ইঞ্জিন বিকল হয়ে নিয়ন্ত্রণ হারানো এলপিজিবাহী জাহাজের সম্ভাব্য নিশ্চিত ধাক্কা-বিস্ফোরণ ও ভয়ানক বিপর্যয় ঠেকিয়ে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেলেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সহকারি হারবার মাস্টার ক্যাপ্টেন আসিফ আহমেদ। অসীম সাহসিকতা ও পেশাদারত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পাচ্ছেন জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) ২০২৬ সালের মর্যাদাপূর্ণ ‘লেটার অব কমেন্ডেশনস ফর এক্সেপশনাল ব্রেভারি অ্যাট সি’ পুরস্কার বা সম্মাননা। এরই মধ্যে আইএমও তাকে ওই পুরস্কারের জন্য মনোনীত করেছে, যা আগামি ১৪ ডিসেম্বর লন্ডনে সংস্থাটির সদর দপ্তরে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্যাপ্টেন আসিফের হাতে তুলে দেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ২০ জানুয়ারি চট্টগ্রামের কর্ণফুলী চ্যানেলে একটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অপারেশনের দায়িত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন আসিফ আহমেদ। ৫১৫ মেট্রিক টন প্রোপেন এবং ৪ হাজার ৫৭০ মেট্রিক টন বিউটেন গ্যাস বোঝাই ১৫৯ দশমিক ৯ মিটার দীর্ঘ লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী এলপিজি পরিবাহী জাহাজ ‘গ্যাস হারমোনি’কে ইউনাইটেড ট্যাংক টার্মিনাল জেটিতে ভেড়ানোর (বার্থিং) কাজ করছিলেন তিনি। কিন্তু হঠাৎ করেই কোনো পূর্ব সতর্কবার্তা ছাড়া বিশাল জাহাজটির ইঞ্জিন ও স্টিয়ারিং বিকল হয়ে যায়। প্রবল স্রোতের টানে মুহূর্তের মধ্যে জাহাজটি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে। এতে ধেয়ে আসছিল এক মহাবিপর্যয়। ইঞ্জিনের শক্তি হারিয়ে নিয়ন্ত্রণহীন জাহাজটি দ্রুতগতিতে পার্শ্ববর্তী ‘কাফকো অ্যামোনিয়া জেটির’ দিকে প্রবল বেগে ভেসে যেতে থাকে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, অত্যন্ত দাহ্য ও বিস্ফোরক পদার্থ বোঝাই এই জাহাজের সঙ্গে জেটির সংঘর্ষ হলে একটি ভয়াবহ ধারাবাহিক বিস্ফোরণ ঘটতে পারত। এর ফলে ব্যাপক প্রাণহানি, দীর্ঘ সময়ের জন্য চট্টগ্রাম শহরের বাসযোগ্যতা হারানোসহ বন্দরের স্পর্শকাতর স্থাপনার মারাত্মক ক্ষতি এবং দেশের প্রধান এই সামুদ্রিক প্রবেশপথ দীর্ঘমেয়াদে বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো জাতীয় বিপর্যয় নেমে আসতে পারত।
সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য ক্যাপ্টেন আসিফের হাতে সময় ছিল মাত্র কয়েক সেকেন্ড। এই চরম সংকট মুহূর্তে নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে তিনি অসীম সাহস ও নিখুঁত পেশাদারত্বের সঙ্গে জাহাজটির গতি রোধ করার জন্য জরুরি ভিত্তিতে দুটি নোঙর ফেলার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে ‘টেক্সটবুক ম্যানুভারিংয়ের’ বাইরে গিয়ে দুটি নোঙরকে ‘অ্যাসিমেট্রিক্যালি’ তুলে ফেলেন। তার এই দূরদর্শী ও নিখুঁত কৌশলের কারণে গতিশীল ও নিয়ন্ত্রণহীন জাহাজটির গতি থমকে দাঁড়ায়। ‘গ্যাস হারমোনি’ জেটি থেকে মাত্র ৫ ফুট দূরত্বে এসে কোনো ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই সম্পূর্ণ নিরাপদভাবে জাহাজটি থেমে যায়। এতে নিশ্চিত বড় ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। এ ঘটনার পর থেকে চট্টগ্রাম বন্দরসহ মেরিন খাতের সংশ্লিষ্টদের প্রসংশায় ভাসছেন ক্যাপ্টেন আসিফ। তার এই অনন্য সাধারণ মেধা, উদ্ভাবন, দৃঢ় মনোবল ও বীরত্ব ইতোমধ্যেই বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের শক্তিশালী ব্যবস্থাপনা ও বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও বেড়েছে বলে মনে করেন এই খাতের সংশ্লিষ্টরা।
আলমগীর হোসেন/রিফাত/