ঢাকা ২৮ আষাঢ় ১৪৩৩, রোববার, ১২ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে দেশ নেই মফস্বলে পারে, রাজধানীতে পারে না কেন? পুঁজিবাজারে স্থিতিশীল গতি প্রয়োজন বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের পর বরখাস্ত সেনেগাল কোচ পাপে থিয়াও বন্যাপ্লাবিত ১১ জেলায় বিজিবি মোতায়েন নীলফামারীর ডোমারে ট্রাকচাপায় নিহত ৪ দুর্গতদের ত্রাণ ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পনা প্রণয়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ অধ্যায়ের ৮টি বহুনির্বাচনি প্রশ্ন ও উত্তর, ৪র্থ পর্ব, এইচএসসির ব্যবসায় সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা ২য় পত্র টেকনাফ সীমান্তে বন্যার্ত পরিবারের মধ্যে বিজিবির ত্রাণ বিতরণ প্রাথমিকে বৃত্তির টাকা দ্বিগুণ, কার্যকর ২০২৬ থেকে নোবিপ্রবির সৈকতের অনন্য প্রত্যাবর্তন ঈশ্বরদীতে বৃত্তির হাসি ২০৬ শিক্ষার্থীর মুখে রাজশাহী কলেজ সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সামাজিক স্কুল ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংস্কার নিশ্চিত করা জরুরি মিয়ানমার সীমান্তে জেলের ছদ্মবেশে পাচারচক্র, আটক দুই যুবক নরওয়ে ‘ডাকাতির’ শিকার: আলফ-ইঙ্গে হালান্ড যুবদল নেতার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ, হামলায় আহত ১০ সিআইপিএস এশিয়া এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ডের চার পুরস্কার বাংলালিংকের ত্রাণ বিতরণের পর হারুয়ালছড়িতে সেনাবাহিনীর ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প ১০ লাখ নগরবাসীর সেবায় কাজ করছে রসিক: প্রশাসক বীরের মর্যাদায় দলকে বিদায় জানালেন সুইসরা বাকৃবি অধ্যাপক আব্দুল বাতেনের রাজকীয় বিদায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল শুরু ‘আমি সকালে টাইগার খেয়ে আর্জেন্টিনার খেলা দেখেছি, এরপর কী হয়েছে জানি না’ পাঠ্যপুস্তকের বাইরের এক জীবন্ত ক্যাম্পাসের গল্প এক দিনে হাম ও উপসর্গে আরও ৫ শিশুর মৃত্যু বাঁশখালীতে ইসলামী আন্দোলন মহাসচিবের ত্রাণ বিতরণ বেলিংহাম হতে পারেন ইংল্যান্ডের সর্বকালের সেরা ফুটবলার: লিনেকার প্রতারণা মামলায় তানজিন তিশার বিরুদ্ধে সমন জারি বান্দরবানে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি, সাঙ্গু-মাতামুহুরীর পানি বিপৎসীমার ওপরে

পরিকল্পনাহীন নগরায়ণ ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংস্কার নিশ্চিত করা জরুরি

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬, ০৫:২০ পিএম
ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংস্কার নিশ্চিত করা জরুরি
ইকবাল হাবিব

প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে মনুষ্যসৃষ্ট ঝুঁকিও বাড়ছে। অনুমোদনহীন ও অপরিকল্পিতভাবে বহুতল ভবন নির্মাণ, জোনিং বিধি লঙ্ঘন, অগ্নিনিরাপত্তা ও জরুরি বহির্গমনব্যবস্থার ঘাটতির কারণে অগ্নিকাণ্ড ও ভবন ধসের ঘটনা বাড়ছে। একই সঙ্গে আইনের দুর্বল প্রয়োগ ও তদারকির অভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নগরকে অনিরাপদ করে তুলছে।...

বিকেন্দ্রীকৃত নগরায়ণ নিশ্চিতে, আগামীর লক্ষ্য হওয়া উচিত জেলা ও উপজেলা শহরগুলোকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলে সেবার ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করা। এ জন্য নগরায়ণ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, স্থল, বিমান ও সমুদ্রবন্দরভিত্তিক সংযোগ উন্নয়নের মাধ্যমে আঞ্চলিক বৈষম্য কমানো এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে আঞ্চলিক সক্ষমতা জোরদার করা জরুরি। বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতায় ‘হাব-অ্যান্ড-স্পোক’ মডেলে জেলা শহরগুলোকে আঞ্চলিককেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলে গণপরিবহনের মাধ্যমে পার্শ্ববর্তী এলাকার সঙ্গে সংযুক্ত করা গেলে রাজধানীমুখী চাপ কমবে এবং দেশজুড়ে উন্নয়নের ভারসাম্য তৈরি হবে।

বাংলাদেশের নগরসংকট কোনো একক শহরের সমস্যা নয়; দীর্ঘদিনের বৈষম্যপূর্ণ উন্নয়ন কাঠামোর ফল। শিল্প, কর্মসংস্থান ও সেবার কেন্দ্রীকরণের কারণে মানুষ বাধ্য হয়ে বড় শহরমুখী হচ্ছে, ফলে নগরগুলো অতিরিক্ত চাপে পড়ছে এবং জেলা ও উপজেলা শহরগুলো তাদের সম্ভাবনা হারাচ্ছে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ ঢাকা। যেখানে দেশের মাত্র ১ শতাংশ ভূমিতে প্রায় ১১ শতাংশ মানুষ বসবাস করে এবং জাতীয় জিডিপির এক-তৃতীয়াংশের বেশি উৎপন্ন হয়। দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও জলবায়ু চাপের প্রেক্ষাপটে স্পষ্ট, কার্যকর বিকেন্দ্রীকরণ ছাড়া নগরসংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের শহরগুলোয় যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ ব্যক্তিগত গাড়িনির্ভরতা ও গণপরিবহনে পথচারীবান্ধব পরিকল্পনার অভাব। নগরের সড়কগুলোতে ফুটপাত, সাইকেল লেন ও কার্যকর গণপরিবহন উপেক্ষিত থাকা। ঢাকায় এর চরম উদাহরণ দেখা যায়। মাত্র ১৫ শতাংশ মানুষের ব্যক্তিগত গাড়ি সড়কের ৭৭ শতাংশ দখল করে আছে, অথচ ৮৫ শতাংশ মানুষ হাঁটা, রিকশা ও গণপরিবহনের ওপর নির্ভরশীল। শহরের অধিকাংশ যাতায়াত হেঁটে হলেও উপযোগী ফুটপাতের অভাব স্পষ্ট করে যে, বর্তমান পরিবহননীতি টেকসই নয়।

গণপরিবহন ও পথচারীবান্ধব নগরী গড়ে তুলতে, স্থায়িত্বশীল নগরায়ণের ভিত্তি হিসেবে গণপরিবহন, হাঁটা ও সাইকেলকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ব্যক্তিগত গাড়িনির্ভরতা কমাতে না পারলে যানজট নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয় বিধায় বড় সড়কে ব্যক্তিগত গাড়ির লেন সীমিত রেখে গণপরিবহনের জন্য অধিকাংশ লেন নির্ধারণ করে মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করা জরুরি। বাস মালিকদের সিন্ডিকেট ভেঙে যৌক্তিক ভাড়ায় সব রুটে নগরের বাসব্যবস্থাকে সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনায় কার্যকর চলাচল নিশ্চিত করতে হবে; একই সঙ্গে সরকারি খাতেও দক্ষভাবে পর্যাপ্ত বাস পরিচালনার ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি, ফুটপাত দখল ও অসংগতিপূর্ণ ব্যবহার বন্ধ করে সেগুলোকে পথচারীবান্ধব করতে হবে এবং আলাদা সাইকেল লেন ও কর রেয়াতের মাধ্যমে সাইকেলকে সহজলভ্য করে তুলতে হবে। সর্বোপরি, যাতায়াত ও পরিবহন-সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করে নির্বিচার অবকাঠামো নির্মাণের পরিবর্তে সুচিন্তিত নীতি ও তার কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমেই নগরের পরিবহন সংকটের টেকসই সমাধান সম্ভব।

জলাবদ্ধতা, তাপপ্রবাহ ও পরিবেশগত ঝুঁকি এখন নগরের নিত্য বাস্তবতা, যার প্রধান কারণ খাল, জলাশয় ও সবুজ এলাকার দখল ও ধ্বংস। ফলে প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ ও তাপ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে এবং অল্প বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে। একটি বাসযোগ্য নগরীতে কমপক্ষে ১২ শতাংশ উন্মুক্ত স্থান ও ১৫ শতাংশ সবুজ আচ্ছাদন থাকা প্রয়োজন। রাজধানী ঢাকাসহ অন্যান্য প্রধান প্রধান নগরীর প্রণীত মহাপরিকল্পনায় ‘উন্মুক্ত স্থান, পার্ক, খেলার মাঠ’ এবং ‘ব্লু ও গ্রিন নেটওয়ার্ক’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবনা থাকলেও তার কার্যকর বাস্তবায়ন পরিকল্পনা অনুপস্থিত। একই সঙ্গে পার্ক, খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত স্থানের অবৈধ দখল উচ্ছেদ, জলাশয় ভরাট ও বর্জ্য পানি প্রবেশ বন্ধের পাশাপাশি প্রাকৃতিক ঢাল অনুযায়ী পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার উন্নয়ন প্রয়োজন। খেলার মাঠ ও পার্কের বাণিজ্যিক ব্যবহার বন্ধ, ভূমিতথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং সরকারি সংস্থাও নাগরিকদের অভিভাবকত্বে জবাবদিহিমূলক শাসন কাঠামোর মাধ্যমে মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নগরজীবনের ভিত্তি তৈরিতে কার্যকর ও টেকসই ‘ব্লু ও গ্রিন নেটওয়ার্ক’ গড়ে তোলা সম্ভব।

নগরে বায়ু ও শব্দদূষণ বর্তমানে ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য সমস্যায় রূপ নিয়েছে। যানবাহনের ধোঁয়া, শিল্পকারখানার বর্জ্য নির্গমন, নির্মাণকাজের ধুলা ও ইটভাটার কারণে বিশেষ করে শীতকালে ঢাকাসহ বড় শহরগুলোর বায়ুর মান বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছে যায়। একই সঙ্গে অতিরিক্ত হর্ন, নির্মাণকাজ ও শিল্পকারখানার শব্দে শহরের মানুষ ক্রমাগত শব্দচাপে রয়েছে। এর ফলে শ্রবণশক্তি হ্রাসের পাশাপাশি মানসিক চাপ, ঘুমের সমস্যা ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ছে এবং শিক্ষার্থী ও কর্মজীবীদের মনোযোগ ও উৎপাদনশীলতা ব্যাহত হচ্ছে।

নগরে বায়ু ও শব্দদূষণ হ্রাসে করণীয়, বায়ু ও শব্দদূষণ কমাতে তাৎক্ষণিক, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। নগরের আশপাশের বেআইনি ইটভাটা দ্রুত বন্ধ করে অনুমোদিত ইটভাটায় পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ও মানসম্মত প্রযুক্তি ব্যবহারে কঠোর নজরদারির পাশাপাশি উন্নত ও কম দূষণকারী ইট ব্যবহারে উৎসাহ দিতে উদ্যোক্তাদের সহজ ঋণ ও কর রেয়াত দিতে হবে। ধোঁয়া নির্গতকারী যানবাহনের ফিটনেস নিয়ম কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে এবং প্লাস্টিকবর্জ্য থেকে বায়ুদূষণ ও মাইক্রোপ্লাস্টিক ছড়ানো রোধমূলক বর্জ্যব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে মনুষ্যসৃষ্ট ঝুঁকিও বাড়ছে। অনুমোদনহীন ও অপরিকল্পিতভাবে বহুতল ভবন নির্মাণ, জোনিং বিধি লঙ্ঘন, অগ্নিনিরাপত্তা ও জরুরি বহির্গমনব্যবস্থার ঘাটতির কারণে অগ্নিকাণ্ড ও ভবন ধসের ঘটনা বাড়ছে। একই সঙ্গে আইনের দুর্বল প্রয়োগ ও তদারকির অভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নগরকে অনিরাপদ করে তুলছে। এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন ও সবুজ জলাশয় ধ্বংস যুক্ত হয়ে নগরের তাপদাহ তীব্রতর করছে। গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকার তাপমাত্রা আশপাশের এলাকার তুলনায় গড়ে প্রায় সাড়ে ৩ ডিগ্রি বেশি, যা হিট আইল্যান্ড প্রভাবের স্পষ্ট উদাহরণ।

নগরকে ভূমিকম্প, অগ্নিকাণ্ড ও তাপদাহের মতো বহুমাত্রিক দুর্যোগ থেকে সুরক্ষিত করতে, দুর্যোগ মোকাবিলায় ঝুঁকি নিরূপণভিত্তিক সামঞ্জস্যপূর্ণ আপদকালীন পরিকল্পনা (কন্টিনজেন্সি), বিদ্যমান ভবনের ভূমিকম্প সহিষ্ণুতা জরিপ এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের দ্রুত সংস্কার নিশ্চিত করা জরুরি। ভূমি ব্যবহার ও জোনিং বিধি কঠোরভাবে মানা, বহু মন্ত্রণালয়ভিত্তিক টাস্কফোর্স গঠন, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা প্রকাশ, বার্ষিক ভবন ব্যবহারযোগ্যতা সনদ ও ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড অনুযায়ী নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন। পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স শক্তিশালীকরণ, পাড়া-মহল্লাভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবক গড়ে তোলা এবং সচেতনতা ও প্রস্তুতি বৃদ্ধির মাধ্যমে দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে তাপদাহ ও পরিবেশগত ঝুঁকি মোকাবিলায় নগরবন সৃষ্টি, দেশজ বৃক্ষরোপণ, কাচনির্ভর ভবনসংস্কৃতি পরিহার এবং জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত নগর সবুজায়ন নীতিমালা বাস্তবায়নের মধ্যদিয়েই একটি নিরাপদ, সহনশীল ও মানবিক নগর গড়ে তোলা সম্ভব।

পরিবেশ সংরক্ষণ, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সামাজিক ন্যায়বিচার–এ তিনটির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখেই স্থায়িত্বশীল নগরায়ণ অর্জন করতে হয়। বাংলাদেশে অত্যন্ত দ্রুতগতির এবং অনেকাংশে অপরিকল্পিত ও অসম নগরায়ণের ফলে নগর অভিঘাতগুলো বৃহৎ আকার ধারণ করছে। এ বাস্তবতায় স্থায়িত্বশীল নগরায়ণ ও সুষ্ঠু নগরব্যবস্থাপনা এখন সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। তাই স্থায়িত্বশীল নগরায়ণ ও সুষ্ঠু নগরব্যবস্থাপনা নিশ্চিতে, জাতীয় ও নগর–দুই পর্যায়েই কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।

আগামীর নগরায়ণে, জাতীয় পর্যায়ে কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবস্থাপনার জন্য পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি আলাদা বিভাগ গঠন জরুরি। নগর পর্যায়ে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষগুলোকে ডেভেলপার নয়, নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে কাজ করতে হবে এবং নগর পরিচালনায় পেশাজীবী, জনপ্রতিনিধি ও নাগরিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নগর সুব্যবস্থাপনায় এবং উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণে, ‘উন্নয়ন স্বত্ব বিনিময় বা ট্রান্সফার অব ডেভেলপমেন্ট রাইটস (টিডিআর)’ এবং ‘ব্লকভিত্তিক উন্নয়ন বা ব্লক ডেভেলপমেন্ট’–এ দুটি ধারণাকে উপাদান হিসেবে শহরের পুনঃউন্নয়নকল্পে যথাযথভাবে ব্যবহার করতে হবে। জমির মালিকার অধিকার থেকে উন্নয়ন করার অধিকার, স্থানান্তর বা বিক্রির ব্যবস্থা। কৃষিজমি, জলাধার বা সংরক্ষিত এলাকায় উন্নয়ন সীমিত থাকলে মালিকরা তাদের অব্যবহৃত এফএআর অন্য এলাকার ডেভেলপারের কাছে বিক্রি করতে পারেন। এতে সংবেদনশীল এলাকা সুরক্ষিত থাকে, মালিক আর্থিক ক্ষতি এড়ায় এবং নির্ধারিত এলাকায় পরিকল্পিত উন্নয়ন সম্ভব হয়।

নগরায়ণ মানেই কেবল ভবন ও রাস্তা নয়–এটি একটি গভীর সামাজিক প্রক্রিয়া, যা মানুষের জীবনমান, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও পরিবেশের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। পরিকল্পনাহীন নগরায়ণ বাংলাদেশকে ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ ও অমানবিক শহরের দিকে ঠেলে দিচ্ছে এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সুষম বিকেন্দ্রীকরণ, গণপরিবহননির্ভর চলাচল, সাশ্রয়ী আবাসন, জলাধার সংরক্ষণ, কার্যকর বর্জ্যব্যবস্থাপনা ও সবুজ নগর গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া জরুরি। সঠিক নীতি, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে একটি নিরাপদ, মানবিক ও স্থায়িত্বশীল নগর ভবিষ্যৎ গড়া সম্ভব।

লেখক: পরিবেশকর্মী ও নগরবিদ

পুঁজিবাজারে স্থিতিশীল গতি প্রয়োজন

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬, ০৬:০৬ পিএম
পুঁজিবাজারে স্থিতিশীল গতি প্রয়োজন
ড. আবদুর রহমান

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতার গতিময়তা বাড়াতে হবে এসএমই প্লাটফর্ম চালু করা, ডিজিটাল ট্রেডিং ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা, বিনিয়োগকারীদের শেয়ারব্যবস্থা বিষয়ে প্রতিটি ব্রোকার হাউসে যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা অত্যাবশ্যক। পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করা ছাড়া জাতীয় অর্থনীতিতে রক্ত প্রবাহের গতি বেগবান করা অসম্ভব।...

প্রত্যেক দেশের পুঁজিবাজারের স্থিতিশীল অগ্রগতি সংশ্লিষ্ট দেশের শিল্পায়নকে এগিয়ে নিয়ে ওই দেশের জাতীয় অর্থনীতি বিকাশের ক্ষেত্রে রক্ত সঞ্চালন করে থাকে। দুনিয়ার অন্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের তুলনা করলে কোনোভাবেই মেলানো সম্ভব নয়। এর কারণ হচ্ছে, বিশ্বে এমন কোনো দেশ আছে কি যেখানে সকালবেলা অর্থমন্ত্রী কিংবা প্রধানমন্ত্রীর কুশপুত্তলিকা দাহ করলে বিকেলে শেয়ারমূল্য বেড়ে যায় কিংবা বিকেলে উল্লিখিত ব্যক্তিদের কুশপুত্তলিকা দাহ করলে পরের দিন শেয়ারমূল্য বাড়ে? লোকের ধারণা এমন বিষয়ের তাত্ত্বিক ভিত্তি প্রস্তুত করার জন্য হয়তোবা প্রয়াত অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে একটা যোগসাধনের চেষ্টা করলেও করা যেতে পারে। বর্তমানে বেঁচে থাকা অর্থনীতিবিদদের পক্ষে বাংলাদেশে সংঘটিত উপরোল্লিখিত কর্মযজ্ঞের কোনো খোঁড়া যুক্তি দাঁড় করানো সম্পূর্ণভাবেই অসম্ভব। আর এসব কারণেই বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা আনয়নের কাজ জরুরি। সরকার ইতোমধ্যে কমিশনের চেয়ারম্যানসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগও দিয়েছে।

আমরা চলমান শেয়ারবাজারের গতিবিধি যথার্থভাবে বোঝার জন্য গত কয়েকটি অর্থবছরের হালহকিকত একটু বুঝে এলে ভালো হয়। ভয়াবহ কোভিড-পরবর্তী ২০২০-২১ অর্থবছরে পুঁজিবাজারের দৈনিক গড় লেনদেন ছিল প্রায় ২ হাজার  থেকে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে দৈনিক গড় লেনদেন ছিল ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা (বছরের শুরুতে ভালোই ছিল কিন্তু বছরের শেষের দিকে পতনের প্রবণতা দেখা গেল)। আস্থাহীনতা ও তারল্যসংকটের প্রভাবে ২০২২-২৩ অর্থবছরে পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় প্রায় ১.৩ অংশে নেমে ৬০০-৮০০ কোটি টাকায় চলে আসে। পরবর্তী অর্থবছরে (২০২৩-২৪) দীর্ঘমেয়াদি মন্দাভাব ও বিনিয়োগকারী সংকটের কারণে আরও হ্রাস পেয়ে ওই অর্থ ৫০০-৭০০ কোটি টাকায় নেমে আসে; যা ২০২০-২১ সালের তুলনায় মোটামুটি ১.৪ অংশ।

বিভিন্ন সময়ের গড়ের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, বাজারে স্থবিরতা, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দৈনিক লেনদেনের গড় ৪০০-৬০০ কোটি টাকায় নেমে আসে। সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের (CDBL) তথ্যানুযায়ী, বিও (Beneficiary Owner) হিসাব খোলার প্রবণতা পুঁজিবাজারে ২০২১ জুন থেকে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত ২৮-৩০ লাখ থেকে ৩৭-৩৮ লাখে পৌঁছায়। তবে এ ক্ষেত্রে একটি কথা এড়িয়ে যাওয়া যথার্থ হবে না যে, উল্লিখিত বিও হিসাবধারীরা সব সময় কর্মদিবসে কতটা Active থেকে শেয়ার বেচাকেনায় ভূমিকা রাখছেন, সেটাও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার বিষয়।

এ ক্ষেত্রে আমরা মামুন রশীদের (অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও ফাইন্যান্সিয়াল এক্সেলেন্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান) উক্তি–‘বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের বর্তমান দুর্বলতার সবচেয়ে উদ্বেগজনক প্রতীক হলো ২০২৫ সালে বছরজুড়ে একটি নতুন আইপিও না আসা। এটা নিছক বাজার মন্দা নয়; বরং এটি একটি গভীর কাঠামোগত সংকেত। আইপিও মানে শুধু শেয়ার নয়, এর অর্থ নতুন উদ্যোক্তা, নতুন শিল্প, নতুন কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীল বিনিয়োগ। যখন একটি অর্থনীতিতে দীর্ঘ সময় নতুন আইপিও বন্ধ থাকে, তখন তা বোঝায় যে, উদ্যোক্তারা পুঁজিবাজারকে আর কার্যকর মূলধন সংগ্রহের প্লাটফর্ম হিসেবে বিবেচনা করছেন না। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে শিল্প সম্প্রসারণ, প্রযুক্তি বিনিয়োগ ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের ওপর। অর্থাৎ আইপিও-সংকট আসলে বৃহত্তর অর্থনৈতিক গতিশীলতার সংকট’। বিষয়টি বিশেষভাবে প্রবিধানযোগ্য।

আমরা এ পর্যায়ে যদি বিগত পাঁচ বছরের পুঁজিবাজারের প্রধান সমস্যাগুলো মোটাদাগে চিহ্নিত করি তাহলে দেখতে পাব যে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের লোকসান এবং বাজারে দীর্ঘদিন ধরে সূচকের পতন। যদি ধরে ধরে কথা বলি তাহলে এভাবে বলা যায় যে, অনেক কিছু উপেক্ষা না করেই বলা যায়, পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ অতীতে শুধু ব্যর্থই হয়নি বরং যে কথা নিকট অতীতে বলেছি, কুশপুত্তলিকা দাহভিত্তিক প্রশাসন ও শেয়ারের মূল্য হ্রাস-বৃদ্ধিতে অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছে। 
ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের লোকসান তো শুধু শেয়ারবাজারের মধ্যেই থাকে না বরং তার বিস্তৃতি অনেক দূরে।  ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা সীমিত নিজস্ব অর্থ, ভাইবোন ও নিকটাত্মীয়দের কাছ থেকে ঋণ নেওয়া অর্থই তার পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে এবং যখন শেয়ারবাজার মন্দা অবস্থায় পড়ে যায় তখন তো তারা অনেকে আত্মহত্যার পথও বেছে নেয়!
রাষ্ট্রায়ত্ত লাভজনক প্রতিষ্ঠান কেন জানি পুঁজিবাজারে অংশগ্রহণে অনীহা দেখাচ্ছে। এটা পুঁজিবাজারের জন্য আদৌ ভালো নয়। শুধু সরকারি লাভজনক প্রতিষ্ঠানই নয়, বেসরকারি বড় বড় লাভজনক প্রতিষ্ঠান পুঁজিবাজারে তাদের শেয়ার নিয়ে আসছে না।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিন ধরেই সিন্ডিকেট-ভিত্তিক লেনদেনের অভিযোগ আছে। প্রসঙ্গত, প্রয়াত অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের জাতীয় সংসদে দেওয়া একটি বক্তব্য মনে পড়ে। তিনি বলেছিলেন, ‘পুঁজিবাজারে সংগঠিত লুটপাটের বিষয়ে তদন্ত রিপোর্ট জমা দিয়েছেন এবং অভিযুক্ত রাঘববোয়ালরা তার আশপাশেই আছেন।’ তার এমন বক্তব্যে বুঝতে আর অসুবিধা হয় না যে, রাজনৈতিক এবং ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়াবিহীন সিন্ডিকেট পরিচালনা করা অসম্ভব। সাংবাদিক মুন্নী সাহার একটি উক্তি স্মরণে এসে যায়–‘আপনি কি সেই দরবেশ...’।

তারল্যসংকট পুঁজিবাজারে সংকট সৃষ্টিতে আর একটি বাধা। এজন্য ব্যাংকিং খাতে বজায় থাকে উচ্চ সুদের হার, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ কমে যায় এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ হ্রাস পায়।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রায়শই ঘন ঘন নীতিগত পরিবর্তনসহ ফ্লোর প্রাইস আরোপ ও প্রত্যাহার বিষয়গুলোও পুঁজিবাজারের জন্য মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি করে।

দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানির তালিকাভুক্তি ও অতি মূল্যায়নের বিষয়টি পুঁজিবাজারের শেয়ার ব্যবসার মূলে আঘাত করে। যে অভিঘাতে বিনিয়োগকারীদের রাতারাতি পথে বসতে হয়।

পুঁজিবাজারের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় বাজারে রয়েছে গভীরতার অভাব। ডলারসংকট ও মুদ্রাবিনিময় ঝুঁকি তো এ খাতকে মনে হয় স্থায়ীভাবে ঘ্রাস করে বসে আছে। উল্লিখিত কারণে বিদেশি বিনিয়োগও কমে যায়।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজার ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা বিষয়ে প্রবন্ধে আমার নিজের একটু অভিজ্ঞতা শেয়ার করা যথার্থ বলে মনে করছি। ২০০৭ সালে মশিহর সিকিউরিটি কোম্পানির (তখনকার সময়ের টপ টেনের একটি সংশ্লিষ্ট হাউস) অর্থনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে বেশ কিছু দিন কাজ করেছি। কর্মকালীন বাস্তব অভিজ্ঞতা এ কথা বলে যে, একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিনিয়োগকারী পুঁজিবাজারের শেয়ার ব্যবসা বিষয়ে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতাবিহীন এ ব্যবসায় বিনিয়োগ করে এবং হুজুগে নিজে না বুঝেই শেয়ার বেচাকেনা করে। মূলত, হুজুগটা যারা ছড়ায় তারাই সিন্ডিকেটের প্রতিনিধি এবং অভিজ্ঞতাহীন বিনিয়োগকারীরা যথাযথ অভিজ্ঞতার অভাবে প্রায়শই ঝুঁকিতে পড়ে এবং একসময় বিনিয়োগের অর্থ হারিয়ে নামে রাজপথে বিক্ষোভে!

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতার গতিময়তা বাড়াতে হবে এসএমই প্লাটফর্ম চালু করা, ডিজিটাল ট্রেডিং ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা, করপোরেট ব্যবসায় সুশাসন বিধিমালা শক্তিশালী করাসহ কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, বিও হিসাবের সংখ্যা বৃদ্ধি, বন্ড মার্কেট উন্নয়নের প্রচেষ্টা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যারা জাতীয় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে তাদের পুঁজিবাজারের ব্যবসায় সম্পৃক্ত করাসহ বিনিয়োগকারীদের শেয়ারব্যবস্থা বিষয়ে প্রতিটি ব্রোকার হাউসে যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা অত্যাবশ্যক। পরিশেষে বলব, পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করা ছাড়া জাতীয় অর্থনীতিতে রক্ত প্রবাহের গতি বেগবান করা অসম্ভব এবং স্থিতিশীলতা আনয়নও অসম্ভব।

লেখক: উপ-উপাচার্য (ভারপ্রাপ্ত) ও কোষাধ্যক্ষ
প্রাইম ইউনিভার্সিটি, অর্থনীতিবিদ ও কলামিস্ট

বাংলাদেশ-চীন বাণিজ্যিক করিডর: সম্ভাবনা ও বাস্তবতা

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬, ০৫:৫০ পিএম
আপডেট: ১১ জুলাই ২০২৬, ০৫:৫৩ পিএম
বাংলাদেশ-চীন বাণিজ্যিক করিডর: সম্ভাবনা ও বাস্তবতা
মো. মহিদুল ইসলাম

ইচ্ছা থাকলে উপায় হবেই।  বাংলাদেশ-চীন বাণিজ্যিক করিডর দুই দেশ, অঞ্চল, এশিয়া ও বিশ্বকে এগিয়ে নেবে। বাংলাদেশকে রেল রোডে বৃহত্তর সংযোগ দিয়ে শিল্প-বাণিজ্যে অকল্পনীয় অগ্রগতি দেবে। চীনের শক্তি-সামর্থ্য বৃদ্ধি করবে। মানুষের অভাব পূরণ ও দারিদ্র্যবিমোচনে দ্রুত এগিয়ে যাবে দেশ।...

দীর্ঘ দৃষ্টিতে লক্ষ্য করে দেখেছি রেল যোগাযোগ যাতায়াত সেবা দিলেও সেবার মান আঞ্চলিক ও বিশ্বমানের নয়। ১৮৬২ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার বাংলাদেশের মাটিতে দর্শনা-কুষ্টিয়া-গোয়ালন্দে প্রথম যে রেলপথ বানিয়েছিল তা আজ আরও উন্নত হওয়ার কথা। জগতি আজ বিরানভূমি প্রায়। অথচ এটাই বাংলাদেশের প্রথম রেলস্টেশন। একে বহুমুখী করা জরুরি।

বাংলাদেশ-চীন বাণিজ্যিক করিডর বাংলাদেশ তথা গোটা অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য জরুরি। কক্সবাজার-কুনমিং রেল রোড হলে বাংলাদেশকে সমগ্র এশিয়া ও ইউরোপের সঙ্গে সংযোগ করবে। শুধু তাই নয়, এর প্রতিটি স্টেশনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠবে আরও গতিশীল, আরও উৎপাদনশীল সমাজ। মাত্র দুই দশকের মধ্যে চীন বিশ্বের বৃহত্তম হাইস্পিড রেল নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে, যা বর্তমানে পৃথিবীর বাকি সব দেশের সম্মিলিত নেটওয়ার্কের চেয়েও বড়। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে চীনের প্রচলিত যোগাযোগব্যবস্থা তীব্র যানজট এবং ধীরগতির সমস্যায় জর্জরিত ছিল। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে চীনে রেলের আধুনিকায়ন জরুরি হয়ে পড়। ২০০৪ থেকে ২০১৪, এ সময়ে চীন ১০ হাজার কিলোমিটার রেলপথ বানায়, যার গতি ২০০ কিলোমিটারের অধিক। চীনের রেলপথ গড়ার এ কাজকে বলে রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন ওয়্যার বা রেল গড়ার যুদ্ধ। ঘণ্টায় ২০০ কিলোমিটার বা তার চেয়ে বেশি গতির রেলকে উচ্চ গতি বা হাইস্পিড রেল বলা হয়। জাপান ১৯৬৪ সালে প্রথম ২১০ কিলোমিটার গতির রেল গড়ে তোলে, যাকে সিনকানসেন বা বুলেট ট্রেন বলা হয়।

প্রশ্ন হলো, একটি বিশ্বমানের রেল গঠন, সেবাদান, যাত্রী তৈরি, শিল্পায়ন ব্যতীত বাংলাদেশ আর কতদিন অপেক্ষা কববে? এখানে বাংলাদেশ ও চীনের মেলবন্ধন দরকার। বাংলাদেশ পৃথিবীর সপ্তম বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশ। বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম। আছে পৃথিবীর একমাত্র ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। উত্তরে হিমালয়, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। ভূরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু আজকের বাংলাদেশ। মাটি, মানুষ, পানি, ভূপ্রকৃতি, খনিজ–সব মিলিয়ে বিপুল সম্ভাবনার ভূকেন্দ্র। সত্যি বলতে, বাংলাদেশ গঠনে যুদ্ধের তেজ দরকার। রেল দেখার লোভ আজন্ম। আমি একবার ঢালারচর গিয়েছিলাম। শুনেছি ঈশ্বরদী থেকে ঢালারচর রেললাইন হয়েছে। কিন্তু অবাক হয়ে লক্ষ করলাম, স্টেশনে ঢোকার রাস্তা সংকীর্ণ। রেলস্টেশনে যাওয়ার রাস্তা সুগম হতে হবে। ঈশ্বরদী জংশন দেখে বিস্মিত হতাম সেই শৈশব থেকে।

মানুষ ও মালামাল পরিবহনের জন্য রেল। সবচেয়ে নিরাপদ ও আরামদায়ক পরিবেশবান্ধব যোগাযোগ হলো রেল। রেল-নীতিপদ্ধতি পরিকল্পনা তৈরি বিশাল কাজ। সে কাজের দক্ষতা, যোগ্যতা দু-এক দিনে হয় না। আমাদের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রেলপাঠের সিলেবাস ছোট। নেই কোনো রেল বিশ্ববিদ্যালয়। নেই তেমন গবেষণা প্রতিষ্ঠান। মিডিয়ায় প্রচারও কম। রেলভবনে বড় একটি লাইব্রেরি থাকতে পারত। বাংলাদেশ-চীন বাণিজ্যিক করিডর নয় শুধু। দরকার বাংলাদেশ-চীন একাডেমি অব রেলওয়ে সায়েন্স অ্যান্ড গভর্নেন্স।

বাংলাদেশ রেলওয়েকে আঞ্চলিক ও বিশ্বমানের করতে করণীয়: ১. বাংলাদেশ-চীন রেল করিডর, ২. বাংলাদেশ-চীন রেল বিশ্ববিদ্যালয়, ৩. বাংলাদেশ-চীন পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট একাডেমি অব রেলওয়ে সায়েন্স অ্যান্ড গভর্নেন্স, ৪. রোহনপুর-সান্তাহার-বগুড়া-কালীতলা ঘাট রেল, ৫. কালীতলা সারিয়াকান্দী নৌবন্দর, ৬. জগতি রেলস্টেশন বিশ্বমানের করা, ৭. কুষ্টিয়া কোর্ট ও বড় স্টেশনকে মাটির নিচ দিয়ে স্টেশনকে বহুমুখী করা, ৮. দৌলতদিয়া-নগরবাড়ী-আরিচায় নতুন নগরায়ণ ও ত্রিমুখী রেল ব্রিজ বা টানেল করা, ৯. মানিকগঞ্জ-নারায়ণগঞ্জ-কুমিল্লা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-কুনমিং হাইস্পিড রেল, ১০. খুলনা-বরিশাল-ভোলা-লক্ষ্মীপুর রেল, ১১. বরিশাল-কুয়াকাটা রেল, ১২. বগুড়া-জামালপুর রেল ও সারিয়াকান্দী রেল টানেল, ১৩. দেশের সব জেলায় রেল সংযোগ, ১৪. ঢাকা সার্কুলার রেল-নৌ-রোড, ১৫. আমাদের রেল কারখানাগুলো আরও উৎপাদনমুখী করা। আমরা কেন রেল ইঞ্জিন ও ওয়াগন বানাব না। আর তা না পারলে আমরা ভারী শিল্পে এগিয়ে যেতে পারব না। ইচ্ছা থাকলে উপায় হবেই। চুরির নিয়ত ত্যাগ করতে হবে। ইন্দোনেশিয়া ইরান কোরিয়া জাপান জার্মানি পারলে বাংলাদেশকে পারতেই হবে। ব্রিটিশের গড়া সৈয়দপুর রেল কাখানাকে কীভাবে তিলে তিলে পিছিয়ে দিয়েছি আমরা, তা দেখেছি।

যাদের জন্য রেল তারা কেমন হবেন? উদ্যোগী, উৎপাদনশীল, পরিশ্রমী, মানবপ্রেম-দেশপ্রমী, প্রশিক্ষিত, মেধাবী। লাখ লাখ মানুষ রিকশা-অটোরিকশা চালিয়ে জীবনযুদ্ধে লিপ্ত। নগর-বন্দর, হাটবাজার সর্বত্র তারা ছড়িয়ে। তাদের সঙ্গে তাদের জীবনসঙ্গী, সন্তান ও তাদের মা-বাবা তথা নির্ভরশীলরা। আর তার জন্য দরকার দক্ষ, যোগ্য ও শক্তিশালী মানুষ গড়ার শিক্ষা।

পরিশেষে বলব, বাংলাদেশ-চীন বাণিজ্যিক করিডর দুই দেশ, অঞ্চল, এশিয়া ও বিশ্বকে এগিয়ে নেবে। বাংলাদেশকে রেল রোডে বৃহত্তর সংযোগ দিয়ে শিল্প-বাণিজ্যে অকল্পনীয় অগ্রগতি দেবে। চীনের শক্তি-সামর্থ্য বৃদ্ধি করবে। মানুষের অভাব পূরণ ও দারিদ্র্যবিমোচনে দ্রুত এগিয়ে যাবে দেশ। 

লেখক: কর কমিশনার, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড

কল্যাণমূলক রাষ্ট্র তৈরিতে উন্নয়ন সক্ষমতা জরুরি

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬, ০৫:৩০ পিএম
কল্যাণমূলক রাষ্ট্র তৈরিতে উন্নয়ন সক্ষমতা জরুরি
ড. এম শামসুল আলম

সরকার যেন ব্যবসায়ীদের প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়। কারণ, আমাদের এখন দরকার বিনিয়োগ। এই বিনিয়োগের জন্য যা যা করা দরকার সরকার তা করবে। এখানে শেষ পর্যন্ত মানুষের কাছে এই প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবে রূপান্তর হয় সেটাই হচ্ছে বড় প্রশ্ন। তাদের জীবনে স্বস্তি আনে কি না, চাকরি আসে কি না, বিনিয়োগ বাড়ে কি না, জানের নিরাপত্তা আসে কি না, সদিচ্ছা থাকে কি না, সেটাই দেখার বিষয়।...

এবারের বাজেট নতুন সরকারের প্রথম বাজেট। সেই দৃষ্টিভঙ্গিতে যদি আমরা দেখি, তাহলে বলতে হবে নিঃসন্দেহে এই বাজেটের মধ্যদিয়ে সরকার চেষ্টা করছে তাদের যে রাজনৈতিক দর্শন, আগামীর যে চিন্তাভাবনা এবং দেশটাকে কোথায় তারা নিয়ে যেতে চায়, এটা সামগ্রিকভাবে এই বাজেটের মধ্যদিয়ে পরিস্ফুটনের চেষ্টা করছে। নিঃসন্দেহে এটা একটা ভালো উদ্যোগ। যাতে জনগণ বুঝতে পারে এবং সবাই জানতে পারে যে, আসলে সরকার আগামী দিনগুলোতে কী করতে চায়, দেশকে কোথায় নিয়ে যেতে চায়। সরকার এই বাজেটের মধ্যে অনেক কিছু নিয়ে এসেছে।

সরকার যেহেতু বলছে এটা জনগণের বাজেট; কাজেই সব জনগোষ্ঠীকে তাদের যে আকাঙ্ক্ষা, তাদের যে ভবিষ্যতের চিন্তাভাবনা, সবাইকে তাদের একটা সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে আনার প্রচেষ্টা করেছে। যার জন্য দেখা যায়, এখানে বাজেটে মোটামুটিভাবে সব শ্রেণিপেশা থেকে আরম্ভ করে সব গোষ্ঠীর কথাই আছে। এটাই এই বাজেট বাস্তবায়নের দিক থেকে একটা চ্যালেঞ্জিং বাজেট হিসেবে মনে করা হচ্ছে।  এই বাজেটকে যদি আমরা বাস্তবায়ন করতে চাই তাহলে কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে। প্রথম কথা হচ্ছে, এখানে অর্থায়নের সমস্যা আছে। বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অর্থায়নের আরেকটা বিষয় দেখা উচিত হবে–সেটা হচ্ছে বাজেটে যে অর্থ আমরা ব্যয় করছি, সেই অর্থ ব্যয়ের গুণমান রক্ষা করার ক্ষেত্রে আমরা কতটুকু সতর্ক হচ্ছি। যে অর্থটা আমাদের উন্নয়ন খাতে ব্যয় করছি বা বিভিন্ন সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে ব্যয় করছি, যেমন রাজস্ব ব্যয়, এটার গুণমান আমরা কতটুকু রক্ষা করতে পারছি। অপচয়-দুর্নীতি বাদ দিয়ে এটাকে যদি সত্যিকার অর্থে আমরা ব্যয় করতে পারি, তাহলে বাজেটকে আমরা অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারব। বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শুধু নয় বরং এর থেকে আমরা যে সুবিধাটা পেতে চাই সেগুলো অর্জনের ক্ষেত্রে একটা বড় ভূমিকা রাখবে।

আমরা বারবার বলি যে, আড়াই লাখ অর্থাৎ প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার যে ঘাটতির বাজেট পেশ হয়েছে, এটা ঘাটতির উৎস মানে বিভিন্ন দিক থেকে অভ্যন্তরীণ উৎস ও বৈদেশিক উৎস। এখন সরকার বড় আকারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে চাইছে। কিন্তু এত টাকা কোন খাতে এবং কীভাবে কাজে লাগাবে সে প্রশ্ন কিন্তু বারবার চলে আসে। এক সময় শুনতাম ছোটবেলায় যে, ঋণ করে ঘি খাওয়া যায়। এটা প্রবাদ বাক্য। সেই ঋণ করে ঘি খাওয়ার কালচারটা বাজেটে ধারাবাহিকভাবে হয়ে এসেছে। সেই সংস্কৃতি সরকারকে পেয়ে বসেছে। সেখান থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। খাদ্য-নিরাপত্তা, জ্বালানি-নিরাপত্তা এবং বিনিয়োগ-নিরাপত্তা সমানভাবে কাজ না করলে কোনো লক্ষ্যই সরকার বাস্তবায়ন করতে পারবে না। কল্যাণমূলক রাষ্ট্র তৈরি করতে সক্ষমতা উন্নয়নের বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। বাজেট যদি জনমুখী না হয় এবং সেই জিনিসগুলো আমরা মোকাবিলা করতে যদি বিভ্রান্ত হই, তাহলে আমাদের দুই বছরের সময়টা দুই যুগ কেটে গেলে ভালো ফল হবে না।

জ্বালানিতে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই বললেই চলে। নতুন একটা ধারণা এসেছে অর্থাৎ আমি এক জায়গায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করে গ্রিডে দেব কিন্তু আমি অন্য জায়গায় নেব। এতে সরকারের কোনো দায় থাকবে না। সরকারের সঙ্গে কোনো চুক্তি হবে না। সরকারের কোনো দায় নিতে হবে না। পুরোটাই প্রাইভেট; যিনি তৈরি করবেন উনি বিক্রি করবেন। হুইলিং চার্জ বলে একটা কথা আছে যে, বিদ্যুৎ আমি তৈরি করে গ্রিডে দেব সেটা ছিল ৩২ পয়সা প্রতি কিলোওয়াট। এখানে সরকারের কোনো বিনিয়োগ লাগবে না। সরকারের কোনো দায় লাগবে না। সরকারের কোনো ক্যাপাসিটি চার্জ লাগবে না। সেটাকে আতুর ঘরে মেরে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে। এজন্য শুরুতে বলেছিলাম যে, বাস্তবায়ন তো অর্থমন্ত্রী করবেন। তৃণমূলে যারা আছেন উনার থেকে শুরু করে সচিব পর্যন্ত সবাই করবেন। উনাদের চিন্তাভাবনা যদি পরিবর্তন না হয় তাহলে হবে না।

বাজেটে অনেক ভালো ভালো কথা আছে। এগুলাকে বাস্তবায়ন করতে হবে। আর যে ২  লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, এটা নিয়ে এ বছর চিন্তা না করলেও চলবে। এজন্য যারা সত্যি সত্যি শিল্প উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী, কিংবা লুটপাটকারী নয়, তাদের যদি আপনি সাধেনও তাও টাকা নেবে না। কারণ টাকা নিয়ে তা ফেরত দিতে পারবে না। আমার অবকাঠামো থাকতে হবে। বাজেটের যে ঘোষণাগুলো আছে সেগুলো যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে আমি আশাবাদী। এখন সবচেয়ে বড় যেটা সেটা হচ্ছে মূল্যস্ফীতির চাপ। কারণ বিগত প্রায় তিন বছরের বেশি সময় কিন্তু আমরা একটা উচ্চমূল্যস্ফীতির মধ্যে বসবাস করছি। এটা কিন্তু ওই নিচের যারা স্বল্প আয়ের জনগোষ্ঠী, দরিদ্র জনগোষ্ঠী তাদের কিন্তু একেবারে দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। কাজেই তাদের জন্য যেটা সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সেটা হচ্ছে, কীভাবে এই উচ্চমূল্যস্ফীতি থেকে তাদের কিছুটা স্বস্তি দেওয়া যায়।

ঋণ প্রবাহের ক্ষেত্রে ব্যাংকের যে প্রশ্নটা আসছে সেখানে যেন সরকার ব্যবসায়ীদের প্রতিপক্ষ হয়ে না দাঁড়ায়। দুই নম্বর হচ্ছে জ্বালানি নিরাপত্তার কথা যেটা এসেছে, সেখানে যেন সরকার ব্যবসা না করে। সরকার যদি নিজে ব্যবসা করে মুনাফা অর্জনের মাধ্যমে বাজেটের ঘাটতি কমায়, অর্থাৎ উচ্চাবিলাসী বাজেট বাস্তবায়নের জন্য যদি জ্বালানি সেক্টর এবং বিদ্যুৎ সেক্টরকে বেছে নেয়, তাহলে এই প্রত্যাশাটা হতাশায় রূপান্তরিত হবে। এখন যে জিনিস আমি দেশে উৎপাদন করি না, সেই জিনিসের ওপর যদি কর আরোপ করি, পক্ষান্তরে যদি বলি আমি ভর্তুকি দিচ্ছি, এটা কিন্তু সত্যিকারের ভর্তুকি নয়। আমরা এটা তুলে ধরব যে, যদি ভর্তুকি দেওয়া হয় সেটা যেন সত্যি হয়।

সরকার যেন ব্যবসায়ীদের প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়। কারণ, আমাদের এখন দরকার বিনিয়োগ। এই বিনিয়োগের জন্য যা যা করা দরকার সরকার তা করবে। এখানে শেষ পর্যন্ত মানুষের কাছে এই প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবে রূপান্তর হয় সেটাই হচ্ছে বড় প্রশ্ন। তাদের জীবনে স্বস্তি আনে কি না, চাকরি আসে কি না, বিনিয়োগ বাড়ে কি না, জানের নিরাপত্তা আসে কি না, সদিচ্ছা থাকে কি না এবং সরকার যে কথাটা বলেছে অর্থাৎ প্রতিটি ক্ষেত্রে সুশাসন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যে সক্ষমতা, সে বিষয়গুলো নিয়ে বারবার আলোচনা হয়েছে। কর কাঠামোকে আরও কার্যকর করার বিষয়টি আলোচনা হয়েছে। যাতে রাজস্ব আহরণের বিষয়টি আরও বাস্তবসম্মত হয়। কাজেই আমরা বলব, চ্যালেঞ্জ বড় কিন্তু সুযোগও বড়। এখন দেখার বিষয় এই বাজেট শুধু কাগজে-কলমে সীমিত থাকবে নাকি বাস্তবে আমাদের অর্থনীতিতে, সাধারণ মানুষের জীবনে, বিনিয়োগে–সামগ্রিকভাবে একটা পরিবর্তন বয়ে আনতে পারে কি না, সেটাই দেখার বিষয়। 

লেখক: জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) উপদেষ্টা

স্ক্রিনে বন্দি শৈশব-কৈশোর

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬, ১২:৫৬ পিএম
স্ক্রিনে বন্দি শৈশব-কৈশোর
নাঈমুল মাসুম

মানুষের ইতিহাসে প্রযুক্তি যেমন সভ্যতার অগ্রযাত্রার অনিবার্য সঙ্গী, তেমনি নিয়ন্ত্রণহীন প্রযুক্তি কখনো কখনো সেই সভ্যতার জন্যই নতুন সংকট ডেকে আনে। আজকের পৃথিবীতে সেই সংকটের নাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। একসময় শিশুর হাতে থাকত গল্পের বই, রঙিন পেনসিল, ঘুড়ির সুতা কিংবা ফুটবল। এখন সেই হাতের অধিকাংশ সময় দখল করে নিয়েছে স্মার্টফোনের আলোকিত পর্দা। মাঠের সবুজ ঘাসের পরিবর্তে তারা স্পর্শ করছে কাচের স্ক্রিন; প্রকৃত বন্ধুত্বের বদলে খুঁজছে ভার্চুয়াল অনুসারী; কল্পনার রাজ্যের পরিবর্তে ডুবে যাচ্ছে অন্তহীন স্ক্রলের অন্ধকারে।

আজকের শিশুরা আগের যেকোনো প্রজন্মের তুলনায় তথ্যসমৃদ্ধ, কিন্তু তারা কি সমানভাবে কল্পনাশক্তিতে সমৃদ্ধ? প্রযুক্তির বিস্ময়কর সুবিধা আমাদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে, কিন্তু সেই সম্ভাবনাই যখন নিয়ন্ত্রণহীন আসক্তিতে রূপ নেয়, তখন তা সৃজনশীলতা, মনন, সম্পর্ক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য এক নীরব বিপর্যয়ে পরিণত হয়।

বিশ্বজুড়ে গবেষণা বলছে, অতিরিক্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সঙ্গে উদ্বেগ, বিষণ্নতা, মনোযোগের ঘাটতি, ঘুমের সমস্যা এবং আত্মসম্মানবোধের অবক্ষয়ের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কিশোর-কিশোরীদের বিকাশমান মস্তিষ্ক বারবার ক্ষণস্থায়ী উত্তেজনার প্রতি অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। 
ফলে দীর্ঘ সময় ধরে মনোযোগ দিয়ে পড়া, চিন্তা করা, লেখা বা নতুন কিছু উদ্ভাবনের ক্ষমতা ক্রমশ দুর্বল হতে থাকে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম এমনভাবে তৈরি, যা ব্যবহারকারীর মনোযোগকে যতক্ষণ সম্ভব আটকে রাখে। প্রতিটি লাইক, মন্তব্য কিংবা নোটিফিকেশন মস্তিষ্কে ক্ষণিকের আনন্দের অনুভূতি সৃষ্টি করে। ধীরে ধীরে এটি এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক নির্ভরশীলতায় রূপ নেয়। শিশু-কিশোররা বুঝতেই পারে না কখন তারা নিজের সময়ের মালিকানা হারিয়ে ফেলেছে।

সৃজনশীলতা জন্ম নেয় নির্জনতা, একাগ্রতা, পর্যবেক্ষণ এবং কল্পনার সংমিশ্রণে। একজন কবি, বিজ্ঞানী, শিল্পী কিংবা উদ্ভাবকের জন্য সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অবিরাম উদ্দীপনা মানুষের মনকে খণ্ডিত করে দেয়। এক মিনিটের ভিডিও, কয়েক সেকেন্ডের রিল কিংবা অন্তহীন স্ক্রল ধীরে ধীরে দীর্ঘ মনোযোগের সংস্কৃতিকে ধ্বংস করছে। ফলে শিশুরা বই পড়তে বিরক্ত হয়, দীর্ঘ লেখা লিখতে অনীহা বোধ করে, গবেষণামূলক চিন্তার পরিবর্তে তাৎক্ষণিক বিনোদনকেই জীবনের স্বাভাবিক অভ্যাস হিসেবে গ্রহণ করে।

বাংলাদেশেও এ পরিবর্তন ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। শহর থেকে গ্রাম¬–সবখানেই শিশুর হাতে স্মার্টফোন। অনেক অভিভাবক ব্যস্ততার কারণে শিশুকে শান্ত রাখতে ফোন তুলে দেন। প্রথমে এটি সাময়িক সমাধান মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে সেটাই হয়ে ওঠে আসক্তির বীজ। পরিবারের সদস্যরা একই ঘরে থেকেও একে অপরের সঙ্গে কথা বলার পরিবর্তে নিজ নিজ স্ক্রিনে ডুবে থাকে। পারিবারিক সম্পর্কের উষ্ণতা কমে যায়, বেড়ে যায় মানসিক দূরত্ব।

শিক্ষাক্ষেত্রেও এর প্রভাব উদ্বেগজনক। অনলাইন শিক্ষার সুযোগ যেমন তৈরি হয়েছে, তেমনি একই ডিভাইসেই পড়াশোনার পাশাপাশি অবিরাম বিনোদনের দরজাও খোলা। ফলে শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ পড়ার চেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই বেশি সময় ব্যয় করছে। পরীক্ষায় মুখস্থ জ্ঞান হয়তো অর্জিত হচ্ছে, কিন্তু বিশ্লেষণী ক্ষমতা, সৃজনশীল চিন্তা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে।

এ কারণে বিশ্বের বহু দেশ ইতোমধ্যে কঠোর নীতিমালা গ্রহণ করেছে। ২০২৪ সালে অস্ট্রেলিয়া ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার আইন পাস করে, যা বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। আইনটির উদ্দেশ্য শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষা এবং অনলাইন ক্ষতি কমানো।

শুধু অস্ট্রেলিয়াই নয়, বিশ্বের অন্তত ৭৯টি দেশে বিদ্যালয়ে স্মার্টফোন ব্যবহারে বিভিন্ন মাত্রায় নিষেধাজ্ঞা বা কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। এর পেছনে মূল যুক্তি–শিক্ষার পরিবেশে মনোযোগ ফিরিয়ে আনা এবং শিশুদের সামাজিক বিকাশ নিশ্চিত করা।

প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কী ভাবছে? বাংলাদেশে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশ নির্মাণের অভিযাত্রায় প্রযুক্তি অবশ্যই অপরিহার্য। কিন্তু প্রযুক্তির প্রসার যদি ডিজিটাল শৃঙ্খলার সঙ্গে না আসে, তাহলে উন্নয়নের সুফলই একসময় সামাজিক সমস্যায় পরিণত হতে পারে।

বাংলাদেশে এখনো শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের জন্য কার্যকর বয়স যাচাই ব্যবস্থা নেই। অধিকাংশ প্ল্যাটফর্মে বয়সসীমা থাকলেও বাস্তবে তা সহজেই এড়িয়ে যাওয়া যায়। ফলে অল্প বয়সেই শিশুরা এমন কনটেন্টের মুখোমুখি হচ্ছে, যা তাদের মানসিক বিকাশের জন্য ক্ষতিকর।

এ অবস্থায় কেবল নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন বহুমাত্রিক ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল।

প্রথমত, পরিবারকে সচেতন হতে হবে। সন্তানকে স্মার্টফোন দিয়ে ব্যস্ত রাখার পরিবর্তে তার সঙ্গে সময় কাটানো, বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা জরুরি। শিশু তার অভিভাবকের আচরণ থেকেই সবচেয়ে বেশি শেখে। তাই বড়দেরও দায়িত্বশীল ডিজিটাল আচরণ প্রদর্শন করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, বিদ্যালয়ে ডিজিটাল শৃঙ্খলা নীতিমালা প্রণয়ন করা দরকার। শিক্ষার প্রয়োজনে প্রযুক্তি ব্যবহার হবে, কিন্তু অপ্রয়োজনীয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে কঠোর নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে। বিদ্যালয়কে আবারও পাঠাগার, বিতর্ক, বিজ্ঞানচর্চা, সাহিত্যচর্চা ও খেলাধুলার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত করতে হবে।

তৃতীয়ত, সরকারকে শিশুদের জন্য নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। বয়স যাচাই ব্যবস্থা, অনলাইন নিরাপত্তা, ক্ষতিকর কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ এবং প্ল্যাটফর্মগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়ে আধুনিক আইন ও কার্যকর বাস্তবায়ন জরুরি।

চতুর্থত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলোরও নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে। শিশুদের মনোযোগকে পণ্যে পরিণত করে মুনাফা অর্জনের প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে তাদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

পঞ্চমত, গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেবল প্রযুক্তির সুবিধা প্রচার নয়, এর ঝুঁকি সম্পর্কেও ধারাবাহিক জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে। যেমন–একসময় ধূমপানের ক্ষতি নিয়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তেমনি আজ প্রয়োজন সুস্থ ডিজিটাল জীবনযাপনের আন্দোলন।

যে শিশু ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভিডিও দেখে, সে হয়তো সাময়িক আনন্দ পাচ্ছে; কিন্তু একই সময়ে সে হারিয়ে ফেলছে গল্প কল্পনা করার ক্ষমতা, নতুন প্রশ্ন করার সাহস, প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ এবং মানুষের সঙ্গে মুখোমুখি কথোপকথনের দক্ষতা। একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে তার শিশুদের কল্পনাশক্তি। সেই কল্পনাই যদি স্ক্রিনের অ্যালগরিদমের কাছে বন্দি হয়ে যায়, তবে ভবিষ্যতের উদ্ভাবক, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী কিংবা দার্শনিক কোথা থেকে আসবে?

একটি জাতি কেবল প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উন্নত হয় না; উন্নত হয় তখনই, যখন তার শিশুরা স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে শেখে, বইয়ের গন্ধ চিনতে শেখে, মাঠের ঘাসে দৌড়াতে শেখে, প্রশ্ন করতে শেখে, স্বপ্ন দেখতে শেখে।

আমরা যদি আজ তাদের হাতে কেবল একটি স্মার্টফোন তুলে দিই, অথচ একটি বই, একটি মাঠ, একটি গাছ, একটি আকাশ কিংবা একটি মুক্ত শৈশব ফিরিয়ে দিতে না পারি–তবে ভবিষ্যৎ আমাদের ক্ষমা করবে না। স্ক্রিনে বন্দি শৈশব কোনো ডিজিটাল অর্জন নয়; এটি সভ্যতার জন্য এক নীরব সতর্কবার্তা। এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়–আমরা কি অ্যালগরিদমের কাছে আমাদের আগামী প্রজন্মকে সমর্পণ করব, নাকি প্রযুক্তিকে মানুষের সেবায় নিয়োজিত রেখে সৃজনশীল, মানবিক ও মুক্ত ভবিষ্যৎ নির্মাণ করব? সেই উত্তরই নির্ধারণ করবে আগামী বাংলাদেশের মানচিত্র।

লেখক: লেখক ও কবি
[email protected]

রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার লাভ-ক্ষতি

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬, ১২:৩১ পিএম
রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার লাভ-ক্ষতি
ড. খলিলুর রহমান

বাংলাদেশ তার রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। ২০২৪ সালের আগস্টের নাটকীয় রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং পরবর্তী ক্ষমতা হস্তান্তরের পর দেশ একটি নতুন গণতান্ত্রিক পথরেখা নির্মাণের চেষ্টা করছে। কিন্তু জাতীয় বিতর্কের কেন্দ্রে এখনো একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়ে গেছে: প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে বাদ দিয়ে গড়ে তোলা কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থা কি সত্যিকার অর্থে সফল গণতান্ত্রিক উত্তরণ নিশ্চিত করতে পারে?

এ প্রশ্নের উত্তর শুধু বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না; এটি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রভাবশালী অবস্থানে থাকা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ভবিষ্যতের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।

এ উদ্বেগের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন দেখা যায় ৩ জুন ২০২৬ তারিখে, যখন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) মন্ত্রী এবং বিএনপির মহাসচিব, যিনি দলের অন্যতম অভিজ্ঞ নেতা, ঘোষণা করেন যে বিএনপি বাংলাদেশে একটি সহনশীল ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তিনি বলেন, সব রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড পরিচালনা, মতামত প্রকাশ এবং জনগণের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ থাকা উচিত।

গণতান্ত্রিক বহুত্ববাদে বিশ্বাসী অনেকের কাছে এ বক্তব্য আশাব্যঞ্জক বলে মনে হয়েছে। তবে একই সঙ্গে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও উত্থাপন করেছে। ‘সব রাজনৈতিক দল’ বলতে কি তিনি সেই দলগুলোকে বোঝাতে চেয়েছেন, যাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম গত দুই বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় নিষিদ্ধ বা কঠোরভাবে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে? প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎকে রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির প্রশ্ন থেকে আলাদা করে দেখা যায় না।

এখানে স্মরণ করা যেতে পারে যে, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ সালে বিএনপির একজন জ্যেষ্ঠ স্থায়ী কমিটির সদস্য, যিনি বর্তমানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন, সতর্ক করে বলেছিলেন যে, কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা ভবিষ্যতে একটি বিপজ্জনক রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্ম দিতে পারে। সে সময় এই সতর্কবার্তাটি খুব বেশি আলোচিত হয়নি। কিন্তু আজ তা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক বলে মনে হচ্ছে।

অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা এখন বর্জনমূলক রাজনীতির সম্ভাব্য গুরুতর পরিণতি উপলব্ধি করতে শুরু করেছেন। দীর্ঘ কয়েক দশকের রাজনৈতিক উত্থান-পতনের সাক্ষী হিসেবে তারা একটি সহজ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সত্য জানেন–রাজনৈতিক নজির প্রায়শই সেই পরিস্থিতির চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী হয়, যার প্রেক্ষাপটে সেগুলো সৃষ্টি হয়েছিল।

২০২৪ সালের ঘটনাবলির পর যে বর্জনমূলক রাজনৈতিক পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে মৌলিকভাবে পরিবর্তন করেছে। একটি বড় রাজনৈতিক দলের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা প্রতিযোগিতামূলক ও অংশগ্রহণমূলক রাজনীতির সেই নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক, যা গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।

এ ধরনের পদক্ষেপের সমর্থকরা হয়তো যুক্তি দিতে পারেন যে, অসাধারণ পরিস্থিতিতে অসাধারণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে যে, রাজনৈতিক বর্জন খুব কম ক্ষেত্রেই তার প্রাথমিক লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। একবার কোনো নজির প্রতিষ্ঠিত হলে, ভবিষ্যতের সরকারগুলো প্রায়ই একই অস্ত্র নতুন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে আগ্রহী হয়।

এটাই সম্ভবত আজ বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি, একই সঙ্গে বিএনপির জন্যও।

বিএনপির অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা উপলব্ধি করতে শুরু করেছেন যে, আজ যে রাজনৈতিক অস্ত্র একটি শক্তির বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে, আগামীকাল সেটা তাদের নিজেদের বিরুদ্ধেও ব্যবহৃত হতে পারে। রাজনৈতিক ক্ষমতা কখনোই স্থায়ী নয়। নির্বাচনের ফলাফল পরিবর্তিত হয়, জনমত বদলায়, রাজনৈতিক জোট পুনর্গঠিত হয়, সরকার আসে এবং সরকার যায়।

যদি এই নীতি প্রতিষ্ঠিত হয় যেকোনো বড় রাজনৈতিক দলকে আইনগত বা প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ থেকে বাদ দেওয়া যেতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতের কোনো সরকার একই নীতি বিএনপির বিরুদ্ধেও প্রয়োগ করতে পারে।

এই আশঙ্কা কাল্পনিক নয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে যে, রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের যন্ত্রপাতি ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে মালিকানা পরিবর্তন করেছে। একের পর এক সরকার রাষ্ট্রযন্ত্র, আইন এবং প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে তাদের প্রতিপক্ষকে দমন করার চেষ্টা করেছে, এবং পরবর্তীতে নিজেরাই একই ধরনের ব্যবস্থার শিকার হয়েছে।

বিশেষ করে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের ক্ষেত্রে এই উদ্বেগ আরও গভীর। তাদের অনেকেই এখন সত্তরের কোঠায় এবং কয়েক দশক ধরে জনজীবনের সঙ্গে যুক্ত। তারা জানেন, ভবিষ্যতে রাজনৈতিক পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন ঘটলে আজ যেসব নজিরকে কেউ কেউ স্বাগত জানাচ্ছেন, সেগুলোই একদিন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে পারে। অভিযোগ, মামলা, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাধা, এমনকি ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও সম্পত্তির ওপর হুমকিও তখন দেখা দিতে পারে।

এ কারণেই গণতান্ত্রিক রীতিনীতি এত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো শুধু রাজনৈতিক বিরোধীদের সুরক্ষার জন্য নয়, বরং ক্ষমতাসীনদেরও সুরক্ষা দেওয়ার জন্য।
তদুপরি, রাজনৈতিক বর্জন প্রায়শই স্থিতিশীলতার একটি ভ্রান্ত ধারণা তৈরি করে। বিরোধীদের রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে সরিয়ে দিলে দৃশ্যমান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সাময়িকভাবে কমতে পারে, কিন্তু অন্তর্নিহিত অসন্তোষ দূর হয় না। বরং তা আরও গভীরভাবে প্রোথিত হয় এবং ভবিষ্যতের অস্থিরতা ও সংঘাতের ভিত্তি তৈরি করে।

বিনিয়োগকারী এবং উন্নয়ন সহযোগীরা রাজনৈতিক পূর্বানুমানযোগ্যতা ও প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেন। একটি অস্থিতিশীল বা বর্জনমূলক রাজনৈতিক পরিবেশ বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করতে পারে, আস্থা কমিয়ে দিতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে ধীর করে দিতে পারে। ফলে বর্জনমূলক রাজনীতির প্রকৃত মূল্য শুধু রাজনীতিবিদদের নয়; সাধারণ জনগণকেই পরিশোধ করতে হয়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি। সম্প্রতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হওয়া দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অর্জন এবং জাতীয় গর্বের বিষয়। তবে এমন মর্যাদা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাড়তি মনোযোগ ও পর্যালোচনাও নিয়ে আসে।

বাংলাদেশ যখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও দৃশ্যমান নেতৃত্বের ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছে, তখন গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি, মানবাধিকার এবং আইনের শাসন সম্পর্কিত বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও গভীর নজরে আসবে।

গত দুই বছরের রাজনৈতিক উত্তরণের সময় ঘটে যাওয়া ঘটনাবলি–রাজনৈতিক দলের ওপর বিধিনিষেধ, রাজনৈতিক নিপীড়নের অভিযোগ, রাজনৈতিক স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ এবং রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর হামলার মতো বিষয় আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মনোযোগ আকর্ষণ করবে, এটাই স্বাভাবিক।

এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে প্রমাণ করা যে, তার গণতান্ত্রিক উত্তরণ এখনো অন্তর্ভুক্তি, অংশগ্রহণ এবং মৌলিক গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই ভবিষ্যৎ নির্মাণে বিএনপির সামনে এখন একটি ঐতিহাসিক সুযোগ রয়েছে। দলটি চাইলে অতীতের বর্জনমূলক রাজনৈতিক চক্রকে অব্যাহত রাখতে পারে, অথবা একটি আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার নেতৃত্ব দিতে পারে।

দ্বিতীয় পথটি শুধু জাতীয় স্বার্থই নয়, বিএনপির নিজস্ব রাজনৈতিক স্বার্থও রক্ষা করবে। এটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করবে, রাজনৈতিক বৈধতা বৃদ্ধি করবে, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি উন্নত করবে এবং ভবিষ্যতে একই বর্জনমূলক নজির বিএনপির বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকি কমাবে।

সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের সাফল্য কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের বর্জনের মাধ্যমে পরিমাপ করা হবে না। বরং তা পরিমাপ করা হবে এমন প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার সক্ষমতার মাধ্যমে, যা আইনের শাসনের অধীনে সব অংশীজনকে শান্তিপূর্ণ ও প্রতিযোগিতামূলক রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়।

বাংলাদেশ যদি সেই লক্ষ্য অর্জন করতে পারে, তবে তা শুধু গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে না; বরং টেকসই আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও জাতীয় অগ্রগতির জন্যও প্রয়োজনীয় ভিত্তি তৈরি করবে। এটাই কোটি কোটি বাংলাদেশির প্রত্যাশিত ভবিষাৎ আর সেই ভবিষ্যৎ নির্মিত হতে পারে কেবল অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে, বর্জনের মাধ্যমে নয়।

লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব