টুলের ওপর সাজানো ছোট্ট একটি সিগারেট ও পান-সুপারির দোকান। মাথার ওপর ছাতা থাকলেও ঠেকাতে পারছে না বৃষ্টির পানি। ছাতার ফাঁক দিয়ে অবিরাম পানি ঝরে পড়ছে দোকানের ওপর। সেই ছোট্ট দোকানটি আঁকড়ে ধরে নীরবে চোখের পানি মুছছিলেন নাছিমা বেগম (৫০)। চারপাশে বৃষ্টির পানি, পথচারীরা ছাতা মাথায় দ্রুত গন্তব্যে ছুটছেন। কিন্তু কেউ থামছেন না। দোকানে সারা দিন বসে থেকেও ক্রেতার দেখা নেই।
গত কয়েক দিন টানা বৃষ্টির কারণে রাজধানীর কাঁঠালবাগান এলাকার বাসিন্দা নাছিমা বেগমের জীবনসংগ্রাম চলছে এভাবে। পাঁচ বছর আগে কর্মস্থলে দুর্ঘটনায় স্বামী আবদুল মান্নানের হাত ভেঙে যায়। আর সংসার উপার্জনের দায়িত্ব এসে পড়ে নাছিমার কাঁধে। কাঁঠালবাগানের ফুটপাতে একটি ছোট্ট টুলের ওপর সিগারেট, পান-সুপারি সাজিয়ে বসেন। ছোট্ট এই দোকানের প্রতিদিনের আয় দিয়ে কোনোমতে চলছিল তাদের সংসার।
কিন্তু টানা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিতে সেই সামান্য আয়ের পথও প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। যে দোকান থেকে প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা বিক্রি হতো, সেখানে এখন সারা দিন বসে থেকেও ১০০ টাকার পণ্য বিক্রি হয় না। তবু সংসারের দায়ে বৃষ্টি উপেক্ষা করে প্রতিদিন দোকান খুলে বসতে হয় তাকে।
চোখের পানি মুছতে মুছতে নাছিমা বলেন, ‘ঘরে বসে থাকলে তো কেউ টাকা দিয়ে যাবে না। তাই বৃষ্টি মাথায় নিয়েই দোকান খুলেছি। সেই যে বৃষ্টি শুরু হয়েছে থামছে না, কেউ কিছু কিনছে না। আগে দিনে ৩০০-৪০০ টাকা বিক্রি হতো, এখন ১০০ টাকাও হয় না। স্বামী অসুস্থ, সংসার চালাব কীভাবে বুঝতে পারছি না। তাহলে বাঁচব কী করে, খাব কী?’
টানা বৃষ্টির কারণে নাছিমার মতো রাজধানীজুড়ে দিনমজুর, হকার, নির্মাণশ্রমিক, ফেরিওয়ালা ও রিকশাচালকদের ব্যাপক দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
যাদের প্রতিটি দিনের আয় নির্ভর করে প্রতিদিনের কাজের ওপর। টানা বর্ষণে একদিকে যেমন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা, অন্যদিকে উন্নয়নকাজের জন্য খোঁড়াখুঁড়ি করা সড়কগুলো বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে জনদুর্ভোগকে আরও তীব্র করেছে।
গত শুক্র ও শনিবার রাজধানীর মিরপুর, আগারগাঁও, ফার্মগেট, ধানমন্ডি, বাড্ডা, বনানী, নিউ মার্কেট, গুলিস্তানসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই অধিকাংশ সড়কে হাঁটুসমান পানি জমেছে। কোথাও ড্রেন উপচে নোংরা পানি রাস্তায় উঠে এসেছে, আবার কোথাও উন্নয়নকাজের জন্য খুঁড়ে রাখা সড়ক পানির নিচে তলিয়ে গিয়ে যানবাহন চলাচলকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। এর ফলে রাজধানীজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে দীর্ঘ যানজট, আর নগরবাসীকে পোহাতে হচ্ছে চরম দুর্ভোগ।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় চলমান উন্নয়নকাজের কারণে খুঁড়ে রাখা সড়কগুলো বৃষ্টিতে যেন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। পানির নিচে কোথায় রাস্তা, কোথায় গর্ত কিংবা কোথায় খোঁড়া অংশ, তা বোঝার উপায় নেই। ফলে মোটরসাইকেল, রিকশা ও ছোট যানবাহন প্রায়ই গর্তে পড়ছে।
সংবাদকর্মী শেখ জাহাঙ্গীর গতকাল টঙ্গী থেকে বাংলামোটরে অফিসে আসার পথে বনানী ফ্লাইওভারের নিচে জলাবদ্ধতার কারণে এক ঘণ্টার বেশি সময় যানজটে আটকে ছিলেন। পরে মোটরসাইকেল চালিয়ে সামনে এগোতেই একাধিকবার পানির নিচে থাকা গর্তে হোঁচট খান।
তিনি বলেন, ‘বনানী ফ্লাইওভারের নিচে হাঁটুসমান পানি জমে ছিল। পানির নিচে কোথায় গর্ত আর কোথায় রাস্তা খোঁড়া রয়েছে, তা বোঝার কোনো উপায় ছিল না। কয়েক গজ পর পরই মোটরসাইকেল গর্তে পড়ে যায়। সবচেয়ে বড় ভয় ছিল, কখন বড় ধরনের দুর্ঘটনার শিকার হই।’
মিরপুর-১০, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, কাঁঠালবাগান, পুরান ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় পানির নিচে ডুবে থাকা গর্তে পড়ে একাধিক মোটরসাইকেল ও রিকশা আরোহীকে দুর্ঘটনার শিকার হতে দেখা গেছে। অনেক সিএনজিচালিত অটোরিকশাও বিকল হয়ে পড়ে।
মিরপুরের বাসিন্দা মো. রেজাউল ইসলাম বলেন, বৃষ্টির চেয়ে এখন বেশি ভোগান্তি হচ্ছে খোঁড়া রাস্তার কারণে। অফিসে যেতে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ সময় লাগছে।
জলাবদ্ধতার কারণে রাজধানীর বিভিন্ন নিচু এলাকায় বাসাবাড়ি, দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়েছে বলে জানা গেছে। ড্রেনের নোংরা পানি রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ায় সেটা মাড়িয়ে গন্তব্যে যেতে হচ্ছে কর্মজীবী মানুষদের।
মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা রুবিনা আক্তার বলেন, বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর থেকেই দুর্ভোগ শুরু হয়। রাস্তায় হাঁটা যায় না, আবার গাড়িও পাওয়া যায় না। ছোট সন্তানকে নিয়ে বের হওয়া এখন সবচেয়ে কঠিন।
এদিকে টানা বৃষ্টিতে রাজধানীর ফুটপাতগুলো প্রায় ক্রেতাশূন্য। নিউ মার্কেট, গুলিস্তান, মিরপুর-১০, ফার্মগেটসহ বিভিন্ন এলাকায় অনেক হকার দোকানই খুলতে পারেননি। কেউ কেউ ত্রিপল টাঙিয়ে বসে থাকলেও সারা দিনে তেমন বিকিকিনি হয়নি। বিভিন্ন হকার সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরে ছয় লাখের বেশি মানুষ ফুটপাতকেন্দ্রিক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তাদের অধিকাংশই দৈনিক বিক্রির ওপর নির্ভরশীল। ফলে টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিতে তাদের জীবিকা চরম সংকটে পড়েছে।
পান্থপথের পোশাক বিক্রেতা হকার মো. শাহিন বলেন, ‘ছাতি হাতে দাঁড়িয়ে আছি, বেচাবিক্রি করতে পারিনি। গত কয়েক দিন একই অবস্থা।’
বৃষ্টির কারণে নির্মাণকাজ বন্ধ থাকায় আয়হীন দিন কাটাছেন শ্রমজীবীরা। নির্মাণশ্রমিক নুর ইসলাম বলেন, ‘বৃষ্টি হলে নির্মাণকাজ বন্ধ থাকে। তিন দিন ধরে কোনো কাজ পাইনি। ঘরে চাল শেষ হয়ে গেছে। ধার করে বাজার করতে হচ্ছে।’
রিকশাচালক জসিম উদ্দিন বলেন, ‘আগে দিনে প্রায় এক হাজার টাকা আয় হতো। এখন ৫০০ টাকাও হয় না। রিকশার জমা কী দিব আর খাবোইবা কী? পানি জমে থাকলে চালানো খুব কষ্টের, আবার রিকশা নষ্ট হচ্ছে বারবার।’
এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক দিন বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। এতে রাজধানীর জলাবদ্ধতা ও জনদুর্ভোগ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রতিবছর বর্ষা এলেই রাজধানীবাসীকে একই দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
যদিও সিটি করপোরেশন থেকে বরাবরই সংকট সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে। গত শুক্রবার জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি পরিদর্শন করেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান। এ সময় তিনি মিরপুর-১০, কাজীপাড়া ও শেওড়াপাড়া মেট্রোরেল এলাকার সড়কে জমে থাকা বৃষ্টির পানি এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার সার্বিক পরিস্থিতি ঘুরে দেখেন।
পরিদর্শনকালে কর্মরত পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের দ্রুত পানি নিষ্কাশনের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন ডিএনসিসি প্রশাসক। এ সময় তিনি নিজেই পানির মধ্যে হেঁটে পানি সরে যাওয়ার নালা ও ড্রেনের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন। তবে প্রশাসকের পরিদর্শনের পরদিন শনিবার ওই এলাকায় জলাবদ্ধতার চিত্রের কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। বৃষ্টির কারণে মিরপুর-১০, কাজীপাড়া ও শেওড়াপাড়া মেট্রোরেল এলাকার বিভিন্ন সড়কে হাঁটুসমান পানি জমে থাকতে দেখা গেছে।
টানা বৃষ্টিতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সৃষ্ট জলাবদ্ধতা নিরসনে কুইক সার্ভিস টিম মাঠপর্যায়ে কাজ করছে বলে জানিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)।
ডিএসসিসির জনসংযোগ বিভাগ জানায়, বৃষ্টির পর কোথাও পানি জমে গেলে দ্রুত তা নিষ্কাশনের জন্য কুইক সার্ভিস টিম সার্বক্ষণিক কাজ করছে।
তবে নগরীর বিদ্যমান ড্রেনেজ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে অতিবৃষ্টিতে অনেক এলাকায় সাময়িক জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। সংস্থাটি জানায়, বর্তমানে পানি নিষ্কাশনের লাইন প্রয়োজনের তুলনায় কম রয়েছে। এ কারণে দ্রুত পানি সরানোর ক্ষেত্রে কিছুটা সমস্যা তৈরি হচ্ছে। পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি অচল ড্রেনগুলো সচল করার কাজও চলমান রয়েছে।