একসময় উত্তরবঙ্গের অন্যতম বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান ছিল সিরাজগঞ্জের রায়পুরের জাতীয় জুট মিল। এ মিলকে ঘিরে কয়েক হাজার নারী-পুরুষের কর্মসংস্থান হয়েছিল। জেলার অর্থনীতিরও অন্যতম কেন্দ্র ছিল এটি। কিন্তু নানা অব্যবস্থাপনার কারণে বিগত সরকারের সময়ে মিলটি বন্ধ হয়ে যায়।
দীর্ঘদিন ধরে তালাবদ্ধ থাকায় কোটি কোটি টাকার মেশিন ও যন্ত্রপাতি নষ্ট হচ্ছে। সেই সঙ্গে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন মিলটির হাজারও দক্ষ শ্রমিক।
উৎপাদন বন্ধ থাকলেও ব্যয় থেমে নেই। জাতীয় জুট মিলের নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রশাসনিক কার্যক্রম চালাতে সরকারের প্রতি মাসে প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ লাখ টাকা খরচ হচ্ছে। বছরে এই ব্যয় দাঁড়াচ্ছে ৮ কোটিরও বেশি। অথচ উৎপাদন থেকে সরকারের কোনো আয় নেই।
মিলটি চালুর দাবিতে বিভিন্ন সময় আন্দোলন করে আসছেন শ্রমিক, কৃষক, ব্যবসায়ী ও নাগরিক সমাজ। স্থানীয়রা বলছেন, কয়েক বছর ধরে বন্ধ থাকা জাতীয় জুট মিলের সঙ্গে হাজারও পরিবারের জীবন-জীবিকা জড়িত। তাদের প্রশ্ন, নতুন লিজের মাধ্যমে আবার কি উৎপাদনের চাকা ঘুরবে, নাকি কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি মরিচা ধরেই পড়ে থাকবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ১৯৬০ সালে সিরাজগঞ্জ পৌরসভার রায়পুর এলাকায় প্রায় ৭৫ একর জমির ওপর নর্দান পিপলস জুট মিল প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বাধীনতার পর জাতীয়করণের মাধ্যমে এর নাম হয় কওমি জুট মিল। পরে নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় জাতীয় জুট মিল। একসময় প্রতি মাসে ৫০ থেকে ৬০ টন পাট সংগ্রহ করে বিভিন্ন ধরনের পাটজাত পণ্য উৎপাদন হতো এখানে। দেশীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি করা হতো।
দীর্ঘদিন লাভজনকভাবে চললেও দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও আর্থিক সংকটে ২০০৭ সালে প্রথমবার উৎপাদন বন্ধ হয়। শ্রমিকদের আন্দোলনের মুখে ২০১১ সালে আবার চালু হলেও সংকট কাটেনি। পরে ২০২০ সালের ১ জুন লোকসান, ঋণের বোঝা ও কাঁচামাল সংকটের অজুহাতে আবার উৎপাদন বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ২০২২ সালে কুষ্টিয়ার রশিদ গ্রুপ ২০ বছরের জন্য মিলটি লিজ নিয়ে উৎপাদন শুরু করলেও শ্রমিকদের বেতন-ভাতা ও বোনাস বকেয়া রেখেই ২০২৪ সালে কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়।
জাতীয় জুট মিল সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে উৎপাদন বন্ধ থাকলেও মিলটির নিরাপত্তা, যন্ত্রপাতি সংরক্ষণ ও প্রশাসনিক কাজের জন্য ১৮৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের বেতন-ভাতা, বিদ্যুৎ বিল ও অন্যান্য প্রশাসনিক ব্যয় মিলিয়ে প্রতি মাসে সরকারের খরচ হচ্ছে প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ লাখ টাকা।
জুট মিলের শ্রমিক আসলাম উদ্দিন বলেন, ‘মিল চালু থাকার সময় প্রতি মাসে ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা আয় করতেন। বর্তমানে বেকার অবস্থায় দিন পার করছি। ভালো কাজকর্ম না থাকায় সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। আমার মতো অন্য শ্রমিকদেরও একই অবস্থা।’
আরেক শ্রমিক লিটন শেখ বলেন, ‘একসময় জুট মিলের মাসিক বেতন দিয়ে আমার পুরো সংসার চলত। কিন্তু মিলটি বন্ধ হয়ে যাওয়াতে চরম সংকটের মধ্যে পড়ে গিয়েছি।’ মিলটি আবার চালুর দাবি জানান তিনি।
সিরাজগঞ্জ জেলা শ্রমিক দলের (ভারপ্রাপ্ত) সভাপতি বিশা শেখ বলেন, ‘জাতীয় জুট মিল শুধু একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি জেলার অর্থনীতি, পাটচাষি ও হাজারও শ্রমিকের জীবিকার সঙ্গে জড়িত। এই সরকার জুট মিলটি চালু পুনরায় চালু করলে এ অঞ্চলের অনেক বেকার মানুষের কর্মসংস্থান হবে। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব পাটপণ্যের উৎপাদনও বৃদ্ধি পাবে।’
সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রেসিডেন্ট সাইদুর রহমান বাচ্চু বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে মিলটি বন্ধ থাকায় শুধু হাজারও শ্রমিকই কর্মহীন হননি, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন পাটচাষি, ব্যবসায়ী, পরিবহন খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং স্থানীয় অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল অসংখ্য মানুষ। তাই সরকারের উচিত, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে জাতীয় জুট মিল পুনরায় চালু করা।’
জাতীয় জুট মিলের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন জানান, মিলটি বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) অধীনে রয়েছে। বর্তমানে ১৮৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলটির দেখভালের দায়িত্বে রয়েছেন। তাদের বেতন, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য খাতে প্রতি মাসে প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে। তবে নতুন করে লিজ দেওয়ার উদ্যোগ চলছে। উপযুক্ত বিনিয়োগকারী পাওয়া গেলে পুনরায় উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হবে।