টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও সমুদ্রের জোয়ারের পানিতে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। উপজেলার ১৪টি ইউনিয়ন ও পৌরসভার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে প্রায় দুই লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। প্রশাসনের ত্রাণ কার্যক্রম চললেও প্রত্যন্ত এলাকার অনেক বানভাসি এখনও সহায়তা থেকে বঞ্চিত। স্থানীয়দের অভিযোগ, দুর্গত এলাকায় জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতিও চোখে পড়ছে না।
জানা গেছে, চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। টানা ৯ দিনের ভারি বর্ষণ এবং পাহাড়ি ঢলে সৃষ্টি হওয়া এই ভয়াবহ বন্যায় মহা সংকটে পড়েছেন বানবাসীরা। পর্যাপ্ত ত্রাণ বিশুদ্ধ পানি ওষধের সংকট দেখা দিয়েছে।
উপজেলার ১৪টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার অধিকাংশই এখন পানির নিচে। বেসরকারি হিসেব মতে প্রায় ১০ হাজারের অধিক ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হওয়ার পাশাপাশি বহু পাকা ভবন এবং সেমিপাকা বাসা বাড়িও বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। আরেক সড়ক ও রাস্তাঘাটে কোমর পানি। হাজার হাজার বসতবাড়ি পানির নিচে। বিশেষ করে বাঁশখালী-চট্টগ্রাম প্রধান সড়কের পশ্চিম অংশ তথা উপকূলীয় এলাকার লক্ষাধিক মানুষ বর্তমানে পানিবন্দি।
এদিকে বন্যায় ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় দেখা দিলেও ভানবাসী মানুষের পাশে নেই জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় নেতারা। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৩টি ইউনিয়ন ছাড়া সবগুলোই জনপ্রতিনিধি শুন্য। ভারপ্রাপ্ত দিয়েই চলছে ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার কার্যক্রম। এসব ইউনিয়নে নামকাওয়াস্তে কিছু সরকারি ত্রাণ বিতরণ হলেও ব্যক্তি উদ্যোগে নেই কোন সহায়তা।
বিভিন্ন দলের পদধারী বড় নেতাদের দেখা নেই। ত্রাণ কার্যক্রমেও নেই তারা। অথচ করোনা দূর্যোগের সময় বাঁশখালীতে মুজিবুর রহমান সিআইপি কয়েক কোটি টাকার ত্রাণ বিতরণ করেন। গন্ডামারার সাবেক চেয়ারম্যান লেয়াকত আলী, এসআলম নাছিরসহ অনেক ধনার্ঢ্য ব্যবসায়ী শিল্পপতি কোটি কোটি টাকার ত্রাণ বিতরণ করছিলেন। কিন্তু বর্তমান বন্যা পরিস্থিতির এক সাপ্তাহ অতিবাহিত হতে চললেও কোন দানশীল ব্যক্তিবর্গের সাড়া শব্দ নেই।
এমপি জহিরুল ইসলাম জানান, তিনি ২০ লাখ টাকা ও ১০০ মেট্রিকটন খাদ্য শস্যের বরাদ্দ চেয়ে ডিও লেটার দিয়েছেন। কিন্তু এখনো সরকারিভাবে তা বরাদ্দ হয়নি। তাই ব্যক্তিগত উদ্যোগেই ত্রাণ কার্যক্রম চালাচ্ছেন। তার দল জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকেও ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
সরেজমিনে বাঁশখালীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে বন্যার্থদের হাহাকার। নেই পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তা। বিক্ষিপ্তভাবে কিছু ব্যক্তি ও সংগঠন ত্রাণ বিতরণ করলেও তা অপ্রতুল। অপরদিকে প্রধান সড়কের আশপাশের লোকজনই শুধু ত্রাণ পাচ্ছে। দুরদুরান্তের ছনুয়া, শেখেরখীল, গন্ডামারা, বড়ঘোনা, সরল, বাহারছড়া, খানখানাবাদ ও কাথরিয়া ইউনিয়নের বহু এলাকায় এখনো কোন ত্রাণ সহায়তা পৌছায়নি।
কাথরিয়া এলাকায় মনির আহমদ জানান, আমি এবং আমার ভাইয়ের ঘর ভেঙে গেছে। আমরা আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছি। এখন কিভাবে এই ঘর মেরামত করব তা নিয়েই আছি দুঃশ্চিন্তায়।
পশ্চিম বড়ঘোনা গ্রামের মোহাম্মদ ইউনুস জানান, শুনেছি এমপি সাহেব আসবেন। কিন্তু দেখা মিলেনি। এত এত নেতা, জনপ্রতিনিধি, নির্বাচন এলে গিজ গিজ করেন। কিন্তু আমাদের দূর্দিনে কাউকে খোঁজ খবর নিতেও চোখে পড়েনি।
এদিকে বাঁশখালীর বেড়িবাঁধের বিভিন্ন স্লুইসগেট বন্ধ করে এক শ্রেণীর প্রভাবশালী মাছ চাষের জন্য জনদূর্ভোগ সৃষ্টি করেছে বলে অভিযোগ করেছে স্থানীয়রা। বৃষ্টির পানি নদীতে নামতে না পেরে এই বন্যার সৃষ্টি হয়েছে।
বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ রুহুল আমিন জানান, বাঁশখালীতে বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। শনিবার থেকে পানি কমতে শুরু করেছে। তিনি জানান, বাঁশখালীর দূর্গত মানুষের জন্য এখনো পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা পাওয়া যায়নি। তবুও আমরা উপজেলা প্রশাসন থেকে মানুষের পাশে দাড়ানোর চেষ্টা করছি।
এদিকে বাঁশখালীতে বন্যায় এ পযর্ন্ত ৪ শিশু নিহত হয়েছে। এরমধ্যে শুক্রবার একদিনেই বাহারছড়াতে নিহত হয়েছে দুই শিশু। এরা সকলে বন্যার পানিতে ডুবে মারা যায়। শনিবার থেকে সেনাবাহিনীর মোতায়েন করা হলেও এখনো তারা পুরোদমে কার্যক্রম শুরু করেনি। তবে বাঁশখালীর বিভিন্ন স্পটে শনিবার দুপুর থেকেই সেনাবাহিনীর উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।
শফকত হোসাইন চাটগামী/এসএন