলু। দাম বেড়ে ৫০-৬০ টাকা কেজি হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে সরকার ৩৫ টাকা কেজি দাম বেঁধে দেয়। তার পরও ভরা মৌসুমেও কমছে না দাম। গত বছরের এই সময়ে ২০-২৫ টাকা কেজি বিক্রি করা হলেও গতকাল ৩৫-৪০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা গেছে। টাউন হল বাজারের খুচরা বিক্রেতা রফিকসহ অন্য খুচরা বিক্রেতারা বলেন, দাম বেশি। ৩৫-৪০ টাকা কেজি। অথচ সরকার অনেক আগে এর দাম ভোক্তাপর্যায়ে ৩৫-৩৬ টাকা বেঁধে দিয়েছে। 

এদিকে কারওয়ান বাজারেও দেখা গেছে আলুর দাম বেশি। বিক্রমপুর স্টোরের সবুজসহ অন্য আড়তদাররা জানান, ২৫-২৭ টাকায় এক কেজি আলু বিক্রি করা হচ্ছে। সেই আলু পাইকারি পর্যায়ে ১৫০ টাকা পাল্লা বলে সেলিমসহ অন্যান্য পাইকারি বিক্রেতা জানান। ভোক্তাদের কাছে ৩৫ টাকা কেজি বিক্রি করা হচ্ছে বলে হালিমসহ বিভিন্ন বাজারের খুচরা বিক্রেতারা জানান। 

টিসিবি বলছে, গত বছরের এই দিনে আলু বিক্রি হয়েছে ২২-২৫ টাকা কেজি। বছরের ব্যবধানে কেজিতে বেড়েছে ১৫ টাকা বা ৬০ শতাংশ। বিক্রেতারা বলছেন, ‘দাম কমবে কি না তা বলা যাবে না। কারণ কত উৎপাদন হচ্ছে তা জানি না। তবে আমদানি বেড়ে গেলে দাম কমবে। এটা পচনশীল পণ্য। ধরে রাখা যাবে না।’ 

এদিকে আগে কম দামে ডিম বিক্রি হলেও বছরখানেক থেকে আর কমছে না। ১৩০-১৪০ টাকা ডজনে আটকে আছে। কয়েকটা কোম্পানি সিন্ডিকেট করে ডিমের দাম গত বছরের আগস্টে হঠাৎ করে বাড়িয়ে দেয়। তা বাড়তে বাড়তে ১৭০ টাকা ডজন ঠেকে। এ নিয়ে হইচই পড়লে অনেক পরে পেঁয়াজ, আলুর সঙ্গে ডিমের দাম সর্বোচ্চ ১৪৪ টাকা ডজন বেঁধে দেয়। তার থেকে কম দামেই ১২৫-১৩০ টাকা ডজন ডিম বিক্রি হয়। কিন্তু নিয়ম অমান্য করে অস্বাভাবিক দামে বিক্রি করায় ডায়মন্ড এগ লিমিটেড ও সিপি বাংলাদেশ কোম্পানিকে জরিমানা করেছে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন (বিসিসি)। এই দুই কোম্পানিকে সাড়ে ৩ কোটি টাকা জরিমানা করার পরই আবার বেড়ে গেছে ডিমের দাম। বর্তমানে কিছুটা কমে ১৩৫-১৪০ টাকায় ডিমের ডজন বিক্রি করা হচ্ছে বলে বিক্রেতারা জানান। 

টিসিবি বলছে, গত বছরের এই দিনেও ৪৫-৪৭ টাকা হালি বা ১৪১ টাকা ডজন বিক্রি হয়েছে। বছরের ব্যবধানে ডজনে বেড়েছে ৬ টাকা বা ৪ শতাংশ। ডিম বিক্রেতারা বলছেন, করপোরেটরা না কমালে খুচরা বাজারে কমবে না ডিমের দাম। জানতে চাইলে কারওয়ান বাজারের ডিম বিক্রেতা রাফসান বলেন, ‘বর্তমানে ১৩৫-১৪০ টাকা ডজন বিক্রি করা হচ্ছে। গোড়ায় কমালে আমরাও কম দামে বিক্রি করতে পারব।’

দুর্বিষহ শব্দদূষণ, বেপরোয়া হর্ন

প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০১:১৫ পিএম
দুর্বিষহ শব্দদূষণ, বেপরোয়া হর্ন

রাজধানীর আসাদ অ্যাভিনিউতে প্রতিদিনই শিক্ষার্থীরা যখন রাস্তা পার হন, তখন অনেককেই দেখা যায় দুই হাতে কান চেপে ধরতে। বয়স্ক মানুষ অস্থির হয়ে দিগ্বিদিকশূন্য হয়ে পড়েন। সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে এমন পরিস্থিতি। একই রকম দৃশ্য চোখে পড়ে ফার্মগেট, বাংলামোটর, মহাখালী, গুলিস্তান, যাত্রাবাড়ী, গাবতলী, মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকার ব্যস্ত সড়কে।

বছিলায় ছোট বস্তির ঘরে বড় ভাইয়ের পরিবারের সঙ্গে থাকে ১৫ বছর বয়সী পরিবহন শ্রমিক মো. রাহুল হোসেন। প্রতিদিন সকাল ৭টায় বেরিয়ে আবার ঘরে ফিরতে বেজে যায় রাত ১১টা-১২টা। চার বছর ধরে তার কাজ মোহাম্মপুর টু ফার্মগেট রুটের টেম্পোতে। গত কয়েক মাস ধরেই তার মনে হচ্ছে কানে ঠিক মতো শুনতে পাচ্ছেন না। সেই সঙ্গে সারাক্ষণ মাথার মধ্যে ঝিমঝিম করতে থাকে। বিষয়টি জানার পর বড় ভাই মকবুল হোসেন তাকে নিয়ে যান মহাখালীর নাক, কান, গলা ইনস্টিটিউটে। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ধরা পড়ে তার শ্রবণযন্ত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেই সঙ্গে তার মস্তিষ্কের কিছু কোষেও সমস্যা তৈরি হয়েছে।

হাতিরপুল কাঁচাবাজারের কাছেই ছোট্ট চায়ের দোকানে মায়ের সঙ্গে প্রতিদিন অনেকটা সময় কাটায় ৪ বছরের শিশু সুমাইয়া। কিছুদিন ধরেই ঘুমের মধ্যে লাফিয়ে ওঠে কান চেপে ধরে শিশুটি কান্নাজুড়ে দিচ্ছে। সারা রাত আর তার ঘুম হয় না। এক দিন তাকে নিয়ে যাওয়া হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের শিশু বিভাগে। প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ওই বিভাগ থেকে তাকে পাঠানো হয় শ্রবণ বিভাগে। প্রতিদিনের ইতিহাস শুনে ও পরীক্ষা করে চিকিৎসকরা জানান, অসহনীয় মাত্রার শব্দদূষণের প্রভাবে এই পরিণতি হয়েছে শিশুটির।

স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের নাক, কান, গলা বিভাগের অধ্যাপক মনিলাল আইচ লিটু খবরের কাগজকে বলেন, দেশে বিশেষ করে ঢাকা মহানগরীতে শব্দদূষণ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা মানুষের কেবল শ্রবণশক্তিই নয়, শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গেরও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অন্য অনেক রোগের কারণও হয়ে উঠেছে। এমনকি হৃদরোগ, স্মৃতিভ্রম, স্নায়ুর সমস্যাও হচ্ছে মানুষের। তিনি জানান, সাধারণ মানুষের পাশাপাশি বিশেষ কিছু পেশার মানুষের মধ্যে শব্দদূষণের ক্ষতিকর প্রভাব খুবই বেশি দেখা যাচ্ছে। 

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. এহসান খবরের কাগজকে বলেন, ‘শব্দদূষণের কারণগুলো আমরা সবাই জানি। এটা নিয়ন্ত্রণে আইন থাকলেও তা যথাযথভাবে কার্যকর হচ্ছে না। এমনকি প্রয়োজনে আরও কঠোর কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়াও এখন জরুরি। জনসচেতনতাও বাড়াতে হবে।’ 

এদিকে শব্দদূষণ নিয়ে দেশে খুব কাছাকাছি তেমন কোনো গ্রহণযোগ্য গবেষণা, তথ্য-উপাত্তও হয়েছে কম। তবে সংশ্লিষ্টদের পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে নাক, কান, গলা বিভাগের কয়েকজন চিকিৎসক খবরের কাগজকে জানান, দিনে দিনে দেশে শ্রবণশক্তি লোপ পাওয়া মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, যা একসময়ে বড় এক জনগোষ্ঠীর বিপদ হয়ে দাঁড়াবে।

সর্বশেষ ২০২২ সালের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সের উদ্যোগে ‘বাংলাদেশের রাজপথে শব্দদূষণ এবং শব্দদূষণের কারণে রাজপথে কর্মরত পেশাজীবীদের শ্রবণ সমস্যা’ নিয়ে গবেষণার আওতায় ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন, রাজশাহী, কুমিল্লা এবং সিলেট সিটি করপোরেশনের শব্দদূষণের মাত্রা পরিমাপ করা হয়। এ সময় ট্রাফিক পুলিশ ও সার্জেন্ট, বাসচালক ও হেলপার, পিকআপচালক, সিএনজিচালক, লেগুনাচালক, দোকানদার, মোটরসাইকেল, রিকশাচালক এবং প্রাইভেটকারচালক-শ্রমিকদের শ্রবণশক্তি পরিমাপ করা হয়েছে।

গবেষণার ফলাফলে জানানো হয়, শ্রবণশক্তি কম থাকা মানুষের মধ্যে ৪২ শতাংশই রিকশাচালক। বাকিদের মধ্যে ৩১ শতাংশ ট্রাফিক পুলিশ, ২৪ শতাংশ সিএনজিচালক, ২৪ শতাংশ দোকানদার, ১৬ শতাংশ বাসচালক, ১৫ শতাংশ প্রাইভেটকারচালক এবং ১৩ শতাংশ মোটরসাইকেলচালক। 

বিশেষজ্ঞরা জানান, শব্দদূষণের সঙ্গে বধিরতার সম্পর্ক রয়েছে। আকস্মিক তীব্র শব্দে অন্তকর্ণের ক্ষতির কারণে মানুষ আংশিক বা সম্পূর্ণ বধির হয়ে যেতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, প্রতি এক হাজার জনের মধ্যে ১ জন জীবনের কোনো না কোনো সময় বধির হয়ে যেতে পারে। শব্দদূষণ থেকে বধিরতা ছাড়াও নানা জটিল রোগের সৃষ্টি হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, ৩০টি কঠিন রোগের কারণ ১২ রকমের দূষণ, যার মধ্যে শব্দদূষণ অন্যতম। শব্দদূষণের কারণে শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ছাড়াও রক্তচাপ বৃদ্ধি, হৃদস্পন্দনে পরিবর্তন, হৃৎপিণ্ডে ও মস্তিষ্কে অক্সিজেন কমে যেতে পারে। এ জন্য শ্বাসকষ্ট, মাথাঘোরা, বমি বমি ভাব, বমি হওয়া, দিক ভুলে যাওয়া, দেহের নিয়ন্ত্রণ হারানো, মানসিক ক্ষতিসহ বিভিন্ন ধরনের অসুস্থতা সৃষ্টি করে। 

বিভিন্ন তথ্য খুঁজে দেখা যায়, শব্দদূষণের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষার জন্য বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়। বিশেষ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং আমেরিকান স্পিচ অ্যান্ড হিয়ারিং অ্যাসোসিয়েশন (আশা) গ্রহণযোগ্য শব্দের মাত্রা নির্ধারণ করে দিয়েছে। শব্দের মাত্রা নির্ধারিত মানমাত্রার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সফলতা দেখিয়েছে। বাংলাদেশেও শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০০৬ প্রণয়ন করা হয়েছে, যেখানে শব্দের মানমাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া আছে। 

২০১৭ সালে সরকারের পরিবেশ অধিদপ্তরের এক জরিপ কার্যক্রমের মাধ্যমে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রংপুর, খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী এবং ময়মনসিংহ শহরে শব্দদূষণের মাত্রা পরিমাপ করা হয়েছিল। তখন ঢাকায় ১১ লাখ ৩৪ হাজার বার, চট্টগ্রামে ৬ লাখ ৬৪ হাজার ২০০ বার, সিলেট শহরে ৩ লাখ ২৪ হাজার, খুলনায় ৩ লাখ ২৪ হাজার, বরিশাল শহরে এবং ২ লাখ ৪৩ হাজার, রংপুরে ২ লাখ ৪৩ হাজার, রাজশাহীতে ১ লাখ ৬২ হাজার এবং ময়মনসিংহ শহরে ২ লাখ ৪৩ হাজার বার পর্যবেক্ষণ করা হয় বিভিন্ন এলাকা ভাগ করে। এর আওতায় জনমত জরিপও ছিল।

জরিপের জন্য নির্ধারিত প্রতিটি স্থানে ৯০ জন করে ব্যক্তির মতামত নেওয়া হয়। নির্ধারিত স্থানগুলোতে শব্দের উৎস পর্যবেক্ষণ ও গাড়ির হর্ন গণনাও করা হয়েছে। 

জরিপের ফলাফল সম্পর্কে পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা, বরিশাল, রংপুর, রাজশাহী এবং ময়মনসিংহের প্রতিটি শহরের নির্ধারিত স্থানগুলোতে বিধিমালা নির্দেশিত শব্দের মানমাত্রার চেয়ে শব্দের মাত্রা দ্বিগুণ থেকে তিন গুণ ছিল। আটটি শহরের রেকর্ড করা আকস্মিক শব্দের মাত্রার (ডেসিবল) ভিত্তিতে প্রথম (বেশি শব্দ) ও শেষে (কম শব্দ) অবস্থানকারী স্থানগুলো যথাক্রমে ঢাকার ‘পল্টন মোড়’ ও মিরপুর-১ নম্বর সেকশন: চট্টগ্রামে ‘বঙ্গবন্ধু হাসপাতালের সামনে’ ও ‘পোর্ট কলোনি মোড়’। সিলেটে ‘করিমউল্লাহ মার্কেট’ ও ‘কোর্ট পয়েন্ট’। খুলনায় ‘ডাক বাংলো মোড়’ ও ‘সরকারি মহিলা কলেজ মোড়’; বরিশালে ‘কাশিপুর বাজার’ উল্লেখযোগ্য ছিল। প্রতিটি শহরেই শব্দের উৎস হিসেবে যানবাহন এবং হর্ন শব্দদূষণের জন্য প্রধানত দায়ী বলে উঠে আসে। এ ছাড়া নির্মাণকাজ, সামাজিক অনুষ্ঠান, মাইকিং, জেনারেটর এবং কলকারখানা ইত্যাদি শব্দদূষণের উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ওই জরিপের সুপারিশে জানানো হয়, শহরগুলোতে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে আইনের বাস্তবায়ন, প্রতিপালন, পরিকল্পনা, প্রযুক্তির ব্যবহারে রাষ্ট্রীয়, প্রাতিষ্ঠানিক, সামাজিক ও ব্যক্তি পর্যায়ে পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।

ওই জরিপের ফলাফল অনুসারে শব্দের মাত্রা পরিমাপের মাধ্যমে ঢাকা শহরের ৭০টি স্থানের বর্তমান পরিস্থিতি উঠে আসে। ঢাকার প্রতিটি স্থানেই শব্দের মাত্রা শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০০৬ নির্দেশিত মানমাত্রা অতিক্রম করেছিল তখনই। প্রাপ্ত ফলাফল অনুযায়ী নির্ধারিত স্থানগুলোতে শব্দের মাত্রা নির্ধারিত মানমাত্রার চেয়ে দ্বিগুণ থেকে তিন গুণ। ঢাকা শহরের মধ্যে নির্বাচিত স্থানগুলোর মধ্যে ফার্মগেটের কেন্দ্রস্থলে সবচেয়ে বেশি শব্দদূষণ ছিল। শব্দদূষণের দিক থেকে উত্তরা ১৪ নং সেক্টরের ১৮ নং সড়ক সর্বনিম্ন অবস্থানে থাকলেও সেখানেও শব্দের মাত্রা নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে দ্বিগুণ ছিল। 

অধ্যাপক ড. মো. এহসান বলেন, আগের তুলনায় এখন অনেক বেশি শব্দদূষণ হচ্ছে। কারণ নির্মাণ কার্যক্রম বেড়েছে আবার প্রতিদিন পরিবহন চলাচলের পরিমাণও বেড়েই চলছে।

এদিকে শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০০৬ অনুসারে আবাসিক এলাকার জন্য শব্দের নির্ধারিত মানমাত্রা দিনে ৫৫ এবং রাতে ৪৫ ডেসিবল। এর বিপরীতে মধ্যে আগের জরিপ অনুসারেই রাজধানীর শাজাহানপুরে সর্বোচ্চ শব্দমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল দিনের বেলায় সর্বোচ্চ ১২৮ দশমিক ৪ ডেসিবল আর সর্বনিম্ন ছিল ৫০ দশমিক ৭ ডেসিবল; রাতব্যাপী শব্দের মাত্রা ছিল ১৩৩ দশমিক ৬ ডেসিবল। অন্যদিকে সবচেয়ে কম শব্দদূষণ থাকা উত্তরা ১৪ নং সেক্টরেও শব্দের মাত্রা যথাক্রমে সর্বোচ্চ ৯৯ দশমিক ৬ ডেসিবল ছিল। 

বিধিমালা অনুসারে মিশ্র এলাকার জন্য শব্দের নির্ধারিত মানমাত্রা দিনে ৬০ এবং রাতে ৫০ ডেসিবল। এ ক্ষেত্রে ঢাকার ২০টি মিশ্র এলাকার মধ্যে ফার্মগেট শব্দদূষণের জন্য শীর্ষে ছিল। যেখানে শব্দের মাত্রা যথাক্রমে সর্বোচ্চ ১৩০ দশমিক ২ ডেসিবল ছিল।

শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০০৬ এ নীরব এলাকার জন্য শব্দের নির্ধারিত মানমাত্রা দিনে ৫০ এবং রাতে ৪০ ডেসিবল। নির্বাচিত ১০টি নীরব এলাকার মধ্যে আইসিসিডিডিআরবি-মহাখালী শব্দদূষণের মাত্রা দেখা যায় ১১০ দশমিক ৯ ডেসিবল। 

বিধিমালায় শিল্প এলাকার জন্য শব্দের নির্ধারিত মানমাত্রা দিনে ৭৫ এবং রাতে ৭০ ডেসিবল। ঢাকায় ২০টি আবাসিক এলাকার মধ্যে ধোলাইপাড়-যাত্রাবাড়ী এলাকায় ছিল ১২৬ দশমিক ৮ ডেসিবল থেকে ১৩১ দশমিক ৯ ডেসিবল।

এদিকে সর্বশেষ ওই সরকারি জরিপ অনুসারেই ৮০ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, ঢাকা শহরে মোটরযানের হর্ন শব্দদূষণের প্রধান কারণ। এ ছাড়া যথাক্রমে ২৪ শতাংশের মতে কলকারখানা এবং নির্মাণকাজের কারণেও শব্দদূষণের সৃষ্টি হচ্ছে। সেই সঙ্গে আছে পটকা ও আতশবাজির শব্দদূষণ।

এদিকে ওই জরিপে উঠে আসা তথ্য অনুসারে শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০০৬ সম্পর্কে প্রায় ৪৯ শতাংশই অবগত নন বলে জানা যায়। এ ছাড়া ৯৬ শতাংশ মানুষ জানান, বিধিমালা বাস্তবায়নে কোনো পদক্ষেপ তারা দেখেননি। 

ওই জরিপের সময় হর্ন গণনা করা হয়েছিল। জরিপের ফলাফল অনুযায়ী রাজধানীর শ্যামলী এলাকায় ১০ মিনিটে ৫৯৮টি হর্ন বাজানো হয়, যার মধ্যে ১৫৮টি হাইড্রোলিক হর্ন এবং ৪৪০টি সাধারণ হর্ন।

থেমে গেছে হাইড্রোলিক হর্নের বিরুদ্ধে অভিযান

প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১১:৪৫ এএম
থেমে গেছে হাইড্রোলিক হর্নের বিরুদ্ধে অভিযান
ছবি : সংগৃহীত

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরের সড়কে চলাচলকারী অনেক গাড়িকে অযথা হর্ন বাজতে দেখা যায়। যে স্থানে হর্ন বাজানোর দরকার নেই বা সামনে তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো যানবাহন না থাকলেও সেখানে গাড়ির চালকরা হর্ন বাজান। কোনো কোনো গাড়ির চালক পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন বাজিয়ে সড়কে চলছেন। যাতে তাদের দেখে সড়ক থেকে অন্য গাড়ির চালকরা দ্রুত সরে যান। কেউ কেউ গাড়িতে হাইড্রোলিক হর্ন সংযোজন করেন। আবার কোনো কোনো চালক গাড়িতে কিছু ভয়ংকর শব্দের হর্ন লাগান।

পুলিশ বলছে, হাইড্রোলিক হর্ন যারাই বাজিয়ে থাকে তাদের আইনের আওতায় আনা হয়। তাদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়। আর অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অযথা হর্ন বাজানো একটি অপরাধ। এতে সড়কে চলাচলকারীরা শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন।

আইনের সঠিক প্রয়োগের অভাবে দিন দিন এ অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে। ২০১৯ সালে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া হাইড্রোলিক হর্নের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করেন। ওই সময় হাইড্রোলিক হর্ন গাড়িতে রাখা ও বাজানোর জন্য ৪ শতাধিক মামলা করেছিল পুলিশ। সড়কের সব মোড়ে যেখানেই গাড়িতে হাইড্রোলিক হর্ন বাজাতে দেখেছে ট্রাফিক পুলিশ সেই গাড়িকেই আটক করে নিয়মিত মামলা দিয়েছে। মোটরযান অধ্যাদেশ, ১৯৮৩ অনুযায়ী কোনো গাড়িতে হাইড্রোলিক হর্ন পাওয়া গেলে জরিমানার বিধান আছে। 

এ ছাড়াও প্রাইভেট গাড়িগুলোতে পিপ-পিপ শব্দের হর্ন আর বাণিজ্যিক গাড়িতে ‘পপ-পপ’ শব্দের হর্ন বাজানোর বিধান রয়েছে। ওই সময় কিছু গাড়ি আটক করা হয়। কিন্তু ওই গাড়ির মালিকরা যারা কি না,  উচ্চবিত্ত শ্রেণির গাড়ি ছোটানোর জন্য আসাদুজ্জামানের কাছে একাধিক তদবির করেন। একপর্যায়ে ওই অভিযান থেমে যায়। পরে আর হাইড্রোলিক হর্ন বন্ধের জন্য অভিযান পরিচালনা করা যায়নি।  ওই অভিযান মাত্র ৪ দিন চলেছিল। পরে কমিশনারের পক্ষ থেকে অভিযান চালানো বন্ধ করে দেওয়া হয়।
 
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. মনিবুর রহমান মঙ্গলবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় খবরের কাগজকে জানান, সড়কে কেউ যাতে অযথা হর্ন না বাজায় এ জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে আমরা প্রচার চালিয়ে থাকি। ট্রাফিক পুলিশ এ বিষয়ে সতর্ক রয়েছে। তারা সড়কে যেখানেই কাউকে হর্ন বাজাতে দেখেন তাদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। এতে কাউকে ছাড় দেওয়া হয় না। 

তিনি আরও জানান, সড়কে কাউকে গাড়িতে হাইড্রোলিক হর্ন বাজাতে দেখলেই তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তিনি সবাইকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার আহ্বান জানান। 

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ডিন ও ক্রিমিলোজি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. জিয়া রহমান বলেন, ‘শব্দদূষণ ঘটানো একটি অপরাধ। বিনা কারণে হর্ন বাজিয়ে সড়কে চলাচলকারী লোকজনকে মানসিক হয়রানির মধ্যে ফেলা হয়। এই অপরাধপ্রবণতা রুখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এগিয়ে আসতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘দিনের পর দিন এই শব্দ দূষণ বেড়ে চলছে। এর কারণ হচ্ছে, যারা এর দেখভাল করেন তারা মূলত উদাসীনতার পরিচয় দিচ্ছেন। দেখা গেছে, সড়ক ফাঁকা রয়েছে সামনে তেমন কোনো গাড়ি নেই তাও হর্ন বাজাচ্ছে। হাসপাতালের সামনে হর্ন বাজানো নিষেধ থাকলেও সেখানেও কেউ কেউ হর্ন বাজাচ্ছেন। এই প্রবণতা রুখতে আইনের প্রয়োগ যেমন ঘটাতে হবে তেমন করে সবাইকে সচেতন হতে হবে।’ 

ড. জিয়া রহমান বলেন, ‘সড়কে যেসব নাগরিক চলাচল করেন তাদেরও অনেক সচেতন হতে হবে। কেউ যাতে বিনা কারণ হর্ন না বাজান সেই বিষয়টি তার কাছে তুলে ধরতে হবে। যদি তিনি একই কাজ বারবার করেন তাহলে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশকে জানাতে হবে, যাতে করে তারা তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারেন।’

‘এক নেতা এক পদ’ নীতি ৮ বছরেও কার্যকর হয়নি

প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৭:০০ এএম
‘এক নেতা এক পদ’ নীতি ৮ বছরেও কার্যকর হয়নি

২০১৬ সালে সর্বশেষ কাউন্সিলে ‘এক নেতার এক পদ’ এই নীতি চালুর ঘোষণা দিয়েছিল বিএনপি। দীর্ঘ আট বছর শেষ হতে চললেও সেই নীতি এখনো দলে কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। আট বছরে আশানুরূপ কোনো পদক্ষেপেও যেতে পারেনি দলটি। এক বা একাধিক পদ আঁকড়ে ধরে রেখেছেন দুজন করে স্থায়ী কমিটি সদস্য ও ভাইস চেয়ারম্যান। এ ছাড়া চেয়ারপারসনের সাতজন উপদেষ্টা, তরুণ চার নেতাসহ প্রায় অর্ধশতাধিক নেতা আছেন একাধিক পদে। 

দলে তৃণমূল থেকে নেতা-কর্মীরা উঠে আসতে পারছেন না বলে অভিযোগ করে একাধিক নেতা বলেন, বিএনপিতে যার আছেন- তো সব আছে, আবার যার নেই- তার কিছুই নেই। এটা শুধু পদের বেলায় প্রযোজ্য। এক নেতা একাধিক পদ আঁকড়ে রাখায় নতুন নেতৃত্ব তৈরি হচ্ছে না। সর্বোচ্চ চার পদে ধরে রেখেছেন তরুণ চার নেতা। ফলে অনেকেই পদ না পেয়ে হতাশায় ভোগেন। তাদের দাবি, বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলের পর ‘এক নেতার এক পদ’ এই নীতি চালু করার দাবি জোরালো হয়। কিন্তু প্রায় আট বছর শেষ হতে চললেও কার্যকর নীতি চালু করেনি হাইকমান্ড। 

এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, “এই নীতি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্যে চলমান রয়েছে। গঠনতন্ত্রে ‘এক নেতার এক পদ’ নীতি এখনো সংযুক্ত করা হয়নি। রাতারাতি তো সবকিছু করা যায় না। গত ৭-৮ বছরের পারিনি বলে আগামীতে পারব না, এটা ঠিক নয়। সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এই নীতি কার্যকর ও দলের ভেতরের চর্চা অব্যাহত রাখার চেষ্টা করছে বিএনপির হাইকমান্ড।”

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান নিতাই রায় চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, ‘বেগম খালেদা জিয়া প্রথম এক নেতার এক পদ নীতি চালু করেছিলেন। সেই সময়ে সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বিএনপি মহাসচিব ও আমিসহ অনেকেই পদ ছেড়ে দিয়েছিলেন।’ 

তিনি বলেন, ‘এখনো দুই বা একাধিক পদে অনেকেই আছেন। কিন্তু অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে দলের মধ্যে হতাশা বা আক্ষেপ নেই। পদ না ছাড়লে তো আর কাউকে জোর করতে পারি না।’ 

আরেক ভাইস চেয়ারম্যান ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, “দলের প্রয়োজনে হয়তো কেউ কেউ একাধিক পদ ধরে রেখেছেন। তবে ‘এক নেতার এক পদ’ নীতির প্র্যাকটিস চালু রয়েছে।” 

২০১৬ সালের ১৯ মার্চ দলের ষষ্ঠ কাউন্সিলের পরই ২ এপ্রিল প্রথম মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ‘বিএনপি মহাসচিব’ পদ ধরে রেখে কৃষক দলের সভাপতি ও ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতির পদ ছেড়ে দেন। ওই সময়ে বিএনপি মহাসচিবকে অনুসরণ করে আরও বেশ কয়েকজন সিনিয়র নেতা পদ ছেড়ে দেন। সেই সময়ে ‘পছন্দমতো’ পদ রেখে বাকি পদ ছাড়তে একাধিক নেতাকে দলের পক্ষ থেকে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। অনেকেই চিঠির জবাব দিলেও পদ ছাড়তে রাজি ছিলেন না। আবার সিনিয়র অনেক নেতা পদ ছেড়ে দেন। পরবর্তী সময়ে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার উদ্যোগ থাকলেও অদৃশ্য কারণে ‘এক নেতার এক পদ’ নীতি এখনো পুরোপুরিভাবে বাস্তবায়ন হয়নি। সম্প্রতি নতুন প্রজন্মের কয়েকজন নেতাও এই তালিকায় যুক্ত হয়েছেন।

২০২১ সালের ৩ আগস্ট ঢাকা মহানগর উত্তরের সদস্যসচিব পদ পেয়ে আমিনুল হক কেন্দ্রীয় ক্রীড়া সম্পাদক পদ ছেড়ে দেন। তাকে অনুসরণ করে ঢাকা মহানগর যুবদলের পদ ছেড়ে দেন দক্ষিণের সদস্যসচিব রফিকুল ইসলাম মজনু। কিন্তু মহানগর কমিটিতে থাকা অন্যরা এখনো একাধিক পদ ধরে রেখেছেন। 

বর্তমানে স্থায়ী কমিটির দুই নীতিনির্ধারক আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও বেগম সেলিমা রহমান দুটি পদে রয়েছেন। স্থায়ী কমিটির পাশাপাশি আমীর খসরু আন্তর্জাতিকবিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান এবং সেলিমা রহমান দলের নারী ও শিশু অধিকার ফোরামের আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করছেন। দলের দুজন ভাইস চেয়াম্যান একাধিক পদ আঁকড়ে রয়েছেন। ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন ভাইস চেয়ারম্যান এবং পেশাজীবী পরিষদের আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করছেন। তবে পেশাজীবী পরিষদ বিএনপি বা এর অঙ্গসংগঠনভুক্ত কোনো দল নয়। এটি বিএনপি সমর্থক একটি সংগঠন। আরেক ভাইস চেয়ারম্যান নিতাই রায় চৌধুরীও বিএনপি সমর্থিত হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্টের উপদেষ্টা। 

বিএনপি চেয়ারপারসনের সাতজন উপদেষ্টা জেলা বা মহানগরের পদে রয়েছেন। এরা হলেন আব্দুস সালাম ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক, আমানউল্লাহ আমান ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক, ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার ঢাকা মহানগর উত্তরের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক, হাবিবুর রহমান হাবিব পাবনা জেলা বিএনপির সভাপতি, সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমী কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সভাপতি, আবুল খায়ের ভূঁইয়া লক্ষ্মীপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য এবং বিজন কান্তি সরকার হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্টের চেয়ার‌ম্যান।

ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক আব্দুস সালাম বলেন, ‘দলের প্রয়োজনে তিনি দুই পদে আছেন। তবে দল যদি মনে করে তাহলে পদ ছেড়ে দেবেন। তাই দল প্রয়োজনে যে সিদ্ধান্ত নেবে, তাকে স্বাগত জানাব।’

কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন নরসিংদী জেলা বিএনপির আহ্বায়ক, বিএনপির প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি লক্ষ্মীপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও মিডিয়া সেলের সদস্যসচিব, কায়সার কামাল আইনবিষয়ক সম্পাদক এবং জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের মহাসচিব, শামা ওবায়েদ দলের সাংগঠনিক সম্পাদক ও আন্তর্জাতিকবিষয়ক কমিটির সদস্য, আসাদুল হাবিব দুলু রংপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এবং লালমনিরহাট জেলা বিএনপির সভাপতি, কামরুজ্জামান রতন বিএনপির সমাজকল্যাণ সম্পাদক ও মুন্সীগঞ্জ জেলা বিএনপির সদস্যসচিব, ফরহাদ হোসেন আজাদ পল্লি উন্নয়নবিষয়ক সম্পাদক ও পঞ্চগড় জেলা বিএনপির সদস্যসচিব, মো. শরিফুল আলম ময়মনসিংহ বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক ও কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি, ওয়ারেস আলী মামুন সহসাংগঠনিক সম্পাদক ও জামালপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক, হাজি আমিন উর রশিদ ইয়াছিন বিএনপির ত্রাণ ও পুনর্বাসনবিষয়ক সম্পাদক ও কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক, ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা সহআন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক ও মিডিয়া সেলের সদস্য, হাসান জাফির তুহিন বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য আবার কৃষক দলের সভাপতি, ইশরাক হোসেন বিএনপির আন্তর্জাতিকবিষয়ক কমিটির সদস্য ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য, খন্দকার আবু আশফাক ঢাকা জেলা বিএনপির সভাপতি ও বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য। 

এ ছাড়া বিএনপির তিন-চারটি পদে বহাল রয়েছেন অন্তত চারজন। তারা হলেন নিপুণ রায় চৌধুরী বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ছাড়াও একই সঙ্গে ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক, কেরানীগঞ্জ দক্ষিণ থানা বিএনপির সভাপতি এবং দলের নারী ও শিশু অধিকার ফোরামের সদস্যসচিব। সাংবাদিক কাদের গনি চৌধুরী দলের সহ-তথ্য গবেষণাবিষয়ক সম্পাদকের পাশাপাশি সমর্থক পেশাজীবী পরিষদের সদস্যসচিব ও বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য। শাম্মী আক্তার বিএনপির সহ-স্থানীয় সরকারবিষয়ক সম্পাদকের পাশাপাশি হবিগঞ্জ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক, মিডিয়া সেলের সদস্য এবং বিএনপি সমর্থিত জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের সদস্য। ব্যারিস্টার মীর হেলাল বিএনপির নির্বাহী কমিটি, মিডিয়া সেল এবং আন্তর্জাতিকবিষয়ক কমিটির সদস্য।

বিএনপির চার পদে থাকা নিপুণ রায় চৌধুরী বলেন, ‘আমি একা তো নই, আরও অনেক নেতাই একাধিক পদে আছেন। দলের প্রয়োজনে আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। দলের নীতিনির্ধারকরা যখনই বলবেন, তখনই পদ ছেড়ে দেব।’ 

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল মান্নান নবীনগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি, শাহ রিয়াজুল হান্নান গাজীপুর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও কাপাসিয়া উপজেলার সভাপতি, শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক নির্বাহী কমিটির সদস্য ও চাঁদপুর জেলা বিএনপির সভাপতি, রাজিব আহসান বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক। এদের বাইরেও বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের এক ব্যক্তির একাধিক পদ আঁকড়ে রাখার নজির রয়েছে।

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক খবরের কাগজকে বলেন, ‘এক নেতার এক পদ’ এই নীতি এখনো বহাল আছে। কেউ কেউ হয়তো এক বা দুই পদে থাকতে পারেন। এতে দলে কোনো কার্যক্রমে ব্যাঘাত হয়নি। এই নিয়ে দলের মধ্যে কোনো হতাশা নেই। তিনি আরও বলেন, ‘এখন সবার লক্ষ্য সরকার পতন। তৃণমূলের নেতা-কর্মীরাও সাহসের সঙ্গে রাজপথে ছিলেন। একাধিক পদের বিষয়ে হাইকমান্ডের নজর আছে।’

‘কথায় কথায়’ ঘুষ নেন বিদ্যুতের প্রকৌশলী

প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৫:০০ এএম
‘কথায় কথায়’ ঘুষ নেন বিদ্যুতের প্রকৌশলী
স্বাগত সরকার। ছবি : সংগৃহীত

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের খাগড়াছড়ি বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে চার বছর আগে যোগদান করে এখনো দায়িত্বে রয়েছেন স্বাগত সরকার। তবে তার বিরুদ্ধে গ্রাহকদের অভিযোগের অন্ত নেই। বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগের এমন কোনো খাত নেই, যেখানে তিনি স্বেচ্ছাচারিতা কিংবা অনিয়ম করেন না। পোস্ট-পেইড মিটারে ভূতুড়ে বিল, প্রি-পেইড সংযোগ দিতে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করেন বলে অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। আরও অভিযোগ, বিদ্যুৎ অফিসেরই একজন কর্মচারী দিয়ে করেন মিটারের ব্যবসা।

বিদ্যুৎ সংযোগ সম্প্রসারণে খুঁটি প্রতি তিনি নেন ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকা, আর প্রতি কিলোওয়াট লোড বৃদ্ধিতে গ্রাহকদের কাছ থেকে আদায় করেন অতিরিক্ত ১০ গুণ অর্থ। অফিসের কয়েকজন অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সঙ্গে নিয়ে চার বছর ধরে চলছে নির্বাহী প্রকৌশলী স্বাগত সরকারের অনিয়মের এই কাণ্ডকারখানা।

অভিযোগের সূত্র ধরে সাধারণ বিদ্যুৎ গ্রাহক হিসেবে প্রথমেই ফোন দেওয়া হয় লাইনম্যান সাহায্যকারী জামান রিয়াদকে। আবাসিক প্রি-পেইড সংযোগের এক কিলোওয়াট লোড বৃদ্ধিতে করণীয় জানতে চাইলে তিনি জানান, প্রতি কিলোওয়াট লোড বাড়াতে খরচ লাগবে আড়াই হাজার টাকা। এর মধ্যে ২ হাজার টাকা সরকারি ফি এবং বাকি ৫০০ টাকা অফিসের আনুষঙ্গিক খরচ। 

২৩০ টাকা সরকারি ফি ব্যাংকে প্রদানের মাধ্যমে প্রি-পেইড সংযোগ পাওয়ার কথা, তবে কেন সরকারি খরচ আড়াই হাজার টাকা চেয়েছেন তিনি, এমন প্রশ্নের উত্তরে লাইনম্যান সাহায্যকারী জামান রিয়াদ বলেন, ‘এসডি সাকিব স্যার (উপসহকারী প্রকৌশলী মো. নাজমুস সাকিব) এবং এক্সিয়েন স্যারের (নির্বাহী প্রকৌশলী স্বাগত সরকার) নির্দেশেই আমি এই টাকা নিয়ে থাকি। আপনি তাদের সঙ্গে কথা বলুন।’
 
এরপর গ্রাহক পরিচয়ে মুঠোফোনে জানতে চাইলে উপসহকারী প্রকৌশলী মো. নাজমুস সাকিব বলেন, ‘অফিশিয়াল নিয়ম যদি ফলো করেন, আবাসিক সংযোগের লোড বাড়াতে হলে ১০০ ওয়াটের একটা সোলার প্যানেল বসিয়ে কাগজ জমা দিতে হবে। তবে সোলার প্যানেলের কাগজ দিতে না পারলে আমাদের লোকজন ম্যানেজ করে দেয়। আর সেজন্য তারা আড়াই হাজার টাকা নেয়।’

শুধু লোড বৃদ্ধিতেই নয়, নতুন প্রি-পেইড সংযোগ পেতেও হয়রানির শিকার হচ্ছেন গ্রাহকরা। একই সঙ্গে মোটা অঙ্কের উৎকোচ দিতে হচ্ছে নির্বাহী প্রকৌশলীকে। মিটারও কিনতে হয় নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছ থেকেই। মিটার বিক্রির জন্য প্রকৌশলী স্বাগত সরকার দায়িত্ব দিয়েছেন ‘টিটু সূত্রধর’ নামে একজন লাইনম্যান সাহায্যকারীকে। টিটু সূত্রধরকে দিয়ে অফিসেই মিটারের রমরমা বাণিজ্য চলছে তার। বাজারের স্বাভাবিক দরে নয়, তিনি গ্রাহকদের কাছে মিটার বিক্রি করেন বাড়তি দামে। গ্রাহকরাও হয়রানি এড়াতে বাধ্য হন তার কাছ থেকে মিটার কিনতে। নিয়ম অনুযায়ী আবেদনের সাত দিনের মধ্যে প্রি-পেইড সংযোগ পাওয়ার কথা গ্রাহকদের। কেউ যদি টিটু সূত্রধরের কাছ থেকে মিটার না কিনে বাজার থেকে কেনেন, তবে সেই গ্রাহকের ফাইল আটকে থাকে এক থেকে দেড় মাস পর্যন্ত। অনুসন্ধানে এমন অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গিয়েছে। 

খাগড়াছড়িতে বর্তমানে ৫৬০০ প্রি-পেইড মিটার রয়েছে। যার মধ্যে প্রকৌশলী স্বাগত সরকারের দায়িত্বে থাকার সময়ে গত চার বছরে স্থাপিত হয়েছে ৩ হাজারেরও বেশি মিটার। হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া বাকি সব গ্রাহককে মিটার কিনতে বাধ্য করা হয়েছে বিদ্যুৎ অফিস থেকেই। 

খাগড়াছড়ি সদরের ইসলামপুর এলাকার বাসিন্দা নুর মোহাম্মদ সৈকত বলেন, ‘অস্বাভাবিক বিলের কারণে পোস্ট-পেইড মিটারের পরিবর্তে প্রি-পেইড সংযোগ দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট লাইনম্যানদের জানাই। তারা এর জন্য ১২ হাজার টাকা চেয়েছেন, বলেছেন এর কমে সংযোগ দেওয়া যাবে না। এটা নাকি অফিসের নিয়ম।’

কুমিল্লা টিলা এলাকার বাসিন্দা খোরশেদ আলম বলেন, ‘সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে আমার বাড়ির সামনে একটি খাম্বা (বৈদ্যুতিক খুঁটি) হেলে পড়েছিল। এ নিয়ে আমি বেশ কয়েকবার বিদ্যুৎ অফিসে গিয়েছি। তারা এটি সোজা করে দিতে ২০ হাজার টাকা চেয়েছে। এত টাকা দেওয়া সম্ভব নয় বলে পরে ওই খাম্বাটিকে দড়ি দিয়ে কোনোরকমে আমগাছের সঙ্গে বেঁধে রেখেছি।’

অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে খাগড়াছড়ি বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী স্বাগত সরকার বলেন, ‘সরকার তো একেক সময় একেক নিয়ম দেয়। তবে সবকিছু প্রতিপালন করা যায় না, সব নিয়ম তো অ্যাপ্লাই করা যায় না।’ 

বিদ্যুতের নতুন সংযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করে প্রকৌশলী স্বাগত সরকার বলেন, ‘সরকারিভাবে একটি আবাসিক ভবনে কেবলমাত্র একটি মিটার দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। তবে ভবনের মালিকরা প্রতিটি ফ্ল্যাটের জন্য আলাদা আলাদা মিটার নিয়ে থাকেন। কোনো কোনো ভবনে আমরা ৮ থেকে ১০টি মিটারও দিয়েছি। এ কারণেই গ্রাহকরা আমাদের বাড়তি টাকা দেয়।’ 

এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে বিউবো রাঙামাটি সার্কেলের (পরিচালন ও সংরক্ষণ) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. কামালউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘কোনো অজুহাতেই অতিরিক্ত টাকা আদায়ের সুযোগ নেই। অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখে সত্যতা পাওয়া গেলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

পোশাকশিল্প বিকাশে নারীর অবদানই বেশি

প্রকাশ: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২:৩১ পিএম
পোশাকশিল্প বিকাশে নারীর অবদানই বেশি
ছবি : খবরের কাগজ

দেশে রপ্তানি আয়ের সর্ববৃহৎ তৈরি পোশাকশিল্পে কর্মরত মোট শ্রমিকের বেশির ভাগই নারী। তবে এ শিল্পে এখনো উচ্চপদে নারীর সংখ্যা কম। এ ছাড়া উত্তরাধিকার সূত্রে অনেক নারী কারখানার মালিক হলেও নিজের চেষ্টায় মালিক হয়েছেন এমন সংখ্যাও উল্লেখ করার মতো নয়। 

তৈরি পোশাক খাতের সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন, আগের চেয়ে এ খাতে শিক্ষিত নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। উৎপাদনের তুলনায় পোশাকের ডিজাইনে নারীর আগ্রহ বেশি।

তৈরি পোশাক খাতে কত নারী শ্রমিক কাজ করছে তার সংখ্যা দেশি -বিদেশি প্রতিবেদনে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য হিসেব পাওয়া গিয়েছে। 

এশিয়ান সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্টের তথ্য অনুযায়ী, “পোশাক খাতে কাজ করছেন মোট শ্রমিকের ৫৯.১২ শতাংই নারী। সংখ্যার হিসাবে ২৩ লাখেরও বেশি। 

অন্যদিকে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর এন্ট্রাপ্রেনিওরশিপ ডেভেলপমেন্টের তথ্যানুযায়ি, এ খাতে নারী শ্রমিকের হার ৫৮ দশমিক ৩ শতাংশ। 

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘পোশাক খাতে নারীরা সুনামের সঙ্গে কাজ করছেন। নারীরা সৃষ্টিগতভাবেই সেলাই, কাপড় কাটা এসবে পারদর্শী। এর সঙ্গে কারখানায় কাজ করতে করতে তারা আরও দক্ষ হয়ে ওঠেন। আমি এক কথায় বলব, এ দেশে তৈরি পোশাকশিল্পের দ্রুত বিকাশের পেছনে নারীর অবদান সবচেয়ে বেশি।’ 

উচ্চপদে কেন নারীদের অংশগ্রহণ কম বা নিজের চেষ্টায় কেন নারীরা তৈরি পোশাক কারখানার মালিক হচ্ছেন না- এমন প্রশ্নের উত্তরে ব্যবসায়ী এই নেতা বলেন, এখন অনেক শিক্ষিত নারী পোশাকশিল্পে আসছেন। উৎপাদনের চেয়ে ডিজাইনে তাদের আগ্রহ বেশি। উত্তরাধিকার সূত্রে অনেকে মালিক হয়েছেন। নিজের চেষ্টায় কারখানার মালিক হয়েছেন, এমন নারীর সংখ্যাও নেহাত কম নয়।

তৈরি পোশাক খাতে নারী শ্রমিকের সংখ্যা নিয়ে নানা হিসাব পাওয়া গেছে। তবে আমরা মনে করি এ খাতে নারী শ্রমিকের হার ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ।  

গত বছর এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে বলেন, ‘আমাদের পোশাক খাত নারীদের কর্মসংস্থানে নতুন দ্বার উন্মোচন করেছে। গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকেও নারীরা এসে কাজ করছেন। এসব নারী পোশাক খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিতেও বিশেষ অবদান রাখছেন। তাদের মাধ্যমে অনেক পরিবার আর্থিক সচ্ছলতা ফিরে পাচ্ছে।’ প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘পোশাক মানুষের অন্যতম মৌলিক চাহিদা। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পোশাক খাতের অবদান অপরিসীম। আমাদের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ অর্জিত হচ্ছে তৈরি পোশাক খাত থেকে। দারিদ্র্য বিমোচন, নারীর ক্ষমতায়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে পোশাক খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।’

যোগাযোগ করা হলে সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী খবরের কাগজকে বলেন, দেশের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ আসে পোশাক খাত থেকে। দ্রুত সম্প্রসারিত এ শিল্প দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রাখছে। বর্তমানে পোশাক খাতে প্রায় অর্ধকোটি লোক কর্মরত। এদের বেশির ভাগই নারী। ফলে নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে এ খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

তৈরি পোশাক খাতে নারীর অংশগ্রহণের শুরু হয় সত্তরের দশকে। শুরুটা হয় ‘রিয়াজ গার্মেন্টস’ দিয়ে। ১৯৭৩ সালে রিয়াজ উদ্দিন নামে এক ব্যবসায়ী এই গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথমে দেশের বাজারেই বিক্রি হতো এই প্রতিষ্ঠানের তৈরি পোশাক। প্রতিষ্ঠার পাঁচ বছর পর ১৯৭৮ সালে প্রথম তারা ফ্রান্সে ১০ হাজার শার্ট রপ্তানি করেন। সেটিই দেশের প্রথম পোশাক রপ্তানি। তখনকার সামাজিক অবস্থা ততটা অনুকূলে না থাকায় রিয়াজ উদ্দিন নিজের মেয়েকেই তার কারখানায় পোশাক তৈরির কাজে লাগিয়ে দেন। এরপর ধীরে ধীরে অন্য নারীরা পোশাকশিল্পের কাজে আগ্রহী হয়ে ওঠেন।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, গত ৩০ বছরের ইতিহাস আলোচনা করলে দেখা যাবে পোশাকশিল্পে নারীরা অনেক দূর এগিয়েছেন। তাদের অংশগ্রহণ বেড়েছে, কিন্তু মজুরি বাড়েনি। তারা যে মজুরিতে কাজ করেন, সেটা পুরুষের তুলনায় অনেক কম। মূলত তাদের নেওয়া হয় সস্তা শ্রমের জন্য। তবে কিছু জায়গায় শ্রমিক সংগঠনের আন্দোলনের কারণে কিছু পরিবর্তন এসেছে। এখনো কারখানাগুলোতে নারীদের কর্মক্ষেত্র নিরাপদ হয়নি। এর জন্য আমাদের আরও লড়াই ও আন্দোলন-সংগ্রাম করতে হবে। কারখানার মালিকদের এ ক্ষেত্রে আরও আন্তরিক হতে হবে।