ঢাকা ৬ বৈশাখ ১৪৩১, শুক্রবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৪
Khaborer Kagoj

১০৩ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছে রাজস্ব পাওনা ১৩৮৯ কোটি টাকা

প্রকাশ: ০২ এপ্রিল ২০২৪, ১০:১১ এএম
১০৩ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছে রাজস্ব পাওনা ১৩৮৯ কোটি টাকা
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড

বেসরকারি খাতের ১০৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) শুল্ক, কর ও ভ্যাট পাওনা ১ হাজার ৩৮৯ কোটি টাকা। এনবিআর সূত্রে এ কথা জানা যায়। 

আরও জানা যায়, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের রাজস্ব পরিশোধের তথ্য খতিয়ে দেখতে ১৪ সদস্যের টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। এ টাস্কফোর্সে ভ্যাট, আয়কর ও শুল্ক শাখা, ভ্যাট নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর, শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর এবং এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা শাখা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেলের (সিআইসি) কর্মকর্তারা আছেন। 

বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্যানুসারে, সারা দেশে সরকারি খাতের ১১৬টি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১২৩টি ইংরেজি মাধ্যম স্কুল আছে। চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই টাস্কফোর্সের কর্মকর্তারা পর্যায়ক্রমে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আয়, ব্যয়, কর-শুল্ক-ভ্যাট পরিশোধের তথ্য খতিয়ে দেখেন। বিশেষভাবে ব্যাংক লেনদেনের তথ্য, শিক্ষার্থী ভর্তির পরিমাণ এবং এ খাতে আদায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উপকরণ কেনা, বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজনের আয়-ব্যয় বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হয়। 

সব তথ্য-প্রমাণ যাচাই-বাছাই করে মোট ১০৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের রাজস্ব পরিশোধের তথ্যে গরমিল পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৪৪টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ৫৯টি ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল রয়েছে। গত ৩ মার্চ ৪১টি এবং ৩১ মার্চ ২৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এনবিআর থেকে চিঠি পাঠিয়ে বকেয়া রাজস্ব পরিশোধ করতে বলা হয়েছে। চলতি সপ্তাহে বাকি ৩৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চিঠি পাঠানো হবে। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ১৫ কর্মদিবস সময় দেওয়া হয়েছে। বেঁধে দেওয়া সময়ে রাজস্ব পরিশোধ না করায় এবং রাজস্ব কেন পরিশোধ করেনি তার সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে না পারায় সম্প্রতি দেশের আট নামিদামি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। 

এ আটটি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক, ইস্টওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি ও সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটি। 

এনবিআরের প্রতিবেদনে বলা হয়, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে এনবিআরের কাছে দাখিল করা তথ্য প্রমাণ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, শিক্ষার্থী ভর্তির তথ্যে মিথ্যা হিসাব দেওয়া হয়েছে। রেজিস্ট্রারে শিক্ষার্থী ভর্তির সংখ্যা ও ভর্তি ফির ক্ষেত্রে যে হিসাব দেওয়া হয়েছে, ব্যাংক লেনদেনে তার চেয়ে বেশি। আবার বিভিন্ন উপকরণ কেনা, সেমিনার, শিক্ষামূলক কার্যক্রম আয়োজন, প্রশিক্ষণ, বেতন-ভাতাসহ সব ক্ষেত্রেই এনবিআরে দাখিল করা হিসাবের সঙ্গে ব্যাংক লেনদেনের মিল নেই। বিনা বেতনে অনেক শিক্ষার্থীকে পড়ানো হচ্ছে এমন তথ্য দেওয়া হলেও তা সঠিক নয়। স্কলারশিপের তথ্যেও রয়েছে গরমিল। শুধু তাই নয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ ব্যয়েও মিথ্যা হিসাব দেওয়া হয়েছে। 

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, একসময়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ধনী পরিবারের সন্তান হলেও এখন আর তা না। অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান সরকারিতে ভর্তির সুযোগ না পেয়ে বেসরকারিতে বাধ্য হয়ে ভর্তি হন। এদের অনেকে জমিজমা এবং বাবা-মায়ের শেষ সঞ্চয় দিয়েও ভর্তি হন। এসব শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ভর্তি ফি হিসেবে মোটা অঙ্ক আদায় করেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে, যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ ক্ষেত্রে এনবিআরকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকরা ক্ষমতাবান। তাই কোনো তদবির বা সুপারিশে রাজস্ব মাফ করা উচিত হবে না। দু-একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আদায় করা সম্ভব হলে অন্যরাও ঠিকমতো পরিশোধ করবে। 

এনবিআরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘আয়কর আইন-২০২৩-এর ২১৪ ধারা অনুসারে গত ৪ মার্চ কর অঞ্চল-১১ থেকে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির রেজিস্ট্রার বরাবর চিঠি পাঠিয়ে ২০০২-০৩ থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছর পর্যন্ত মোট ১৬ অর্থবছরে ১৮০ কোটি ৫০ লাখ ৯৪ হাজার ৫৬৪ টাকা রাজস্ব পাওনা দাবি করা হয়। চিঠিতে এ অর্থ ১৫ মার্চের মধ্যে পরিশোধের জন্য সময় বেঁধে দেওয়া হয় এবং সময়মতো রাজস্ব পরিশোধ না করলে ২০২৩-এর ২৭৫ ধারা অনুযায়ী জরিমানা আরোপসহ অন্যান্য আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়।’ 

এ বিষয়ে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. আতিকুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘এনবিআর থেকে চিঠি পাঠিয়ে রাজস্ব পাওনার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে আরও বলা হয়েছে, কোনো ধরনের রাজস্ববিষয়ক মামলা থাকলে তা এনবিআরকে জানাতে হবে। আমরা ১৪ মার্চ জানিয়েছি। অথচ তারপরও আমাদের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। এতে ঈদের আগে আমাদের লেনদেনে সমস্যা হচ্ছে। বিষয়টি এখনো সুপ্রিম কোর্টে প্রক্রিয়াধীন, তাই আমরা আইনজীবীকে জানিয়েছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘এনবিআরের রাজস্ব পরিশোধসংক্রান্ত হিসাবের সঙ্গে আমরা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একমত নই। আমাদের আইনজীবী বলেছেন ২০১০ সালের পর থেকে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আমাদের কাছে যে পরিমাণ রাজস্ব দাবি করা হয়েছে, প্রকৃত হিসাব তা নয়।’     

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. ফকরুল আলম খবরের কাগজক বলেন, ২০১০ সালের ১ জুলাই এনবিআর প্রজ্ঞাপন জারি করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর ১৫ শতাংশ কর নির্ধারণ করে। এই কর আদালতের রায়ে স্থগিত হয়। আবারও গত ২৭ ফেব্রুয়ারি এই কর কার্যকর করা হয়।

তদন্ত প্রতিবদনে বলা হয়েছে, রাজস্ব পাওনা আছে এমন সব বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকদের ব্যক্তিগত আয়কর নথি খতিয়ে দেখা হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি তারা আর কী ব্যবসা করছেন, সেসব ব্যবসায়ে হিসাবমতো কর, শুল্ক, ভ্যাট পরিশোধ করেছে কি না, তা গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিআইসির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলেন, ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকরা সমাজের সম্পদশালী ব্যক্তি। এদের প্রতিষ্ঠান থেকে যেমন রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয় তেমনি নিজেরাও প্রভাব খাটিয়ে ঠিকমতো রাজস্ব পরিশোধ করেন না। এদের চিহ্নিত করতে কাজ করা হবে। 

জেলা-উপজেলা হাসপাতালে কাজের পরিবেশ পান না চিকিৎসকরা

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৪, ০৩:৩৩ পিএম
জেলা-উপজেলা হাসপাতালে কাজের পরিবেশ পান না চিকিৎসকরা
ছবি : সংগৃহীত

একদিকে অপর্যাপ্ত পরিষেবা কক্ষ, যথাযথ চিকিৎসাসরঞ্জামের স্বল্পতা, আবাসনের খারাপ অবস্থা, রোগীদের সুযোগ-সুবিধার অভাব, স্বাস্থ্যকর্মীর অভাব, ল্যাবরেটরি পরিষেবার অভাব, অতিরিক্ত কাজের চাপ, অন্যদিকে নিরাপত্তার অভাব এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও সাংবাদিকদের অযাচিত চাপ, উচ্চশিক্ষা, পদায়ন, বদলি, পদোন্নতিসংক্রান্ত নীতির যথাযথ প্রয়োগের অনুপস্থিতি সরকারি পর্যায়ের উপজেলা ও জেলা হাসপাতালে কর্মস্থলের বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন স্ব স্ব জায়গায় কর্মরত চিকিৎসকরা।

গত বুধবার (১৭ এপ্রিল) স্বাস্থ্য গবেষণাবিষয়ক আন্তর্জাতিক জার্নাল ল্যানসেটের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংস্করণে এ-সংক্রান্ত এক গবেষণা প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে আসে।

এই গবেষক টিমের অন্যতম সদস্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ ইনফরমেটিক্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. খালেকুজ্জামান খবরের কাগজকে বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহায়তায় ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ ইনফরমেটিক্স বিভাগ ২০২১ সালের মার্চ ও এপ্রিল মাসে দেশের ১৭টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ৯টি জেলা হাসপাতালের ৫১ জন চিকিৎসকের ওপর এই গবেষণাটি পরিচালিত হয়।

ওই গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, হাসপাতালের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাগুলো ডাক্তারদের জন্য তাদের কর্মক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রচলিত চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত। এ ছাড়া দুর্বল অবকাঠামো, যথাযথ চিকিৎসা সরবরাহের স্বল্পতা, প্রয়োজনীয় ওষুধের সীমিত সরবরাহ, ডায়াগনস্টিক সুবিধার অভাব, কর্মীদের অভাব এবং অতিরিক্ত কাজের চাপ বড় সমস্যা তৈরি করে।

এতে বলা হয়, হাসপাতালে চিকিৎসকদের পরামর্শ কক্ষ বা জরুরি কক্ষগুলো সাধারণত ছোট, যথাযথ প্রযুক্তিগত সহায়তার অভাব এবং সব সময় রোগীর বন্ধুবান্ধব এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে উপচে পড়া ভিড় থাকে। কখনো কখনো, দুই বা ততোধিক মেডিকেল অফিসারকে একই রুম ভাগ করে স্বাস্থ্য পরিষেবা দিতে হয়। রোগীর গোপনীয়তা রক্ষা করা যায় না। বসার এবং বিশ্রামের জায়গা অপ্রতুল।

এ ছাড়া রোগীদের যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য যথাযথ চিকিৎসাসরঞ্জাম এবং প্রযুক্তির অভাব গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। একইভাবে কিছু হাসপাতালে শুধু কয়েকটি সাধারণ ডায়াগনস্টিক পরীক্ষা করা হয়। অনেক হাসপাতালে ত্রুটিপূর্ণ আল্ট্রাসাউন্ড মেশিন, এক্স-রে মেশিন এবং প্যাথলজিক্যাল ল্যাবের কথাও উঠে আসে এই গবেষণায়।

পাশাপাশি হাসপাতালের প্রতিটি স্তরে কর্মীসংকট দেখা যায়। এতে ডাক্তার, নার্স, প্যাথলজিস্ট, ল্যাব টেকনোলজিস্ট, অফিস সহকারী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। কোনো হাসপাতালেই পর্যাপ্ত সংখ্যক মেডিকেল অফিসার পাওয়া যায়নি। যেখানে রোগীর ভিড় অনুযায়ী নিয়োগ করা হয়নি, যার ফলে উপস্থিত জনবলের জন্য অতিরিক্ত কাজের চাপ ছিল। কিছু হাসপাতালে সুসজ্জিত ল্যাবরেটরি ছিল কিন্তু উপযুক্ত সোনোলজিস্ট, রেডিওলজিস্ট এবং প্যাথলজিস্টের অভাব ছিল।

এই গবেষণায় অংশগ্রহণকারী প্রায় সব চিকিৎসক অত্যধিক কাজের চাপের কথা বলেন। তারা যথাযথ বিরতি বা ডিউটি রোস্টার ছাড়াই দীর্ঘ সময় ধরে অতিরিক্ত কাজ করার কথা জানাতে গিয়ে উত্তেজিত ছিলেন। লোকবলের অভাবে অনেক ডাক্তার পরপর সকাল এবং সন্ধ্যা উভয় শিফটে কাজ করেন।

কোনো কোনো হাসপাতালে একজন ডাক্তার তিনজন ডাক্তারের সমান দায়িত্ব পালন করেন। একই সময়ে, ডাক্তারদের অতিরিক্ত প্রশাসনিক দায়িত্ব মোকাবিলা করতে হয়েছিল, যা তারা অত্যন্ত বিরক্তিকর বলে মনে করেছিল। তাদের দৈনন্দিন কাজের জীবনে অবাঞ্ছিত প্রভাবের পাশাপাশি, তাদের বর্তমান কাজের চাপও তাদের কর্মজীবনের অগ্রগতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

হাসপাতালগুলোতে বিদ্যুৎ, পানি, ইন্টারনেট অ্যাক্সেস ইত্যাদির সীমিত সুবিধা রয়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘ্ন ঘটায় হাসপাতালের দৈনন্দিন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। পানির সংযোগ থাকলেও তারা পানি ট্যাঙ্কে তুলতে ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক মোটর ব্যবহারে উচ্চ বিদ্যুতের বিলের ভয়ে ভীত থাকে। বিদ্যুতের বিলের উচ্চ ব্যয় তাদের বাজেটে অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় নিরবচ্ছিন্ন পানি সরবরাহ ব্যবহার করা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে বিশুদ্ধ পানীয়জলের অভাবও রয়েছে। 

যদিও বেশির ভাগ উত্তরদাতা হাসপাতালে ওষুধের পর্যাপ্ত সরবরাহের কথা উল্লেখ করেছেন। তবুও তারা বলেছেন, সংকটে ওষুধগুলো সবসময় সহজলভ্য থাকে না।

অন্যদিকে রাজনৈতিক চাপ, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের প্রতিকূলতা এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার অভাবের কারণে চিকিৎসকদের পেশাগত ঝুঁকির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বেশির ভাগ উত্তরদাতা। প্রভাবশালীদের দাবির মধ্যে ছিল অগ্রাধিকারভিত্তিক চিকিৎসা প্রদান, তাদের আত্মীয় ও বন্ধুদের জন্য প্রশাসনিক বিষয় পরিচালনা করা এবং অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া মেডিকেল সার্টিফিকেট প্রদান করা।

রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে সহায়ক কর্মী নিয়োগের বিষয়টিও কয়েকজন ডাক্তার উল্লেখ করেছেন। নিরাপত্তার অভাবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মক্ষেত্রে ডাক্তারদের সহিংসতার সমস্যাটি সব স্তরের উত্তরদাতারা স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করেন। তারা বেশ কয়েকবার রোগীর স্বজনদের মাধ্যমে শারীরিক ও মৌখিকভাবে লাঞ্ছিত হওয়ার কথা জানিয়েছেন।

চিকিৎসকদের ক্যারিয়ারের বিকাশে প্রতিবন্ধকতা নিয়ে গবেষণার প্রায় সব অংশগ্রহণকারীই সোচ্চার ছিলেন। উচ্চশিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ সম্পর্কিত নীতিগুলোর প্রতি তাদের অসন্তোষ। উত্তরদাতাদের মধ্যে কয়েকজন কর্মক্ষেত্রে তাদের জ্ঞান প্রয়োগের সুযোগের অপর্যাপ্ততার কথা উল্লেখ করেছেন, যা তারা বিভিন্ন বিশেষ প্রশিক্ষণ এবং কোর্স থেকে পেয়েছেন। পরিবর্তে, তাদের অন্য বিভাগে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, যেখানে তাদের অর্জিত দক্ষতা কাজে লাগানোর সুযোগ তারা পাননি।

উত্তরদাতারা বদলি ও পদায়নসংক্রান্ত নীতি ও পদ্ধতি সম্পর্কে তাদের অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। প্রায় সব উত্তরদাতাই একমত যে, স্থানান্তরের সমস্যাটি রাজনৈতিক লবিং দ্বারা প্রবলভাবে প্রভাবিত। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (বিসিএস) স্বাস্থ্য ও অন্যান্য ক্যাডারের মধ্যে বৈষম্য, সমমানের গ্রেডে অন্যান্য বিসিএস ক্যাডারদের তুলনায় কর্মপরিবেশের বৈষম্য এবং পেশাগত বৃদ্ধির সুযোগ নিয়ে চিকিৎসকরা তাদের হতাশা প্রকাশ করেন। তারা মনে করেন, যোগদানের প্রথম দিন থেকেই তাদের সঙ্গে বৈষম্য করা হচ্ছে। অনেক ডাক্তার উল্লেখ করেছেন যে, তারা ১০-১২ বছর সিনিয়র মেডিকেল অফিসার হিসেবে কাজ করার পরও পদোন্নতি পাননি, যেখানে অন্যান্য ক্যাডার পরিষেবাগুলোতে, তাদের নিয়মিতভাবে, প্রতি কয়েক বছর পরপর (ক্যাডার অনুসারে পরিসীমা পরিবর্তিত হয়) সময়সূচি অনুসারে পদোন্নতি দেওয়া হয়।

এ ছাড়াও মেডিকেল অফিসারদের জন্য মানসম্মত বাসস্থানের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

রাজধানী বা বড় শহর থেকে দূরে কর্মক্ষেত্রে স্থানান্তরিত হওয়ার সময় তাদের সামনে আরেকটি সাধারণ চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, তাদের সন্তানদের জন্য মানসম্পন্ন স্কুলিং সুবিধা নিশ্চিত করা।

জন্ম যাদের মৃত্যু দিয়ে, ভাগ্যে জোটে না কবর

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৪, ০১:৫৬ পিএম
জন্ম যাদের মৃত্যু দিয়ে, ভাগ্যে জোটে না কবর
খবরের কাগজ গ্রাফিকস

চলতি বছরের ২৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাংলোর সীমানা প্রাচীরসংলগ্ন এলাকা থেকে এক নবজাতকের লাশ উদ্ধার করা হয়। রাস্তা থেকে কেউ একজন লাশটি সেখানে ছুড়ে ফেলে চলে যায়। ওই দিন দুপুরে হঠাৎ দেয়ালের অপর পাশের রাস্তা থেকে টুপ করে কিছু পড়ার শব্দ পান পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। তারা এগিয়ে দেখেন একটি ব্যাগ পড়ে আছে। প্রথমে তারা ভয় পান এ ভেবে যে, বোমা বা অন্য কিছু। পরে লাঠিজাতীয় কিছু দিয়ে একটু খুললে নবজাতকের মাথা বেরিয়ে আসে। প্রথমে তারা বিষয়টি উপাচার্যকে জানান। পরে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পুলিশে খবর দেন। এ ছাড়া একই দিনে টিএসসির ফুটপাত থেকে আরেকটি নবজাতকের লাশ উদ্ধার করা হয়। ওই নবজাতকের বয়স ছিল আনুমানিক এক দিন।

ডাস্টবিন ও রাস্তার পাশে ময়লা জায়গায় ফেলে দেওয়া এসব নবজাতকের বেশির ভাগই মায়ের পেটে বা জন্ম হওয়ার সময় মারা যায়। পরিচয় গোপন করতেই তাদের ফেলে দেওয়া হয়। যেসব নবজাতকের লাশ উদ্ধার করা সম্ভব হয় তাদের কবর জুটলেও বাকিরা যায় শেয়াল-কুকুর ডাস্টবিনের পেটে।

ভিসির বাংলো এলাকা থেকে নবজাতকের লাশ উদ্ধারের ঘটনাটি ব্যাপক আলোচনায় আসে। এ ঘটনায় ওই নবজাতকের বাবা সুলতান মিয়াকে গ্রেপ্তারও করে পুলিশ। সুলতান দায় স্বীকার করে জানান, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার স্ত্রী খাদিজা একটি মৃত কন্যাশিশুর জন্ম দেন। সুলতান শিশুর লাশ হাসপাতাল থেকে বুঝে নিয়ে গোপনে একটি বাজারের ব্যাগে ভরে উপাচার্যের বাসভবনের সীমানা দেয়ালের পাশে বাগানের উত্তর-পূর্ব কোণে ফেলে যান। সিসিটিভির ফুটেজ দেখে এবং সুলতানের শ্যালক মুত্তাকীর স্বীকারোক্তির মাধ্যমে পুলিশ অভিযুক্ত সুলতানকে শনাক্ত করে। এরপর পুলিশ অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে। 

বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ২১ নভেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন এলাকা থেকে অন্তত ১৬টি নবজাতকের লাশ উদ্ধার করেছে শাহবাগ থানা ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টরিয়াল টিম।

২০১৮ সালের ২১ নভেম্বর কার্জন হলের বাসস্ট্যান্ড থেকে একটি নবজাতকের লাশ উদ্ধার করা হয়। ২০১৯ সালের ২৭ জুন শহীদুল্লা হল এলাকা থেকে একটি, পরের বছর ২০২০ সালের ২৮ অক্টোবর কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির পিছন থেকে একটি, একই বছর ৯ ডিসেম্বর শহীদুল্লা হলের পেছনে পানির পাম্পসংলগ্ন কেচিগেটের পাশ থেকে একটি এবং ওই বছরের ৫ ডিসেম্বর জগন্নাথ হলের পাশ থেকে একটি নবজাতকের লাশ উদ্ধার করা হয়।

২০২১ সালের ২৬ অক্টোবর গণিত ভবনের পাশ থেকে একটি, ২০২২ সালের ১৮ জানুয়ারি রাসেল টাওয়ারের ফুটপাত থেকে একটি, একই বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ছবির গেট এলাকা থেকে দুটি, ওই বছর ১৭ মার্চ অমর একুশে হলের পাশের ফুটপাত থেকে একটি এবং একই বছর ২০ সেপ্টেম্বর শহিদ মিনার এলাকা থেকে একটি নবজাতকের লাশ উদ্ধার করা হয়।

২০২৩ সালের ১২ আগস্ট অমর একুশে হলের ফুটপাত থেকে দুটি এবং সর্বশেষ গত ২৯ ফেব্রুয়ারি উপাচার্যের বাংলো এলাকা ও টিএসসির ফুটপাত থেকে একটি করে মোট দুটি নবজাতকের লাশ উদ্ধার করা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাবির নির্দিষ্ট সীমানাপ্রাচীর না থাকা, বহিরাগতদের অতিরিক্ত যানবাহনের চলাফেরা করার কারণে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় এসব অপরাধ বেড়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সিটি করপোরেশন, সড়ক বিভাগসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা জোরদার করতে কাজ করছে প্রশাসন। 

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ডক্টর এম মাকসুদুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে ঢাকা মেডিকেল ও বেশ কয়েকটি ক্লিনিক রয়েছে। এটা তারই একটি প্রতিফল। নবজাতকের লাশ হাসপাতাল থেকে বুঝে পাওয়ার পর অনেকে আশেপাশের (বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা) খালি জায়গায় ফেলে যায়। তবে অধিকাংশ লাশ ডাস্টবিনে পাওয়া যায়। ঘটনাগুলো ভোরের দিকে বেশি হয়। কারণ এ সময়ে ক্যাম্পাস ফাঁকা থাকে। এটা তো ক্যাম্পাসের সমস্যা না। কিন্তু এখানে এনে ফেলার কারণে আমরা সমস্যায় পড়ে যাই।’

তিনি বলেন, ‘এটা ভয়াবহ অপরাধ। মৃত বাচ্চা হলেও দাফন করতে হবে। গত ফেব্রুয়ারিতে এ ধরনের ঘটনায় আমরা মামলা করেছি। সুলতান নামে একজন গ্রেপ্তারও রয়েছে। সে এখন কারাগারে আছে। তবে ঢাকা মেডিকেল এ ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কোনো উদ্যোগ নেয়নি।’ 

প্রক্টর আরও জানান, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে সতর্ক রয়েছে। ক্যাম্পাসে ওই ঘটনার পর থেকে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। ক্যাম্পাসে অপরাধ করে কেউ পার পাবে না।

এ বিষয়ে শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ঢাবি ক্যাম্পাসে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। ক্যাম্পাসসহ আশপাশের এলাকায় পুলিশের বিশেষ টিম কাজ করছে। পাহারা ও নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। এ ছাড়াও মোবাইল কোর্ট অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।’

ভারতবিরোধী অবস্থান থেকে সরে আসছে বিএনপি!

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৪, ০২:০০ পিএম
ভারতবিরোধী অবস্থান থেকে সরে আসছে বিএনপি!
ছবি : সংগৃহীত

দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ থাকা সত্ত্বেও ভারতবিরোধী অবস্থান বিএনপি দলগতভাবে আর জোরালো করবে না। বরং বৃহৎ প্রতিবেশী এই দেশটি সম্পর্কে বিএনপি আপাতত নীরব থাকার কৌশল নিয়েছে।

নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো জানাচ্ছে, ভারতবিরোধী অবস্থান স্পষ্ট করার বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সায় মেলেনি। এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানেরও কোনো নির্দেশনা নেই। সিনিয়র বেশ কয়েকজন নেতা ‘ভারত ইস্যু’তে তার সঙ্গে কথা বলেছেন; বুঝিয়েছেন, এমন খবর পাওয়া গেছে। এরপর গত দুই সপ্তায় ভারতের বিরুদ্ধে বিএনপি নেতাদের কথাবার্তা থেমে গেছে। 

তবে দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী যে ভারতীয় পণ্য বর্জনের আন্দোলনে সংহতি জানিয়েছেন, সেটি দলের নেতা-কর্মীদের মনোভাব ও শীর্ষ নেতৃত্বের ইঙ্গিতেই হয়েছে বলে বিএনপির অধিকাংশ সিনিয়র নেতা বিশ্বাস করেন। তাদের মতে, গত ৭ জানুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও এর সমর্থক দলগুলোর ভেতরে-বাইরে ভারতের বিরুদ্ধে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়েছে; যার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে রিজভীর ভূমিকায়। দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের বক্তব্যেও এর কিছুটা প্রকাশ দেখা গেছে। নির্বাচনের পর গত ফেব্রুয়ারি মাসে রাজধানী ঢাকায় এক কর্মসূচিতে বিএনপি নেতা ড. আবদুল মঈন খান বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ভারতবিদ্বেষ কেন বাড়ছে, তা খুঁজে দেখার জন্য ভারতের নীতিনির্ধারকদের প্রতি আহ্বান জানান। প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘আজকে আমাদের বন্ধুরাষ্ট্রকে এমন একটা পারস্পরিক অবিশ্বাসের দোলাচলে কেন এই সরকার নিয়ে যাচ্ছে?’

গত ২০ মার্চ এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলমান ভারতের পণ্য বর্জনের আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানান এবং ভারতের বিরুদ্ধে ক্ষোভের প্রকাশ দেখান। ওই দিন নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে নিজের গায়ের কাশ্মীরি শাল ছুড়ে ফেলে দিলে নেতা-কর্মীরা তাতে আগুন ধরিয়ে দেন। এর পর থেকেই বিএনপির ভারতবিরোধী অবস্থানের বিষয়টি আলোচনায় আসে। বিএনপির পাশাপাশি সমমনা দলগুলোর নেতাদের বক্তৃতা-বিবৃতিতেও ভারত-বিরোধিতার বিষয়টি উঠে আসে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, এমনকি ভারতের কোনো কোনো থিংক ট্যাংক সদস্যও এ বিষয়ে তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।

এমন পরিস্থিতিতে গত ২৫ মার্চ বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও বিষয়টি আলোচিত হয়। তবে ওই বৈঠকে ভারত প্রশ্নে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। পরবর্তী বৈঠকে ওই ইস্যুতে আলোচনার কথা থাকলেও এ প্রসঙ্গে আর কোনো আলোচনা ওঠেনি। দলটির নীতিনির্ধারক একাধিক নেতা খবরের কাগজকে নিশ্চিত করেন, এসব ইস্যু আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো বিষয় নয়। আবার ভবিষ্যতে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনাও কম। পাশাপাশি রুহুল কবির রিজভীও এ বিষয়ে কথা বলা কমিয়ে দিয়েছেন। তবে রিজভী খবরের কাগজকে জানিয়েছেন, ভারতীয় পণ্য বর্জনের ওই সামাজিক আন্দোলন হয়তো চলবে। এ বিষয়ে বিএনপি হস্তক্ষেপ করবে না। 

ভারতবিরোধী অবস্থান থেকে বিএনপি সরে এসেছে কি না- এমন প্রশ্নের উত্তরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. আবদুল মঈন খান খবরের কাগজকে বলেন, ‘বিএনপি কখন ভারতবিরোধী অবস্থান নিয়েছিল, সেটি আমার জানা নেই। হতে পারে অনেকেই এ রকম মনে করেন। তবে ভারত বিএনপির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব’ বাংলাদেশের এই পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তিতেই বিএনপি কাজ করে থাকে। ভারতের কোনো ভূমিকার কারণে বাংলাদেশের জনগণ যদি ভারতবিরোধী হয়ে যায়, সেটি বিএনপির বিষয় নয়। ভারতের নীতিনির্ধারকদের বিষয়টি বিশ্লেষণ করে হয়তো দেখতে হবে যে বন্ধুত্ব দুটি দেশের জনগণের মধ্যে কাম্য। দুটি সরকারের মধ্যে নয়।’

‘মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে এভাবেও বলা যায় যে বাংলাদেশের জনগণের আপাতদৃষ্টির ভারতবিদ্বেষ আসলে এ দেশের মানুষের বর্তমান সরকারবিদ্বেষেরই বহিঃপ্রকাশ’ যোগ করেন ড. খান।

স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু খবরের কাগজকে বলেন, ভারতীয় পণ্য বর্জনে সংহতি জানানোর বিষয়ে রিজভী নিজেই ব্যাখ্যা দিয়েছেন যে এটি তার ব্যক্তিগত সমর্থন, দলের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি বলেন, ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়- শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রবর্তিত এই পররাষ্ট্রনীতিই বিএনপি মেনে চলে।’

গতকাল বৃহস্পতিবার (১৮ এপ্রিল) রুহুল কবির রিজভী খবরের কাগজকে আরও বলেন, ‘ভারতের পণ্য বর্জন বিষয়টি একটি সামাজিক আন্দোলন। আমার মনে হয়েছে, এই আন্দোলন তারা সঠিক কারণে করেছে। কারণ ভারত এ দেশের মানুষকে পছন্দ করে না। তারা একটি দলকে পছন্দ করে। এ জন্য তারা ভারতের পণ্য কিনবে না।’ 

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘বিএনপির অনেকেই এই আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়েছেন। আমিও ব্যক্তিগতভাবে সমর্থন করেছি। এখানে দলের কোনো বিষয় নেই।’

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল এমন আভাস দিয়েছিলেন যে বিএনপিতে ভারত-বিরোধিতা বাড়তে পারে। কারণ গত চারটি নির্বাচনেই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পাশে ভারত ছিল বলে মনে করে বিএনপি। দলটি এ জন্য প্রতিটি নির্বাচনের আগেই ভারতের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টা চালিয়েছে। ২০১৮ সালের জুনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির ভারত সফর করেন। দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নির্দেশে ওই সফর শেষে ‘দ্য হিন্দু’ পত্রিকায় এক সাক্ষাৎকার দেন হুমায়ুন কবির। 

তিনি বলেন, ‘পেছনে ফিরে তাকানোর পরিবর্তে আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। আশি ও নব্বইয়ের দশকের রাজনীতি এখন বিলুপ্ত হয়ে গেছে।’ তারেক রহমানের উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির আরও বলেন, ‘তারেক রহমান চান আমরা ভারতের সঙ্গে যুক্ত হই। এখন উভয় দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীই আমাদের প্রধান অগ্রাধিকারের বিষয়।’ দ্য হিন্দুর ওই সাক্ষাৎকারে বিএনপি সরকারের বিগত আমলগুলোতে ভারত ও বাংলাদেশের খারাপ সম্পর্কের নীতিকে ‘ভুল ও বোকামি’ বলেও মন্তব্য করেছিলেন হুমায়ুন কবির।

ওই সফরের বাইরেও গত ১৫ বছরে নানাভাবে ভারতের মন গলানোর চেষ্টা করে বিএনপি। যুদ্ধাপরাধের দায়ে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীসহ জামায়াতে ইসলামী নেতাদের ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পর বিএনপির নীরবতা, প্রায় এক যুগ ধরে জামায়াতের সঙ্গে শীতল সম্পর্ক তৈরি, ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে ২০-দলীয় জোটের বাইরে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন, হেফাজতে ইসলামসহ ইসলামপন্থি দলগুলোর সঙ্গে সরাসরি গাঁটছড়া না বাঁধা; এসবই ভারতকে খুশি করার জন্য করা হয়েছে বলে রাজনীতিতে আলোচনা আছে। ২০১৭ সালের ১০ মে বিএনপির ঘোষিত ‘ভিশন ২০৩০’ রূপকল্পে অন্য কোনো রাষ্ট্রের জন্য নিরাপত্তা সমস্যা সৃষ্টি না করা এবং কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কেউ নিরাপত্তা হুমকি সৃষ্টি করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকারও করা হয়েছিল মূলত ভারতকে খুশি করার জন্য। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ২০০৪ সালে চট্টগ্রামে ধরা পড়া ১০ ট্রাক অস্ত্রই ভারতের সঙ্গে আজ পর্যন্ত বিএনপির শীতল সম্পর্কের মূল কারণ। সমালোচনা আছে, ধরা না পড়লে ওই অস্ত্র ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হাতে যেত, যা দেশটির নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে মনে করা হয়।

কংগ্রেস সরকারের আমলে সংঘটিত ওই ঘটনার পর বিএনপি মনে করেছে, দিল্লিতে ক্ষমতার বদল হলে বাংলাদেশ প্রশ্নেও ভারতের মনোভাবে পরিবর্তন আসবে। এ লক্ষ্যে ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিএনপির পক্ষ থেকে ভারতের নীতিনির্ধারকদের কাছে অনেক ধরনের রাজনৈতিক ‘বার্তা’ পাঠানো হয়। চেষ্টা করা হয় সম্পর্কোন্নয়নের। দিল্লির ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকের সঙ্গে দেশে-বিদেশে বেশ কিছু বৈঠকের খবরও গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। কিন্তু মোদি ক্ষমতায় আসার পর ‘নেইবারহুড ফার্স্ট’ (প্রতিবেশীরা সবার আগে) পররাষ্ট্রনীতি ঘোষণা করে বুঝিয়ে দেন কংগ্রেস জমানার বাংলাদেশ নীতিতে তিনি কোনো পরিবর্তন তো আনবেনই না; বরং ঘরের পাশে এই বন্ধুদেশটি তার সরকারের কাছে সর্বাধিক গুরুত্ব পাবে। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেও অতিদ্রুত তার একধরনের ‘পারসোনাল কেমিস্ট্রি’ বা ব্যক্তিগত রসায়ন তৈরি হয়। অনেকের মতে, মোদি-হাসিনার ওই কেমিস্ট্রি আজ পর্যন্ত বহাল আছে। ফলে বিএনপির বড় অংশই এখন মনে করা শুরু করেছেন যে, বিএনপিকে ভারত কখনোই আস্থায় নেবে না। সর্বশেষ নির্বাচনের পর বিএনপিতে এমন মনোভাবই জোরালো হয়েছে। 

তবে সূত্রের দাবি, নির্বাচনের পর ওই ক্ষোভ থেকেই দলের কেউ কেউ রিজভীকে নির্দেশনা দিলেও এখন আস্তে আস্তে পাল্টা মত তৈরি হচ্ছে। রিজভীর ক্ষোভ প্রকাশের চার দিন পরই বিএনপির ইফতার পার্টিতে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে ঢাকাস্থ ভারতীয় কূটনীতিকরা অংশ নেন। অনেকেই বলছেন, বিএনপি যেহেতু ক্ষমতায় যাওয়ার পার্টি, সেহেতু ভারতের মতো বৃহৎ প্রতিবেশীর সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক রাখাই ভালো। ভারতের পণ্য বর্জনের আন্দোলন আদৌ কোনো ফল বয়ে আনবে কি না, তা নিয়েও অনেকের সংশয় রয়েছে। কারণ বাংলাদেশে চীনের পর ভারত থেকেই সবচেয়ে বেশি পণ্য আমদানি করা হয়ে থাকে, যা মোট আমদানির প্রায় ২০ শতাংশ। এর মধ্যে পেঁয়াজের মতো জরুরি অনেক নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের জন্য ভারতের ওপর নির্ভরতা রয়েছে বাংলাদেশের আমদানিকারকদের। 

বিএনপির মধ্যে ভারতপন্থি বলে পরিচিত স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য খবরের কাগজকে বলেন, ‘প্রতিবেশীকে তো বদল করা যাবে না। তা ছাড়া ভারত এখন সুপার পাওয়ার। যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত তাদের সমীহ করে চলে। এমন পরিস্থিতিতে দেশটির সঙ্গে বৈরিতা করে লাভ নেই।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থায়ী কমিটির আরেকজন সদস্য বলেন, বিএনপি ভারতের ভূমিকার সমালোচনা করতে পারে। কিন্তু ভারত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে কিছু অর্জন করা যাবে না। তার মতে, ভারত আজ বিএনপিকে সমর্থন করছে না। কিন্তু আগামীকাল যে করবে না, তার নিশ্চয়তা কী?

ভারতের লোকসভা নির্বাচন নিয়ে কৌতূহল বাংলাদেশে

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৪, ০১:৩০ পিএম
ভারতের লোকসভা নির্বাচন নিয়ে কৌতূহল বাংলাদেশে

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের অনেকগুলো অভিন্ন ইস্যু রয়েছে। তিস্তা চুক্তি ও অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন, সীমান্তে হত্যাকাণ্ড, ট্রানজিট ও বন্দর ব্যবহারের মতো ইস্যুগুলোর পাশাপাশি নতুন যুক্ত হয়েছে দেশটির নাগরিকত্ব আইন। এ অবস্থায় আজ শুক্রবার থেকে শুরু হচ্ছে বিশ্বের বৃহত্তম এই গণতান্ত্রিক দেশটির জাতীয় নির্বাচন। স্বভাবতই নিকটতম প্রতিবেশী হিসেবে দেশটির এই নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশ সরকার, বিরোধী দল ও সাধারণ মানুষের মধ্যে রয়েছে ব্যাপক কৌতূহল। 

ভারতে নির্বাচন হয় প্রায় দেড় মাস ধরে। ৭ ধাপের এই নির্বাচন শেষ হবে ১ জুন। বিভিন্ন জরিপে দেখা যাচ্ছে, বর্তমানে ক্ষমতাসীন বিজেপি জোটই ক্ষমতায় থেকে যাবে।

ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে ১৯৯৬ সালে গঙ্গা নদীর পানিবণ্টনের চুক্তি সই হলেও তিস্তাসহ আলোচনায় থাকা ৮ অভিন্ন নদীর পানিবণ্টনের ব্যাপারে এখনো কোনো সুরাহা হয়নি। এ অবস্থায় ২০২৬ সালে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদও শেষ হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি বিজেপি জোট ক্ষমতায় থাকে বা না থাকে তারপরও বাংলাদেশের সঙ্গে দেশটির সম্পর্কে কোনো প্রভাব পড়বে না। তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি হবে বলে মনে হয় না। চুক্তি না হওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় সরকার পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের ওপর দায় চাপাচ্ছে। কিন্তু এ কথা মনে করার কোনো কারণ নেই যে, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় গেলে তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি হবে।

এ প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মো. তৌহিদ হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘একরকম নিশ্চিত যে বিজেপি জোটই ক্ষমতায় আসছে। তবে কংগ্রেস বা বিজেপি যেই ক্ষমতায় আসুক, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কে কোনো হেরফের হবে না।’

এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি হবে না। ফলে যা করার বাংলাদেশকেই করতে হবে। পশ্চিমবঙ্গ থেকে সিকিমে প্রচুর পানি দিতে হয়। কাজেই তিস্তা প্রকল্প করার ব্যাপারে চীন আগ্রহ দেখিয়েছে। এটা স্বাভাবিক। ভারত যদি যোগ দিতে চায় দিতে পারে। সেক্ষেত্রে ত্রিপক্ষীয় একটা ব্যাপার থাকবে। জাপান বা অন্য কোনো দেশও যুক্ত হতে পারে। এটা কোনো সমস্যা না।’

ট্রানজিট ও বন্দর ব্যবহার

বাংলাদেশ ভারতকে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু ভারতের স্থল, বিমান ও সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে নেপাল ও ভুটানে পণ্য পরিবহনের সুবিধা বাংলাদেশকে দেওয়া হয়নি। এ অবস্থায় ভারতকে দেওয়া ও পাওয়ার মধ্যে বিস্তর ফারাক নিয়েও আলোচনা হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মো. তৌহিদ হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘বন্ধুত্বের কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই। যেমন পানি নিয়েও ২০ বছরে অগ্রগতি নেই। তারপরও কিন্তু আমরা কখনো বলিনি যে ভারত আমাদের বন্ধু না।’

ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে নিরাপত্তার সমস্যা সমাধান করেছে বাংলাদেশ। সে হিসেবে ভারতও মনে করে যে বন্ধুরাষ্ট্র থাকাটা তাদের জন্যও খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমি মনে করি ট্রানজিট ইস্যুতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রেসার বাড়ানো দরকার। একতরফা ট্রানজিট হলে সেটা ভবিষ্যতে আর ট্রানজিট থাকবে না। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা লাভবান না হলে অন্য ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্যের দিকে জোর দেবে তারা। ফলে ব্যবসা কমে যাবে। তখন বাংলাদেশ ব্রাজিল, আফ্রিকার সঙ্গে ব্যবসা বাড়াবে। তাই ভারতেরও বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করা দরকার। ভুটান ও নেপালকেও ট্রানজিট সুবিধা দিলে সব দেশেরই উপকার হবে।’

সীমান্তে হত্যাকাণ্ড

বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সীমান্ত রয়েছে প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটারের মতো। সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি নিয়মিত মারা যান। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) এক হিসাবে দেখা যায়, প্রতিবছর আগের বছরের তুলনায় সীমান্তে বিএসএফ বেশি মানুষ মারছে। ২০২১ সালে বিএসএফের গুলিতে প্রাণ হারায় ১৭ বাংলাদেশি। ২০২২ সালে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ২৩-এ। ২০২৩ সালে মারা গেছেন ৩০ জন বাংলাদেশি। এ ছাড়া নিয়মিত বাংলাদেশিদের সীমান্ত থেকে অপহরণের মতো ঘটনা অহরহই ঘটে। 

এ প্রসঙ্গে ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘সীমান্তে সমস্যা রয়ে গেছে। হত্যাকাণ্ড বেড়েছে। তাই বিষয়টিতে বেশি মনোযোগ দেওয়া দরকার যেটা এখনো দেওয়া হয়নি। নির্বাচনে কংগ্রেস এলেও যে বিষয়টিতে মনোযোগ দেবে তেমন নয়। চীন ও ভারতের মধ্যে চুক্তি আছে যে সীমান্তের দুই কিলোমিটারের মধ্যে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করা যাবে না। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যেও এমন চুক্তি হওয়া দরকার।’

নতুন মাথাব্যথা ভারতের নাগরিকত্ব আইন

ভারত সম্প্রতি কিছুটা সংশোধন করে নাগরিকত্ব আইন বা সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট (সিএএ) কার্যকর করেছে। এই আইন অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে যেসব হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, শিখ, জৈন ও পারসি ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা সাম্প্রদায়িক নির্যাতন ও নিপীড়নের কারণে ভারতে চলে আসাদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। তার মানে ২০১৪ সালের পর থেকে যারা বাংলাদেশ থেকে গিয়ে গত প্রায় সাড়ে নয় বছর ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন তাদের বাংলাদেশে ফেরত আসতে হবে। এই সংখ্যা কত সেটি নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। তাছাড়া বাংলাদেশ তাদের ফেরত নিতে রাজি হবে কী না।

ভারতীয় গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, সিএএ বাস্তবায়নের পর জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) বাস্তবায়নেরও পরিকল্পনা রয়েছে বিজেপির। এটি কার্যকর হলে আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে বহু মুসলিম ভারতের নাগরিকত্ব হারাতে পারেন এবং এর প্রভাব পড়বে বাংলাদেশ সীমান্তে। এ কারণেই অতীতের যে কোনো নির্বাচনের চেয়ে ভারতের এবারের নির্বাচনে বাংলাদেশ ইস্যুটি জড়িয়ে আছে নিবিড়ভাবে।

এ ব্যাপারে ভারত সফর শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘নাগরিকত্ব আইন ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। প্রতিবেশী হিসেবে আমরা নজর রাখছি।’

সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মো. তৌহিদ হোসেন এ প্রসঙ্গে খবরের কাগজকে বলেন, ‘এই আইনের প্রভাব বাংলাদেশে পড়বে। আইনের প্রয়োগ শুরু হলে সীমান্তে এ প্রভাব পড়তে পারে।’

টানা তাপপ্রবাহের রেকর্ডের পথে বাংলাদেশ

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৪, ১২:২২ পিএম
টানা তাপপ্রবাহের রেকর্ডের পথে বাংলাদেশ
প্রচণ্ড গরমে সেচের পানিতে গোসলে মত্ত একদল কিশোর। ছবি: খবরের কাগজ

স্বাভাবিকভাবেই অন্য মাসের চেয়ে আবহাওয়া উষ্ণ থাকে এপ্রিল মাসে। তাপমাত্রা বাড়ার কারণে বয়ে যায় তাপপ্রবাহ। কখনো কখনো সেটি থাকে একটানা। দেশে ১৫ থেকে ১৩ দিন পর্যন্ত লাগাতার তাপপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার তথ্য রয়েছে। অপরদিকে চলতি এপ্রিল মাসের ১৮ দিনই টানা তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। তাই চলমান তাপপ্রবাহকে টানা তাপপ্রবাহের রেকর্ড হিসেবে দেখছেন আবহাওয়া সংশ্লিষ্টরা। 

এ প্রসঙ্গে আবহাওয়াবিদ এ কে এম নাজমুল হক খবরের কাগজকে বলেন, ২০২০ সালের শেষের দিকে টানা ১৩ দিন তাপপ্রবাহের রেকর্ড ছিল। কিন্তু চলতি মাসের শুরু থেকেই চলছে তাপপ্রবাহ। বৃহস্পতিবারও (১৮ এপ্রিল) ২১ জেলার ওপর দিয়ে তাপপ্রবাহ ছিল। চার জেলায় ছিল তীব্র তাপপ্রবাহ। সে হিসাবে গত কয়েক বছরের মধ্যে এটা বেশি দিন টানা হিট ওয়েভের রেকর্ড হতে যাচ্ছে। 

আবহাওয়া-সংশ্লিষ্টরা জানান, গত বছর বাংলাদেশের আবহাওয়া ছিল অস্বাভাবিক। ২০২৩ সালে জুন মাসেও টানা ১৫ দিন হিট ওয়েভ বা তাপপ্রবাহের তথ্য রয়েছে।

স্বাভাবিকের চেয়ে বাড়ছে তাপমাত্রা
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে এপ্রিল মাসে স্বাভাবিক সর্বোচ্চ তাপমাত্রা হলো ৩৩ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কিন্তু চলতি মাসের ১৭ দিনের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, কোনো দিনই সর্বোচ্চ তাপমাত্রা স্বাভাবিক ছিল না। টানা রেকর্ড হচ্ছে ৩৬ ডিগ্রি সে. এর বেশি। গত ১৩ এপ্রিল থেকে টানা ৪০ ডিগ্রির ওপর থাকছে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা। যার কারণে প্রতিদিনই দেশে বিক্ষিপ্তভাবে তাপপ্রবাহ বয়ে যায়। গত বুধবার ৪০ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে চুয়াডাঙ্গায়, যা মৌসুমের সর্বোচ্চ। যা তাপপ্রবাহের ধরনে তীব্র। গত কয়েক দিন ধরে তীব্র তাপপ্রবাহের বিস্তৃতি হচ্ছে। সঙ্গত কারণেই দুই দফা সতর্কবার্তা দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।

তাপমাত্রা রেকর্ডের স্থান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রাঙামাটিতে ৫ দিন সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। এ ছাড়া চুয়াডাঙ্গায় ৪ দিন, রাজশাহীতে ৩ দিন, ঈশ্বর্দীতে ২ দিন, খেপুপাড়ায় ২ দিন ও কক্সবাজারে ১ দিন দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। 

রাজধানী ঢাকার ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ১৭ দিনের মধ্যে ঢাকার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৮ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয় ১৬ এপ্রিল। এদিন স্বাভাবিকের চেয়ে ৫ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল তাপমাত্রা। আর সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৩০ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয় ৮ এপ্রিল। ১১ দিন ৩৬ ডিগ্রির ওপরে ছিল তাপমাত্রা। যেখানে ঢাকার এপ্রিল মাসের স্বাভাবিক তাপমাত্রা ৩৩ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অধিকাংশ দিনগুলোতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে।

বৃষ্টির সম্ভাবনার মধ্যেও অস্বস্তি বাড়ার পূর্বাভাস
দেশের পাঁচ বিভাগে বৃষ্টির সম্ভাবনার মধ্যেও বাতাসে জলীয়বাষ্পের পরিমাণ বাড়ার কারণে অস্বস্তি বাড়তে পারে বলে নিয়মিত পূর্বাভাসে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, রংপুর, ঢাকা, ময়মনসিংহ, বরিশাল, চট্টগ্রাম এবং সিলেট বিভাগের দু’এক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা-ঝোড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি-বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে কোথাও কোথাও বিক্ষিপ্তভাবে শিলাবৃষ্টি হতে পারে। এ ছাড়া দেশের অন্যত্র অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা আকাশসহ আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকতে পারে। 

বাগেরহাট, যশোর, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়া জেলার ওপর দিয়ে তীব্র তাপপ্রবাহ এবং দিনাজপুর, রাঙামাটি, চাঁদপুর, খুলনা, সাতক্ষীরা, বরিশাল ও পটুয়াখালী জেলাসহ ঢাকা ও রাজশাহী বিভাগের ওপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং তা অব্যাহত থাকতে পারে। সারা দেশে দিনের তাপমাত্রা বাড়তে পারে এবং রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে। জলীয়বাষ্পের আধিক্যের কারণে অস্বস্তি বৃদ্ধি পেতে পারে। শুক্রবার (১৯ এপ্রিল) সন্ধ্যা ৬টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রংপুর, ময়মনসিংহ এবং সিলেট বিভাগের দু’এক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা-ঝোড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি-বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে কোথাও কোথাও বিক্ষিপ্তভাবে শিলাবৃষ্টি হতে পারে। এ ছাড়া দেশের অন্যত্র অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা আকাশসহ আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকতে পারে। সারা দেশে দিন এবং রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে। জলীয়বাষ্পের আধিক্যের কারণে অস্বস্তি বৃদ্ধি পেতে পারে।