নরসিংদী জেলা কারাগারের নাশকতা ভাবিয়ে তুলেছে দেশের মানুষকে। এ হামলা একটি নজিরবিহীন ঘটনা। কারাগারে হামলা, ভাঙচুর, আগুন দেওয়া, ফটক ভেঙে বন্দি পালানো ও লুটপাটের ঘটনায় দেশজুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। দুর্বৃত্তদের দেওয়া আগুনে পুড়ে ছাই হয়েছে কারাগারের গুরুত্বপূর্ণ সব নথি। সূত্রমতে, দেশের ইতিহাসে এর আগে এমনভাবে কোনো কারাগার থেকে সব আসামি পালানো ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেনি। ৪৬টি অস্ত্র এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
এটি রীতিমতো উৎকণ্ঠার বিষয়। এ ঘটনা পরিকল্পিত ছাড়া কিছুই হতে পারে না। এই কারাগারে দুর্ধর্ষ ৯ জন জঙ্গি আসামি ছিল। এ ঘটনায় দুটি মামলা হয়েছে। গঠন করা হয়েছে বিচার বিভাগীয় দুটি তদন্ত কমিটি।
ইতোমধ্যে নরসিংদী কারাগারের জেল সুপার, জেলারসহ সেখানে দায়িত্বরত সবাইকে বরখাস্ত করা হয়েছে। ওই কারাগারে এখন দায়িত্ব পালন করছেন একজন জেল সুপার ও দুজন ডেপুটি জেলার। কারাগারের সব নথি পুড়ে যাওয়ায় আসামিদের ডিজিটাল যে ডেটাবেজ তৈরি করা হয়েছে, সেই তথ্যের ভিত্তিতে মামলা ও গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।
অগ্নিকাণ্ডের ফলে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে নরসিংদীর কারাগারটি। সংস্কারের কাজ চলছে। নরসিংদী জেলা কারাগার থেকে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার করতে পারলে প্রতিটির জন্য ৫০ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছেন আইজিপি। জেলা প্রশাসকের নির্দেশনা অনুযায়ী নরসিংদীর বিভিন্ন স্থানে মাইকিং করা হয়। এতে বলা হয়, যেসব কয়েদি আত্মসর্পণ করবে না, তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র লুট, ভাঙচুরসহ কারাগারে হামলার দায়ে মামলা করা হবে।
হামলার বর্ণনা দিয়ে জেল সুপার আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘শুক্রবার বিকেল সোয়া ৪টার দিকে কাঁদানে গ্যাসের ধোঁয়ায় আমরা তাকাতে পারছিলাম না। তখন আমরা গেটে ছিলাম, সবাই দায়িত্ব নিয়েই কাজ করছিলাম। এর মধ্যে জেলখানায় প্রবেশের প্রথম গেট ও বাসাবাড়ির গেট ভেঙে হামলাকারীরা ভেতরে ঢোকে।
একপর্যায়ে তারা দেশি অস্ত্র ও হামার দিয়ে দ্বিতীয় গেট ভাঙে। এ সময় চায়নিজ কুড়াল, রামদা দিয়ে তারা কোপানো শুরু করে। তা ছাড়া লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা করে। এতে হাজার হাজার মানুষ অংশ নেয়। আমরা বন্দিদের আটকাতে অনেক চেষ্টা করি, তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়নি। হামলাকারীরা কারাগারে ভাঙচুর করে, আগুন দেয় এবং অস্ত্র, বুলেটসহ কয়েদিদের খাবার চাল-ডাল লুটপাট করে নিয়ে যায়। তাৎক্ষণিক পুলিশের কোনো সহায়তা পাইনি আমরা।’
কারা অধিদপ্তরের সূত্রমতে, গত চার দিনে পলাতক ৮২৬ বন্দির মধ্যে ৪৬৮ জন আত্মসমর্পণ করেছেন বা থানা-পুলিশের অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছেন। লুট হওয়া ৮৫ অস্ত্রের মধ্যে ৩৯টি, ১ হাজার গুলি ও অনেক হাতকড়া উদ্ধার করা হয়েছে। নাশকতার ঘটনায় কারাগারের ১১ কোটি ২১ লাখ ৫০ হাজার টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক ইন্সপেক্টর জেনারেল এ কে এম শহীদুল হক খবরের কাগজকে বলেন, নরসিংদী কারাগার ভেঙে ৮২৬ জন আসামি পালিয়ে যাওয়া এবং তার মধ্যে ৯ জন জঙ্গি বের হয়ে যাওয়া খুবই দুঃখজনক। ইতোমধ্যে দুজন নারী জঙ্গিকে আটক করা হয়েছে। জেলখানায় কমপক্ষে দুটি গেট থাকে। সেই গেট ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করা খুবই কঠিন কাজ।
ধারণা করছি, জেলখানার মূল গেট খোলা ছিল। কী কারণে গেট খোলা ছিল তদন্তে তা বেরিয়ে আসবে। জেলখানার গেট খোলা ছিল বলেই দুষ্কৃতকারীরা ভেতরে ঢুকতে সক্ষম হয়েছে। কয়েদিরাও সহযোগিতা করেছেন। কতটা ভয়াবহ পরিস্থিতি ছিল দেশের জন্য।
এদের যদি পুনরায় গ্রেপ্তার করতে না পারে, তাহলে তা হবে দেশ ও জননিরাপত্তার জন্য চরম হুমকি। তারা এখন দেশে অন্য কোনো নাশকতা তৈরি করে কি না তা দেখতে হবে। গোয়েন্দাসহ সব বাহিনীকে একযোগে এদের গ্রেপ্তারে কাজ করতে হবে। তা না হলে এরা দেশের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
চলমান পরিস্থিতিতে দেশের সব কারাগারের নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে। কারাগারে সন্ত্রাসী কার্যক্রম ঠেকাতে সরকারকে কঠোর নরজদারি বাড়াতে হবে। যেসব জঙ্গি ও দুর্ধর্ষ কয়েদি অস্ত্র, গোলাবারুদসহ পালিয়েছে, তাদের উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে একযোগে কাজ করতে হবে।
জঙ্গিরা পালিয়েছে, তারা যাতে নাশকতার পরিকল্পনা না করতে পারে সে জন্য দ্রুত তাদের গ্রেপ্তারে তৎপর হতে হবে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জনসাধারণও তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করতে পারে। সর্বোপরি দেশের শান্তিশৃঙ্খলা ও জনসাধারণের জানমালের নিরাপত্তায় সরকার জোরালো ভূমিকা পালন করবে, সেটিই প্রত্যাশা।