দ্বিতীয়বারের মতো হজরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের দানবাক্সের টাকা প্রকাশ্যে গণনা সম্পন্ন হয়েছে। দ্বিতীয় দফার গত ১৯ দিনে মাজারের দানবাক্স ও ডেগগুলোতে মোট ৪৭ লাখ ১০ হাজার ১৫৩ টাকা জমা হয়েছে।
শনিবার (১১ জুলাই) সকাল সাড়ে ১১টার দিকে সিলেটের শাহজালাল (রহ.) মাজার প্রাঙ্গণে দিনভর গণনা শেষে মাজার ব্যবস্থাপনা কমিটি ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
গণনা শেষে সার্বিক তথ্য উপস্থাপন করেন সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী। এসময় উপস্থিত ছিলেন মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত উচ্চ কমিটির সদস্য ও সিলেট উন্নয়ন সংস্থার চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক পিংকি সাহা ও মাজার সংশ্লিষ্টরা।
গণনা শেষে সংশ্লিষ্ট কমিটির অফিশিয়াল হিসাবপত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৮ দিনে নগদ অর্থ পাওয়া গেছে ৪৭ লাখ ১০ হাজার ১৫৩ টাকা। দানবাক্সে প্রাপ্ত বিদেশি মুদ্রা ও অন্যান্য সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে সৌদি রিয়েল ১৩৫টি, ২০টি ইউএস ডলার, ২৫৩২ ভারতীয় রুপি, ২২টি কাতারি দেরহাম, ৬টি মালয়েশিয়ান রিংগিত, ২০টি হংকং ডলার, ২০টি ইউরোপিয় ইউনিয়নের ইউরো, ১ দিনার ৪৫০ পয়সা ওমানি দিনার। ৫৪ (৫৪.২) আমিরাতের দেহরাম, ইন্দোনেশিায়র রুপি ৪ হাজার, পাকিস্তানি ৬০ রুপি, ১০টি সিঙ্গাপুরি ডলার। নগদ টাকা ও বিদেশি মুদ্রার পাশাপাশি দানবাক্স থেকে মূল্যবান অলংকার ও ধাতু পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে: সোনা ৯ গ্রাম; স্বর্ণ-সদৃশ বস্তু ১০ গ্রাম এবং রূপা পাওয়া যায় ৩৯.৪ গ্রাম।
সর্বশেষ গণনার দিন থেকে আজ পর্যন্ত দানের গরু এসেছে ১টি। গরুটি লঙ্গরখানায় শিরনি রান্না করে বিতরণ করা হয়েছে। ছাগল পাওয়া গেছে ৬৫টি। তার মধ্যে ৪০টি লঙ্গরখানায় রান্না করে বিতরণ করা হয়েছে। অবশিষ্ট ২৫টি ছাগল বিক্রি করা হয়েছে যার মূল্য ১ লাখ ১৫ হাজার ৪০৩ টাকা।
প্রথমবার গণনার ১৯ দিনের ব্যবধানে শনিবার (১১ জুলাই) সকাল সাড়ে ১১টার দিকে সিলেটের শাহজালাল (রহ.) মাজার প্রাঙ্গণে দ্বিতীয়বারের মতো প্রকাশ্যে গণনা করা হচ্ছে এই মাজারের টাকা। এই গণনা কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছে শাহজালাল (রহ.) মাজার মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার সিলেট সার্কিট হাউসে অনুষ্ঠিত মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত উচ্চ কমিটির বৈঠকে দানবাক্সের টাকা দ্বিতীয় দফায় গণনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় শনিবার প্রকাশ্যে টাকা গণনার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এই কার্যক্রম শুরু করতে শনিবার সকাল ১০টার দিকে মাজারে আসেন মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত উচ্চ কমিটির সদস্য ও সিলেট উন্নয়ন সংস্থার চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, একই কমিটির সদস্য ও জেলা পরিষদ প্রশাসক আবুল কাহের চৌধুরী শামীম, ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক পিংকি সাহা ও সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মো. আব্দুল কুদ্দুছসহ মাজার সংশ্লিষ্টরা।
এবার বাক্স থেকে ৪ বস্তা টাকা পাওয়া গেছে। প্রথমবার গণনায় ১ হাজার ও পাঁচশ টাকার নোট বেশি পাওয়া গেলেও এবার সংখ্যার দিক থেকে লাল রংয়ের নোটের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি বলে দেখা যায়।
এর আগে গত ১২ জুন সিলেটের সাবেক জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরান (রহ.) এর মাজার পরিদর্শনে যান। মাত্র চারদিকে ওই সময় দানবাক্সে ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা পাওয়া যায়। টাকাগুলো জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে খোলা সিলেটের সোনালী ব্যাংকে রাখা হয়েছে।
উল্লেখ্য, মাজারের আয়-ব্যয়ের ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত ১২ জুন প্রথমবারের মতো উদ্যোগ নেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম। এর ধারাবাহিকতায় ১৮ জুন মাজার প্রাঙ্গণে নতুন চারটি দানবাক্স স্থাপন করা হয়। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত তিনটি ঐতিহাসিক দানের ডেগ এবং দানবাক্সগুলো সিলগালা করা হয়।
এ উদ্যোগকে ঘিরে দেশজুড়ে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। এর মধ্যেই গত ২১ জুন সারওয়ার আলমকে জেলা প্রশাসকের পদ থেকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়। পরদিন ২২ জুন তিনি মাজারের সিলগালা করা ডেগ ও দানবাক্স খুলে প্রকাশ্যে অর্থ গণনার ব্যবস্থা করেন। ওইদিন গণনা শেষে মোট ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা পাওয়া যায়। পরে অর্থগুলো সোনালী ব্যাংকে খোলা একটি নতুন হিসাবে জমা রাখা হয়।
পরবর্তীতে মাজারের আর্থিক কার্যক্রমে অধিকতর স্বচ্ছতা আনতে গত ২৬ জুন বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের উদ্যোগে ১১ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে এক মাসের মধ্যে মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার জন্য আধুনিক ও কার্যকর কাঠামোর সুপারিশ তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার সিলেট সার্কিট হাউসে অনুষ্ঠিত কমিটির বৈঠকে দানবাক্সের টাকা দ্বিতীয় দফায় গণনার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়।
শাকিলা ববি/এসএন