সুফিয়া কামাল জাতীয় গণগ্রন্থাগার বা কেন্দ্রীয় গণগ্রন্থাগার বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পাঠাগার। এই গ্রন্থাগারটি ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়। গত ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত গণগ্রন্থাগারটিতে থাকা বইয়ের সংখ্যা ২ লাখ ৬২ হাজারের বেশি। অথচ পাঠকের সংখ্যা খুবই কম। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ৩০ জন পাঠক আসেন। এক কথায় বলা যায়, বইভর্তি পাঠাগার আছে ঠিকই কিন্তু পাঠক নেই। কর্তৃপক্ষ বলছে, পাঠাভ্যাস কমে যাওয়াই পাঠক কমে যাওয়ার মূল কারণ। কিন্তু পাঠকদের অভিযোগ, তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী বই না পাওয়া, নতুন প্রকাশিত গ্রন্থের অপ্রতুলতা, পুরোনো ধ্যান-ধারণায় পাঠাগার পরিচালনা এবং প্রচারের অভাবে পাঠাগারটি তার আকর্ষণ হারাচ্ছে।
সুফিয়া কামাল জাতীয় গণগ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী এখন প্রতিদিন গড়ে ৩০ জন পাঠক আসেন এই গ্রন্থাগারে। অথচ গত ২০২০ সালে ছিল প্রতিদিন গড়ে ৯৫৪ জন এবং ২০১৮ সালে এ সংখ্যা ছিল প্রতিদিন ২ হাজার ৯৪৯ জন।
সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বাস্তবায়নাধীন গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের বহুতল ভবন নির্মাণ প্রকল্পের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। প্রকল্পের কাজ চলায় অধিদপ্তরের অধীন সুফিয়া কামাল জাতীয় গণগ্রন্থাগারের কার্যক্রম শাহবাগ থেকে রমনা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন (আইইবি) ভবনে স্থানান্তর করা হয় ২০২২ সালের এপ্রিলে।
গত ৩ ফেব্রুয়ারি সোমবার সকালে সরেজমিনে গ্রন্থাগারটিতে গিয়ে দেখা যায়, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত হাতেগোনা ৩-৪ জন পাঠক এসেছেন। এদের মধ্যে একজন মোমেনা আক্তার পান্না। তার বাসা মহাখালীতে। খবরের কাগজের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘আমি একটি প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা করছি। তবে আরও ভালো চাকরির জন্য চেষ্টা করছি। বাসায় ছোট দুটি সন্তান থাকায় বাসায় মনোযোগ দিয়ে পড়া সম্ভব হয় না। তাই স্কুল ছুটি থাকায় এখানে পড়তে এসেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি মূলত এখানে এসে অনলাইনে ক্লাস করি এবং সে অনুযায়ী পড়াশোনা করি।’ এখানে চাকরির জন্য প্রয়োজনীয় তেমন বই নেই জানিয়ে তিনি বলেন, চাকরির জন্য প্রয়োজনীয় বই থাকলে হয়তো এ পাঠাগারে আরও পাঠক আসতেন। কারণ এখানে সবই শিল্প-সাহিত্যসহ সৃজনশীল ধারার বই। কিন্তু এখন দেখা যায় লাইব্রেরিতে পড়তে আসাদের বেশির ভাগই চাকরিপ্রার্থী। তাই তাদের ধরে রাখার জন্য লাইব্রেরিগুলোকে নতুনভাবে চিন্তা করা উচিত।
আব্দুর রহমান নামের আরেক পাঠকের দেখা মেলে পাঠাগারে। তিনি আসেন নাজিমউদ্দীন রোড থেকে। পাঠাগারে হেড ফোন কানে দিয়ে মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায় তাকে। খবরের কাগজকে তিনি বলেন, ‘আমি একজন চাকরিপ্রার্থী। এখানে এসে পাঠাগারের ফ্রি ওয়াইফাই ব্যবহার করে বিভিন্ন অনলাইন কন্টেন্ট দেখি এবং ক্লাস করি।’ এই পাঠাগারে চাকরিপ্রার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত বই নেই অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘চাকরিপ্রার্থীদের জন্য প্রতিবছর আপডেট হওয়া বইগুলো যদি থাকত তাহলে আমাদের অনেক উপকার হতো। তবে এখানে এলে অনেক দৈনিক পত্রিকা একসঙ্গে পড়ার সুযোগ হয়। তাই এটি আমাদের উপকারে আসে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখানে অনেক পাঠকই আসেন সারা দিনের জন্য। কিন্তু আগত পাঠকদের দুপুরে খাবার খাওয়ার কোনো জায়গা নেই। আমরা বাড়ি থেকে খাবার আনলেও এখানে পাঠাগারের ভেতরে তো বসে খাওয়ার নিয়ম নেই। আর এর আশপাশেও কোনো জায়গা নেই। ফলে বাধ্য হয়ে সিঁড়িতে বসে খাবার খেতে হয়। এ ছাড়া এখানে কোনো অনুষ্ঠান হলে তা পাঠাগারের ভেতরেই হয়। ফলে আমাদের পড়ার সুযোগ সে সময় বন্ধ থাকে। আমার মনে হয় অনুষ্ঠানগুলো অন্যখানে হওয়া প্রয়োজন।’
গ্রন্থাগারটির জুনিয়র লাইব্রেরিয়ান ফরিদা নাসরিন সাথি খবরের কাগজকে বলেন, পাঠকদের জন্য এখানে বিভিন্ন ধরনের মোট ২ লাখ ৬২ হাজার ৫১৭টি বই আছে। পাশাপাশি প্রতিদিন বাংলা দৈনিক পত্রিকা থাকে ৮টি এবং ইংরেজি পত্রিকা থাকে ৫টি। এ ছাড়া বাংলা ও ইংরেজি মিলিয়ে মোট ৫টি সাময়িকী রাখা হয় পাঠকদের জন্য। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত পাঠাগার খোলা থাকে। এ সময় পাঠকরা এখানে বসে বইগুলো পড়তে পারেন। তবে বই ধার নিতে গেলে পাঠাগারের সদস্য হতে হয়। এর জন্য স্টুডেন্টদের ৫০০ টাকা এবং সিনিয়র সিটিজেনদের জন্য ১ হাজার টাকা দিতে হয়। এই সমপরিমাণ অর্থের বই কেবল তারা নিতে পারেন।
গণগ্রন্থাগারটির স্থান পরিবর্তনের কারণে পাঠক কমে গেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘শাহবাগের আগের জায়গায় এখন আধুনিক ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। এ অবস্থায় আমরা এখানে সাময়িকভাবে স্থানান্তরিত হয়েছি। ওখানে যত বড় জায়গা ছিল এখানে তা নেই। মাত্র একটি ফ্লোরে আমরা জায়গা পেয়েছি। ফলে আমরা আমাদের সব বইও ডিসপ্লে করতে পারছি না। এখানে পাঠকদের বসার আসন সংখ্যা মাত্র ১০০টি।’
গ্রন্থাগারটির প্রিন্সিপাল লাইব্রেরিয়ান ও উপপরিচালক ফিরোজা পারভীন বলেন, ‘পাঠক বাড়ানোর জন্য আমরা বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম হাতে নিয়েছি। এর অংশ হিসেবে আমরা বিভিন্ন স্কুল-কলেজে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় করি। তাদের সৃজনশীল বই পড়তে আগ্রহী করার চেষ্টা করি। তারা যেন পাঠাগারে এসে বই পড়ে সে বিষয়েও আলোচনা করি। পাঠকের সুবিধার জন্য এখানে ফ্রি ওয়াইফাইয়ের ব্যবস্থা আছে। এ ছাড়া বইয়ের তালিকা ডিজিটালি দেওয়া আছে, তাই বই খুঁজে পাওয়া এখন সহজ হয়েছে।’
খবরের কাগজকে তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এখানে সৃজনশীল পাঠকদের জন্যই মূলত কাজ করছি। তাই সৃজনশীল বইগুলোই থাকে। চাকরিপ্রার্থীদের জন্য বই আমরা এখানে কম রাখি। তবে এখানে বইয়ের রিকোয়ারমেন্ট দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। পাঠক যদি আবেদন করেন, তবে সেটি আমরা বই কেনার কমিটিতে উপস্থাপন করি। পরবর্তী সময়ে তারা সিদ্ধান্ত নেন যে, কোন বই পাঠাগারের জন্য কিনবেন।’
পাঠক ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাবলিক লাইব্রেরি এখনো নানা বয়সের পাঠকের জন্য সাহিত্য, গবেষণা এবং বিষয়ভিত্তিক বই রাখে। তবে এখন তরুণ পাঠকদের কাছে তা আর আগের মতো আবেদন তৈরি করতে পারছে না। কিন্তু পাঠকদের চাহিদা অনুযায়ী যদি বই পাওয়া যায় এবং নতুন প্রকাশিত প্রয়োজনীয় বইগুলো পাঠাগারের সংগ্রহে থাকে তাহলে হয়তো হারিয়ে যাওয়া জৌলুশ ফিরে পেত পাঠাগারগুলো।