আমাদের চাক্ষুষ উন্নয়ন ও প্রাকৃতিক বিনাশের মধ্যবর্তী ধূসর রেখাটি দিন দিন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। প্রতি বছর বর্ষা এলেই দেশজুড়ে বৃক্ষরোপণের এক বিশাল মহোৎসব শুরু হয়। সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগে লাখ লাখ চারা রোপণের লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করা হয়, ব্যানার-ফেস্টুন আর প্রচারণায় মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। কিন্তু প্রচারের আলো নিভে যাওয়ার পর সেই চারাগুলোর কী দশা হলো, তার তদারকি করার লোক খুঁজে পাওয়া যায় না। এখানে একটি চরম সত্য আমাদের স্বীকার করতেই হবে–আমরা রোপণকে যতটা উদযাপনে রূপ দিতে পেরেছি, রোপণ-পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণকে ততটা প্রাতিষ্ঠানিক বা নাগরিক দায়িত্ব হিসেবে গড়ে তুলতে পারিনি।
সম্প্রতি বিশ্ব পরিবেশ দিবস ও জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান-২০২৬-এর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঠিক এই সংকটের দিকেই আঙুল তুলেছেন। তিনি পরিষ্কার করে বলেছেন, পরিবেশ মেলা বা বৃক্ষমেলা কেবল বাৎসরিক কোনো আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। এটিকে আমাদের প্রতিদিনের অভ্যাসে রূপ দিতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমাদের পুরো প্রশাসনিক এবং নাগরিক ‘মাইন্ডসেট’ বা মানসিকতা কি এই দীর্ঘমেয়াদি প্রতিপালনের জন্য প্রস্তুত?
রোপণ-পরবর্তী ঔদাসীন্য: যেখানে আটকে আছে গলদ
এখানেই আমাদের আসল গলদ। আমাদের বনায়ন নীতি আজ পর্যন্ত মূলত ‘সংখ্যা-ভিত্তিক’ (Number-driven), ‘ফলাফল-ভিত্তিক’ (Outcome-driven) নয়। উদাহরণস্বরূপ, সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি চারা রোপণের একটি বিশাল মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। উদ্যোগটি দারুণ, কিন্তু এই ২৫ কোটির মধ্যে কতটি চারা শেষ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ বৃক্ষে রূপ নেবে, তার কোনো বৈজ্ঞানিক হিসাব বা জবাবদিহির কাঠামো আমাদের আছে কি?
কোনো পরিকল্পনা ছাড়া, মাটির গুণাগুণ না বুঝে কিংবা জলবায়ুর সামঞ্জস্য না রেখে শুধু সংখ্যা পূরণের জন্য গাছ লাগালে আখেরে কোনো লাভ হয় না। অনেক সময় দেখা যায়, রাস্তার দুই পাশে হাজার হাজার চারা লাগানো হলো, অথচ কয়েক সপ্তাহ পরেই পানির অভাবে বা গবাদিপশুর পেটে গিয়ে সেগুলো নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। এর অর্থ হলো, রোপণের পেছনে যে বিপুল অর্থ ও শ্রম ব্যয় হলো, তার বড় অংশই অপচয়।
কিউরেটেড বা পরিকল্পিত বনায়ন ছাড়া এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। গাছ লাগানোর বাজেটেই অন্তত তিন বছরের জন্য সেই গাছের পানি, সার এবং নিরাপত্তার (বেড়া বা খাঁচা) খরচ বরাদ্দ রাখা বাধ্যতামূলক করতে হবে। একই সঙ্গে কোন মাটিতে কোন প্রজাতির গাছ টিকবে, যেমন–ফলদ, বনজ, ঔষধি কিংবা বিপন্ন দেশীয় প্রজাতি–সেই বৈজ্ঞানিক জ্ঞানকে বনায়নের প্রধান ভিত্তি বানাতে হবে। ইউক্যালিপটাস বা আকাশমণির মতো ক্ষতিকর বিদেশি প্রজাতি বর্জন করে মাটির স্বাভাবিক ইকোসিস্টেম রক্ষা করা এখন আর বিলাসিতা নয়, অস্তিত্বের প্রশ্ন।
‘মাদার ট্রি’ নিধন: উন্নয়নের নামে আত্মঘাতী খেলা
নতুন গাছ রোপণের চেয়েও বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় এবং নীরব অপরাধটি হলো দেশের প্রাচীন ও শতবর্ষী বৃক্ষ নিধন। তথাকথিত আধুনিকায়ন, রাস্তা প্রশস্তকরণ কিংবা নতুন আবাসন প্রকল্পের দোহাই দিয়ে এক রাতেই কেটে ফেলা হচ্ছে শতবর্ষী বট, পাকুড় বা রেইনট্রি।
পরিবেশবিজ্ঞানের সাধারণ সমীকরণ বলে, একটি শতবর্ষী প্রাচীন গাছ প্রকৃতিকে যে পরিমাণ অক্সিজেন দেয়, যে মাত্রায় কার্বন শোষণ করে এবং স্থানীয় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে যেভাবে ভূমিকা রাখে, তা হাজারটি নতুন চারা গাছ দিয়েও রাতারাতি পূরণ করা সম্ভব নয়। এই প্রাচীন বৃক্ষগুলো কেবল কাঠের কোনো কঙ্কাল নয়; এগুলো একেকটি স্থানীয় ইকোসিস্টেমের প্রাণভোমরা, পরিবেশের ভাষায় যাদের বলা হয় ‘মাদার ট্রি’। এগুলো বহু প্রজাতির পাখি, অনন্য কীটপতঙ্গ এবং বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আশ্রয় ও খাদ্যের প্রধান উৎস।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বন বিভাগের কর্মকর্তাদের এই মাদার ট্রিগুলো রক্ষার ব্যাপারে কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আইনের ফাঁক গলে কিংবা প্রভাবশালী মহলের চাপে এই গাছগুলো প্রতিনিয়ত কাটা পড়ছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি প্রাচীন গাছ কেটে সেখানে ১০টি চারা রোপণের আশ্বাস দেওয়া আর একজন সুস্থ মানুষকে হত্যা করে ১০টি শিশুর জন্মের প্রতিশ্রুতি দেওয়া একই রকম হাস্যকর। উন্নয়ন পরিকল্পনা এমনভাবে সাজাতে হবে যেন একটিও প্রাচীন গাছ না কেটেও রাস্তার নকশা বা অবকাঠামো তৈরি করা যায়। প্রয়োজনে রাস্তা বাঁকা হবে, কিন্তু শতবর্ষী গাছ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে–এই নীতিগত অবস্থান রাষ্ট্রকে নিতে হবে।
সমন্বিত পরিবেশ ভাবনা: বিচ্ছিন্ন কোনো খাত নয়
জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে পরিবেশকে আর আলাদা কোনো বিচ্ছিন্ন খাত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি এখন আমাদের জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম মূল ভিত্তি। তীব্র তাপপ্রবাহ, ঘূর্ণিঝড়, আকস্মিক বন্যা আর লবণাক্ততার মতো ভয়াবহ দুর্যোগগুলো আমাদের অর্থনীতি, কৃষি এবং পানির নিরাপত্তাকে প্রতিদিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।
একটি পূর্ণাঙ্গ ও টেকসই সবুজ পরিবেশ গড়ে তুলতে হলে গাছ লাগানোর পাশাপাশি আমাদের নদী, পাহাড়, জলাভূমি এবং নগর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দিকে তাকাতে হবে। নদী ও খাল ভরাট বন্ধ না করতে পারলে এবং সারা দেশে শুরু হওয়া ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন-পুনঃখননের মতো কর্মসূচিগুলো সফল করতে না পারলে শুধু গাছ লাগিয়ে মাটির আর্দ্রতা রক্ষা করা যাবে না। ঠিক একইভাবে, প্লাস্টিক বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ এবং জাতীয় পর্যায়ে ‘থ্রি আর’ (Reduce, Reuse, Recycle) নীতি বাস্তবায়ন না করতে পারলে চারা গাছের গোড়াগুলো বিষাক্ত প্লাস্টিকে দমবন্ধ হয়ে মারা যাবে।
যুবশক্তির ব্যবহার এবং নাগরিক আন্দোলন
গাছ বাঁচানোর এই লড়াইয়ে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে ফ্রন্টলাইনে নিয়ে আসতে হবে। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘গ্রিন ভলান্টিয়ারিজম’ চালুর যে সরকারি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তাকে কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রতিটি শিক্ষার্থীর একাডেমিক মূল্যায়নের অংশ করা যেতে পারে। একজন শিক্ষার্থী তার স্কুল বা কলেজ জীবনে অন্তত একটি গাছ রোপণ করবে এবং তার পুরো শিক্ষাবর্ষে সেই গাছটির পরিচর্যা করবে–এমন নিয়ম করা গেলে তা এক যুগান্তকারী সামাজিক আন্দোলন তৈরি করবে। এর পাশাপাশি ‘ক্লাইমেট ইউথ ফেলোশিপ’ কিংবা ‘এনভায়রনমেন্ট স্টার্টআপ ফান্ড’-এর মতো উদ্যোগগুলো পরিবেশ সুরক্ষায় নতুন নতুন উদ্ভাবনী ধারণার জন্ম দেবে।
প্রধানমন্ত্রীর একটি প্রস্তাবনা এখানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও মানবিক: পরিবারে কোনো নতুন সন্তানের জন্ম হলে সেই মুহূর্তকে স্মরণীয় করে রাখতে একটি করে গাছ লাগানো। নবজাতকের বাড়ন্ত বয়সের সঙ্গে সঙ্গে গাছটিও বড় হবে। এটি কেবল সবুজের সংখ্যা বাড়াবে না, বরং সেই সন্তানের মনে শৈশব থেকেই প্রকৃতির প্রতি এক নিবিড় আত্মিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতা তৈরি করবে।
প্রকৃতির সঙ্গে সম্প্রীতির উন্নয়ন
উন্নয়ন ও পরিবেশ একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; প্রকৃতির সঙ্গে সম্প্রীতি রেখেই টেকসই সমৃদ্ধি গড়ে তোলা সম্ভব। জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের চাপে আমাদের জীববৈচিত্র্য আজ হুমকির মুখে। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, মানুষ ছাড়া প্রকৃতি বাঁচতে পারে, কিন্তু প্রকৃতি ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে না। দেশ হোক সব প্রাণী ও প্রাণের নিরাপদ আবাসস্থল–এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে শুধু রোপণের সংখ্যার পেছনে না ছুটে, প্রতিটি রোপণকৃত গাছের বেঁচে থাকা নিশ্চিত করতে হবে এবং শতবর্ষী বৃক্ষ হত্যা কঠোর আইন ও সামাজিক প্রতিরোধের মাধ্যমে বন্ধ করতে হবে। তবেই এই প্রিয় বাংলাদেশ আগামী প্রজন্মের জন্য এক নিরাপদ, চিরসবুজ ও জলবায়ু-সহনশীল টেকসই বাসযোগ্য ভূমি হিসেবে টিকে থাকবে।
লেখক: উন্নয়ন ও অধিকারকর্মী (শ্রেষ্ঠ যুব সম্মাননাপ্রাপ্ত)
প্রতিষ্ঠাতা-সভাপতি, ইয়ুথ অ্যাকশন ফর সোশ্যাল চেঞ্জ; ইয়্যাস সভাপতি, ভঙ্গী নৃত্য শিল্পালয়
[email protected]