কক্সবাজারের চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলায় টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বিস্তীর্ণ এলাকা এখনো প্লাবিত। ফলে নিম্নাঞ্চলগুলোর লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
অনেক এলাকায় নলকূপ তলিয়ে যাওয়ায় দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট। গবাদিপশু ও সামান্য সহায়-সম্বল নিয়ে ঘরবাড়ি ছেড়ে অসংখ্য পরিবার আশ্রয় নিয়েছে উঁচু স্থান কিংবা ঘরের মাচায়। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অনেক এলাকায় নৌকাই এখন যাতায়াতের একমাত্র ভরসা।
বন্যার পানিতে গ্রামীণ সড়ক ও বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ায় বহু এলাকা কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। মাঠ-ঘাট তলিয়ে থাকায় গবাদিপশুর খাদ্য সংগ্রহ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে বানভাসি মানুষ নিজেদের খাবারের পাশাপাশি গৃহপালিত পশুপাখি নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় দিন পার করছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, শুধু অতিবৃষ্টিই এই ভয়াবহ রূপ নেয়নি বরং দীর্ঘদিন ধরে মাতামুহুরী নদী ও এর শাখা নদীগুলোর নাব্যতা হারানো, দখল এবং পানি চলাচলের পথ সংকুচিত হওয়াই এই স্থায়ী জলাবদ্ধতার অন্যতম প্রধান কারণ।
মায়ানমারের উত্তর আরাকান পর্বতমালায় উৎপত্তি হওয়া মাতামুহুরী নদীটি বান্দরবানের আলীকদম ও লামা উপজেলা হয়ে কক্সবাজারের চকরিয়া ও পেকুয়ার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য অনুযায়ী, নদীটির দৈর্ঘ্য প্রায় ২৮৭ কিলোমিটার এবং গড় প্রস্থ ১৫৪ মিটার। একসময় এই নদীটি ছিল দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি ও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ।
পেকুয়ার প্রবীণ বাসিন্দা মোহাম্মদ ইদ্রিস বলেন, একসময় মাতামুহুরী নদীপথে লামা ও আলীকদম পর্যন্ত নৌকায় যাতায়াত করেছি। তখন নদীর যে গভীরতা ও প্রশস্ততা ছিল, আজ তার কিছুই নেই। নদীর বড় একটি অংশ এখন দখল ও ভরাট হয়ে গেছে।
একই আক্ষেপ ঝরে পড়ল চকরিয়ার বেতুয়া বাজার এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা গিয়াসউদ্দিনের কণ্ঠে। তিনি বলেন, এই নদীতে একসময় বড় বড় সাম্পান, মালবোঝাই নৌকা ও ট্রলার চলত। এখন নদীটি যেন শুধু কাগজ-কলমেই আছে। আমার বাবা-দাদার সময়েও এমন ভয়াবহ বন্যা দেখিনি। যেভাবে নদী দখল ও ভরাট হচ্ছে, তাতে আগামী প্রজন্ম আরও বড় বিপদের মুখে পড়বে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর নদী ও এর শাখা নদীর বিভিন্ন অংশ দখল, ভরাট এবং অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পেকুয়ার বেতুয়া বাজার ও আমান্নরচরসহ বিভিন্ন এলাকায় নদীর অংশ ভরাট করে গড়ে উঠেছে বসতবাড়ি, দোকানপাট, মাছের ঘের ও কৃষিজমি। এছাড়া বালু উত্তোলনের ইজারা নিয়ে অনেক জায়গায় নদীর প্রস্থ কমিয়ে স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে।
পাশাপাশি, মাতামুহুরী নদী ও এর শাখা নদীর ওপর নির্মিত রাবারড্যাম এবং দীর্ঘদিন ড্রেজিং না করায় তলদেশে পলি জমে নদী ভরাট হয়ে গেছে। ফলে বৃষ্টির পানি দ্রুত সাগরে নামতে না পেরে লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে।
জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার পেছনে স্লুইস গেটের অব্যবস্থাপনাকেও দায়ী করছেন ভুক্তভোগীরা। অভিযোগ রয়েছে, কিছু স্লুইসগেট ইজারা নিয়ে স্থানীয় প্রভাবশালীরা মাছ চাষ করছেন। ফলে বন্যা দেখা দিলেও সময়মতো পানি নিষ্কাশনের গেটগুলো খোলা হয় না।
পরিবেশবিদদের মতে, মাতামুহুরী নদী ও এর শাখা নদীগুলোর নাব্যতা পুনরুদ্ধার, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, নিয়মিত ড্রেজিং এবং স্লুইসগেটের কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না গেলে প্রতিবছরই চকরিয়া-পেকুয়া অঞ্চলে বন্যার তীব্রতা বাড়বে। নদীকে তার স্বাভাবিক প্রবাহে ফিরিয়ে দেওয়া না গেলে শুধু নদী নয় এর তীরবর্তী জনপদ, কৃষি, মৎস্যসম্পদ এবং লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা দীর্ঘমেয়াদি সংকটের মুখে পড়বে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবু রায়হান বলেন, মাতামুহুরী নদী এবং এর সঙ্গে সংযুক্ত শাখা নদীগুলো খননের জন্য একটি প্রকল্প প্রস্তাব প্রস্তুতের কাজ চলছে। আগামী মাসের মধ্যেই প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
নদীর তীরে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ধরনের অভিযান সফলভাবে পরিচালনায় রাজনৈতিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সহযোগিতা পাওয়া গেলে অবৈধ দখল ও স্থাপনা উচ্ছেদে পানি উন্নয়ন বোর্ড আরও কার্যকরভাবে পদক্ষেপ নিতে পারবে।
মাতামুহুরী নদীর নব্যতা সংকট দূর করতে এবং স্থানীয় মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে দ্রুত নদীটি খনন (ড্রেজিং) করা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীন দেলোয়ার।
তিনি বলেন, মাতামুহুরী নদীটি খনন করা হলে এলাকার অর্থনৈতিক চিত্র বদলে যাবে। দীর্ঘদিনের পলি জমে নদীটি ভরাট হয়ে যাওয়ায় বর্ষায় বন্যা আর শুষ্ক মৌসুমে তীব্র পানির সংকট দেখা দেয়। নদীটি খনন করা এখনকার সময়ের দাবি, কারণ এর সাথে এই অঞ্চলের লক্ষ লক্ষ মানুষের ভাগ্য ও জীবিকা জড়িত। এটি সম্পন্ন হলে স্থানীয় মানুষ ব্যাপকভাবে উপকৃত হবে।
রকিবুল হাসান/আজহার/