একসময় চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেছিলেন। হৃৎস্পন্দন বন্ধ ছিল টানা সাত মিনিট। ২৬ ঘণ্টা কোমায় থাকার পর মৃত্যুকে হারিয়ে ফিরেছিলেন জীবনে। ২৫ বছর পর সেই মানুষটিই এখন নরওয়ের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায়ের নায়ক।
তিনি নরওয়ের জাতীয় দলের কোচ স্টালে সোলবাক্কেন। তার অধীনেই প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে নরওয়ে। শেষ ষোলোতে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে ২-১ গোলে হারিয়ে ইতিহাস গড়ে আর্লিং হালান্ডদের দল। গত রাতে ইংল্যান্ড বাধা টপকাতে পারলে ইতিহাস গড়ে সেমিতে পা রেখেছে হালান্ড শিবির। হেরে থাকলে বিদায় নিতে হয়েছে বিশ্বকাপে চমক দেখানো দলটিকে।
তবে নরওয়েরে কোচ সোলবাক্কেনের গল্প শুধু ফুটবল নয়, জীবন-মৃত্যুর লড়াইয়েরও। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে খেলোয়াড় হিসেবে নরওয়ের হয়ে ব্রাজিলকে হারানোর ঐতিহাসিক ম্যাচের অংশ ছিলেন তিনি। পরে ইতালির কাছে হেরে বিদায় নেয় নরওয়ে। এরপর ২০০০ সালে ডেনিশ ক্লাব এফসি কোপেনহেগেনে যোগ দেন সোলবাক্কেন।
২০০১ সালের ১৩ মার্চ অনুশীলনের সময় আচমকাই হৃৎরোগে আক্রান্ত হয়ে মাঠে লুটিয়ে পড়েন তিনি। চিকিৎসকরা প্রাণপণ চেষ্টা চালালেও সাত মিনিট তার হৃৎস্পন্দন ছিল না। হাসপাতালে নেওয়ার পথে অ্যাম্বুলেন্সে আবার হৃৎস্পন্দন ফিরে আসে। এরপর ২৬ ঘণ্টা কোমায় ছিলেন তিনি।
পরে সোলবাক্কেন জানান, সেই সময় তিনি যেন একটি নীল আলো আর একটি সুড়ঙ্গ দেখতে পেয়েছিলেন। জন্মগত হৃৎযন্ত্রের সমস্যাই ছিল এই ঘটনার কারণ। চিকিৎসকরা জানিয়ে দেন, তার ফুটবল ক্যারিয়ার শেষ। পেসমেকার বসানো হয় শরীরে, আর মাত্র ৩৩ বছর বয়সেই খেলোয়াড়ি জীবনকে বিদায় বলতে হয়। তাই বলে তিনি ফুটবল ছাড়েননি। কোচিং শুরু করেন, দীর্ঘদিন ডেনমার্ক, ইংল্যান্ড ও জার্মানির বিভিন্ন ক্লাবে কাজ করার পর ২০২০ সালে নরওয়ে জাতীয় দলের দায়িত্ব নেন।
শুরুটা সহজ ছিল না। হালান্ড ও মার্টিন ওডেগার্ডের মতো তারকা থাকা সত্ত্বেও কাতার বিশ্বকাপ ও ইউরো; দুটিতেই জায়গা করে নিতে ব্যর্থ হয় নরওয়ে। চাকরিও প্রায় হারাতে বসেছিলেন সোলবাক্কেন। কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি। ২০২৬ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ইতালিকে হারিয়ে বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করে নরওয়ে। মূল পর্বে এসে দুর্দান্ত ফুটবল খেলছে দলটি। গ্রুপ পর্ব পেরিয়ে আইভরি কোস্ট ও ব্রাজিলকে বিদায় করে প্রথমবারের মতো জায়গা করে নেয় শেষ আটে।
সোলবাক্কেনের ভাষায়, ‘এই ছেলেরা শুধু নরওয়ের ফুটবল নয়, পুরো দেশের ইতিহাসই বদলে দিয়েছে।’ আর সেই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রতীক হয়তো স্বয়ং সোলবাক্কেনই; যিনি সাত মিনিট মৃত্যুর কাছে হার মেনেও শেষ পর্যন্ত জীবন ও ফুটবল; দুটোতেই ফিরেছেন বিজয়ীর বেশে।