চলমান বিশ্বকাপের অন্যতম এক পরিচিত এক মুখ হয়ে উঠেছেন কেইনে। স্পেন যতই টুর্নামেন্টে এগিয়ে যাচ্ছে, ক্যামেরা ততই গ্যালারিতে থাকা এই ছোট্ট শিশুটিকে খুঁজে নিচ্ছে। তিন বছরের বাচ্চা পিট দুই হাত উঁচু করে ‘ভামোস’ বলে চিৎকার করছে এমন এক নির্ভার আনন্দ নিয়ে, যা কোনো প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ অভিনয় করে দেখাতে পারে না। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে সে উদযাপন করেছে, বেলজিয়ামের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে স্টেডিয়ামের বড় পর্দায় হাত নেড়েছে। আর এরই মধ্যে পুরো ইন্টারনেট দুনিয়া যেন তার প্রেমে পড়ে গেছে।
কেইনে, লামিনে ইয়ামালের তিন বছর বয়সী সৎভাই। যদিও ‘সৎ’ শব্দে আপনাকে বা যে কাউকে তেড়ে আসতে পারেন স্প্যানিশ তারকা। হয়তো আক্রমণ করতে দ্বিতীয়বার ভাববেন না। কেন? আসেন, জেনে নেওয়া যাক ভ্রাতৃপ্রেমের গল্প।
২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে শেইলা এবানার ঘরে জন্ম হয় কেইনের। শেইলা হলেন ইয়ামালের মা। দুই ভাইয়ের মা একই হলেও তাদের বাবা আলাদা। তাদের বয়সের ব্যবধান ১৫ বছরেরও বেশি। ইয়ামাল যখন ছোট ছিলেন, তখনই তার বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হয়। তিনি মূলত মায়ের সঙ্গেই বড় হয়েছেন, আর তার বাবা মুনির নাসরাউই আলাদা থাকতেন। পরে দুজনই নতুন জীবন শুরু করেন। শেইলা এবানা পুনরায় বিয়ে করেন এবং এর পর কেইনের জন্ম হয়।
বয়সের এই বিশাল ব্যবধানের কারণে ইয়ামাল মূলত তার ছোট ভাইকে এমন এক পৃথিবীতে বড় হতে দেখছেন, যা তার নিজের শৈশবের পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এ নিয়ে তিনি একাধিকবার কথা বলেছেন, আর তার কথায় আবেগের ছাপ স্পষ্ট। ইয়ামাল বলেন, ‘আমি এমন একটি ফ্ল্যাটে বড় হয়েছি, যেখানে রান্নাঘর আর শোবার ঘর একই জায়গায় ছিল। আমি দেখি আমার মা সুখী। আমি দেখি আমার ছোট ভাই সেই শৈশবটা পাচ্ছে, যেটা আমি চাইতাম। আর এটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি আনন্দ দেয়।’ এই কথাই ইয়ামালের সম্পর্কে এমন অনেক কিছু বলে দেয়।
শেষ ৩২-এর ম্যাচে স্পেন জয়ের পর ইয়ামাল ম্যাচসেরার পুরস্কার পান। ম্যাচ শেষে তার প্রথম কথাগুলো ছিল না কৌশল বা গোল নিয়ে। ছিল কেইনেকে নিয়ে। তিনি বলেন, ‘আমার ছোট ভাইকে এত খুশি দেখতে পেয়ে আমি আবেগাপ্লুত হয়ে যাই। একই সঙ্গে আমার মা ও বন্ধুদেরও সেই জীবনযাপন করতে দেখছি, যার স্বপ্ন তারা সব সময় দেখেছেন।’ এর পর যখন তাকে সরাসরি তাদের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন করা হয়, তখন এক মুহূর্তও দেরি করেননি ইয়ামাল, ‘আমার ছোট ভাই আমার কাছে সবকিছু। আমি ওকে ভীষণ ভালোবাসি। আমার মনে হয়, ও যেন আমার নিজের ছেলে।’
একজন ১৭ বছর বয়সী তরুণের মুখে একটি তিন বছরের শিশুকে নিয়ে এমন কথা, যেখানে ভালোবাসাটা অনেকটা বাবার মতো। যারা ইয়ামালকে দীর্ঘদিন ধরে অনুসরণ করেন, তারা বলেন, শুরু থেকেই তাদের সম্পর্ক এমনই। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে বার্সেলোনার সঙ্গে নতুন চুক্তি স্বাক্ষরের সময় পুরো পরিবার তার সঙ্গে ছিল। সম্প্রতি পৃথিবীর সবচেয়ে আলোচিত তরুণ ফুটবলারদের একজন হিসেবে চাপ কীভাবে সামলান– এমন প্রশ্নের জবাবেও তিনি নিজের বেড়ে ওঠার গল্পই তুলে ধরেন, ‘দেখুন, আমার মা আমাকে জন্ম দিয়েছিলেন যখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৬ বছর। আমার বাবাকেও জীবিকার জন্য বাইরে যেতে হতো। কখনো কখনো রাস্তায় পড়ে থাকা জিনিসপত্র কুড়িয়ে এনে আমাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করতেন। আমার কাছে এটাই সত্যিকারের চাপ। আমি এখন যে চাপের মুখোমুখি হই, সেটা নয়।’
এর পর আর বুঝতে বাকি নেই, কতটা ফুটবলে বড় মুখ হয়ে ওঠার আগে কতটা অসহায় ছিলেন ইয়ামাল ও তার পরিবার। তারকা বনে এখন আলো ফিরেছে তাদের জীবনে। তাই ছোট্ট ভাইকে এমন শৈশব উপহার দিচ্ছেন ইয়ামাল, যা ছিল না তার। বিশ্বকাপে ক্যামেরা তাকে খুঁজে পাওয়ার অনেক আগেই ইয়ামালের জীবনের নিয়মিত অংশ হয়ে উঠেছিল কেইনে। সে প্রায় প্রতিটি বার্সেলোনা ম্যাচেই উপস্থিত থাকে। এমনকি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে হওয়া অ্যাওয়ে ম্যাচেও যায়।
ইয়ামাল যখন ব্যালন ডি’অর অনুষ্ঠানে যোগ দিতে প্যারিসে যান, তখনো কেইনে তার সঙ্গে ছিল। লাল গালিচায় চারদিকে ক্যামেরার ফ্ল্যাশের মধ্যেও সে বেশির ভাগ সময় উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের একটি বল নিয়ে খেলছিল। ক্যাম্প ন্যুতেও সে নিজের মতো করেই ছোটখাটো এক তারকায় পরিণত হয়েছে। বার্সেলোনার মাসকট ক্যাটের সঙ্গে তার নাচের ভিডিও রয়েছে। লা লিগার একটি ম্যাচের পর নিকো উইলিয়ামসের সঙ্গে খেলাধুলার ভিডিও রয়েছে। বাড়িতে বসে বার্সেলোনার সংগীত গাওয়ার ভিডিওও রয়েছে।
গত মৌসুমে লা লিগা শিরোপা উদযাপনের সময় যেন পুরো মাঠটাই নিজের দখলে নিয়ে নিয়েছিল কেইনে। নিজের জন্মদিনে নাচ, প্রিয় বার্সেলোনা খেলোয়াড়দের নাম ভুল উচ্চারণ করা, কিংবা ইয়ামালের বড়সড় জার্সি পরে টলমল করে হাঁটার ভিডিও– সব মিলিয়ে কোটি কোটি ভিউ পেয়েছে। ইয়ামাল তার সঙ্গে টিকটক নাচের ভিডিও পোস্ট করেছেন। বাড়ির বাগানে একসঙ্গে ফুটবল খেলার ভিডিও শেয়ার করেছেন। এমনকি নিজের অ্যাপার্টমেন্ট ঘুরে দেখানোর একটি ইউটিউব ভিডিওতেও কেইনেকে রেখেছেন।
দুজনের এক সঙ্গে করা কনটেন্টগুলো একেবারেই স্বাভাবিক ও সাজানো নয়। সম্ভবত এ কারণেই মানুষ এগুলোর সঙ্গে এত সহজে সংযোগ খুঁজে পায়। শেইলা এবানার ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে, যার অনুসারী এখন ৭ লাখেরও বেশি, নিয়মিতই কেইনের ছবি ও ভিডিও দেখা যায়। জানা গেছে, ছোট্ট এই শিশুকে নিয়ে সম্ভাব্য বাণিজ্যিক সহযোগিতার জন্য বিভিন্ন ব্র্যান্ডও যোগাযোগ শুরু করেছে। তবে তার পরিবারের কাছে এসবই যে মূল বিষয় নয়, সেটাও স্পষ্ট।
অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয়ের ম্যাচে একটি ভিডিওতে দেখা যায়, কেইনে বারবার দুই হাত উঁচু করে আনন্দে চিৎকার করছে। সেই ভিডিও হাজার হাজার বার শেয়ার হয়েছে। মুহূর্তের মধ্যেই সেটি মিমে পরিণত হয়। স্পেনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে ভিডিওটি। এমনকি জাতীয় দলের খেলোয়াড়রাও এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানান। একটি পোস্টে এক্সে (সাবেক টুইটার) অভিযোগ করা হয়েছিল, ‘সামনের স্বর্ণকেশী নারীটি দৃশ্যটা ঢেকে দিচ্ছিলেন।’ এর জবাবে স্পেনের স্ট্রাইকার বোরহা ইগলেসিয়াস মন্তব্য করেন, ‘যে স্বর্ণকেশী নারীর কথা বলছেন, তিনি তো এই ম্যাচেই দুটি গোল করেছেন।’
পরে জানা যায়, তিনি ছিলেন ওইয়ারজাবালের মা। স্পেন দলের খেলোয়াড়দের পরিবারের সদস্যরা সবাই স্টেডিয়ামের একই অংশে বসেন। বেলজিয়ামের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালেও আরেকটি স্মরণীয় মুহূর্ত তৈরি হয়। সোফাই স্টেডিয়ামের বড় পর্দায় কেইনেকে দেখা যায় ক্যামেরার দিকে হাত নাড়তে। এমন বিশাল পরিবেশেও সে ছিল একেবারে স্বাভাবিক, যেখানে অনেক প্রাপ্তবয়স্কও অস্বস্তিতে পড়ে যেতেন। তবে বিষয়টি শুধু এই নয় যে কেইনে দেখতে খুবই মিষ্টি, যদিও সে নিঃসন্দেহে তাই। আসল বিষয় হলো, সে কী প্রতিনিধিত্ব করে। যে বিশ্বকাপে ইয়ামালের পারফরম্যান্সই সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে, সেই গল্পে গ্যালারিতে বসে ছোট ভাইয়ের নির্মল আনন্দ পুরো ঘটনাটিকে এক মানবিক ভিত্তি এনে দিয়েছে।
আর ইয়ামালের কাছেও কোনো ট্রফি, কোনো ব্যক্তিগত পুরস্কার কিংবা কোনো ভাইরাল মুহূর্তই এতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, যতটা গুরুত্বপূর্ণ এই নিশ্চয়তা– তার ছোট ভাইটি ভালো আছে।