বৃষ্টি মহান আল্লাহর এক অনন্য ও বরকতময় নিয়ামত। বৃষ্টির পরশ পেয়ে মৃতপ্রায় পৃথিবী নতুন জীবন ফিরে পায়, জমিতে ফসল ফলে এবং মানবজাতিসহ সমস্ত জীবকূল বেঁচে থাকার রসদ পায়। এই ঐশী নিয়ামতের বর্ণনা দিয়ে পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, আমি আকাশ থেকে বরকতময় বৃষ্টি বর্ষণ করি, অতঃপর তা দ্বারা বাগান ও শস্যদানা উৎপন্ন করি। (সুরা কাফ, ৯)
তবে মাঝে মাঝে এই নিয়ামতই অতিবর্ষণ, বন্যা বা জলাবদ্ধতার রূপ নিয়ে আমাদের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে, যা মানুষের জন্য পরীক্ষা ও কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এমন দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তে একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের করণীয় কী, তা ইসলাম স্পষ্টভাবে নির্দেশ করেছে। নিচে এ বিষয়ে ৫টি গুরুত্বপূর্ণ আমল আলোচনা করা হলো:
১. ধৈর্য ধারণ ও আল্লাহর প্রতি আস্থা রাখা
প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা অতিবৃষ্টির কারণে ঘরবাড়ি, ফসল বা জানমালের ক্ষতি হলে ভেঙে না পড়ে ধৈর্য ধারণ করা মুমিনের প্রধান দায়িত্ব। এটিকে আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা এবং জান-মাল ও ফল-ফসলের ক্ষয়ক্ষতির মাধ্যমে। আর আপনি সুসংবাদ দিন ধৈর্যশীলদের।(সূরা বাকারা, ১৫৫)
বিপদের সময় মুমিনের কোনো লোকসান নেই, যদি সে ধৈর্য ধরে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মুমিনের পুরো জীবনটাই চমৎকার। তার প্রতিটি বিষয়ই তার জন্য কল্যাণকর, যা মুমিন ছাড়া অন্য কেউ পায় না। সে যখন সুখের দেখা পায় তখন শুকরিয়া আদায় করে, যা তার জন্য কল্যাণ বয়ে আনে। আর যখন কোনো বিপদে পড়ে তখন ধৈর্য ধারণ করে, এটাও তার জন্য কল্যাণকর হয়। (মুসনাদে আহমাদ)
২. সুন্নাহ সম্মত দোয়া ও ইস্তিগফার
বৃষ্টি শুরু হলে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো দোয়া পড়া সুন্নাত। সাধারণ বৃষ্টির সময় তিনি বলতেন, আল্লাহুম্মা সাইয়্যিবান নাফিআ
অর্থ: হে আল্লাহ! আপনি এই বৃষ্টিকে আমাদের জন্য মুষলধারে বর্ষিত কল্যাণকর বৃষ্টি বানিয়ে দিন। (সহিহ বুখারি)
আবার বৃষ্টি যখন অতিবৃষ্টিতে রূপ নিত এবং ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিত, তখন রাসুল (সা.) আল্লাহর দরবারে এই দোয়া করতেন, আল্লাহুম্মা হাওয়ালাইনা ওয়া লা আলাইনা, আল্লাহুম্মা আলাল আকামি ওয়াজ জিরাবি, ওয়া বুত্বনিল আউদিয়াতি ওয়া মানাবিতিশ শাজার,
অর্থ: হে আল্লাহ! আমাদের আশপাশে বৃষ্টি বর্ষণ করুন, আমাদের ওপর (ক্ষতিগ্রস্ত করে) নয়। হে আল্লাহ! পাহাড়, টিলা, উপত্যকা ও বনাঞ্চলে এই বৃষ্টি ফিরিয়ে নিন। (সহিহ বুখারি)
৩. ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো
যেকোনো সংকটে আর্তমানবতার সেবায় এগিয়ে আসা ইসলামের অন্যতম মৌলিক শিক্ষা। অতিবর্ষণ ও বন্যার কারণে বহু মানুষ খাদ্য, চিকিৎসা ও আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো প্রতিটি সামর্থ্যবান মুমিনের দায়িত্ব। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, বান্দা যতক্ষণ তার ভাইয়ের সাহায্য-সহযোগিতায় লিপ্ত থাকে, আল্লাহ তায়ালাও ততক্ষণ সেই বান্দাকে সাহায্য করতে থাকেন। (সুনানে আবু দাউদ)
৪. দুর্ভোগ লাঘবে স্বেচ্ছাসেবী হওয়া
যাদের শারীরিক সামর্থ্য ও শক্তি আছে, বিশেষ করে তরুণ সমাজের উচিত এই দুর্যোগে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে ভূমিকা রাখা। জলাবদ্ধতা দূর করতে ড্রেন পরিষ্কার করা, ভেঙে পড়া গাছ রাস্তা থেকে সরানো বা আটকে পড়া মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। হাদিস শরিফে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আমি এক ব্যক্তিকে জান্নাতে মনের সুখে বিচরণ করতে দেখেছি, কারণ সে রাস্তা থেকে এমন একটি গাছ কেটে সরিয়েছিল যা মুসলিমদের যাতায়াতে কষ্ট দিচ্ছিল। (মুসলিম)
৫. সামাজিক মাধ্যমে গুজব ছড়ানো থেকে বিরত থাকা
যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় একশ্রেণীর মানুষ আতঙ্ক ছড়াতে মিথ্যা বা অতিরঞ্জিত তথ্য প্রচার করে। কেউবা আবার ভিউ ও লাইকের আশায় মানুষের আবেগ নিয়ে খেলা করে, যা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। যাচাই না করে কোনো তথ্য বিশ্বাস করা বা ছড়ানো যাবে না। এ বিষয়ে মহান আল্লাহ সতর্ক করে বলেছেন, হে মুমিনগণ! কোনো পাপাচারী যদি তোমাদের কাছে কোনো খবর নিয়ে আসে, তবে তা ভালোভাবে যাচাই করে নাও। যেন অজ্ঞতাবশত তোমরা কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে না বসো এবং পরে নিজেদের কর্মের জন্য অনুতপ্ত হতে হয়। (সুরা হুজুরাত, ৬)
প্রাকৃতিক এই বিপর্যয় আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মহাবিশ্বের সমস্ত ক্ষমতার মালিক একমাত্র মহান আল্লাহ। তাই দুর্যোগের এই মুহূর্তে আতঙ্কিত না হয়ে আমাদের বেশি বেশি তাওবা-ইস্তিগফার করা, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা এবং সাধ্যমতো মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করা উচিত। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে সব ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা করুন। আমিন।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক