বান্দরবানে টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় জেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, শনিবার (১১ জুলােই) সকাল ৯টা পর্যন্ত সাঙ্গু নদীর পানি ১৫ দশমিক ৮৭ মিটার এবং মাতামুহুরী নদীর পানি ১০ দশমিক ০৬ মিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছে, যা বিপৎসীমার ওপরে রয়েছে। যদিও গত রাত থেকে সকাল পর্যন্ত বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কিছুটা কমেছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় (শনিবার সকাল ৯টা থেকে রবিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত) বান্দরবানে ১৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। তবে পাহাড়ি ঢলের কারণে নদ-নদীর পানি দ্রুত কমছে না।
অতি বৃষ্টির কারণে বান্দরবান-কেরানীহাট সড়কের বিভিন্ন অংশে পানি জমে থাকায় জেলার সঙ্গে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ এখনো স্বাভাবিক হয়নি। দূরপাল্লার বাস চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। তবে ঝুঁকি নিয়ে কিছু ছোট যানবাহন সীমিত পরিসরে চলাচল করছে। গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে পানি ও কাদা জমে থাকায় যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে চরম ভোগান্তি সৃষ্টি হয়েছে।
জেলা সদর ছাড়াও লামা, আলীকদম, রোয়াংছড়ি, নাইক্ষ্যংছড়ি, থানচি ও রুমা উপজেলার বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। অনেক এলাকার বসতঘর, দোকানপাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে গেছে।
বান্দরবান সদর উপজেলার ফায়ার সার্ভিস এলাকা, বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগের রেস্ট হাউস এলাকা, সেনাবাহিনীর ব্রিগেড এলাকা, বেতারকেন্দ্র, পুলিশ লাইন্স, ইসলামপুর, শেরে বাংলা নগর, কালাঘাটা, বালাঘাটা ও আশেপাশের বিভিন্ন এলাকায় এখনো পানি থইথই করছে। বিশেষ করে বালাঘাটা ব্রিগেড এলাকা ও পুলিশ লাইন্স এলাকায় মানুষকে নৌকায় করে চলাচল করতে দেখা গেছে। অনেক স্থানে দোকানপাট বন্ধ থাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সংগ্রহেও ভোগান্তিতে পড়েছেন বাসিন্দারা।
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগ দিন দিন বাড়ছে। পানিবন্দি পরিবারগুলোর অনেকের খাদ্যসামগ্রী শেষ হয়ে এসেছে। বিশুদ্ধ খাবার পানি, শুকনো খাবার, শিশু খাদ্য ও প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকট দেখা দিয়েছে।
অন্যদিকে জেলার বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনাও ঘটেছে। পাহাড়ি এলাকায় এখনো ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন অনেক পরিবার। স্থানীয় প্রশাসন বারবার ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশ ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়ার আহ্বান জানালেও অনেকেই ঘরবাড়ি ছেড়ে যেতে অনিচ্ছুক।
দুর্যোগ মোকাবেলায় জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, বিজিবি, রেড ক্রিসেন্ট ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে রান্না করা খাবার, শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
বান্দরবানের জেলা প্রশাসক মো. সানিউল ফেরদৌস জানান, জেলার সাতটি উপজেলায় মোট ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে এখন পর্যন্ত প্রায় ৬ হাজার ২৫০ জন আশ্রয় নিয়েছেন। আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়মিত শুকনো খাবার ও রান্না করা খাবার বিতরণ করা হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, চলমান দুর্যোগে এ পর্যন্ত পাহাড়ধসে ৫ জন এবং পানিতে ডুবে ১ জনের মৃত্যু হয়েছে। জেলাজুড়ে ২৬টি পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে, যার অধিকাংশই সড়কের ওপর হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। এছাড়া প্রায় ৮ হাজার ৫০০ মানুষ এখনো পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
আবহাওয়া পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত নদী তীরবর্তী ও পাহাড়ধসপ্রবণ এলাকায় বসবাসকারীদের সতর্ক থাকার পাশাপাশি প্রয়োজন হলে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।
রিজভী রাহাত/খাদিজা রুমি/