মানবভ্রূণের ডিএনএ পরিবর্তনের এক নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কার করেছেন যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের একদল বিজ্ঞানী। ল্যাবরেটরিতে করা এই গবেষণাটি গত ২৫ জুন আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সাময়িকী ‘ন্যাচার’-এ প্রকাশিত হয়েছে। এর পর থেকেই বিশ্বজুড়ে বৈজ্ঞানিক ও নৈতিক বিতর্ক নতুন করে সামনে এসেছে।
বংশগত মারাত্মক রোগগুলো পরবর্তী প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়া রোধ করতে চিকিৎসাবিজ্ঞানে জিন এডিটিং ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। এতে বহু রোগীর জীবন রক্ষা ও কষ্ট লাঘব করা সম্ভব হলেও তারা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ত্রুটিপূর্ণ জিন বহন করার ঝুঁকি থেকে পুরোপুরি মুক্ত নন।
দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের অন্তত ৭০টি দেশের আইন ও আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক মহল মানবভ্রূণের ডিএনএ পরিবর্তন বা ‘হিউম্যান জার্মলাইন এডিটিং’ করাকে অত্যন্ত বিপজ্জনক মনে করে আসছে। কিন্তু সম্প্রতি বিজ্ঞানীদের দুটি নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, এখন নজিরবিহীন নিখুঁত উপায়ে মানবভ্রূণের ডিএনএতে পরিবর্তন আনা সম্ভব, যা ইঙ্গিত করে যে অদূর ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি চিকিৎসাক্ষেত্রে সফল হতে পারে। অবশ্য বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, মানবভ্রূণ নিরাপদে সম্পাদনার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানোর আগে এখনো বড় ধরনের বাধা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রিপ্রোডাক্টিভ সায়েন্স সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক আমান্ডার ক্লার্ক বলেন, ‘ছয় বছর আগেও আমি ভেবেছিলাম মানবভ্রূণে জিন এডিটিংয়ের ব্যবহার করা অসম্ভব। তবে এই নতুন কাজটি ভবিষ্যতে আইভিএফ বা টেস্টটিউব ভ্রূণের চিকিৎসার উদ্দেশ্যে জিন এডিটিংয়ের সম্ভাবনাকে আবার জাগিয়ে তুলেছে।’
সাধারণত গবেষণাগারে মানবভ্রূণ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা অধিকাংশ দেশেই কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। আইভিএফ রোগীদের সম্পাদন করা ভ্রূণ তৈরির পর সর্বোচ্চ ১৪ দিন পর্যন্ত গবেষণার অনুমতি দেওয়া হয়। তা ছাড়া জিন সম্পাদিত শিশুদের প্রতি সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি কতটা ইতিবাচক, তাও এখনো স্পষ্ট নয়। চিকিৎসার সুরক্ষার বাইরেও এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তির অপব্যবহার করে নির্দিষ্ট গুণাগুণসমৃদ্ধ ‘ডিজাইনার বেবি’ বা কৃত্রিমভাবে নিখুঁত শিশু তৈরির আশঙ্কায় বিশ্বজুড়ে তীব্র নৈতিক উদ্বেগ রয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণাগারে বহুল ব্যবহৃত ‘ক্রিসপার-ক্যাস৯’ প্রযুক্তিটি বৈজ্ঞানিক গবেষণায় বড় বিপ্লব ঘটিয়েছে, যার জন্য ২০২০ সালে দুই বিজ্ঞানী রসায়নে নোবেল পুরস্কার পান। এমনকি ২০২৩ সালে মার্কিন এফডিএ সিকল সেল রোগের চিকিৎসার জন্য এই প্রযুক্তির দুটি থেরাপির অনুমোদন দেয়। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিপ্লব ঘটালেও ক্রিসপার প্রযুক্তির কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যখন এটি মানবভ্রূণে ব্যবহৃত হয়, তখন এটি জিনের গঠনে অনাকাঙ্ক্ষিত ও বড় ধরনের পরিবর্তন করে দিতে পারে, এমনকি পুরো ক্রোমোজোম হারিয়ে যাওয়ার মতো বড় ক্ষতিও হতে পারে।
এই স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণেই ২০১৮ সালে চীনা গবেষক হে জিয়ানকুই যখন ক্রিসপার প্রযুক্তি ব্যবহার করে এইচআইভি প্রতিরোধী যমজ শিশুর জন্ম দেওয়ার দাবি করেন, তখন বিশ্বজুড়ে তীব্র নিন্দার ঝড় ওঠে। ২০১৯ সালে তাকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
জিনের গঠনকে আরও নিখুঁতভাবে পরিবর্তনের জন্য বিজ্ঞানীরা এখন ‘বেস এডিটিং’ নামক একটি নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন। এটি ডিএনএর অতি ক্ষুদ্র একক বা বেস স্তরেও সুনির্দিষ্ট পরিবর্তন আনতে পারে। ২০২২ সালে যুক্তরাজ্যে এক কিশোরীর লিউকেমিয়া চিকিৎসায় প্রথমবার এটি সফলভাবে ব্যবহৃত হয়। পরবর্তী সময়ে আরও কয়েকজন শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক এই চিকিৎসা পান। গত বছর একটি শিশু মারাত্মক সিপিএস১ ঘাটতি নিয়ে জন্ম নিলে চিকিৎসকরা এই প্রযুক্তির সাহায্য নেন।
এখন দুটি নতুন গবেষণায় আইভিএফ চিকিৎসার মাধ্যমে পাওয়া মানবভ্রূণের প্রাথমিক স্তরে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। উভয় গবেষক দলই দেখেছে যে, এই প্রযুক্তির নিখুঁত কার্যকারিতা অনাকাঙ্ক্ষিত ক্রোমোজোমের ত্রুটির ঝুঁকি অনেক কমিয়ে দেয়। সূত্র: সিএনএন