নকশা জটিলতায় নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার চার বছরের মধ্যে বড় ধরনের জটিলতায় পড়েছে কচুয়া-বেতাগী সেতু প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের তথ্যের সঙ্গে মিলছে না বাস্তবতা। তাই একাধিকবার নকশা পরিবর্তন করা হয়েছে। বেড়েছে সময় ও ব্যয়, যা প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতিকে ধীর করে দিয়েছে। পরিবহন অডিটের তথ্য বলছে, যথাযথ সম্ভাব্যতা যাচাই না করার কারণে সরকারের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৯৯ কোটি ২৬ লাখ ১৫ হাজার ৪০৭ টাকা।
১ হাজার ৪২ কোটি টাকা ব্যয়ে ১ হাজার ৬৯০ মিটার দীর্ঘ এই সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০২২ সালে। এ বছরের মে মাস পর্যন্ত এই প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতির হার মাত্র ২৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ।
বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভূমিকম্প ঝুঁকি মূল্যায়নে প্রাথমিক সমীক্ষার তথ্য বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে মিলছে না। তাই সেতু কতটা দুর্যোগ সহনশীল সেই স্থায়িত্ব পুনরায় নিরীক্ষা করতে হচ্ছে। নদীর গতিপথ এবং মাটির গুণাগুণ পরিবর্তনের কারণে প্রকল্পের নকশায় আবারও পরিবর্তন আনতে হচ্ছে। এর ফলে বাড়ছে খরচ।
নতুন মূল নকশা পাস হয়নি
এই প্রকল্পের মূল বাধা বা বড় চিন্তার কারণ হলো মূল সেতুর নতুন নকশা এখনো পাস হয়নি। এ পর্যায়ে নকশা চূড়ান্ত না হওয়ায় সেতুর কাজ (সুপার স্ট্রাকচার) এক চুলও এগোতে পারছে না। সড়ক তৈরির একদম প্রাথমিক পর্যায়ের মাটি ভরাট থেকে শুরু করে ওপরের পিচ ঢালাই পর্যন্ত কোনো কাজই শুরু করা যায়নি। ফলে সংযোগ সড়কটির কোনো অস্তিত্বই এখনো তৈরি হয়নি। নদীর পাড় বাঁধানোর জন্য যে ১ হাজার মিটার দীর্ঘ বাঁধ তৈরির কথা ছিল, সেটিও থেমে আছে। টোল সংগ্রহের জন্য যে অবকাঠামো তৈরির কথা ছিল, সেটির কাজও শুরু হয়নি।
প্রকল্পের ওয়ার্কিং পাইলের অগ্রগতি ৬৯ দশমিক ২৩ শতাংশ এবং পাইল ক্যাপের কাজ ৬২ দশমিক ৫ শতাংশে আটকে আছে। সাব-স্ট্রাকচার পর্যায়ের এই ধীরগতির কারণে সুপার-স্ট্রাকচারের কাজ শুরু করতে দেরি হচ্ছে।
পটুয়াখালী প্রান্তে সেতুর যে মূল ভিত্তি বা ‘পাইল ক্যাপ’ (যার ওপর সেতুর পুরো ভার থাকে) তৈরি হওয়ার কথা ছিল, তার অর্ধেক কাজ এখনো বাকি। এ ছাড়া সেতুর দুই প্রান্তের দেয়ালের কাজও এখনো শেষ হয়নি।
প্রকল্প পরিচালক মো. তোফাজ্জল হোসেনও এই দায় স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, ঠিকাদারের নকশা প্রণয়ন ও জমা দিতে দেরি হওয়ার কারণেই মূল কাজে বিলম্ব ঘটছে। কাজের গতি বজায় রাখতে ভায়াডাক্ট অংশের নকশা অনুমোদন দিয়ে নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এখন মূল সেতুর নকশা দ্রুত অনুমোদনের জন্য দপ্তর থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, মূল সেতু ও সংযোগ অবকাঠামোর কাজ শুরু না হওয়ায় প্রকল্পের গতি অত্যন্ত ধীর। তাই মূল সেতুর নকশা দ্রুত চূড়ান্ত করা, সাব-স্ট্রাকচার কাজের গতি বাড়ানো এবং সুপার স্ট্রাকচারের কাজ শুরু করতে সমন্বিত কারিগরি ও ব্যবস্থাপনাগত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।
এই সেতু প্রকল্পের নকশা মূল্যায়ন ও নির্মাণ তদারকির জন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ প্রক্রিয়া চলছে। এই প্রকল্পের জন্য জমা দেওয়া কারিগরি প্রস্তাবগুলো মূল্যায়ন করেছে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের সাত সদস্যের একটি কমিটি। প্রকল্প অফিস জানিয়েছে, তাদের মূল্যায়নে তিনটি কনসোর্টিয়াম এগিয়ে রয়েছে। এগুলো হলো কুনহোয়া (কোরিয়া) ও ইন্টারকন্টিনেন্টাল (ভারত) জোট; রেন্ডেল লিমিটেড (যুক্তরাজ্য) ও দেশীয় জোট; এইউকম (হংকং) ও বিসিএল অ্যাসোসিয়েটস। তাদের মধ্যে যেকোনো একটি কনসোর্টিয়ামের কাছে এখন মূল দায়িত্ব অর্পণ করা হবে।
বাজেট বাস্তবায়নে মন্থরতা
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মোট ১ হাজার ৪২ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ের বিপরীতে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ক্রমপুঞ্জিত আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ১৮৩ কোটি টাকা। প্রকল্পের আর্থিক ও ভৌত অগ্রগতির পর্যালোচনায় দেখা যায়, রাজস্ব খাতে ৬০ কোটি টাকার বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ১২ কোটি টাকা। এই খাতে বেতন-ভাতা ও অফিস ভাড়ার মতো নিয়মিত খরচে অগ্রগতি থাকলেও বৈদেশিক প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা সেবা ও অডিও-ভিডিও নির্মাণের মতো খাতে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যয়ই হয়নি।
অন্যদিকে মূলধন খাতে ৯৫১ কোটি টাকার বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ১৭১ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ১৭ দশমিক ৯৯ শতাংশ। এটি প্রকল্পের মূল কাজের ধীরগতির একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সেতু (ভায়াডাক্টসহ) খাতে মোট ব্যয়ের প্রায় ৭২ দশমিক ২৪ শতাংশ সংস্থান থাকলেও এর অগ্রগতি মাত্র ১০ দশমিক ৯৯ শতাংশ। এ ছাড়া সংযোগ সড়ক ও অন্য নির্মাণকাজের কোনো অগ্রগতিই হয়নি। নদী শাসন কাজের অগ্রগতিও সন্তোষজনক নয়, যা দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৬ শতাংশ।
তবে প্রকল্পের একটি ইতিবাচক দিক হলো ভূমি অধিগ্রহণ খাত। এই খাতে প্রায় শতভাগ অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। এ ছাড়া প্রকল্পের নকশা পরিবর্তন ও শ্রমসংক্রান্ত জরুরি তহবিল থেকে এখন পর্যন্ত কোনো অর্থ ব্যয় হয়নি।
এর আগে প্রকল্পের এডিবি বরাদ্দের চিত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, মোট ৩৯০ কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ২৩৮ কোটি টাকা অর্থছাড় হয়েছে, যার মধ্যে ব্যয় হয়েছে ২০৬ কোটি টাকা। প্রকল্প শুরুর প্রারম্ভিক পর্যায়ে (২০১৯-২০) কোনো বরাদ্দ ও ব্যয় না থাকায় কার্যক্রম শুরুতেই বাধার সম্মুখীন হয়েছিল। চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত প্রকল্পের তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট বরাদ্দের বিপরীতে ৩৬ দশমিক ৭৯ শতাংশ অর্থ ছাড় হয়েছে এবং ৩৬ দশমিক ৪৫ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয়েছে।
১১৫ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম
২০২২-২৩ এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে নানা অনিয়মে এই প্রকল্পে ১১৫ কোটি টাকারও বেশি আর্থিক অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে পরিবহন অডিটের প্রতিবেদনে।
২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রাক্কলন ছাড়াই অগ্রিম ফান্ড ট্রান্সফারের মাধ্যমে ১১ কোটিরও বেশি টাকা অনিয়মিত ব্যয়ের তথ্য উঠে এসেছে অডিট প্রতিবেদনে। সেই অর্থবছরে পরিবহন অডিটে ধরা পড়ে আরও বড় অনিয়ম। যথাযথ সম্ভাব্যতা যাচাই না করার কারণে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয় ৯৯ কোটি ২৬ লাখ টাকা। প্রকল্পের বাজেট থেকে পরামর্শককে কিছু টাকা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আয়কর কাটার সময় ভুলবশত নিয়মের চেয়ে বেশি টাকা কেটে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে। এতে সরকারের ৪ লাখ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে। সেই টাকার হিসাব মেলাতে গিয়ে প্রকল্প কর্মকর্তারা আরেক বিপত্তি বাধিয়েছেন। ঠিকাদারের দায়বদ্ধতা ছিল তার বিল থেকে ভ্যাট ও আয়কর প্রদান করা। কিন্তু কর্তৃপক্ষ ঠিকাদারকে পুরো টাকা দিয়ে দেওয়ায় পরে সরকারি কোষাগারে সেই ভ্যাট ও আয়কর আবারও প্রকল্পের টাকা থেকে শোধ করতে হয়েছে। এতে করে প্রকল্পের বাজেটের ১৯ লাখ টাকা গচ্চা গেছে। ওই অর্থবছরে ভূমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত মামলায় ৩ কোটি ৪৯ লাখ টাকা অনিয়মিতভাবে পরিশোধ করা হয়েছে।
সেতু নির্মাণের একটি প্যাকেজে দুটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ২০২১ সালের জুনে চুক্তি হলেও মূল ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি হয় ২০২২ সালের মার্চে। এই ৯ মাসের ব্যবধানে কোনো নির্মাণকাজ হয়নি। তা সত্ত্বেও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান দুটি বিলের মাধ্যমে প্রায় ৩৮ কোটি টাকার বেশি অর্থ গ্রহণ করেছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। এ সময় পরামর্শক প্রতিষ্ঠান দরপত্র প্রক্রিয়া ও প্রশাসনিক কাজে যুক্ত হলেও নির্মাণকাজে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।