আনন্দনগর। দিনাজপুরের ছোট্ট একটি গ্রাম। চারদিকে ধানখেত, বাঁশঝাড়, কাঁচা রাস্তা আর পাখির ডাক। বর্ষা এলেই যেন গ্রামটা নতুন করে জন্ম নিত। সেই গ্রামেরই এক ছোট্ট মেয়ে আরু।
আরুর কাছে বৃষ্টি মানেই ছিল ছুটি, আনন্দ আর হাজারও গল্প। আকাশে কালো মেঘ জমলেই সে দৌড়ে উঠানে চলে আসত। প্রথম বৃষ্টির ফোঁটা পড়তেই মাটির যে ধুলোমাখা গন্ধ উঠত, আরু বলত, মাটি আজ হাসছে। প্রকৃতি আজ নতুনরূপে সজ্জিত হবে।
গ্রামের মাঝখানে ছিল এক পুরোনো কদমগাছ। আশ্চর্যের বিষয়, গ্রামের সবাই বলত এই গাছের নিচে দাঁড়িয়ে যদি মন থেকে কোনো স্বপ্ন বলা যায়, তবে বৃষ্টি সেই স্বপ্নকে আকাশে লিখে রাখে। কেউ বিশ্বাস করত, কেউ করত না। কিন্তু আরু প্রতি বর্ষাতেই সেখানে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলত, আমার শৈশব যেন কখনো হারিয়ে না যায়।
একদিন বিকেলে প্রবল বৃষ্টি নামল। চারদিকে শুধু টাপুরটুপুর শব্দ। আরু একা কদমগাছের নিচে দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎ সে দেখল, বৃষ্টির ফোঁটাগুলো যেন মাটিতে পড়ে ছোট ছোট গোল আয়নায় পরিণত হচ্ছে। প্রতিটি আয়নায় ভেসে উঠছে গ্রামের কারও না কারও হাসিমুখ, কেউ কাগজের নৌকা ভাসাচ্ছে, কেউ কাদায় ফুটবল খেলছে, কেউ দাদির মুখে রূপকথা শুনছে।
আরু সাহস করে একটি বৃষ্টির আয়নায় হাত রাখতেই সে যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য অন্য এক আনন্দনগরে পৌঁছে গেল। সেখানে সময় থেমে আছে। কোনো শিশু বড় হয় না, কোনো দাদু-দিদা বুড়ো হয় না, আর প্রতিটি বর্ষার দিন চিরকাল একই রকম আনন্দে ভরা।
সেই গ্রামের এক বৃদ্ধ দাদু আরুকে বললেন, শোনো মা, মানুষ বড় হলে শৈশব হারায় না। হারিয়ে যায় শুধু মনে রাখার অভ্যাস। তাই যতদিন তুমি বৃষ্টির শব্দ শুনে হাসতে পারবে, ততদিন তোমার ভেতরের শিশুটি বেঁচে থাকবে।
পরক্ষণেই এক ঝলক বিদ্যুৎ চমকালো। আরু চোখ খুলে দেখল, সে আবার কদমগাছের নিচেই দাঁড়িয়ে। হাতে একটি ছোট্ট কদম ফুল। অথচ আশপাশে কোথাও কদম ফুল ছিল না।
সেই দিন থেকে প্রতি বর্ষায় আরু গ্রামের ছোটদের নিয়ে কাগজের নৌকা বানাত, কাদায় পা ডুবিয়ে হাঁটত আর বৃষ্টির ফোঁটা গুনতে গুনতে নতুন গল্প বানিয়ে শোনাত। গ্রামের মানুষ অবাক হয়ে দেখত যেদিন আরু গল্প বলত, সেদিন আনন্দনগরের বৃষ্টি যেন একটু বেশি কোমল হয়ে নামত।
বহু বছর পর, আরু বড় হলো। শহরে চলে গেল, জীবনের ব্যস্ততাও বাড়ল। কিন্তু যখনই বর্ষার প্রথম বৃষ্টি নামত, তার জানালার কাচে একটি কদম ফুল এসে আটকে থাকত। কেউ জানত না সেটি কোথা থেকে আসে।
আরু তখন মৃদু হেসে বলত,
আনন্দনগর আমাকে ডাকছে।
আজও দিনাজপুরের আনন্দনগরে বর্ষার প্রথম বৃষ্টি নামলে গ্রামের বৃদ্ধরা বলেন, যদি মন দিয়ে শোনো, বৃষ্টির টাপুরটুপুর শব্দের ভেতর এক ছোট্ট মেয়ের হাসি ভেসে আসে। সে আর কেউ নয়,শৈশবকে হারাতে না দেওয়া সেই আরু, যে শিখিয়ে গেছে, বৃষ্টি শুধু আকাশ থেকে নামে না, বৃষ্টি নামে মানুষের স্মৃতির ভেতরেও।