উচ্চশিক্ষা শুধু পাঠ্যপুস্তকের চার দেয়ালের অধ্যয়ন বা পরীক্ষার ফলাফলেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে জীবনের নানা অভিজ্ঞতা, ভাঙা-গড়ার গল্প আর অমলিন কিছু অনুভূতি। উপকূলীয় অঞ্চলের অন্যতম শীর্ষ বিদ্যাপীঠ নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (নোবিপ্রবি) গত দুই দশকে যেমন গবেষণা ও জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে, ঠিক তেমনি এটি হয়ে উঠেছে হাজারও শিক্ষার্থীর আবেগ ও স্বপ্নের এক জীবন্ত ক্যানভাস।

ক্লাস, ল্যাব আর অ্যাসাইনমেন্টের চিরচেনা ব্যস্ততার ফাঁকে শিক্ষার্থীরা এখানে খুঁজে নিয়েছে কিছু প্রিয় আশ্রয়, যা তাদের বন্ধুত্ব, প্রেম আর সৃষ্টিশীলতার নীরব সাক্ষী। বিকেল নামলেই শিক্ষার্থীদের সরব উপস্থিতিতে জমে ওঠে শহীদ মিনার গোল চত্বর। রাজনীতি, সাহিত্য, সংস্কৃতি থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত জীবনের নানা আলোচনা কিংবা গভীর রাত পর্যন্ত বন্ধুদের গিটারের সুর ও আড্ডায় এটি হয়ে উঠেছে ক্যাম্পাস জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আবার প্রকৃতির কাছাকাছি একটু মানসিক প্রশান্তির খোঁজে শিক্ষার্থীরা ছুটে যায় ক্যাম্পাসের পেছনের সবুজাভ পরিবেশে অবস্থিত ‘ময়না দ্বীপ’-এ, যা চারপাশের জলধারা ও নির্জনতার কারণে একটি ‘গোপন স্বর্গ’। মেছোবাঘ, রেসাস বানর, সোনালি শেয়াল কিংবা বেগুনি কালিম ও তুলা হাঁসের মতো বিরল বন্যপ্রাণী ও পাখির দেখা মেলায় এটি ক্যাম্পাসের এক অনন্য বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যও বটে। এখানেই গোধূলিবেলায় বন্ধুরা মিলে সূর্যাস্ত দেখার আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়।

ঠিক একইভাবে কেন্দ্রীয় মাঠের একপাশে অবস্থিত ছায়াঘেরা ‘শান্তিনিকেতন’ কবিতা আবৃত্তি, মেঠো সংস্কৃতি ও গিটারের তারে নতুন সুর তোলার এক পরম আশ্রয়স্থল। এর অনতিদূরে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাশে শান্ত রূপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ‘নীলদীঘি’, যার জলরাশি দুপুরের সূর্যের আলোয় নীলাভ আভা ছড়িয়ে দেয় এবং লাইব্রেরির পড়া শেষে শিক্ষার্থীরা এখানে এসে মৃদু বাতাস ও জলের আয়নায় নিজেকে নতুন করে খুঁজে পায়।
অন্যদিকে, ক্যাম্পাসের প্রধান ফটকের পাশের ‘প্রশান্তি পার্ক’ বিশাল বৃক্ষের শীতল ছায়া আর সারি সারি চায়ের টং নিয়ে শিক্ষার্থীদের অন্যতম মিলনমেলা। এখানে সকাল থেকে মধ্যরাতের চায়ের আড্ডায় অনেক আজীবন বন্ধুত্বের সূচনা হয় এবং ক্যারিয়ারের হতাশা ভুলে শিক্ষার্থীরা কিছুটা স্বস্তি পায়।
তারুণ্য ও উদ্দীপনার প্রতীক নোবিপ্রবির ‘কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ’ প্রতিদিন শত শত শিক্ষার্থীর পদচারণায় মুখর থাকে। কুয়াশাঘেরা সকালে শরীরচর্চা, বিকেলে আন্তঃবিভাগীয় ফুটবল-ক্রিকেট খেলা কিংবা জ্যোৎস্না রাতে গোল হয়ে গান গাওয়ার এই মাঠটি সমাবর্তন ও বড় বড় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মূল মঞ্চ।

ক্যাম্পাস জীবনের এই কোলাহলের মাঝেও আত্মিক প্রশান্তি ও মানসিক স্থিরতার এক নিরিবিলি পরিসর হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘কেন্দ্রীয় মসজিদ’। আর শিক্ষার্থীদের প্রাত্যহিক লড়াইয়ের আরেক নাম ‘গ্যারেজ’, যা শুধু বাস টার্মিনাল নয়, বরং ক্লাস শেষে শহরের বাসের সিট ধরার হুড়োহুড়ি, যান্ত্রিক জীবনে ছুটে চলা এবং সন্ধ্যার অবসরে টঙের দোকানে চা-নাশতার আড্ডায় সেরা সব স্মৃতি তৈরির স্থান।
দুই দশকের এই দীর্ঘ পথচলায় নোবিপ্রবি শুধু একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি হয়ে উঠেছে হাজারও শিক্ষার্থীর স্মৃতির নোঙর। যুগের পর যুগ শিক্ষার্থীরা ডিগ্রি শেষ করে ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যাবে, কিন্তু এই চিরসবুজ প্রাঙ্গণগুলো তাদের তারুণ্যের দিনগুলোর নীরব সাক্ষী হয়ে রয়ে যাবে। কারণ নোবিপ্রবির প্রকৃত সৌন্দর্য এর অবকাঠামোয় নয়, বরং এর প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে থাকা মানুষের গল্প ও আত্মিক সম্পর্কের স্পন্দনে।
লেখক: শিক্ষার্থী, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, নোয়াখালী