শীতের এক কনকনে সকাল। চারদিকে তীব্র ঠান্ডা। এমন এক সকালে চীনের শানসি প্রদেশের ইয়ানহু জেলায় চাং ছাংছিন নামের এক ব্যক্তির চোখে ধরা পড়ল অদ্ভুত ও হৃদয়বিদারক দৃশ্য। একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী প্রচণ্ড শীতের মধ্যে ঠান্ডা পানি দিয়ে শক্ত ও ঠাণ্ডা রুটি গিলে খাওয়ার চেষ্টা করছেন। সমাজের অপরিহার্য এই কর্মীদের এমন মানবেতর দশা চাং-এর মনে গভীর দাগ কাটে। সেই মুহূর্তেই তিনি এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেন—রাস্তার এই পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের জন্য অন্তত একবেলা গরম ও পুষ্টিকর সকালের নাস্তার ব্যবস্থা করবেন।
এই মানবিক তাড়না থেকেই ২০১৬ সালের নভেম্বরে শুরু হয় একটি অনন্য জনকল্যাণমূলক প্রকল্প। তবে এর শুরুটা সহজ ছিল না। ২০১৬ সালে যখন চাং এই ফ্রি ব্রেকফাস্ট প্রজেক্ট বা বিনামূল্যে সকালের নাস্তা দেওয়ার কর্মসূচি শুরু করেন, তখন তার সাথে ছিলেন মাত্র কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবী। কিন্তু চাং দমে যাননি। তিনি পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে গিয়ে বোঝাতে শুরু করেন, কেন এই উদ্যোগটি প্রয়োজন এবং এর গুরুত্ব কতটুকু।
ধীরে ধীরে তার এই নিঃস্বার্থ প্রচেষ্টা মানুষের বিবেককে নাড়া দেয়। সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ, বড় বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলো এই উদ্যোগে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়। চাল, ডাল, সবজিসহ বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী ও প্রয়োজনীয় রসদ আসতে শুরু করে চারপাশ থেকে।
১০ বছরের পরিসংখ্যান ও বিশাল অর্জন
দেখতে দেখতে কেটে গেছে দীর্ঘ ১০টি বছর। এই এক দশকে চাং ছাংছিন এবং তার ভলান্টিয়ার অ্যাসোসিয়েশনের অর্জন সত্যিই চোখ কপালে তোলার মতো:
• বিগত ১০ বছরে এই সংগঠনটি ২ লাখ ৭০ হাজার এরও বেশি বিনামূল্যে গরম নাস্তা বিতরণ করেছে।
• মাত্র কয়েকজন সদস্য নিয়ে শুরু হওয়া এই অ্যাসোসিয়েশনে বর্তমানে নিবন্ধিত স্বেচ্ছাসেবীর সংখ্যা প্রায় ২ হাজার।
• এই উদ্যোগ অনুপ্রাণিত করেছে আরও হাজার হাজার সাধারণ নাগরিককে, যারা এখন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই সেবামূলক কাজে অংশ নিচ্ছেন।
অ্যাসোসিয়েশনের একজন নিয়মিত স্বেচ্ছাসেবী বলেন, ‘আমরা শুধু খাবার দিই না, আমরা তাদের জানাতে চাই যে সমাজ তাদের অবদানকে সম্মান করে।‘
পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সকালের নাস্তা দেওয়ার মাধ্যমে কাজ শুরু হলেও চাং-এর মানবিকতার পরিধি দিন দিন আরও বিস্তৃত হয়েছে। বর্তমানে তার এই স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনটি সমাজের অন্যান্য অবহেলিত ও সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণির পাশেও দাঁড়াচ্ছে। বিশেষ করে— ১. দুস্থ ও কঠিন পরিস্থিতিতে থাকা শিশুদের শিক্ষা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিতকরণ। ২. অসহায় ও প্রবীণ নাগরিকদের নিয়মিত দেখভাল ও সহায়তা প্রদান।
দশ বছর ধরে অক্লান্ত পরিশ্রমের পরও চাং ছাংছিন থামতে চান না। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, ‘আমরা এই কাজ চালিয়ে যাব। আমরা বিশ্বাস করি, স্বেচ্ছাসেবামূলক সেবা সামাজিক অগ্রগতি তরাণ্বিত করার ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী চালিকাশক্তি হতে পারে।’
চাং ছাংছিন প্রমাণ করেছেন, সদয় চিন্তা ও দৃঢ় ইচ্ছা কীভাবে হাজার হাজার মানুষের জীবনে আলো ছড়াতে পারে এবং বদলে দিতে পারে পুরো সমাজের চিত্র। পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের প্রতি তার এই ভালোবাসা আজ বিশ্বজুড়ে মানবতা ও সহানুভূতির এক অনন্য নজির।
সূত্র: সিএমজি