সরকার যেন ব্যবসায়ীদের প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়। কারণ, আমাদের এখন দরকার বিনিয়োগ। এই বিনিয়োগের জন্য যা যা করা দরকার সরকার তা করবে। এখানে শেষ পর্যন্ত মানুষের কাছে এই প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবে রূপান্তর হয় সেটাই হচ্ছে বড় প্রশ্ন। তাদের জীবনে স্বস্তি আনে কি না, চাকরি আসে কি না, বিনিয়োগ বাড়ে কি না, জানের নিরাপত্তা আসে কি না, সদিচ্ছা থাকে কি না, সেটাই দেখার বিষয়।...

এবারের বাজেট নতুন সরকারের প্রথম বাজেট। সেই দৃষ্টিভঙ্গিতে যদি আমরা দেখি, তাহলে বলতে হবে নিঃসন্দেহে এই বাজেটের মধ্যদিয়ে সরকার চেষ্টা করছে তাদের যে রাজনৈতিক দর্শন, আগামীর যে চিন্তাভাবনা এবং দেশটাকে কোথায় তারা নিয়ে যেতে চায়, এটা সামগ্রিকভাবে এই বাজেটের মধ্যদিয়ে পরিস্ফুটনের চেষ্টা করছে। নিঃসন্দেহে এটা একটা ভালো উদ্যোগ। যাতে জনগণ বুঝতে পারে এবং সবাই জানতে পারে যে, আসলে সরকার আগামী দিনগুলোতে কী করতে চায়, দেশকে কোথায় নিয়ে যেতে চায়। সরকার এই বাজেটের মধ্যে অনেক কিছু নিয়ে এসেছে।
সরকার যেহেতু বলছে এটা জনগণের বাজেট; কাজেই সব জনগোষ্ঠীকে তাদের যে আকাঙ্ক্ষা, তাদের যে ভবিষ্যতের চিন্তাভাবনা, সবাইকে তাদের একটা সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে আনার প্রচেষ্টা করেছে। যার জন্য দেখা যায়, এখানে বাজেটে মোটামুটিভাবে সব শ্রেণিপেশা থেকে আরম্ভ করে সব গোষ্ঠীর কথাই আছে। এটাই এই বাজেট বাস্তবায়নের দিক থেকে একটা চ্যালেঞ্জিং বাজেট হিসেবে মনে করা হচ্ছে। এই বাজেটকে যদি আমরা বাস্তবায়ন করতে চাই তাহলে কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে। প্রথম কথা হচ্ছে, এখানে অর্থায়নের সমস্যা আছে। বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অর্থায়নের আরেকটা বিষয় দেখা উচিত হবে–সেটা হচ্ছে বাজেটে যে অর্থ আমরা ব্যয় করছি, সেই অর্থ ব্যয়ের গুণমান রক্ষা করার ক্ষেত্রে আমরা কতটুকু সতর্ক হচ্ছি। যে অর্থটা আমাদের উন্নয়ন খাতে ব্যয় করছি বা বিভিন্ন সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে ব্যয় করছি, যেমন রাজস্ব ব্যয়, এটার গুণমান আমরা কতটুকু রক্ষা করতে পারছি। অপচয়-দুর্নীতি বাদ দিয়ে এটাকে যদি সত্যিকার অর্থে আমরা ব্যয় করতে পারি, তাহলে বাজেটকে আমরা অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারব। বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শুধু নয় বরং এর থেকে আমরা যে সুবিধাটা পেতে চাই সেগুলো অর্জনের ক্ষেত্রে একটা বড় ভূমিকা রাখবে।
আমরা বারবার বলি যে, আড়াই লাখ অর্থাৎ প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার যে ঘাটতির বাজেট পেশ হয়েছে, এটা ঘাটতির উৎস মানে বিভিন্ন দিক থেকে অভ্যন্তরীণ উৎস ও বৈদেশিক উৎস। এখন সরকার বড় আকারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে চাইছে। কিন্তু এত টাকা কোন খাতে এবং কীভাবে কাজে লাগাবে সে প্রশ্ন কিন্তু বারবার চলে আসে। এক সময় শুনতাম ছোটবেলায় যে, ঋণ করে ঘি খাওয়া যায়। এটা প্রবাদ বাক্য। সেই ঋণ করে ঘি খাওয়ার কালচারটা বাজেটে ধারাবাহিকভাবে হয়ে এসেছে। সেই সংস্কৃতি সরকারকে পেয়ে বসেছে। সেখান থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। খাদ্য-নিরাপত্তা, জ্বালানি-নিরাপত্তা এবং বিনিয়োগ-নিরাপত্তা সমানভাবে কাজ না করলে কোনো লক্ষ্যই সরকার বাস্তবায়ন করতে পারবে না। কল্যাণমূলক রাষ্ট্র তৈরি করতে সক্ষমতা উন্নয়নের বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। বাজেট যদি জনমুখী না হয় এবং সেই জিনিসগুলো আমরা মোকাবিলা করতে যদি বিভ্রান্ত হই, তাহলে আমাদের দুই বছরের সময়টা দুই যুগ কেটে গেলে ভালো ফল হবে না।
জ্বালানিতে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই বললেই চলে। নতুন একটা ধারণা এসেছে অর্থাৎ আমি এক জায়গায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করে গ্রিডে দেব কিন্তু আমি অন্য জায়গায় নেব। এতে সরকারের কোনো দায় থাকবে না। সরকারের সঙ্গে কোনো চুক্তি হবে না। সরকারের কোনো দায় নিতে হবে না। পুরোটাই প্রাইভেট; যিনি তৈরি করবেন উনি বিক্রি করবেন। হুইলিং চার্জ বলে একটা কথা আছে যে, বিদ্যুৎ আমি তৈরি করে গ্রিডে দেব সেটা ছিল ৩২ পয়সা প্রতি কিলোওয়াট। এখানে সরকারের কোনো বিনিয়োগ লাগবে না। সরকারের কোনো দায় লাগবে না। সরকারের কোনো ক্যাপাসিটি চার্জ লাগবে না। সেটাকে আতুর ঘরে মেরে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে। এজন্য শুরুতে বলেছিলাম যে, বাস্তবায়ন তো অর্থমন্ত্রী করবেন। তৃণমূলে যারা আছেন উনার থেকে শুরু করে সচিব পর্যন্ত সবাই করবেন। উনাদের চিন্তাভাবনা যদি পরিবর্তন না হয় তাহলে হবে না।
বাজেটে অনেক ভালো ভালো কথা আছে। এগুলাকে বাস্তবায়ন করতে হবে। আর যে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, এটা নিয়ে এ বছর চিন্তা না করলেও চলবে। এজন্য যারা সত্যি সত্যি শিল্প উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী, কিংবা লুটপাটকারী নয়, তাদের যদি আপনি সাধেনও তাও টাকা নেবে না। কারণ টাকা নিয়ে তা ফেরত দিতে পারবে না। আমার অবকাঠামো থাকতে হবে। বাজেটের যে ঘোষণাগুলো আছে সেগুলো যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে আমি আশাবাদী। এখন সবচেয়ে বড় যেটা সেটা হচ্ছে মূল্যস্ফীতির চাপ। কারণ বিগত প্রায় তিন বছরের বেশি সময় কিন্তু আমরা একটা উচ্চমূল্যস্ফীতির মধ্যে বসবাস করছি। এটা কিন্তু ওই নিচের যারা স্বল্প আয়ের জনগোষ্ঠী, দরিদ্র জনগোষ্ঠী তাদের কিন্তু একেবারে দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। কাজেই তাদের জন্য যেটা সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সেটা হচ্ছে, কীভাবে এই উচ্চমূল্যস্ফীতি থেকে তাদের কিছুটা স্বস্তি দেওয়া যায়।
ঋণ প্রবাহের ক্ষেত্রে ব্যাংকের যে প্রশ্নটা আসছে সেখানে যেন সরকার ব্যবসায়ীদের প্রতিপক্ষ হয়ে না দাঁড়ায়। দুই নম্বর হচ্ছে জ্বালানি নিরাপত্তার কথা যেটা এসেছে, সেখানে যেন সরকার ব্যবসা না করে। সরকার যদি নিজে ব্যবসা করে মুনাফা অর্জনের মাধ্যমে বাজেটের ঘাটতি কমায়, অর্থাৎ উচ্চাবিলাসী বাজেট বাস্তবায়নের জন্য যদি জ্বালানি সেক্টর এবং বিদ্যুৎ সেক্টরকে বেছে নেয়, তাহলে এই প্রত্যাশাটা হতাশায় রূপান্তরিত হবে। এখন যে জিনিস আমি দেশে উৎপাদন করি না, সেই জিনিসের ওপর যদি কর আরোপ করি, পক্ষান্তরে যদি বলি আমি ভর্তুকি দিচ্ছি, এটা কিন্তু সত্যিকারের ভর্তুকি নয়। আমরা এটা তুলে ধরব যে, যদি ভর্তুকি দেওয়া হয় সেটা যেন সত্যি হয়।
সরকার যেন ব্যবসায়ীদের প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়। কারণ, আমাদের এখন দরকার বিনিয়োগ। এই বিনিয়োগের জন্য যা যা করা দরকার সরকার তা করবে। এখানে শেষ পর্যন্ত মানুষের কাছে এই প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবে রূপান্তর হয় সেটাই হচ্ছে বড় প্রশ্ন। তাদের জীবনে স্বস্তি আনে কি না, চাকরি আসে কি না, বিনিয়োগ বাড়ে কি না, জানের নিরাপত্তা আসে কি না, সদিচ্ছা থাকে কি না এবং সরকার যে কথাটা বলেছে অর্থাৎ প্রতিটি ক্ষেত্রে সুশাসন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যে সক্ষমতা, সে বিষয়গুলো নিয়ে বারবার আলোচনা হয়েছে। কর কাঠামোকে আরও কার্যকর করার বিষয়টি আলোচনা হয়েছে। যাতে রাজস্ব আহরণের বিষয়টি আরও বাস্তবসম্মত হয়। কাজেই আমরা বলব, চ্যালেঞ্জ বড় কিন্তু সুযোগও বড়। এখন দেখার বিষয় এই বাজেট শুধু কাগজে-কলমে সীমিত থাকবে নাকি বাস্তবে আমাদের অর্থনীতিতে, সাধারণ মানুষের জীবনে, বিনিয়োগে–সামগ্রিকভাবে একটা পরিবর্তন বয়ে আনতে পারে কি না, সেটাই দেখার বিষয়।
লেখক: জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) উপদেষ্টা
