খবরের কাগজ ১১ জুলাই ২০২৬ তারিখের খবর পড়লাম ‘ফরিদপুরে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীন সরকারি শিশু পরিবারে (বালিকা) ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়েছে।’
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য থেকে জানা গেছে, গত আড়াই বছরে দেশে নারী ও শিশু ধর্ষণের অভিযোগে ১০ হাজার ৮৩০টি মামলা হয়েছে। অর্থাৎ, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২টি মামলা। এটি শুধু অপরাধের সংখ্যা নয়, এটি রাষ্ট্রের শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা, আইন প্রয়োগ, সামাজিক সচেতনতা এবং বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা সম্পর্কে একটি কঠিন প্রশ্নও উত্থাপন করে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব মামলার উল্লেখযোগ্য অংশের ভুক্তভোগী শিশু।
বাংলাদেশে শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা আর বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়, এটি এখন জাতীয় শিশু সুরক্ষা সংকটে রূপ নিয়েছে। গত কয়েক বছরে প্রকাশিত পুলিশ সদর দপ্তর, আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম এবং ইউনিসেফের তথ্য একত্রে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতার প্রকৃতি যেমন পরিবর্তিত হয়েছে, তেমনি বেড়েছে এর ভয়াবহতাও। উদ্বেগজনকভাবে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপরাধী কোনো অপরিচিত ব্যক্তি নয়, বরং পরিবারের সদস্য, আত্মীয়, প্রতিবেশী, শিক্ষক, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তি কিংবা শিশুর পরিচিত কেউ। অর্থাৎ, যে পরিবেশ শিশুর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ হওয়ার কথা, অনেক ক্ষেত্রে সেই পরিবেশই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, শুধু ২০২৬ সালের প্রথম কয়েক মাসেই শতাধিক শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে; তাদের মধ্যে কয়েকজনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে, আবার কেউ কেউ নির্যাতনের মানসিক আঘাত সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার পথও বেছে নিয়েছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের বার্ষিক প্রতিবেদনও একই ধরনের প্রবণতার কথা বলছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রকাশিত সংখ্যাই প্রকৃত চিত্র নয়। যৌন সহিংসতার অসংখ্য ঘটনা সামাজিক কলঙ্ক, পারিবারিক চাপ, ভয়ভীতি এবং বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতি অনাস্থার কারণে থানায় পৌঁছায় না। ফলে সরকারি পরিসংখ্যান বাস্তব পরিস্থিতির কেবল দৃশ্যমান অংশমাত্র।
প্রশ্ন হচ্ছে, শিশুরা কেন এত বেশি ঝুঁকির মধ্যে? এর উত্তর শুধু আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতায় সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের দ্রুত নগরায়ণ, পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তন, ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তার, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা সবকিছু মিলিয়েই ঝুঁকি তৈরি করছে। অনেক পরিবার এখনো শিশুদের শরীরের নিরাপত্তা, অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ কিংবা যৌন নির্যাতন সম্পর্কে বয়সোপযোগী শিক্ষা দিতে সংকোচ বোধ করে। বিদ্যালয়গুলোর বড় অংশেও কার্যকর শিশু সুরক্ষা নীতি নেই। ফলে শিশুরা অনেক সময় বুঝতেই পারে না যে সে অপরাধের শিকার হয়েছে, কিংবা বুঝলেও কাকে জানাবে, সেটা জানে না।
ইউনিসেফ বহু বছর ধরে বলে আসছে, শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা কেবল অপরাধ দমন দিয়ে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত Child Protection System। অর্থাৎ পরিবার, বিদ্যালয়, স্থানীয় প্রশাসন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক সুরক্ষা প্রতিষ্ঠান–সবগুলোকে একই কাঠামোর মধ্যে কাজ করতে হবে।
বাংলাদেশে জাতীয় শিশু সুরক্ষা নীতি থাকলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এখনো বড় ঘাটতি রয়েছে। অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষা কমিটি নেই, শিক্ষকদের বাধ্যতামূলক সেফগার্ডিং প্রশিক্ষণ নেই, অভিযোগ গ্রহণের স্বাধীন ব্যবস্থা নেই এবং নির্যাতিত শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় মানসিক স্বাস্থ্যসেবাও অত্যন্ত সীমিত।
এই সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিচারব্যবস্থা। কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও অপরাধ কমছে না। কারণ, অপরাধ প্রতিরোধে আইনের কঠোরতার চেয়ে শাস্তির নিশ্চয়তা অনেক বেশি কার্যকর। বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলোয় হাজার হাজার মামলা বছরের পর বছর বিচারাধীন। তদন্তে বিলম্ব, ফরেনসিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, সাক্ষী সুরক্ষার দুর্বলতা এবং দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া অনেক ভুক্তভোগী পরিবারকে নিরুৎসাহিত করে। এর ফলে অপরাধীদের মধ্যে দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি হয়, যা নতুন অপরাধ সংঘটিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।
বাংলাদেশে শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার আলোচনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রায়ই উপেক্ষিত থেকে যায়। আমরা সাধারণত একটি ঘটনা ঘটার পর অপরাধীকে গ্রেপ্তার, বিচার এবং শাস্তির প্রশ্নে মনোযোগ দিই। কিন্তু কার্যকর শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত–অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই ঝুঁকি চিহ্নিত করা এবং তা প্রতিরোধ করা। উন্নত দেশগুলোর শিশু সুরক্ষা নীতির কেন্দ্রবিন্দুতেই আছে এই প্রতিরোধমূলক দৃষ্টিভঙ্গি। বাংলাদেশেও এখন সেই দৃষ্টিভঙ্গির দিকে যাওয়ার এসেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগ INSPIRE Framework শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধে সাতটি অগ্রাধিকারমূলক কৌশলের কথা বলেছে। এর মধ্যে আছে কার্যকর আইন প্রয়োগ, সামাজিক মূল্যবোধের পরিবর্তন, নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা, অভিভাবকদের সক্ষমতা বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সহায়তা, শিশুদের জীবনদক্ষতা শিক্ষা এবং সহজলভ্য সেবা ব্যবস্থা। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই সাতটি কৌশলের অধিকাংশই অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর নয়, বরং তার আগেই ঝুঁকি কমানোর ওপর গুরুত্ব দেয়। বাংলাদেশের শিশু সুরক্ষা নীতিতেও এই দর্শনের প্রতিফলন ঘটানো প্রয়োজন।
আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও নতুন করে ভাবতে হবে। বর্তমানে অধিকাংশ বিদ্যালয়ের নিরাপত্তাব্যবস্থা শারীরিক অবকাঠামো বা প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অথচ একটি বিদ্যালয় তখনই প্রকৃত অর্থে নিরাপদ হয়, যখন সেখানে শিশু সুরক্ষা নীতি কার্যকর থাকে, শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য আচরণবিধি থাকে, অভিযোগ জানানোর গোপন ও নিরাপদ ব্যবস্থা থাকে এবং প্রতিটি অভিযোগ দ্রুত তদন্তের আওতায় আসে। উন্নত বিশ্বের বহু দেশে শিক্ষক নিয়োগের আগে Child Safeguarding Screening বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশেও শিশুদের সঙ্গে কাজ করেন–এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে অনুরূপ ব্যবস্থা চালুর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
পরিবারের ভূমিকাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের সমাজে যৌনতা ও শরীর নিয়ে খোলামেলা আলোচনা এখনো অনেকাংশে নিষিদ্ধ বিষয়। এর ফলে শিশুরা নিজের শরীর সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞান ছাড়াই বড় হয়। তারা জানে না কোন আচরণ গ্রহণযোগ্য, কোনটি নয়; কোথায় আপত্তি জানাতে হবে, কাকে জানাতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে নির্যাতনের শিকার হওয়ার পরও শিশুরা ঘটনাটিকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে না। এই নীরবতাই অপরাধীদের সবচেয়ে বড় সুবিধা।
শিশু সুরক্ষাকে তাই শুধু নারী ও শিশু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, সামাজিক কল্যাণ বিভাগ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত দায়িত্ব। একই সঙ্গে প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় শিশুবান্ধব কাউন্সেলিং সেবা, দ্রুত ফরেনসিক পরীক্ষা, দক্ষ তদন্ত কর্মকর্তা এবং ভুক্তভোগী পরিবারের জন্য আইনি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, একজন নির্যাতিত শিশুর জন্য ন্যায়বিচার মানে শুধু অপরাধীর শাস্তি নয়, তার মানসিক পুনর্বাসন এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার সুযোগও নিশ্চিত করা।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিশুদের নিরাপত্তাকে রাজনৈতিক বিতর্ক বা সাময়িক আলোচনার বিষয় বানানো যাবে না। সরকার পরিবর্তন হতে পারে, নীতি বদলাতে পারে, কিন্তু শিশু সুরক্ষা রাষ্ট্রের স্থায়ী অঙ্গীকার হওয়া উচিত। আজ যে শিশু নিরাপদ নয়, আগামীকাল সেই রাষ্ট্রও নিরাপদ থাকবে না। কারণ, সহিংসতার অভিজ্ঞতা নিয়ে বেড়ে ওঠা প্রজন্মের সামাজিক ও মানসিক মূল্য চুকাতে হয় পুরো জাতিকেই।
বাংলাদেশের সামনে এখন দুটি পথ খোলা। একটি পথ হলো, প্রতিটি আলোচিত ঘটনার পর কয়েক দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে আবার আগের মতো নীরব হয়ে যাওয়া। অন্য পথটি হলো, এই ১০ হাজার ৮৩০টি মামলাকে সতর্কবার্তা হিসেবে গ্রহণ করে শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থাকে নতুন করে গড়ে তোলা। স্বাভাবিকভাবেই দ্বিতীয় পথটি আমাদের বেছে নিতে হবে। কারণ, শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু তার অধিকার রক্ষা নয়, এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রক্ষারও পূর্বশর্ত।
লেখক: কথাসাহিত্যিক