ঢাকা ২৭ আষাঢ় ১৪৩৩, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
ইংল্যান্ডের হয়েও খেলতে পারতেন হালান্ড, এখন তিনিই প্রতিপক্ষ সাঙ্গু থেকে লোকালয়ে ঢুকছে পানি, বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সীমান্তে ৩ কোটি টাকার মোবাইলফোনের ডিসপ্লে জব্দ বন্যাদুর্গত ফটিকছড়িতে ত্রাণ সহায়তা শক্তিশালী হয়ে ফিরবেন লামেন্স: কোর্তোয়া ‘ইয়েস ফ্যাশন’র ট্রেন্ডি জুব্বা হবিগঞ্জে বন্যার পানি কমেছে, ভেসে গেছে মানুষের স্বপ্ন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি বাতিল কামড়ের পর মৃত সাপ নিয়ে হাসপাতালে হাজির রোগী মেহজাবীনের হাত ধরে ওসান লাইফস্টাইল মিরপুরে বন্যার শঙ্কায় সুনামগঞ্জ পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল মৌলভীবাজারে ভয়াবহ বন্যা, পানিবন্দি ৪০ হাজার মানুষ ভূমিরূপ পরিবর্তন অধ্যায়ের ১০টি বহুনির্বাচনি প্রশ্ন ও উত্তর, ৪র্থ পর্ব, এইচএসসির ভূগোল ১ম পত্র গ্রিল ভেঙে পালিয়েও রক্ষা হয়নি, কেরানীগঞ্জে আটক আসামি ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু ভিয়েতনামে পর্যটকবাহী নৌকা ডুবে ১৫ জনের মৃত্যু ত্রাণ পৌঁছাতে সব বাহিনী সমন্বিতভাবে কাজ করছে: জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী টেকসই সবুজায়ন ও শতবর্ষী বৃক্ষ সংরক্ষণে শুধু রোপণ নয়, চাই দীর্ঘমেয়াদি যত্ন আড়াই বছরে ১০ হাজার ৮৩০ ধর্ষণ মামলা: শিশুর জন্য নিরাপদ বাংলাদেশ কোথায় চকরিয়া-পেকুয়ায় পানিবন্দি লাখো মানুষ, কাটেনি দুর্ভোগ আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানালেন সেনেগাল তারকা সাদিও মানে ফটিকছড়িতে বন্যাদুর্গতদের পাশে সেনাবাহিনী প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশ রবিবার রেশন সুবিধা পাবেন যেসব সরকারি চাকরিজীবীরা সেপ্টেম্বরের মধ্যে আরও ৫ শিশু হাসপাতাল চালুর ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর চিকিৎসায় বিদেশনির্ভরতা কমাতে ইন্টার্নরাই মূল ভরসা: প্রধানমন্ত্রী বর্ষায় জয়েন্ট পেইন কমাতে ‘হলুদ চা’ গোল নয়, দলের জয়ই ইয়ামালের কাছে বড় সারাদেশে ১ লাখ হেলথ কেয়ারার নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার ট্রাম্পের সঙ্গে গলফ খেলাকে ‘অবাস্তব অনুভূতি’ বললেন হ্যারি কেইন

আড়াই বছরে ১০ হাজার ৮৩০ ধর্ষণ মামলা: শিশুর জন্য নিরাপদ বাংলাদেশ কোথায়

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬, ০৪:২৬ পিএম
আড়াই বছরে ১০ হাজার ৮৩০ ধর্ষণ মামলা: শিশুর জন্য নিরাপদ বাংলাদেশ কোথায়
খবরের কাগজ ইনফোগ্রাফিক

খবরের কাগজ ১১ জুলাই ২০২৬ তারিখের খবর পড়লাম ‘ফরিদপুরে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীন সরকারি শিশু পরিবারে (বালিকা) ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়েছে।’

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য থেকে জানা গেছে, গত আড়াই বছরে দেশে নারী ও শিশু ধর্ষণের অভিযোগে ১০ হাজার ৮৩০টি মামলা হয়েছে। অর্থাৎ, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২টি মামলা। এটি শুধু অপরাধের সংখ্যা নয়, এটি রাষ্ট্রের শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা, আইন প্রয়োগ, সামাজিক সচেতনতা এবং বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা সম্পর্কে একটি কঠিন প্রশ্নও উত্থাপন করে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব মামলার উল্লেখযোগ্য অংশের ভুক্তভোগী শিশু।

বাংলাদেশে শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা আর বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়, এটি এখন জাতীয় শিশু সুরক্ষা সংকটে রূপ নিয়েছে। গত কয়েক বছরে প্রকাশিত পুলিশ সদর দপ্তর, আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম এবং ইউনিসেফের তথ্য একত্রে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতার প্রকৃতি যেমন পরিবর্তিত হয়েছে, তেমনি বেড়েছে এর ভয়াবহতাও। উদ্বেগজনকভাবে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপরাধী কোনো অপরিচিত ব্যক্তি নয়, বরং পরিবারের সদস্য, আত্মীয়, প্রতিবেশী, শিক্ষক, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তি কিংবা শিশুর পরিচিত কেউ। অর্থাৎ, যে পরিবেশ শিশুর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ হওয়ার কথা, অনেক ক্ষেত্রে সেই পরিবেশই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, শুধু ২০২৬ সালের প্রথম কয়েক মাসেই শতাধিক শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে; তাদের মধ্যে কয়েকজনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে, আবার কেউ কেউ নির্যাতনের মানসিক আঘাত সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার পথও বেছে নিয়েছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের বার্ষিক প্রতিবেদনও একই ধরনের প্রবণতার কথা বলছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রকাশিত সংখ্যাই প্রকৃত চিত্র নয়। যৌন সহিংসতার অসংখ্য ঘটনা সামাজিক কলঙ্ক, পারিবারিক চাপ, ভয়ভীতি এবং বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতি অনাস্থার কারণে থানায় পৌঁছায় না। ফলে সরকারি পরিসংখ্যান বাস্তব পরিস্থিতির কেবল দৃশ্যমান অংশমাত্র।

প্রশ্ন হচ্ছে, শিশুরা কেন এত বেশি ঝুঁকির মধ্যে? এর উত্তর শুধু আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতায় সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের দ্রুত নগরায়ণ, পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তন, ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তার, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা সবকিছু মিলিয়েই ঝুঁকি তৈরি করছে। অনেক পরিবার এখনো শিশুদের শরীরের নিরাপত্তা, অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ কিংবা যৌন নির্যাতন সম্পর্কে বয়সোপযোগী শিক্ষা দিতে সংকোচ বোধ করে। বিদ্যালয়গুলোর বড় অংশেও কার্যকর শিশু সুরক্ষা নীতি নেই। ফলে শিশুরা অনেক সময় বুঝতেই পারে না যে সে অপরাধের শিকার হয়েছে, কিংবা বুঝলেও কাকে জানাবে, সেটা জানে না।

ইউনিসেফ বহু বছর ধরে বলে আসছে, শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা কেবল অপরাধ দমন দিয়ে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত Child Protection System। অর্থাৎ পরিবার, বিদ্যালয়, স্থানীয় প্রশাসন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক সুরক্ষা প্রতিষ্ঠান–সবগুলোকে একই কাঠামোর মধ্যে কাজ করতে হবে।

বাংলাদেশে জাতীয় শিশু সুরক্ষা নীতি থাকলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এখনো বড় ঘাটতি রয়েছে। অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষা কমিটি নেই, শিক্ষকদের বাধ্যতামূলক সেফগার্ডিং প্রশিক্ষণ নেই, অভিযোগ গ্রহণের স্বাধীন ব্যবস্থা নেই এবং নির্যাতিত শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় মানসিক স্বাস্থ্যসেবাও অত্যন্ত সীমিত।

এই সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিচারব্যবস্থা। কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও অপরাধ কমছে না। কারণ, অপরাধ প্রতিরোধে আইনের কঠোরতার চেয়ে শাস্তির নিশ্চয়তা অনেক বেশি কার্যকর। বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলোয় হাজার হাজার মামলা বছরের পর বছর বিচারাধীন। তদন্তে বিলম্ব, ফরেনসিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, সাক্ষী সুরক্ষার দুর্বলতা এবং দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া অনেক ভুক্তভোগী পরিবারকে নিরুৎসাহিত করে। এর ফলে অপরাধীদের মধ্যে দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি হয়, যা নতুন অপরাধ সংঘটিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।

বাংলাদেশে শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার আলোচনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রায়ই উপেক্ষিত থেকে যায়। আমরা সাধারণত একটি ঘটনা ঘটার পর অপরাধীকে গ্রেপ্তার, বিচার এবং শাস্তির প্রশ্নে মনোযোগ দিই। কিন্তু কার্যকর শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত–অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই ঝুঁকি চিহ্নিত করা এবং তা প্রতিরোধ করা। উন্নত দেশগুলোর শিশু সুরক্ষা নীতির কেন্দ্রবিন্দুতেই আছে এই প্রতিরোধমূলক দৃষ্টিভঙ্গি। বাংলাদেশেও এখন সেই দৃষ্টিভঙ্গির দিকে যাওয়ার এসেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগ INSPIRE Framework শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধে সাতটি অগ্রাধিকারমূলক কৌশলের কথা বলেছে। এর মধ্যে আছে কার্যকর আইন প্রয়োগ, সামাজিক মূল্যবোধের পরিবর্তন, নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা, অভিভাবকদের সক্ষমতা বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সহায়তা, শিশুদের জীবনদক্ষতা শিক্ষা এবং সহজলভ্য সেবা ব্যবস্থা। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই সাতটি কৌশলের অধিকাংশই অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর নয়, বরং তার আগেই ঝুঁকি কমানোর ওপর গুরুত্ব দেয়। বাংলাদেশের শিশু সুরক্ষা নীতিতেও এই দর্শনের প্রতিফলন ঘটানো প্রয়োজন।

আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও নতুন করে ভাবতে হবে। বর্তমানে অধিকাংশ বিদ্যালয়ের নিরাপত্তাব্যবস্থা শারীরিক অবকাঠামো বা প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অথচ একটি বিদ্যালয় তখনই প্রকৃত অর্থে নিরাপদ হয়, যখন সেখানে শিশু সুরক্ষা নীতি কার্যকর থাকে, শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য আচরণবিধি থাকে, অভিযোগ জানানোর গোপন ও নিরাপদ ব্যবস্থা থাকে এবং প্রতিটি অভিযোগ দ্রুত তদন্তের আওতায় আসে। উন্নত বিশ্বের বহু দেশে শিক্ষক নিয়োগের আগে Child Safeguarding Screening বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশেও শিশুদের সঙ্গে কাজ করেন–এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে অনুরূপ ব্যবস্থা চালুর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
পরিবারের ভূমিকাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

আমাদের সমাজে যৌনতা ও শরীর নিয়ে খোলামেলা আলোচনা এখনো অনেকাংশে নিষিদ্ধ বিষয়। এর ফলে শিশুরা নিজের শরীর সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞান ছাড়াই বড় হয়। তারা জানে না কোন আচরণ গ্রহণযোগ্য, কোনটি নয়; কোথায় আপত্তি জানাতে হবে, কাকে জানাতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে নির্যাতনের শিকার হওয়ার পরও শিশুরা ঘটনাটিকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে না। এই নীরবতাই অপরাধীদের সবচেয়ে বড় সুবিধা।

শিশু সুরক্ষাকে তাই শুধু নারী ও শিশু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, সামাজিক কল্যাণ বিভাগ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত দায়িত্ব। একই সঙ্গে প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় শিশুবান্ধব কাউন্সেলিং সেবা, দ্রুত ফরেনসিক পরীক্ষা, দক্ষ তদন্ত কর্মকর্তা এবং ভুক্তভোগী পরিবারের জন্য আইনি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, একজন নির্যাতিত শিশুর জন্য ন্যায়বিচার মানে শুধু অপরাধীর শাস্তি নয়, তার মানসিক পুনর্বাসন এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার সুযোগও নিশ্চিত করা।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিশুদের নিরাপত্তাকে রাজনৈতিক বিতর্ক বা সাময়িক আলোচনার বিষয় বানানো যাবে না। সরকার পরিবর্তন হতে পারে, নীতি বদলাতে পারে, কিন্তু শিশু সুরক্ষা রাষ্ট্রের স্থায়ী অঙ্গীকার হওয়া উচিত। আজ যে শিশু নিরাপদ নয়, আগামীকাল সেই রাষ্ট্রও নিরাপদ থাকবে না। কারণ, সহিংসতার অভিজ্ঞতা নিয়ে বেড়ে ওঠা প্রজন্মের সামাজিক ও মানসিক মূল্য চুকাতে হয় পুরো জাতিকেই।

বাংলাদেশের সামনে এখন দুটি পথ খোলা। একটি পথ হলো, প্রতিটি আলোচিত ঘটনার পর কয়েক দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে আবার আগের মতো নীরব হয়ে যাওয়া। অন্য পথটি হলো, এই ১০ হাজার ৮৩০টি মামলাকে সতর্কবার্তা হিসেবে গ্রহণ করে শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থাকে নতুন করে গড়ে তোলা। স্বাভাবিকভাবেই দ্বিতীয় পথটি আমাদের বেছে নিতে হবে। কারণ, শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু তার অধিকার রক্ষা নয়, এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রক্ষারও পূর্বশর্ত।

লেখক: কথাসাহিত্যিক

টেকসই সবুজায়ন ও শতবর্ষী বৃক্ষ সংরক্ষণে শুধু রোপণ নয়, চাই দীর্ঘমেয়াদি যত্ন

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬, ০৪:৩০ পিএম
টেকসই সবুজায়ন ও শতবর্ষী বৃক্ষ সংরক্ষণে শুধু রোপণ নয়, চাই দীর্ঘমেয়াদি যত্ন
খবরের কাগজ ইনফোগ্রাফিক

আমাদের চাক্ষুষ উন্নয়ন ও প্রাকৃতিক বিনাশের মধ্যবর্তী ধূসর রেখাটি দিন দিন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। প্রতি বছর বর্ষা এলেই দেশজুড়ে বৃক্ষরোপণের এক বিশাল মহোৎসব শুরু হয়। সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগে লাখ লাখ চারা রোপণের লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করা হয়, ব্যানার-ফেস্টুন আর প্রচারণায় মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। কিন্তু প্রচারের আলো নিভে যাওয়ার পর সেই চারাগুলোর কী দশা হলো, তার তদারকি করার লোক খুঁজে পাওয়া যায় না। এখানে একটি চরম সত্য আমাদের স্বীকার করতেই হবে–আমরা রোপণকে যতটা উদযাপনে রূপ দিতে পেরেছি, রোপণ-পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণকে ততটা প্রাতিষ্ঠানিক বা নাগরিক দায়িত্ব হিসেবে গড়ে তুলতে পারিনি।

সম্প্রতি বিশ্ব পরিবেশ দিবস ও জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান-২০২৬-এর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঠিক এই সংকটের দিকেই আঙুল তুলেছেন। তিনি পরিষ্কার করে বলেছেন, পরিবেশ মেলা বা বৃক্ষমেলা কেবল বাৎসরিক কোনো আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। এটিকে আমাদের প্রতিদিনের অভ্যাসে রূপ দিতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমাদের পুরো প্রশাসনিক এবং নাগরিক ‘মাইন্ডসেট’ বা মানসিকতা কি এই দীর্ঘমেয়াদি প্রতিপালনের জন্য প্রস্তুত? 

রোপণ-পরবর্তী ঔদাসীন্য: যেখানে আটকে আছে গলদ
এখানেই আমাদের আসল গলদ। আমাদের বনায়ন নীতি আজ পর্যন্ত মূলত ‘সংখ্যা-ভিত্তিক’ (Number-driven), ‘ফলাফল-ভিত্তিক’ (Outcome-driven) নয়। উদাহরণস্বরূপ, সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি চারা রোপণের একটি বিশাল মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। উদ্যোগটি দারুণ, কিন্তু এই ২৫ কোটির মধ্যে কতটি চারা শেষ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ বৃক্ষে রূপ নেবে, তার কোনো বৈজ্ঞানিক হিসাব বা জবাবদিহির কাঠামো আমাদের আছে কি? 

কোনো পরিকল্পনা ছাড়া, মাটির গুণাগুণ না বুঝে কিংবা জলবায়ুর সামঞ্জস্য না রেখে শুধু সংখ্যা পূরণের জন্য গাছ লাগালে আখেরে কোনো লাভ হয় না। অনেক সময় দেখা যায়, রাস্তার দুই পাশে হাজার হাজার চারা লাগানো হলো, অথচ কয়েক সপ্তাহ পরেই পানির অভাবে বা গবাদিপশুর পেটে গিয়ে সেগুলো নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। এর অর্থ হলো, রোপণের পেছনে যে বিপুল অর্থ ও শ্রম ব্যয় হলো, তার বড় অংশই অপচয়। 

কিউরেটেড বা পরিকল্পিত বনায়ন ছাড়া এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। গাছ লাগানোর বাজেটেই অন্তত তিন বছরের জন্য সেই গাছের পানি, সার এবং নিরাপত্তার (বেড়া বা খাঁচা) খরচ বরাদ্দ রাখা বাধ্যতামূলক করতে হবে। একই সঙ্গে কোন মাটিতে কোন প্রজাতির গাছ টিকবে, যেমন–ফলদ, বনজ, ঔষধি কিংবা বিপন্ন দেশীয় প্রজাতি–সেই বৈজ্ঞানিক জ্ঞানকে বনায়নের প্রধান ভিত্তি বানাতে হবে। ইউক্যালিপটাস বা আকাশমণির মতো ক্ষতিকর বিদেশি প্রজাতি বর্জন করে মাটির স্বাভাবিক ইকোসিস্টেম রক্ষা করা এখন আর বিলাসিতা নয়, অস্তিত্বের প্রশ্ন। 

‘মাদার ট্রি’ নিধন: উন্নয়নের নামে আত্মঘাতী খেলা
নতুন গাছ রোপণের চেয়েও বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় এবং নীরব অপরাধটি হলো দেশের প্রাচীন ও শতবর্ষী বৃক্ষ নিধন। তথাকথিত আধুনিকায়ন, রাস্তা প্রশস্তকরণ কিংবা নতুন আবাসন প্রকল্পের দোহাই দিয়ে এক রাতেই কেটে ফেলা হচ্ছে শতবর্ষী বট, পাকুড় বা রেইনট্রি।

পরিবেশবিজ্ঞানের সাধারণ সমীকরণ বলে, একটি শতবর্ষী প্রাচীন গাছ প্রকৃতিকে যে পরিমাণ অক্সিজেন দেয়, যে মাত্রায় কার্বন শোষণ করে এবং স্থানীয় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে যেভাবে ভূমিকা রাখে, তা হাজারটি নতুন চারা গাছ দিয়েও রাতারাতি পূরণ করা সম্ভব নয়। এই প্রাচীন বৃক্ষগুলো কেবল কাঠের কোনো কঙ্কাল নয়; এগুলো একেকটি স্থানীয় ইকোসিস্টেমের প্রাণভোমরা, পরিবেশের ভাষায় যাদের বলা হয় ‘মাদার ট্রি’। এগুলো বহু প্রজাতির পাখি, অনন্য কীটপতঙ্গ এবং বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আশ্রয় ও খাদ্যের প্রধান উৎস। 

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বন বিভাগের কর্মকর্তাদের এই মাদার ট্রিগুলো রক্ষার ব্যাপারে কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আইনের ফাঁক গলে কিংবা প্রভাবশালী মহলের চাপে এই গাছগুলো প্রতিনিয়ত কাটা পড়ছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি প্রাচীন গাছ কেটে সেখানে ১০টি চারা রোপণের আশ্বাস দেওয়া আর একজন সুস্থ মানুষকে হত্যা করে ১০টি শিশুর জন্মের প্রতিশ্রুতি দেওয়া একই রকম হাস্যকর। উন্নয়ন পরিকল্পনা এমনভাবে সাজাতে হবে যেন একটিও প্রাচীন গাছ না কেটেও রাস্তার নকশা বা অবকাঠামো তৈরি করা যায়। প্রয়োজনে রাস্তা বাঁকা হবে, কিন্তু শতবর্ষী গাছ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে–এই নীতিগত অবস্থান রাষ্ট্রকে নিতে হবে।

সমন্বিত পরিবেশ ভাবনা: বিচ্ছিন্ন কোনো খাত নয়
জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে পরিবেশকে আর আলাদা কোনো বিচ্ছিন্ন খাত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি এখন আমাদের জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম মূল ভিত্তি। তীব্র তাপপ্রবাহ, ঘূর্ণিঝড়, আকস্মিক বন্যা আর লবণাক্ততার মতো ভয়াবহ দুর্যোগগুলো আমাদের অর্থনীতি, কৃষি এবং পানির নিরাপত্তাকে প্রতিদিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।

একটি পূর্ণাঙ্গ ও টেকসই সবুজ পরিবেশ গড়ে তুলতে হলে গাছ লাগানোর পাশাপাশি আমাদের নদী, পাহাড়, জলাভূমি এবং নগর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দিকে তাকাতে হবে। নদী ও খাল ভরাট বন্ধ না করতে পারলে এবং সারা দেশে শুরু হওয়া ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন-পুনঃখননের মতো কর্মসূচিগুলো সফল করতে না পারলে শুধু গাছ লাগিয়ে মাটির আর্দ্রতা রক্ষা করা যাবে না। ঠিক একইভাবে, প্লাস্টিক বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ এবং জাতীয় পর্যায়ে ‘থ্রি আর’ (Reduce, Reuse, Recycle) নীতি বাস্তবায়ন না করতে পারলে চারা গাছের গোড়াগুলো বিষাক্ত প্লাস্টিকে দমবন্ধ হয়ে মারা যাবে।

যুবশক্তির ব্যবহার এবং নাগরিক আন্দোলন
গাছ বাঁচানোর এই লড়াইয়ে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে ফ্রন্টলাইনে নিয়ে আসতে হবে। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘গ্রিন ভলান্টিয়ারিজম’ চালুর যে সরকারি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তাকে কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রতিটি শিক্ষার্থীর একাডেমিক মূল্যায়নের অংশ করা যেতে পারে। একজন শিক্ষার্থী তার স্কুল বা কলেজ জীবনে অন্তত একটি গাছ রোপণ করবে এবং তার পুরো শিক্ষাবর্ষে সেই গাছটির পরিচর্যা করবে–এমন নিয়ম করা গেলে তা এক যুগান্তকারী সামাজিক আন্দোলন তৈরি করবে। এর পাশাপাশি ‘ক্লাইমেট ইউথ ফেলোশিপ’ কিংবা ‘এনভায়রনমেন্ট স্টার্টআপ ফান্ড’-এর মতো উদ্যোগগুলো পরিবেশ সুরক্ষায় নতুন নতুন উদ্ভাবনী ধারণার জন্ম দেবে। 

প্রধানমন্ত্রীর একটি প্রস্তাবনা এখানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও মানবিক: পরিবারে কোনো নতুন সন্তানের জন্ম হলে সেই মুহূর্তকে স্মরণীয় করে রাখতে একটি করে গাছ লাগানো। নবজাতকের বাড়ন্ত বয়সের সঙ্গে সঙ্গে গাছটিও বড় হবে। এটি কেবল সবুজের সংখ্যা বাড়াবে না, বরং সেই সন্তানের মনে শৈশব থেকেই প্রকৃতির প্রতি এক নিবিড় আত্মিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতা তৈরি করবে।

প্রকৃতির সঙ্গে সম্প্রীতির উন্নয়ন
উন্নয়ন ও পরিবেশ একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; প্রকৃতির সঙ্গে সম্প্রীতি রেখেই টেকসই সমৃদ্ধি গড়ে তোলা সম্ভব। জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের চাপে আমাদের জীববৈচিত্র্য আজ হুমকির মুখে। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, মানুষ ছাড়া প্রকৃতি বাঁচতে পারে, কিন্তু প্রকৃতি ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে না। দেশ হোক সব প্রাণী ও প্রাণের নিরাপদ আবাসস্থল–এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে শুধু রোপণের সংখ্যার পেছনে না ছুটে, প্রতিটি রোপণকৃত গাছের বেঁচে থাকা নিশ্চিত করতে হবে এবং শতবর্ষী বৃক্ষ হত্যা কঠোর আইন ও সামাজিক প্রতিরোধের মাধ্যমে বন্ধ করতে হবে। তবেই এই প্রিয় বাংলাদেশ আগামী প্রজন্মের জন্য এক নিরাপদ, চিরসবুজ ও জলবায়ু-সহনশীল টেকসই বাসযোগ্য ভূমি হিসেবে টিকে থাকবে।

লেখক: উন্নয়ন ও অধিকারকর্মী (শ্রেষ্ঠ যুব সম্মাননাপ্রাপ্ত)
প্রতিষ্ঠাতা-সভাপতি, ইয়ুথ অ্যাকশন ফর সোশ্যাল চেঞ্জ; ইয়্যাস সভাপতি, ভঙ্গী নৃত্য শিল্পালয়
[email protected]

আড়াই বছরে ১০ হাজার ৮৩০ ধর্ষণ মামলা: শিশুর জন্য নিরাপদ বাংলাদেশ কোথায়

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬, ০৪:২৬ পিএম
আড়াই বছরে ১০ হাজার ৮৩০ ধর্ষণ মামলা: শিশুর জন্য নিরাপদ বাংলাদেশ কোথায়
খবরের কাগজ ইনফোগ্রাফিক

খবরের কাগজ ১১ জুলাই ২০২৬ তারিখের খবর পড়লাম ‘ফরিদপুরে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীন সরকারি শিশু পরিবারে (বালিকা) ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়েছে।’

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য থেকে জানা গেছে, গত আড়াই বছরে দেশে নারী ও শিশু ধর্ষণের অভিযোগে ১০ হাজার ৮৩০টি মামলা হয়েছে। অর্থাৎ, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২টি মামলা। এটি শুধু অপরাধের সংখ্যা নয়, এটি রাষ্ট্রের শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা, আইন প্রয়োগ, সামাজিক সচেতনতা এবং বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা সম্পর্কে একটি কঠিন প্রশ্নও উত্থাপন করে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব মামলার উল্লেখযোগ্য অংশের ভুক্তভোগী শিশু।

বাংলাদেশে শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা আর বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়, এটি এখন জাতীয় শিশু সুরক্ষা সংকটে রূপ নিয়েছে। গত কয়েক বছরে প্রকাশিত পুলিশ সদর দপ্তর, আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম এবং ইউনিসেফের তথ্য একত্রে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতার প্রকৃতি যেমন পরিবর্তিত হয়েছে, তেমনি বেড়েছে এর ভয়াবহতাও। উদ্বেগজনকভাবে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপরাধী কোনো অপরিচিত ব্যক্তি নয়, বরং পরিবারের সদস্য, আত্মীয়, প্রতিবেশী, শিক্ষক, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তি কিংবা শিশুর পরিচিত কেউ। অর্থাৎ, যে পরিবেশ শিশুর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ হওয়ার কথা, অনেক ক্ষেত্রে সেই পরিবেশই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, শুধু ২০২৬ সালের প্রথম কয়েক মাসেই শতাধিক শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে; তাদের মধ্যে কয়েকজনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে, আবার কেউ কেউ নির্যাতনের মানসিক আঘাত সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার পথও বেছে নিয়েছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের বার্ষিক প্রতিবেদনও একই ধরনের প্রবণতার কথা বলছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রকাশিত সংখ্যাই প্রকৃত চিত্র নয়। যৌন সহিংসতার অসংখ্য ঘটনা সামাজিক কলঙ্ক, পারিবারিক চাপ, ভয়ভীতি এবং বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতি অনাস্থার কারণে থানায় পৌঁছায় না। ফলে সরকারি পরিসংখ্যান বাস্তব পরিস্থিতির কেবল দৃশ্যমান অংশমাত্র।

প্রশ্ন হচ্ছে, শিশুরা কেন এত বেশি ঝুঁকির মধ্যে? এর উত্তর শুধু আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতায় সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের দ্রুত নগরায়ণ, পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তন, ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তার, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা সবকিছু মিলিয়েই ঝুঁকি তৈরি করছে। অনেক পরিবার এখনো শিশুদের শরীরের নিরাপত্তা, অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ কিংবা যৌন নির্যাতন সম্পর্কে বয়সোপযোগী শিক্ষা দিতে সংকোচ বোধ করে। বিদ্যালয়গুলোর বড় অংশেও কার্যকর শিশু সুরক্ষা নীতি নেই। ফলে শিশুরা অনেক সময় বুঝতেই পারে না যে সে অপরাধের শিকার হয়েছে, কিংবা বুঝলেও কাকে জানাবে, সেটা জানে না।

ইউনিসেফ বহু বছর ধরে বলে আসছে, শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা কেবল অপরাধ দমন দিয়ে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত Child Protection System। অর্থাৎ পরিবার, বিদ্যালয়, স্থানীয় প্রশাসন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক সুরক্ষা প্রতিষ্ঠান–সবগুলোকে একই কাঠামোর মধ্যে কাজ করতে হবে।

বাংলাদেশে জাতীয় শিশু সুরক্ষা নীতি থাকলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এখনো বড় ঘাটতি রয়েছে। অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষা কমিটি নেই, শিক্ষকদের বাধ্যতামূলক সেফগার্ডিং প্রশিক্ষণ নেই, অভিযোগ গ্রহণের স্বাধীন ব্যবস্থা নেই এবং নির্যাতিত শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় মানসিক স্বাস্থ্যসেবাও অত্যন্ত সীমিত।

এই সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিচারব্যবস্থা। কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও অপরাধ কমছে না। কারণ, অপরাধ প্রতিরোধে আইনের কঠোরতার চেয়ে শাস্তির নিশ্চয়তা অনেক বেশি কার্যকর। বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলোয় হাজার হাজার মামলা বছরের পর বছর বিচারাধীন। তদন্তে বিলম্ব, ফরেনসিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, সাক্ষী সুরক্ষার দুর্বলতা এবং দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া অনেক ভুক্তভোগী পরিবারকে নিরুৎসাহিত করে। এর ফলে অপরাধীদের মধ্যে দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি হয়, যা নতুন অপরাধ সংঘটিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।

বাংলাদেশে শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার আলোচনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রায়ই উপেক্ষিত থেকে যায়। আমরা সাধারণত একটি ঘটনা ঘটার পর অপরাধীকে গ্রেপ্তার, বিচার এবং শাস্তির প্রশ্নে মনোযোগ দিই। কিন্তু কার্যকর শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত–অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই ঝুঁকি চিহ্নিত করা এবং তা প্রতিরোধ করা। উন্নত দেশগুলোর শিশু সুরক্ষা নীতির কেন্দ্রবিন্দুতেই আছে এই প্রতিরোধমূলক দৃষ্টিভঙ্গি। বাংলাদেশেও এখন সেই দৃষ্টিভঙ্গির দিকে যাওয়ার এসেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগ INSPIRE Framework শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধে সাতটি অগ্রাধিকারমূলক কৌশলের কথা বলেছে। এর মধ্যে আছে কার্যকর আইন প্রয়োগ, সামাজিক মূল্যবোধের পরিবর্তন, নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা, অভিভাবকদের সক্ষমতা বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সহায়তা, শিশুদের জীবনদক্ষতা শিক্ষা এবং সহজলভ্য সেবা ব্যবস্থা। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই সাতটি কৌশলের অধিকাংশই অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর নয়, বরং তার আগেই ঝুঁকি কমানোর ওপর গুরুত্ব দেয়। বাংলাদেশের শিশু সুরক্ষা নীতিতেও এই দর্শনের প্রতিফলন ঘটানো প্রয়োজন।

আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও নতুন করে ভাবতে হবে। বর্তমানে অধিকাংশ বিদ্যালয়ের নিরাপত্তাব্যবস্থা শারীরিক অবকাঠামো বা প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অথচ একটি বিদ্যালয় তখনই প্রকৃত অর্থে নিরাপদ হয়, যখন সেখানে শিশু সুরক্ষা নীতি কার্যকর থাকে, শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য আচরণবিধি থাকে, অভিযোগ জানানোর গোপন ও নিরাপদ ব্যবস্থা থাকে এবং প্রতিটি অভিযোগ দ্রুত তদন্তের আওতায় আসে। উন্নত বিশ্বের বহু দেশে শিক্ষক নিয়োগের আগে Child Safeguarding Screening বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশেও শিশুদের সঙ্গে কাজ করেন–এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে অনুরূপ ব্যবস্থা চালুর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
পরিবারের ভূমিকাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

আমাদের সমাজে যৌনতা ও শরীর নিয়ে খোলামেলা আলোচনা এখনো অনেকাংশে নিষিদ্ধ বিষয়। এর ফলে শিশুরা নিজের শরীর সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞান ছাড়াই বড় হয়। তারা জানে না কোন আচরণ গ্রহণযোগ্য, কোনটি নয়; কোথায় আপত্তি জানাতে হবে, কাকে জানাতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে নির্যাতনের শিকার হওয়ার পরও শিশুরা ঘটনাটিকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে না। এই নীরবতাই অপরাধীদের সবচেয়ে বড় সুবিধা।

শিশু সুরক্ষাকে তাই শুধু নারী ও শিশু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, সামাজিক কল্যাণ বিভাগ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত দায়িত্ব। একই সঙ্গে প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় শিশুবান্ধব কাউন্সেলিং সেবা, দ্রুত ফরেনসিক পরীক্ষা, দক্ষ তদন্ত কর্মকর্তা এবং ভুক্তভোগী পরিবারের জন্য আইনি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, একজন নির্যাতিত শিশুর জন্য ন্যায়বিচার মানে শুধু অপরাধীর শাস্তি নয়, তার মানসিক পুনর্বাসন এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার সুযোগও নিশ্চিত করা।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিশুদের নিরাপত্তাকে রাজনৈতিক বিতর্ক বা সাময়িক আলোচনার বিষয় বানানো যাবে না। সরকার পরিবর্তন হতে পারে, নীতি বদলাতে পারে, কিন্তু শিশু সুরক্ষা রাষ্ট্রের স্থায়ী অঙ্গীকার হওয়া উচিত। আজ যে শিশু নিরাপদ নয়, আগামীকাল সেই রাষ্ট্রও নিরাপদ থাকবে না। কারণ, সহিংসতার অভিজ্ঞতা নিয়ে বেড়ে ওঠা প্রজন্মের সামাজিক ও মানসিক মূল্য চুকাতে হয় পুরো জাতিকেই।

বাংলাদেশের সামনে এখন দুটি পথ খোলা। একটি পথ হলো, প্রতিটি আলোচিত ঘটনার পর কয়েক দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে আবার আগের মতো নীরব হয়ে যাওয়া। অন্য পথটি হলো, এই ১০ হাজার ৮৩০টি মামলাকে সতর্কবার্তা হিসেবে গ্রহণ করে শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থাকে নতুন করে গড়ে তোলা। স্বাভাবিকভাবেই দ্বিতীয় পথটি আমাদের বেছে নিতে হবে। কারণ, শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু তার অধিকার রক্ষা নয়, এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রক্ষারও পূর্বশর্ত।

লেখক: কথাসাহিত্যিক

শ্রেণিকক্ষে শিশুদের প্রশ্ন করতে দিন

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬, ০৭:২১ পিএম
শ্রেণিকক্ষে শিশুদের প্রশ্ন করতে দিন
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

‌‘স্যার, একটা প্রশ্ন ছিল...’
শ্রেণিকক্ষের পেছনের সারি থেকে লাজুক কণ্ঠে কথাটি ভেসে আসে। শিক্ষক তখন বোর্ডে লিখছেন, সামনে পরীক্ষা, সিলেবাস শেষ করার তাড়া। তিনি না তাকিয়েই বললেন, ‘এখন প্রশ্ন কোরো না। আগে এটা শেষ করি।’
অনেক শ্রেণিকক্ষে বাক্যটি আরও কঠোর শোনা যায়–‘এত প্রশ্ন করলে ক্লাস চলবে কীভাবে?’ কিংবা ‘বইয়ে যা আছে, সেটাই লেখো।’

বাংলাদেশের অসংখ্য বিদ্যালয়ে প্রতিদিন এমন দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটে। হয়তো শিক্ষক ইচ্ছাকৃতভাবে শিশুকে নিরুৎসাহিত করতে চান না, কিন্তু শিশু একটি কঠিন বার্তা পেয়ে যায়–প্রশ্ন করা গুরুত্বপূর্ণ নয়, উত্তর মুখস্থ করাই গুরুত্বপূর্ণ। সেই মুহূর্ত থেকেই শেখার স্বাভাবিক আনন্দের জায়গা দখল করে নেয় ভুল করার ভয়।

অথচ শিশুর শেখার সবচেয়ে শক্তিশালী উপায়ই হলো প্রশ্ন করা। সে দেখে শেখে, শুনে শেখে, অনুকরণ করে শেখে, হাতে-কলমে কাজ করে শেখে। তবে সবচেয়ে গভীরভাবে শেখে প্রশ্ন করার মাধ্যমে। প্রশ্নই তাকে ভাবতে শেখায়, যুক্তি খুঁজতে শেখায়, নিজের ভুল ধরতে শেখায় এবং নতুন জ্ঞান নির্মাণের সাহস দেয়। যে শিশুর প্রশ্ন করার অধিকার সংকুচিত হয়ে যায়, তার শেখাও ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে পড়ে। শিক্ষক যখন বলেন, ‘প্রশ্ন কোরো না।’ তখন তিনি পরোক্ষভাবে বলেন, ‘তুমি কিছু শিখো না।’

এ কারণেই একই শ্রেণিকক্ষে, একই শিক্ষক, একই পাঠ্যবই এবং একই পাঠদানের পরও একজন শিক্ষার্থী গণিতে ৯৩ নম্বর পায়, আরেকজন পায় ২৩। আমরা প্রায়ই এটাকে মেধার পার্থক্য বলে ব্যাখ্যা করি। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবতা ভিন্ন। যে শিক্ষার্থী বুঝতে না পেরেও প্রশ্ন করতে পারে না, সে নিজের মতো করে বিষয়টি বুঝে নেয়। ভুল ধারণা জমতে জমতে একসময় সেটাই তার শেখার সবচেয়ে বড় বাধায় পরিণত হয়। প্রশ্ন করার সুযোগ না থাকলে দুর্বল শিক্ষার্থী আরও দুর্বল হয়, আর শেখার বৈষম্য আরও গভীর হয়।

এই সংকট শুধু শ্রেণিকক্ষের নয়, এটা বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থারও সংকট। আমাদের বিদ্যালয়গুলোতে এখনো শিক্ষার সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হয়ে আছে পরীক্ষা এবং নম্বর। শিক্ষার্থী জানতে চায়, কোন অধ্যায় গুরুত্বপূর্ণ, কোন প্রশ্ন কমন আসবে, কত নম্বরের জন্য কতটুকু লিখতে হবে। অভিভাবক সন্তানের কৌতূহলের চেয়ে ফলাফল নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। বিদ্যালয়ের সুনামও অনেক সময় নির্ধারিত হয় কতজন জিপিএ-৫ পেয়েছে, তার ওপর। ফলে শেখার কেন্দ্রবিন্দুতে জ্ঞান নয়, পরীক্ষাই স্থান করে নেয়।

এর ফল আমরা উচ্চশিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রেও দেখতে পাই। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা প্রায়ই অভিযোগ করেন, অনেক শিক্ষার্থী তথ্য মনে রাখতে পারে, কিন্তু বিশ্লেষণ করতে পারে না, উত্তর লিখতে পারে, কিন্তু নিজেরা প্রশ্ন তৈরি করতে পারে না। নিয়োগদাতারাও দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, নতুন স্নাতকদের মধ্যে সমস্যা সমাধান, সমালোচনামূলক চিন্তা, যোগাযোগ এবং সৃজনশীলতার ঘাটতি আছে। এগুলো কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যা নয়, এর শিকড় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শ্রেণিকক্ষেই।

বাংলাদেশে শিক্ষার বিস্তারে গত দুই দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। বিদ্যালয়ে ভর্তি বেড়েছে, অবকাঠামো উন্নত হয়েছে, বিনা মূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ এবং ডিজিটাল শিক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু শুধু বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকাই শেখার নিশ্চয়তা দেয় না। বিশ্বব্যাংক, ইউনেসকো ও ইউনিসেফ বহু বছর ধরেই সতর্ক করে আসছে, অনেক দেশে–বাংলাদেশসহ  শেখার সংকট (Learning Crisis) তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ শিশুরা বিদ্যালয়ে যাচ্ছে, কিন্তু প্রত্যাশিত মাত্রায় শিখছে না। এই সংকটের অন্যতম কারণ হলো এমন শ্রেণিকক্ষ, যেখানে শিক্ষার্থীর কৌতূহল ও অংশগ্রহণের চেয়ে মুখস্থবিদ্যা বেশি গুরুত্ব পায়।

অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (OECD) গবেষণাও একই কথা বলছে। তাদের মতে, কার্যকর শিক্ষাদানের অন্যতম শর্ত হলো এমন শ্রেণিকক্ষ, যেখানে শিক্ষার্থীরা নির্ভয়ে প্রশ্ন করতে পারে, নিজেদের যুক্তি ব্যাখ্যা করতে পারে এবং ভুল উত্তর দেওয়ার কারণে অপমানিত হওয়ার ভয় পায় না। কারণ প্রকৃত শিক্ষা শুরু হয় তখনই, যখন একজন শিক্ষার্থী উত্তর শুনে সন্তুষ্ট না হয়ে পাল্টা প্রশ্ন করতে শেখে–‘কেন?’ ‘কীভাবে?’ ‘অন্যভাবে কি সম্ভব?’

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সামনে তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো–আমরা কি পরীক্ষায় সফল শিক্ষার্থী তৈরি করতে চাই, নাকি চিন্তা করতে সক্ষম মানুষ? এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য আছে। পরীক্ষায় ভালো করা প্রয়োজন, কিন্তু সেটাই শিক্ষার একমাত্র লক্ষ্য হতে পারে না। যে শিক্ষা প্রশ্নকে ভয় পায়, সে শিক্ষা কখনোই উদ্ভাবন, গবেষণা কিংবা সৃজনশীলতার ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে না।

শেখা একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। বিশেষ করে গণিত, বিজ্ঞান কিংবা ভাষার মতো বিষয়ে প্রতিটি ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে পরবর্তী ধারণা গড়ে ওঠে। প্রথম ধাপটি না বুঝলে দ্বিতীয় ধাপও বোঝা কঠিন হয়ে যায়। তখন একজন শিক্ষার্থীর সবচেয়ে প্রয়োজন একটি প্রশ্ন করার সুযোগ। কিন্তু সেই সুযোগ যদি না থাকে, তাহলে সে নিজের মতো করে বিষয়টি অনুমান করে নেয়। ভুল ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে সে পরের অধ্যায়ে যায়, পরের শ্রেণিতে ওঠে। কয়েক মাস পর দেখা যায়, সে শুধু একটি অধ্যায়েই নয়, পুরো বিষয়েই পিছিয়ে পড়েছে।

অর্থাৎ পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীর সমস্যা সব সময় মেধার নয়, অনেক সময় তা প্রশ্ন করতে না পারার ফল। আমরা তার দুর্বলতার কারণ খুঁজি কোচিংয়ের অভাবে, অনুশীলনের ঘাটতিতে কিংবা পারিবারিক পরিবেশে। অথচ শ্রেণিকক্ষেই যদি সে একবার বলতে পারত, ‘স্যার/মিস, আমি বুঝতে পারিনি’, তাহলে হয়তো তার শেখার গতিপথই বদলে যেত।

প্রশ্নহীন শ্রেণিকক্ষ এভাবেই শিক্ষাগত বৈষম্য তৈরি করে। যে শিক্ষার্থী কোনোভাবে বুঝে নেয়, সে এগিয়ে যায়। যে বুঝতে পারে না এবং প্রশ্নও করতে পারে না, সে ক্রমশ পিছিয়ে পড়ে। একই শ্রেণিকক্ষে বসে দুই শিক্ষার্থীর শেখার দূরত্ব তাই দিন দিন বাড়তে থাকে। আমরা পরীক্ষার ফল দেখি, কিন্তু সেই ফলের পেছনে নীরবে জমে ওঠা না-বোঝার ইতিহাস দেখি না।

স্নায়ুবিজ্ঞানের গবেষণা বলছে, কৌতূহল মানুষের মস্তিষ্ককে শেখার জন্য প্রস্তুত করে। নতুন কিছু জানার আগ্রহ তৈরি হলে শেখা গভীর হয়, স্মৃতি দীর্ঘস্থায়ী হয়। বিপরীতে ভয়, অপমান কিংবা অতিরিক্ত পরীক্ষার চাপ শেখার স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে। তখন শিক্ষার্থীর লক্ষ্য হয়ে যায় বিষয়টি বুঝা নয়, ভুল না করা।

তাই প্রশ্ন করার অধিকারকে কেবল শৃঙ্খলার বিষয় হিসেবে না দেখে এটিকে শেখার মান, শিক্ষার সমতা এবং দেশের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ গঠনের প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা দরকার।
শ্রেণিকক্ষে প্রশ্ন করার সংস্কৃতি তৈরি করতে যা প্রয়োজন, তা হচ্ছে শিক্ষাব্যবস্থার অগ্রাধিকার বদলানো। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি), মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এবং শিক্ষক-প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে স্বীকার করতে হবে–প্রশ্ন করার সংস্কৃতি ছাড়া শিক্ষার মান উন্নয়ন সম্ভব নয়।

প্রথম কাজ হওয়া উচিত শ্রেণিকক্ষের সংস্কৃতি বদলানো। শিক্ষককে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে ভুল উত্তর দেওয়ার কারণে কোনো শিক্ষার্থী বিব্রত হবে না। একজন শিক্ষার্থী যদি বলে, ‘স্যার/মিস, আমি বুঝতে পারিনি’, তাহলে সেটাকে দুর্বলতার পরিচয় নয়, শেখার সূচনা হিসেবে দেখতে হবে। শিক্ষক যদি ‘ভুল হয়েছে’ বলার বদলে জিজ্ঞেস করেন, ‘তুমি এমনটা কেন ভাবলে?’, তাহলে একটি ভুল উত্তরও পুরো শ্রেণির শেখার সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।

দ্বিতীয়ত, শিক্ষক-প্রশিক্ষণের ধরন পাল্টাতে হবে। একজন ভালো শিক্ষক কেবল পাঠ্যবই শেষ করেন না, তিনি জানেন কীভাবে প্রশ্ন করতে হয়, কীভাবে প্রশ্ন গ্রহণ করতে হয় এবং কীভাবে একটি প্রশ্নকে আলোচনায় রূপ দিতে হয়। শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণে এই দক্ষতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

তৃতীয়ত, সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আনতে হবে মূল্যায়নব্যবস্থায়। আমাদের পরীক্ষা যদি শুধু মুখস্থ জ্ঞান যাচাই করে, তাহলে বিদ্যালয়ও মুখস্থবিদ্যাই শেখাবে। প্রশ্নপত্রে বিশ্লেষণ, যুক্তি, বাস্তব সমস্যা সমাধান এবং ব্যাখ্যাভিত্তিক প্রশ্নের পরিমাণ বাড়াতে হবে। কারণ পরীক্ষা যা মূল্যায়ন করে, শ্রেণিকক্ষ শেষ পর্যন্ত সেটাই শেখায়।

চতুর্থত, বিদ্যালয়ের সাফল্য মূল্যায়নের পদ্ধতিও পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। একটি বিদ্যালয় কতজন জিপিএ-৫ পেল, সেটাই তার একমাত্র পরিচয় হতে পারে না। শিক্ষার্থীরা কতটা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে প্রশ্ন করতে পারে, কতটা যুক্তি দিয়ে নিজের মত প্রকাশ করতে পারে, কতটা বইয়ের বাইরে জানতে আগ্রহী–এসবও শিক্ষার মানের সূচক হওয়া উচিত।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই পরিবর্তনের জন্য বিপুল অর্থের প্রয়োজন নেই। নতুন ভবন, স্মার্ট বোর্ড কিংবা আধুনিক প্রযুক্তি অবশ্যই প্রয়োজনীয়, কিন্তু এগুলোর কোনোটিই এমন শ্রেণিকক্ষের বিকল্প হতে পারে না, যেখানে শিশু প্রশ্ন করতে ভয় পায়। শিক্ষা সংস্কারের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ আদতে একটি সাংস্কৃতিক পরিবর্তন–শিশুর কৌতূহলকে সম্মান করার সংস্কৃতি।

বাংলাদেশ ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত ও জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। সেই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করা শিক্ষার্থী নয়, প্রয়োজন চিন্তাশীল মানুষ, প্রয়োজন এমন তরুণ, যারা নতুন প্রশ্ন তুলবে, নতুন সমাধান খুঁজবে এবং নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে তথ্য মুখস্থ করার মূল্য ক্রমেই কমছে, কিন্তু সঠিক প্রশ্ন করার মূল্য বাড়ছে প্রতিদিন।

তাই শিক্ষা সংস্কারের আলোচনা শুরু হওয়া উচিত একটি খুব সাধারণ প্রশ্ন দিয়ে–আমাদের শ্রেণিকক্ষে কি শিশুর প্রশ্নের জন্য জায়গা আছে?
যদি উত্তর ‘না’ হয়, তাহলে নতুন পাঠ্যক্রম, নতুন বই, নতুন প্রযুক্তি কিংবা নতুন ভবন–কোনোটিই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারবে না। কারণ শিক্ষার প্রাণ পাঠ্যবইয়ে নয়, শ্রেণিকক্ষের কথোপকথনে, আর সেই কথোপকথনের শুরু হয় একটি প্রশ্ন থেকে।

বাংলাদেশের প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে যেদিন একজন শিক্ষার্থী নির্ভয়ে বলতে পারবে, ‘স্যার/মিস, আমি বুঝতে পারিনি’, আর শিক্ষক বিরক্ত না হয়ে বলবেন, ‘আবার বুঝিয়ে বলি’, সেদিনই শিক্ষা সংস্কারের সবচেয়ে বড় পদক্ষেপটি নেওয়া হবে।
কারণ রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার শিশুদের মুখস্থ করা উত্তরের সংখ্যা দিয়ে নয়, নির্ধারিত হয় তারা কত সাহস নিয়ে প্রশ্ন করতে পারে, তার ওপর। যে জাতি তার শিশুদের প্রশ্ন করতে শেখায়, ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত তার হাতেই গড়ে ওঠে।

লেখক: কথাসাহিত্যিক

শিশুশিক্ষায় প্রয়োজন জলবায়ু সহনশীল শিক্ষাব্যবস্থা

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬, ০৬:০৩ পিএম
শিশুশিক্ষায় প্রয়োজন জলবায়ু সহনশীল শিক্ষাব্যবস্থা
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

বৃষ্টি শুরু হয়েছে। তুমুল বৃষ্টি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ঝুম বৃষ্টির ফলে জলাবদ্ধতায় থমকে গেছে নগর। তবু বাংলাদেশের মানুষ বর্ষাকে ভালোবাসে। কবিতায়, গানে, কৃষিতে, প্রকৃতির নবজাগরণে বর্ষার সৌন্দর্য অনন্য। আবার এই বর্ষাই প্রতি বছর লাখো শিশুর জন্য নিয়ে আসে কঠিন বাস্তবতা–বিদ্যালয়ে যেতে না পারার কষ্ট, বই-খাতা ভিজে যাওয়ার যন্ত্রণা, পাঠ্যবইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার দীর্ঘ বিরতি। যে শিশু কয়েক দিন আগেও শ্রেণিকক্ষে বসে অঙ্ক কষছিল, গল্প পড়ছিল কিংবা নতুন অক্ষর শিখছিল, বর্ষার পানি বাড়তেই সে হয়ে পড়ে বিচ্ছিন্ন। কোথাও নৌকা ছাড়া স্কুলে যাওয়ার উপায় থাকে না, কোথাও বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়, কোথাও আবার জলাবদ্ধতা ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে অভিভাবকেরাই সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে সাহস পান না। ফলে একটি মৌসুমি দুর্যোগ ধীরে ধীরে রূপ নেয় শিক্ষার দীর্ঘমেয়াদি সংকটে।

বাংলাদেশে শিক্ষা নিয়ে আলোচনায় আমরা সাধারণত পরীক্ষার ফল, পাঠ্যক্রম, শিক্ষকসংকট কিংবা অবকাঠামোর কথা বলি। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন যে এখন শিক্ষারও অন্যতম বড় সংকট, সে উপলব্ধি এখনো নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রবিন্দুতে আসেনি। অথচ বাস্তবতা হলো, জলবায়ুর অভিঘাত এখন শুধু কৃষি, স্বাস্থ্য বা অর্থনীতিকে নয়, শিশুদের শেখার অধিকারকেও প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

এ সংকটের ভয়াবহতা বোঝাতে সাম্প্রতিক একটি তথ্যই যথেষ্ট। ইউনিসেফের ২০২৫ সালের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে জলবায়ুজনিত দুর্যোগের কারণে প্রায় সাড়ে তিন কোটি শিশুর শিক্ষাজীবন কোনো না কোনোভাবে ব্যাহত হয়েছে। এপ্রিল-মের তীব্র তাপপ্রবাহে সারা দেশে বিদ্যালয় বন্ধ রাখতে হয়েছিল, এরপর ঘূর্ণিঝড় রিমাল ও জুনের বন্যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। শুধু সিলেট অঞ্চলের বহু শিক্ষার্থী আট সপ্তাহ পর্যন্ত শ্রেণিশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

এটা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। বরং এটা এমন এক ভবিষ্যতের ইঙ্গিত, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যালয়ের ক্যালেন্ডারও অনিশ্চিত হয়ে উঠবে। প্রশ্ন হলো, সেই বাস্তবতার জন্য আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত?

সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়, বাংলাদেশের শিশুরা এমনিতেই শিখন-সংকটের মধ্যে আছে। ইউনিসেফের ভাষায়, দেশে প্রতি দুজন শিশুর একজন নিজের শ্রেণির উপযোগী পাঠদক্ষতা অর্জন করতে পারে না, দুই-তৃতীয়াংশ শিশু প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেও মৌলিক গণনা-দক্ষতায় পিছিয়ে থাকে। এমন অবস্থায় কয়েক সপ্তাহের শিক্ষাবিরতি কেবল কয়েকটি ক্লাস করতে না পারার ব্যাপার নয়, এটা শেখার ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়।

শিশুশিক্ষার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো ধারাবাহিকতা। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হয়তো কয়েক সপ্তাহ পরে আবার পড়াশোনায় ফিরতে পারে। কিন্তু প্রথম বা দ্বিতীয় শ্রেণির একজন শিশুর ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সে প্রতিদিন অক্ষর চিনতে শেখে, বাক্য গঠন শেখে, সংখ্যা বোঝে, বন্ধুদের সঙ্গে মিশতে শেখে, শিক্ষককে অনুসরণ করতে শেখে। এই ধারাবাহিকতা ভেঙে গেলে শেখার গতি যেমন কমে যায়, তেমনি আত্মবিশ্বাসও নষ্ট হয়। অনেক শিশু ফিরে এসে আগের পাঠই ভুলে যায়।

বর্ষার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় হাওড়, চর, উপকূল ও নদীভাঙনপ্রবণ এলাকার শিশুরা। বর্ষা সেখানে কেবল ঋতু নয়, জীবনযাত্রার কাঠামো বদলে দেওয়া বাস্তবতা। বিদ্যালয়ে যেতে নদী পার হতে হয়, কাঁচা রাস্তা ডুবে যায়, নৌযানই হয়ে ওঠে একমাত্র ভরসা। অনেক বিদ্যালয় সপ্তাহের পর সপ্তাহ কার্যত অচল থাকে। আবার কোথাও বিদ্যালয়কে বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করায় শিক্ষা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

তবে ভুল হবে যদি মনে করি, এটা শুধু প্রত্যন্ত অঞ্চলের সমস্যা। ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা কিংবা অন্যান্য বড় শহরেও জলাবদ্ধতা এখন নিয়মিত ঘটনা। ইতোমধ্যে ভারী বর্ষণে চট্টগ্রাম নগরীর রাস্তা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট, হাঁটুপানি, বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে অসংখ্য শিক্ষার্থী নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে পারছেপ না। ফলে বর্ষাজনিত শিক্ষাবিচ্ছিন্নতা আজ গ্রাম-শহর উভয়ের বাস্তবতা, যদিও এর তীব্রতা অঞ্চলভেদে ভিন্ন।

সবচেয়ে নীরব কিন্তু গভীর ক্ষতি ঘটে তখন, যখন শিশুরা ধীরে ধীরে বিদ্যালয়ের সঙ্গে মানসিক সম্পর্ক হারাতে শুরু করে। কয়েক সপ্তাহের বিরতি অনেক সময় কয়েক মাসের অনুপস্থিতিতে পরিণত হয়। দরিদ্র পরিবারের শিশুদের কেউ পারিবারিক কাজে যুক্ত হয়, কেউ মৌসুমি শ্রমে যায়, কারও ক্ষেত্রে বেড়ে যায় স্থায়ী ঝরে পড়ার ঝুঁকি। অর্থাৎ একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ শেষ পর্যন্ত সামাজিক বৈষম্যকেও আরও তীব্র করে তোলে।

এ কারণেই বর্ষাজনিত শিক্ষাবিচ্ছিন্নতাকে কেবল দুর্যোগব্যবস্থাপনার বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এটা এখন মানবসম্পদ উন্নয়ন, দারিদ্র্য হ্রাস এবং জলবায়ু অভিযোজন–এই তিনটিরই মিলিত প্রশ্ন।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রতি বছর যখন একই ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, তখনো কেন আমরা প্রতিবারই অপ্রস্তুত থাকি? কেন বর্ষা এলেই শিক্ষা কার্যক্রম যেন ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়? এর উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোর দিকে তাকাতে হবে।

বাংলাদেশে দুর্যোগব্যবস্থাপনা ও শিক্ষা–দুটি খাতই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু বাস্তবে তাদের সমন্বয় এখনো সীমিত। বন্যা বা অতিবৃষ্টির পূর্বাভাস পাওয়া গেলেও অধিকাংশ এলাকায় আগাম কোনো বিকল্প শিক্ষা পরিকল্পনা প্রস্তুত থাকে না। কোথাও অস্থায়ী শিক্ষাকেন্দ্রের ব্যবস্থা নেই, কোথাও শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়িতে অনুশীলনের উপকরণ পৌঁছায় না, আবার কোথাও শিক্ষক ও অভিভাবকের মধ্যে সমন্বিত যোগাযোগব্যবস্থাও গড়ে ওঠেনি। ফলে দুর্যোগ দেখা দিলেই শিক্ষা কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।

অথচ দুর্যোগপ্রবণ অনেক দেশ ভিন্ন পথ দেখিয়েছে। ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া কিংবা জাপানের মতো দেশগুলোতে বিদ্যালয়ের জন্য আগাম দুর্যোগ পরিকল্পনা, বিকল্প পাঠসূচি, কমিউনিটিভিত্তিক শেখার ব্যবস্থা এবং দ্রুত পুনরায় পাঠদান শুরু করার সুস্পষ্ট প্রোটোকল রয়েছে। শিশুদের শেখার ধারাবাহিকতাকে সেখানে দুর্যোগব্যবস্থাপনারই অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশেরও এখন সেই দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের সময় এসেছে।

দেশের মধ্যেও ইতিবাচক অভিজ্ঞতার অভাব নেই। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল ও নদীবিধৌত কিছু এলাকায় ভাসমান বিদ্যালয় বহু বছর ধরে প্রমাণ করে আসছে যে, ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতা সব সময় শিক্ষার প্রতিবন্ধকতা নয়। বিদ্যালয় যখন শিশুর কাছে পৌঁছে যায়, তখন বর্ষার পানিও শেখাকে থামিয়ে রাখতে পারে না। এই উদ্যোগগুলো দেখিয়েছে, স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে পরিকল্পনা করলে শিক্ষার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সম্ভব। কিন্তু এগুলো এখনো বিচ্ছিন্ন প্রকল্প, জাতীয় শিক্ষানীতির মূলধারায় সেভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি।

অনেকে মনে করেন, ডিজিটাল শিক্ষা বা অনলাইন ক্লাসই সমস্যার সমাধান। কোভিড-১৯-এর অভিজ্ঞতা আমাদের শিখিয়েছে, বিষয়টি এত সহজ নয়। শহরের অনেক পরিবারের জন্য অনলাইন শিক্ষা কার্যকর হলেও হাওড়, চর কিংবা দরিদ্র গ্রামীণ পরিবারের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। অনেক শিশুর হাতে স্মার্টফোন নেই, অনেক পরিবারে একটি ফোন থাকলেও সেটা কর্মজীবী সদস্যের সঙ্গে বাইরে থাকে। ইন্টারনেট সংযোগ দুর্বল, বিদ্যুৎ অনিয়মিত এবং ডিজিটাল দক্ষতার সীমাবদ্ধতাও বড় বাধা। ফলে অনলাইন শিক্ষা একটি সহায়ক ব্যবস্থা হতে পারে, কিন্তু এটা কখনোই একমাত্র সমাধান হতে পারে না।

বরং আমাদের প্রয়োজন বহুমাত্রিক বিকল্প। যেখানে ইন্টারনেট নেই, সেখানে মুদ্রিত স্বশিক্ষা প্যাকেট, কমিউনিটি লার্নিং সেন্টার, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক-শিক্ষক, কমিউনিটি রেডিও বা টেলিভিশনভিত্তিক পাঠ, মোবাইল ফোনে সংক্ষিপ্ত নির্দেশনা–সবকিছুর সমন্বিত ব্যবহার করা যেতে পারে। একেক অঞ্চলের জন্য একেক ধরনের সমাধানই হবে সবচেয়ে কার্যকর।

বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে প্রাথমিক স্তরের শিশুদের। কারণ এ বয়সে প্রতিটি দিন গুরুত্বপূর্ণ। একজন প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী যদি এক মাস নিয়মিত পাঠ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে, তার ক্ষতি একজন নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীর তুলনায় অনেক বেশি হতে পারে। তাই দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে শুধু বিদ্যালয় খুলে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না, প্রয়োজন শিখন-ঘাটতি মূল্যায়ন, পুনরুদ্ধারমূলক পাঠদান এবং মানসিক সহায়তার ব্যবস্থা।

আরও একটি বিষয় প্রায়ই আলোচনার বাইরে থেকে যায়–বিদ্যালয় শিশুদের জন্য শুধু শেখার জায়গা নয়, এটি নিরাপত্তা, পুষ্টি, সামাজিকীকরণ এবং মানসিক বিকাশেরও কেন্দ্র। দীর্ঘদিন বিদ্যালয়ের বাইরে থাকলে অনেক শিশুর মধ্যে উদ্বেগ, একাকিত্ব ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। দরিদ্র পরিবারের ক্ষেত্রে বেড়ে যায় শিশুশ্রমের ঝুঁকি, আর কিশোরীদের ক্ষেত্রে অল্প বয়সে বিয়ের আশঙ্কাও বাড়তে পারে। অর্থাৎ শিক্ষাবিরতির প্রভাব শ্রেণিকক্ষের বাইরেও বিস্তৃত।
এ কারণেই বর্ষা জেঁকে বসার আগে কয়েকটি পদক্ষেপকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।

প্রথমত, দুর্যোগপ্রবণ প্রতিটি জেলার জন্য বিদ্যালয়ভিত্তিক জরুরি শিক্ষা পরিকল্পনা বাধ্যতামূলক করা। দ্বিতীয়ত, যেসব বিদ্যালয় নিয়মিত আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়, সেখানে বিকল্প পাঠদানের আগাম ব্যবস্থা রাখা। তৃতীয়ত, প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জন্য সহজ ভাষায় প্রস্তুতকৃত স্বশিক্ষা প্যাকেট ও অনুশীলন সামগ্রী আগেই বিতরণ করা। চতুর্থত, শিক্ষক, বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি এবং অভিভাবকদের সমন্বয়ে স্থানীয় শিক্ষা সহায়তা দল গঠন করা। পঞ্চমত, দুর্যোগ শেষে শুধু সিলেবাস শেষ করার তাড়না নয়, বরং শিখন-ঘাটতি পূরণকে অগ্রাধিকার দেওয়া। ষষ্ঠত, নতুন বিদ্যালয় নির্মাণ এবং পুরোনো বিদ্যালয় সংস্কারে জলবায়ু-সহনশীল নকশা বাধ্যতামূলক করা।

সবচেয়ে বড় কথা, শিক্ষা খাতকে এখন জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনার কেন্দ্রীয় অংশ হিসেবে দেখতে হবে। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো মানে শুধু বাঁধ নির্মাণ বা আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি নয়, শিশুদের শেখার অধিকার অক্ষুণ্ন রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব।

জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে যে আলোচনা চলছে, সেখানে একটি বিষয় ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে–সবচেয়ে বড় ক্ষতি অনেক সময় দৃশ্যমান অবকাঠামোয় নয়, মানবসম্পদে। একটি ভেঙে যাওয়া সেতু কয়েক মাসে পুনর্নির্মাণ করা যায়, ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা সংস্কার করা যায়, এমনকি বিধ্বস্ত ঘরবাড়িও আবার গড়ে ওঠে। কিন্তু একজন শিশুর হারিয়ে যাওয়া শেখার সময়, নষ্ট হয়ে যাওয়া শিক্ষাভিত্তি কিংবা বিদ্যালয়ের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার অভ্যাস সহজে ফিরিয়ে আনা যায় না। এই ক্ষতির হিসাব কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয়-লাভ বিশ্লেষণে ধরা পড়ে না, অথচ দীর্ঘমেয়াদে সেটিই সবচেয়ে বড় জাতীয় ক্ষতিতে পরিণত হয়।

বাংলাদেশ আগামী কয়েক দশকে জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি হিসেবেই থাকবে বলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায় বারবার উঠে এসেছে। অর্থাৎ বর্ষা, বন্যা, অতিবৃষ্টি কিংবা নদীভাঙনের মতো বাস্তবতাকে আর ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এগুলো আমাদের নতুন স্বাভাবিক বাস্তবতা। সেই বাস্তবতায় এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যা দুর্যোগের কারণে থেমে যাবে না, বরং পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে পারবে।

এ জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, দুর্যোগব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা জরুরি। আবহাওয়ার পূর্বাভাস, বন্যার সম্ভাব্যতা এবং বিদ্যালয়ের ঝুঁকির তথ্য একত্র করে আগাম সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে। কোন বিদ্যালয় কত দিন বন্ধ থাকতে পারে, কোথায় বিকল্প পাঠদান প্রয়োজন, কোথায় নৌযান বা অস্থায়ী শিক্ষাকেন্দ্র লাগবে–এসব বিষয়ে আগে থেকেই প্রস্তুতি থাকলে ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

একই সঙ্গে স্থানীয় সম্প্রদায়কেও এই প্রস্তুতির অংশ করতে হবে। বিদ্যালয় শুধু সরকারের নয়; এটি একটি সমাজেরও প্রতিষ্ঠান। অভিভাবক, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, যুবসমাজ এবং বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি একসঙ্গে কাজ করলে দুর্যোগকালেও শিশুদের শেখার ধারাবাহিকতা অনেকাংশে বজায় রাখা সম্ভব। শিশুর শিক্ষা রক্ষার দায়িত্বকে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে হবে।

এখানে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, বেসরকারি সংগঠন এবং করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা উদ্যোগেরও ভূমিকা আছে। প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, ভাসমান বিদ্যালয়, কমিউনিটি লার্নিং সেন্টার, মোবাইল লাইব্রেরি কিংবা স্বশিক্ষা উপকরণ তৈরির মতো উদ্যোগগুলোকে বৃহত্তর পরিসরে বিস্তৃত করা গেলে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের শিশুরাও শিক্ষার মূলধারায় থাকতে পারবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, শিক্ষা কেবল একটি খাত নয়, এটা দারিদ্র্য হ্রাস, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং গণতান্ত্রিক বিকাশের ভিত্তি। যে শিশু আজ বর্ষার কারণে নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে পারছে না, সে-ই কয়েক বছর পর দক্ষ কর্মী, উদ্যোক্তা, বিজ্ঞানী, কৃষি উদ্ভাবক কিংবা দায়িত্বশীল নাগরিক হওয়ার সুযোগ হারাতে পারে। ফলে প্রতিটি হারানো পাঠদিবস শুধু একজন শিশুর নয়, পুরো দেশের সম্ভাবনাকেই সংকুচিত করে দেয়।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তির হার বাড়িয়েছে, লিঙ্গসমতা অর্জনে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে এবং শিক্ষার বিস্তারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। এখন সেই অর্জন টিকিয়ে রাখার নতুন চ্যালেঞ্জের নাম জলবায়ু পরিবর্তন। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজন নতুন দৃষ্টিভঙ্গি–যেখানে বিদ্যালয় শুধু একটি ভবন নয়, বরং এমন একটি ব্যবস্থা, যা যেকোনো দুর্যোগের মধ্যেও শিশুর শেখার অধিকার নিশ্চিত করতে সক্ষম।

বর্ষা আসবে, নদী ফুলে উঠবে, কোথাও কোথাও বন্যাও হবে। প্রকৃতির এই নিয়ম আমরা বদলাতে পারব না। কিন্তু শিশুর শিক্ষা বর্ষার পানিতে ভেসে যাবে কি না, সেটি পুরোপুরি মানুষের সিদ্ধান্ত, রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার এবং নীতিনির্ধারকদের দূরদর্শিতার ওপর নির্ভর করে।

বর্ষা যদি প্রতি বছর আমাদের প্রস্তুতির দুর্বলতা প্রকাশ করে, তবে সেই ব্যর্থতার দায় প্রকৃতির নয়, আমাদের। আর যদি আমরা এখনই শিক্ষা ও দুর্যোগব্যবস্থাপনাকে একই সুতোয় গেঁথে জলবায়ু-সহনশীল শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারি, তবে বর্ষা আর শিশুদের ভবিষ্যতের প্রতিপক্ষ হবে না, বরং প্রতিকূলতার মধ্যেও এগিয়ে যাওয়ার সক্ষমতার এক নতুন অধ্যায় রচনা করবে। একটি উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্নপূরণে এর বিকল্প নেই।

লেখক: কথাসাহিত্যিক

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে মাদকের ভয়াবহতা

প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬, ০৬:৩৩ পিএম
আপডেট: ০৮ জুলাই ২০২৬, ০৬:৩৬ পিএম
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে মাদকের ভয়াবহতা
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

সবুজে ভরা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) কাম্প্যাস। এই কাম্প্যাসে প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী আসে নিজেদের স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু তাদের মধ্যে কেউ কেউ মাদকের ভয়াল ছোবলে সেই স্বপ্নপথ হতে বিচ্যুত হচ্ছে। ফলে মাদকাসক্তি অনেক সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থীর স্বপ্ন ও ভবিষ্যতের বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। দীর্ঘকাল ধরে চবির অনেক শিক্ষার্থী মাদকের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। চবির মাদকসেবন ও মাদকাসক্তির প্রবণতা ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের মাদকের সহজলভ্যতা শিক্ষার্থীদের একটি অংশকে নেশার দিকে আকৃষ্ট করছে। ফলে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ও শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক বিকাশ ক্রমেই হুমকির মুখে পড়ছে। মাদকসংক্রান্ত কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগে বিভিন্ন সময়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। ফুলের পাপড়ি যেমন প্রবল বাতাসে ঝড়ে যায়, ঠিক তেমনই শিক্ষার্থীরা নিজেদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ার আগেই বিপথগামী হয়ে যাচ্ছে।

বিভিন্ন কারণে শিক্ষার্থীরা বর্তমানে মাদকসেবনের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়ছে। এর পেছনে একটিমাত্র কারণ নয়, বরং সামাজিক, মানসিক এবং পারিপার্শ্বিক পরিবেশ একসঙ্গে কাজ করে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের একটি অংশ প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। সম্পর্কজনিত সমস্যার কারণে অনেক সম্পর্ক বিচ্ছেদে গিয়ে শেষ হয়। প্রিয় মানুষকে হারানোর মানসিক আঘাত, একাকীত্ব ও বিষণ্ণতা থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ হিসেবে অনেক শিক্ষার্থী মাদককে বেছে নেয়। চবির বিভিন্ন হল মাদকের আঁকড়ায় পরিণত হয়েছে। ক্রিমিনোলজির ভাষায় ‘পিয়ার ইনফ্লুয়েঞ্চ’ বা সমবয়সী বন্ধুদের প্রভাব ক্যাম্পাসে মাদকসেবনের উৎসাহ দেওয়ার ভূমিকা পালন করে। অগ্রজ, অনুজ কিংবা সহপাঠীদের সঙ্গে চলাফেরা করতে গিয়ে অনেকেই কৌতূহলবশত প্রথমবার মাদক গ্রহণ করে এবং পরে আসক্ত হয়ে পড়ে। যেসব শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার আগে ধূমপান পর্যন্ত করেনি কিন্তু ক্যাম্পাসের বিভিন্ন প্রভাবে ধূমপান শুরু করে তাদের নিয়ে ঝুঁকি বেশি থাকে। কারণ, একবার ধূমপান শুরু করার পর মাদকের সহজলভ্যতা এবং সেবনের পরিবেশ পাওয়ার কারণে খুব সহজেই অধিক ক্ষতিকর দ্রব্য যেমন: গাঁজা, ইয়াবা, মদ, হেরোইন ইত্যাদি সেবন শুরু করছে। অন্যদিকে, ক্রিমিনোলজির ভাষায় ‘পিয়ার রিজেকশন’ বা সহপাঠীদের সার্কেল থেকে বিচ্ছিন্ন শিক্ষার্থীরা নিজেদের গ্রহণযোগ্য মনে করতে বা মানসিক শূন্যতা পূরণ করতে মাদক গ্রহণ শুরু করছে। এ ছাড়া চবিতে অনেক শিক্ষার্থী জুয়ায় আসক্ত। এই জুয়ার আসক্তি অনেক বড় একটি উদ্বেগের বিষয়। জুয়াতে টাকা হেরে আর্থিকসংকট এবং হতাশায় পড়ে অনেক শিক্ষার্থী সাময়িক স্বস্তির জন্য মাদক গ্রহণ করে। কিছু শিক্ষর্থী মাদক গ্রহণকে আধুনিকতা বা সাহসিকতার প্রতীক মনে করে সেবন করতে গিয়ে আসক্ত হয়ে পড়ছে। প্রত্যাশার অনুরূপ একাডেমিক ফলাফল যখন কোনো শিক্ষার্থী পেতে ব্যর্থ হয় তখন সেই হতাশা থেকে মুক্তি পেতে মাদকসেবন শুরু করছে। খারাপ আর্থসামাজিক অবস্থাও অনেক সময় মাদকাসক্তির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। পারিবারিক অশান্তি, ভাঙন ও মানসিক অবহেলা অনেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে নিঃসঙ্গতার দিকে ঠেলে দেয়। সেই শূন্যতার সুযোগ নিয়ে মাদক সহজেই তাদের জীবনে প্রবেশ করে। অনেক শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকে জন্ম নেওয়া দুশ্চিন্তাও অনেককে মাদকের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।  

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা পথ ও কৌশলে মাদক ছড়িয়ে পড়ছে, যা শিক্ষাঙ্গনের সুস্থ পরিবেশের জন্য ক্রমেই বড় হুমকি হয়ে উঠছে। এ ক্ষেত্রে বহিরাগতরা বিশেষ ভূমিকা পালন করছে। গত ৮ নভেম্বর ২০২৫ ক্যাম্পাসে ইয়াবা ও মাদকসেবনের সরঞ্জামসহ কয়েকজন বহিরাগত আটক হয়। ক্যাম্পাসে নম্বরবিহীন মোটরসাইকেল এবং সিএনজির মাধ্যমে মাদক প্রবেশ করছে। শুধু প্রধান ফটক নয়, ক্যাম্পাসসংলগ্ন বিভিন্ন অলিগলি ও বিকল্প পথও মাদক প্রবেশের নীরব করিডরে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি ১ ডিসেম্বর ২০২৫ রাতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে চাষাবাদের জন্য ইজারা নেওয়া জমিতে অবৈধভাবে চোলাই মদ উৎপাদন ও বন্য প্রাণী শিকারের অভিযোগে একজন ব্যক্তিকে আটক করে প্রক্টরিয়াল বডি। অভিযানে প্রায় ৩০ লিটার চোলাই মদ এবং মদ তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। ক্যাম্পাসে মাদক সরবরাহের নেটওয়ার্কে অভ্যন্তরীণ সহযোগিতা দীর্ঘদিনের। অধ্যয়নরত উপজাতি শিক্ষার্থীরা নিজ এলাকা (রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ইত্যাদি) থেকে ক্যাম্পাসে মাদক সরবরাহ করে আসছে। এই নেটওয়ার্ক পরিচালনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু নিরাপত্তা প্রহরীরও সম্পৃক্ততা রয়েছে। ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের পাশাপাশি কিছু অভ্যন্তরীণ ব্যক্তির সম্পৃক্ততায় একটি সংঘবদ্ধ মাদকচক্র সক্রিয় থাকার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ফলে মাদকের বিস্তার দিন দিন আরও বেড়ে উঠছে। ক্যাম্পাসে পরিচালিত বিভিন্ন অভিযানে মাদক সরবরাহের সময় একাধিক শিক্ষার্থী প্রক্টরিয়াল বডির কাছে হাতেনাতে ধরা পড়ে। গত ৭ জুলাই ২০২৪ মাদকসেবনরত অবস্থায় ৩০ জন শিক্ষার্থী এবং ২৭ জুন ২০২৫ একই অভিযোগে আরও নয়জন শিক্ষার্থীকে আটক করা হয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় কিছু স্থান মাদকসেবনের জন্য পরিচিত। ব্রিকফিল্ড, কলা ঝুপড়ি, লেডিস ঝুপড়ি, আইন অনুষদ ক্যান্টিনসংলগ্ন এলাকা, নীরা পাহাড়, জীববিজ্ঞান অনুষদের পেছনের অংশ, কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ, রেলওয়ে স্টেশন, বোটানিক্যাল গার্ডেন, প্যাগোডা, ঝরনা ও আশপাশের এলাকা, স্লুইস গেট এবং চবি কলেজের পেছনের অংশকে ঘিরে মাদকসেবার ঘটনা বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর এসব এলাকাকে ঘিরে মাদকসেবীদের আনাগোনার অভিযোগ বেশি শোনা যায়।

একজন মাদকাসক্ত শিক্ষার্থী শুধু নিজের জীবন ও ভবিষ্যতের জন্যই নয়, তার পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের জন্যও এক নীরব হুমকিস্বরূপ। সে একই সঙ্গে নিজের শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি করে বসে। এসবের ফলে একজন শিক্ষার্থীর একাডেমিক জীবন যেমন হুমকির মুখে পড়ে, অনেক সময় একেবারে স্থবির হয়ে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্তানকে পাঠানোর পেছনে প্রতিটি পরিবারের থাকে অসংখ্য স্বপ্ন ও প্রত্যাশা। কিন্তু একজন শিক্ষার্থী যখন মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে তখন পরিবারের স্বপ্ন ধীরে ধীরে বিলীন হতে শুরু করে। পরিবারকে মানসিক, সামাজিক ও আর্থিক চাপের মুখোমুখি হতে হয়; অনেক ক্ষেত্রে আসক্ত শিক্ষার্থী জোরপূর্বক অর্থ দাবি করে, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে। এর ফলে সন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের বিশ্বাস, আস্থা ও মানসিক শান্তি গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্যাম্পাসে মাদকসংক্রান্ত বিভিন্ন ঘটনা ও অভিযোগ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তিকে বারবার প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে। এ ধরনের ঘটনার কারণে দেশের অন্যতম শীর্ষ বিদ্যাপীঠ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ও গ্রহণযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মাদকের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ সামনে এলে তা শুধু ব্যক্তির নয়, পুরো বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রদায়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষার্থী রাষ্ট্রের সম্ভাবনাময় মানবসম্পদ। মাদকের কারণে যখন একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষা, দক্ষতা ও সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন এর প্রভাব ব্যক্তিগত পরিসর ছাড়িয়ে জাতীয় উন্নয়নের জন্য বাধাস্বরূপ হয়ে পড়ে। ফলে মানবসম্পদ উন্নয়ন, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং দেশের ভবিষ্যৎ অগ্রযাত্রাও দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হতে পারে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে মাদকমুক্ত করতে হলে কেবল অভিযান নয়, দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রয়োজনে নির্ধারিত নীতিমালার আওতায় শিক্ষার্থীদের ডোপ টেস্ট চালুর বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে এবং পরীক্ষায় মাদকসেবনের প্রমাণ মিললে কাউন্সেলিং, পুনর্বাসন ও প্রয়োজনীয় শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থায়নে প্রতি মাসে মাদকের ক্ষতিকর দিক নিয়ে সেমিনার, সচেতনতামূলক কর্মশালা, পোস্টার ক্যাম্পেইন ও উন্মুক্ত আলোচনা আয়োজন করা জরুরি। গুরুতর আসক্ত শিক্ষার্থীদের জন্য অভিজ্ঞ মনোবিজ্ঞানী ও কাউন্সেলরের মাধ্যমে বিনামূল্যে চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। ক্যাম্পাসে মাদক প্রবেশের সম্ভাব্য পথগুলোতে কঠোর নজরদারি ও নিয়মিত তল্লাশি জোরদার করতে হবে। মাদক সরবরাহকারী ও ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি ক্যাম্পাসের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিয়মিত টহল এবং শিক্ষার্থী, শিক্ষক, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগই একটি নিরাপদ ও মাদকমুক্ত ক্যাম্পাস গড়ে তুলতে পারে।

লেখকদ্বয়: শিক্ষার্থী, তৃতীয় বর্ষ, ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়