যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি হামলার পর আবারও অনিশ্চয়তায় পড়েছে শান্তি আলোচনা। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একদিকে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) কার্যত শেষ বলে মন্তব্য করেছেন, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বলছেন, তেহরানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি এখনো বহাল রয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, আলোচনা আদৌ আবার শুরু হবে কি না।
যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা আল-জাজিরাকে জানিয়েছেন, চলতি সপ্তাহে দুই দিন ধরে ইরানের ওপর হামলা চালালেও ওয়াশিংটন এখনো তেহরানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে চায়। দীর্ঘমেয়াদি শান্তিচুক্তির লক্ষ্যে কারিগরি পর্যায়ের আলোচনাও (টেকনিক্যাল টকস) অব্যাহত থাকবে বলে তিনি জানান। তবে ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলা চলতে থাকলে তারা কোনো আলোচনায় বসবে না।
গত সপ্তাহে মঙ্গলবার রাত থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একে অপরের ওপর পাল্টাপাল্টি হামলা চালায়। এতে দুই দেশের মধ্যে ব্যাপক উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। গত ১৭ জুন স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) আওতায় ৬০ দিনের যে আলোচনা পর্ব শুরু হয়েছিল, এই সংঘাত নতুন করে তা অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে।
হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজগুলো ইরানের অনুমোদিত পথ অনুসরণ না করায় ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) তাদের ওপর হামলা চালায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গলবার রাত ও বুধবার সকালে যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে ইরানের ৮৫টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়।
এর জবাবে বুধবার উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা ও অবকাঠামোয় হামলা চালায় ইরান। এরপর বুধবার রাত ও বৃহস্পতিবার আবারও ইরানের ৯০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। হামলার লক্ষ্য ছিল দেশটির দক্ষিণ উপকূল ও পূর্বাঞ্চল। ইরানের দাবি, এসব হামলায় বেসামরিক অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে মাত্র তিন সপ্তাহ আগে হওয়া যুদ্ধবিরতির সমঝোতা আরও দুর্বল হয়ে পড়ে।
বুধবার (৮ জুলাই) তুরস্কের আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি জানান, তার ধারণা সমঝোতা স্মারকটি শেষ হয়ে গেছে। এতে যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। তবে একই সঙ্গে তিনি জানান, আপাতত শান্তি আলোচনা চালিয়ে যেতে দেবেন। যদিও তার মতে, এই আলোচনা সময় নষ্ট ছাড়া আর কিছু নয়। এ সময় তিনি ক্ষুব্ধ ভাষায় ইরানের নেতৃত্বকে ‘নিকৃষ্ট’ বলে অভিহিত করেন।
তবে একই দিন ট্রাম্প আবার বলেন, মার্কিন আলোচকরা চাইলে ইরানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে পারবেন। তিনি বলেন, ‘আমি আর সময় নষ্ট করতে চাই না। তবে আমাদের আলোচকরা চাইলে কথা চালিয়ে যেতে পারেন।’
অন্যদিকে ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হামলাকে ‘যুদ্ধাপরাধ’ বলে নিন্দা জানিয়েছে। তেহরানের অভিযোগ, সব ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতির যে শর্ত ছিল, যুক্তরাষ্ট্র তা ভেঙেছে। এ ঘটনায় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ও জাতিসংঘের মহাসচিবের কাছেও আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দিয়েছে ইরান।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এক্সে লেখেন, ‘আমেরিকা এখনো শেখেনি যে ভয় দেখানো আর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গেরও মূল্য আছে। আঘাত করলে পাল্টা আঘাত পাবে।’
তবে কয়েকজন বিশ্লেষক মনে করেন, আলোচনা পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। ওয়াশিংটনভিত্তিক মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক অ্যালেক্স ভাতাঙ্কা বলেন, ‘আলোচনায় ফেরার সম্ভাবনাই বেশি। তবে কূটনীতি মানেই শান্তি নয়।’ তার মতে, তেহরান এখন আলোচনা ও সীমিত সামরিক চাপ–দুটিকেই একই সঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার পথ হিসেবে দেখছে।
গত ১৭ জুন স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়। এতে হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ জাহাজ চলাচল, ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা এবং লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান বন্ধ রাখার বিষয়টি ছিল।
কিন্তু এখন দুই দেশই একে অপরের বিরুদ্ধে সেই চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগ করছে। ইরানের দাবি–যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা শুরু করেছে এবং লেবাননে ইসরায়েলের হামলা বন্ধ করেনি। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখতে ব্যর্থ হয়েছে এবং একাধিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সমঝোতা স্মারকের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা এর অস্পষ্ট ভাষা। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে কোন পথে জাহাজ চলবে, নিরাপত্তার দায়িত্ব কীভাবে ভাগ হবে এবং লেবাননের যুদ্ধবিরতি কীভাবে কার্যকর হবে? এসব বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। আর সেই অস্পষ্টতাই এখন দুই দেশের বিরোধের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তাদের মতে, এই মুহূর্তে তেহরান বা ওয়াশিংটন কোনো পক্ষই আরেকটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ চায় না। তবে মাঠের উত্তেজনা কমাতে না পারলে আলোচনার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিতই থেকে যাবে। সূত্র: আল-জাজিরা