টানা ভারি বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের প্রভাবে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। উপজেলার ১৭টি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় অন্তত ১০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় উপজেলা প্রশাসন জরুরি ত্রাণ বিতরণ শুরু করেছে এবং সম্ভাব্য দুর্যোগ বিবেচনায় ৩৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
জলাবদ্ধতার কারণে মঙ্গলবার থেকে উপজেলার সব মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অর্ধবার্ষিক ও প্রাক-নির্বাচনি পরীক্ষা পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে।
শনিবার (১১ জুলাই) উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বাড়িঘর, উঠান, রান্নাঘর ও গ্রামীণ সড়ক পানিতে তলিয়ে রয়েছে। কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমরসমান পানি জমে থাকায় মানুষের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। অনেক পরিবার রান্না করতে না পেরে শুকনো খাবারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানির সংকটও দেখা দিয়েছে।
পটিয়া পৌরসভার রামকৃষ্ণ মিশন সড়ক, গোবিন্দারখীল, খলিলুর রহমান স্কুল অ্যান্ড কলেজ সড়কসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার কারণে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। অনেক বাড়ির নিচতলা পানিতে ডুবে যাওয়ায় বাসিন্দারা চরম দুর্ভোগে রয়েছেন। দোকানপাটে পানি ঢুকে পড়ায় ব্যবসা-বাণিজ্যেও স্থবিরতা নেমে এসেছে।
কেলিশহর, হাইদগাঁও, কচুয়াই, ধলঘাট, শোভনদণ্ডী, কুসুমপুরা, আশিয়া, কোলাগাঁও, জঙ্গলখাইন, ছনহরা ও ভাটিখাইনসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্লাবিত হয়েছে বীজতলা, সবজি ক্ষেত, পুকুর, মাছের ঘের ও বিভিন্ন খামার। এতে কৃষক ও মাছচাষীরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
তবে এই দুর্যোগের মধ্যেও বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে ভিন্ন এক দৃশ্য। প্লাবিত রাস্তাঘাট, খাল-বিল ও জলাশয়ে জাল নিয়ে মাছ ধরতে নেমেছেন স্থানীয়রা। কোথাও একা, কোথাও দলবেঁধে ছোট-বড় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ধরতে ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা। স্থানীয়দের ভাষ্য, বন্যার পানিতে পুকুর ও মাছের ঘের উপচে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ছড়িয়ে পড়ায় সহজেই মাছ ধরা যাচ্ছে। অনেকেই দীর্ঘদিন পর একসঙ্গে এত মাছ পেয়ে কিছুটা আনন্দ প্রকাশ করলেও, এর পেছনে মৎস্যচাষীদের বড় ধরনের ক্ষতির বিষয়টিও উঠে এসেছে।
দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল দিনমজুর, রিকশাচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও কৃষিশ্রমিকদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি। কয়েকদিন ধরে কাজ বন্ধ থাকায় অনেক পরিবার খাদ্যসংকটের মুখোমুখি হয়েছে।
পানিবন্দি রেহেনা বলেন, 'ঘুম থেকে উঠে দেখি পুরো ঘরে পানি। রান্না করার কোনো সুযোগ নেই। বাচ্চাদের নিয়ে শুকনো খাবার খেয়ে সময় কাটাচ্ছি। কখন পানি নামবে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় চিন্তা।'
ধলঘাট ইউনিয়নের বাসিন্দা রহিমা বেগম বলেন, 'প্রতিবছর পানি আসে, কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভয়াবহ। ছোট শিশু ও বয়স্ক মানুষ নিয়ে খুব কষ্টে আছি। বিশুদ্ধ পানিও পাওয়া যাচ্ছে না।'
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য বিতরণ করা প্রতিটি ত্রাণ প্যাকেটে এক কেজি চিড়া, আধা কেজি মুড়ি, এক প্যাকেট টোস্ট বিস্কুট, আধা কেজি গুড়, খাবার স্যালাইন, একটি লাইটার এবং এক ডজন মোমবাতি রাখা হয়েছে। ইউনিয়নভিত্তিক জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে এসব সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
পটিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারহানুর রহমান বলেন, টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। প্রাথমিকভাবে এক হাজার পানিবন্দি মানুষের জন্য শুকনো খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় পর্যায়ক্রমে আরও সহায়তা দেওয়া হবে।
তিনি জানান, উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৩৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। প্রয়োজন হলে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে দ্রুত সেখানে সরিয়ে নেওয়া হবে। প্রশাসনের বিভিন্ন টিম সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
কুসুমপুরা ইউনিয়ন পরিষদের দায়িত্বপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শওকত আকবর বলেন, 'ইউনিয়নের বহু পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। প্রশাসনের দেওয়া ত্রাণ ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। নতুন বরাদ্দ এলে দ্রুত তা পৌঁছে দেওয়া হবে। জলাবদ্ধতায় মাছের ঘের ও পুকুর তলিয়ে যাওয়ায় মৎস্যচাষীরা বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন।'
স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু অতিবৃষ্টিই নয়, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল-নালা ভরাট, পানি চলাচলের পথ সংকুচিত হওয়া এবং নালা-নর্দমার অপর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনাও জলাবদ্ধতাকে ভয়াবহ করে তুলেছে। তাদের মতে, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার কারণেই প্রতি বছর এমন দুর্ভোগ আরও প্রকট আকার ধারণ করছে।
রাফিউল আকরাম আলভী/এসএন