ফুটবল ইতিহাসে এমন কিছু দল আছে, যাদের নাম শুনলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে শিল্প, শৃঙ্খলা আর সৌন্দর্যের এক অপূর্ব মিশেল। স্পেন সেই বিরল দলগুলোর একটি। কখনো বল দখলের মোহময় জাদু, কখনো নিখুঁত পাসিং, কখনো আবার ধৈর্য আর কৌশলের অনন্য সমন্বয়ে বিশ্ব ফুটবলে নিজেদের আলাদা পরিচয় গড়ে তুলেছে ‘লা রোজা’। তবে এই গৌরবের গল্প একদিনে তৈরি হয়নি। দীর্ঘ অপেক্ষা, অসংখ্য ব্যর্থতা এবং বারবার ঘুরে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়েই বিশ্বচ্যাম্পিয়নের আসনে পৌঁছেছিল তারা। আর ২০২৬ বিশ্বকাপে সেই সিংহাসন পুনরুদ্ধারের স্বপ্ন যেন আবারও বাস্তবের খুব কাছে এসে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্বকাপের প্রথম দিকের ইতিহাসে স্পেন ছিল অনিয়মিত এক অংশগ্রহণকারী। প্রথম ৯টি বিশ্বকাপের মধ্যে মাত্র চারটিতে জায়গা করে নিতে পেরেছিল ইউরোপের এই পরাশক্তি। কখনো বাছাইপর্বের কঠিন বাধা, কখনো আন্তর্জাতিক ফুটবলের প্রতিযোগিতা– সব মিলিয়ে বিশ্বকাপের মঞ্চে তাদের উপস্থিতি ছিল অনিয়মিত।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলাতে থাকে ছবিটা। ১৯৭৮ সালের আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ থেকে শুরু হয় নতুন এক অধ্যায়। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। প্রতিটি বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বেই জায়গা করে নিয়েছে স্পেন। ধারাবাহিকতার এই নজির ইউরোপের খুব কম দলই দেখাতে পেরেছে।
তবে নিয়মিত বিশ্বকাপ খেললেও সাফল্য সব সময় ধরা দেয়নি। কোনো আসরে গ্রুপ পর্বেই বিদায়, কোনোবার দ্বিতীয় রাউন্ড, আবার কখনো কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত গিয়েও থেমে যেতে হয়েছে। প্রতিভার অভাব ছিল না, কিন্তু বড় মঞ্চে শেষ বাধা পেরোনোর মানসিক দৃঢ়তা যেন বারবার অধরা থেকে যাচ্ছিল।
অবশেষে আসে ২০১০ সাল- স্প্যানিশ ফুটবলের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় বছর। দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে বিশ্বকাপের শুরুটা ছিল হোঁচট খেয়ে। প্রথম ম্যাচেই সুইজারল্যান্ডের কাছে পরাজয়। অনেকেই ভেবেছিলেন, হয়তো আবারও ব্যর্থতার গল্প লেখা হবে। কিন্তু সেই হারই যেন দলটিকে আরও শক্ত করে তোলে।
ইকার ক্যাসিয়াসের নিরাপদ হাতে গোলপোস্ট, কার্লেস পুয়োল ও জেরার্ড পিকের দুর্ভেদ্য রক্ষণ, মাঝমাঠে জাভি হার্নান্দেজ, আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা ও সার্জিও বুসকেতসের অসাধারণ পাসিং নৈপুণ্য, আর সামনে ডেভিড ভিয়ার গোল করার সহজাত ক্ষমতা–সব মিলিয়ে বিশ্বের অন্যতম সেরা দল হয়ে ওঠে স্পেন।
সেই বিশ্বকাপের ফাইনালে নেদারল্যান্ডসকে অতিরিক্ত সময়ে ১-০ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের ট্রফি উঁচিয়ে ধরে ‘লা রোজারা’। আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার সেই ঐতিহাসিক গোল শুধু একটি ম্যাচের ভাগ্য বদলায়নি, বদলে দিয়েছিল স্প্যানিশ ফুটবলের ইতিহাসও। ইউরো ২০০৮, বিশ্বকাপ ২০১০ এবং ইউরো ২০১২-টানা তিনটি বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা জিতে ফুটবল ইতিহাসে অন্যতম সেরা দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে স্পেন।
কিন্তু শিখরের পরই নেমে আসে অন্ধকার। ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপে শিরোপাধারী স্পেনকে দেখা যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপে। নেদারল্যান্ডসের কাছে ৫-১ গোলের বিধ্বংসী হার এবং চিলির বিপক্ষে পরাজয়ের পর গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয় তাদের। আধিপত্যের যুগের যেন আকস্মিক সমাপ্তি ঘটে।
পরবর্তী দুই বিশ্বকাপেও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসেনি। ২০১৮ সালে রাশিয়ায় এবং ২০২২ সালে কাতারে দ্বিতীয় রাউন্ড থেকেই বিদায় নেয় স্পেন। প্রতিভাবান ফুটবলার ছিল, বল দখলের আধিপত্যও ছিল কিন্তু নকআউটের কঠিন পরীক্ষায় শেষ পর্যন্ত টিকে থাকা সম্ভব হয়নি।
তবে সেই ব্যর্থতাই ছিল নতুন শুরুর ভিত্তি। অভিজ্ঞতার সঙ্গে তরুণদের মিশেলে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে নতুন স্পেন। গতি, সৃজনশীলতা, উচ্চ প্রেসিং এবং আক্রমণাত্মক ফুটবলের সমন্বয়ে তারা আবারও হয়ে উঠেছে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম ভয়ংকর দল।
২০২৬ বিশ্বকাপে সেই পরিবর্তনের পূর্ণ প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। একের পর এক শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে পরাজিত করে স্পেন ইতোমধ্যেই জায়গা করে নিয়েছে সেমিফাইনালে। তাদের ফুটবলে আবারও ফিরে এসেছে আত্মবিশ্বাস, ছন্দ এবং চ্যাম্পিয়নদের মানসিকতা। প্রতিটি ম্যাচেই তারা দেখিয়েছে, ২০১০ সালের গৌরব কেবল অতীতের স্মৃতি নয়–সেটি আবারও বর্তমান হওয়ার অপেক্ষায়।
এখন স্পেনের সামনে মাত্র দুটি ম্যাচ। দুটি জয়ই তাদের পৌঁছে দিতে পারে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপার স্বর্ণমুকুটে। ২০১০ সালের পর দীর্ঘ ১৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আবারও বিশ্বের সেরা হওয়ার সুযোগ দাঁড়িয়ে আছে হাতের নাগালে।
ফুটবলে ইতিহাস কখনো স্থির থাকে না। এক সময় যারা বিশ্ব শাসন করে, তাদেরও পতন ঘটে। আবার যারা পতনের গভীরে হারিয়ে যায়, তারাই একদিন নতুন আলোয় ফিরে আসে। স্পেনের বর্তমান যাত্রা যেন সেই চিরন্তন সত্যেরই প্রতিচ্ছবি।
২০২৬ বিশ্বকাপে ‘লা রোজা’ এখন আর শুধু একটি দল নয়; তারা পুনর্জাগরণের প্রতীক। ২০১৪ সালের হতাশা, ২০১৮ ও ২০২২ সালের অপূর্ণতা পেছনে ফেলে তারা আবারও বিশ্বচ্যাম্পিয়নের পথে হাঁটছে। আর মাত্র দুটি জয়–তার পরই হয়তো আবারও লাল-হলুদ পতাকায় রাঙবে বিশ্ব ফুটবলের আকাশ।