বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতার গতিময়তা বাড়াতে হবে এসএমই প্লাটফর্ম চালু করা, ডিজিটাল ট্রেডিং ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা, বিনিয়োগকারীদের শেয়ারব্যবস্থা বিষয়ে প্রতিটি ব্রোকার হাউসে যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা অত্যাবশ্যক। পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করা ছাড়া জাতীয় অর্থনীতিতে রক্ত প্রবাহের গতি বেগবান করা অসম্ভব।...
প্রত্যেক দেশের পুঁজিবাজারের স্থিতিশীল অগ্রগতি সংশ্লিষ্ট দেশের শিল্পায়নকে এগিয়ে নিয়ে ওই দেশের জাতীয় অর্থনীতি বিকাশের ক্ষেত্রে রক্ত সঞ্চালন করে থাকে। দুনিয়ার অন্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের তুলনা করলে কোনোভাবেই মেলানো সম্ভব নয়। এর কারণ হচ্ছে, বিশ্বে এমন কোনো দেশ আছে কি যেখানে সকালবেলা অর্থমন্ত্রী কিংবা প্রধানমন্ত্রীর কুশপুত্তলিকা দাহ করলে বিকেলে শেয়ারমূল্য বেড়ে যায় কিংবা বিকেলে উল্লিখিত ব্যক্তিদের কুশপুত্তলিকা দাহ করলে পরের দিন শেয়ারমূল্য বাড়ে? লোকের ধারণা এমন বিষয়ের তাত্ত্বিক ভিত্তি প্রস্তুত করার জন্য হয়তোবা প্রয়াত অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে একটা যোগসাধনের চেষ্টা করলেও করা যেতে পারে। বর্তমানে বেঁচে থাকা অর্থনীতিবিদদের পক্ষে বাংলাদেশে সংঘটিত উপরোল্লিখিত কর্মযজ্ঞের কোনো খোঁড়া যুক্তি দাঁড় করানো সম্পূর্ণভাবেই অসম্ভব। আর এসব কারণেই বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা আনয়নের কাজ জরুরি। সরকার ইতোমধ্যে কমিশনের চেয়ারম্যানসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগও দিয়েছে।
আমরা চলমান শেয়ারবাজারের গতিবিধি যথার্থভাবে বোঝার জন্য গত কয়েকটি অর্থবছরের হালহকিকত একটু বুঝে এলে ভালো হয়। ভয়াবহ কোভিড-পরবর্তী ২০২০-২১ অর্থবছরে পুঁজিবাজারের দৈনিক গড় লেনদেন ছিল প্রায় ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে দৈনিক গড় লেনদেন ছিল ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা (বছরের শুরুতে ভালোই ছিল কিন্তু বছরের শেষের দিকে পতনের প্রবণতা দেখা গেল)। আস্থাহীনতা ও তারল্যসংকটের প্রভাবে ২০২২-২৩ অর্থবছরে পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় প্রায় ১.৩ অংশে নেমে ৬০০-৮০০ কোটি টাকায় চলে আসে। পরবর্তী অর্থবছরে (২০২৩-২৪) দীর্ঘমেয়াদি মন্দাভাব ও বিনিয়োগকারী সংকটের কারণে আরও হ্রাস পেয়ে ওই অর্থ ৫০০-৭০০ কোটি টাকায় নেমে আসে; যা ২০২০-২১ সালের তুলনায় মোটামুটি ১.৪ অংশ।
বিভিন্ন সময়ের গড়ের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, বাজারে স্থবিরতা, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দৈনিক লেনদেনের গড় ৪০০-৬০০ কোটি টাকায় নেমে আসে। সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের (CDBL) তথ্যানুযায়ী, বিও (Beneficiary Owner) হিসাব খোলার প্রবণতা পুঁজিবাজারে ২০২১ জুন থেকে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত ২৮-৩০ লাখ থেকে ৩৭-৩৮ লাখে পৌঁছায়। তবে এ ক্ষেত্রে একটি কথা এড়িয়ে যাওয়া যথার্থ হবে না যে, উল্লিখিত বিও হিসাবধারীরা সব সময় কর্মদিবসে কতটা Active থেকে শেয়ার বেচাকেনায় ভূমিকা রাখছেন, সেটাও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার বিষয়।
এ ক্ষেত্রে আমরা মামুন রশীদের (অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও ফাইন্যান্সিয়াল এক্সেলেন্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান) উক্তি–‘বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের বর্তমান দুর্বলতার সবচেয়ে উদ্বেগজনক প্রতীক হলো ২০২৫ সালে বছরজুড়ে একটি নতুন আইপিও না আসা। এটা নিছক বাজার মন্দা নয়; বরং এটি একটি গভীর কাঠামোগত সংকেত। আইপিও মানে শুধু শেয়ার নয়, এর অর্থ নতুন উদ্যোক্তা, নতুন শিল্প, নতুন কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীল বিনিয়োগ। যখন একটি অর্থনীতিতে দীর্ঘ সময় নতুন আইপিও বন্ধ থাকে, তখন তা বোঝায় যে, উদ্যোক্তারা পুঁজিবাজারকে আর কার্যকর মূলধন সংগ্রহের প্লাটফর্ম হিসেবে বিবেচনা করছেন না। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে শিল্প সম্প্রসারণ, প্রযুক্তি বিনিয়োগ ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের ওপর। অর্থাৎ আইপিও-সংকট আসলে বৃহত্তর অর্থনৈতিক গতিশীলতার সংকট’। বিষয়টি বিশেষভাবে প্রবিধানযোগ্য।
আমরা এ পর্যায়ে যদি বিগত পাঁচ বছরের পুঁজিবাজারের প্রধান সমস্যাগুলো মোটাদাগে চিহ্নিত করি তাহলে দেখতে পাব যে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের লোকসান এবং বাজারে দীর্ঘদিন ধরে সূচকের পতন। যদি ধরে ধরে কথা বলি তাহলে এভাবে বলা যায় যে, অনেক কিছু উপেক্ষা না করেই বলা যায়, পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ অতীতে শুধু ব্যর্থই হয়নি বরং যে কথা নিকট অতীতে বলেছি, কুশপুত্তলিকা দাহভিত্তিক প্রশাসন ও শেয়ারের মূল্য হ্রাস-বৃদ্ধিতে অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছে।
ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের লোকসান তো শুধু শেয়ারবাজারের মধ্যেই থাকে না বরং তার বিস্তৃতি অনেক দূরে। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা সীমিত নিজস্ব অর্থ, ভাইবোন ও নিকটাত্মীয়দের কাছ থেকে ঋণ নেওয়া অর্থই তার পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে এবং যখন শেয়ারবাজার মন্দা অবস্থায় পড়ে যায় তখন তো তারা অনেকে আত্মহত্যার পথও বেছে নেয়!
রাষ্ট্রায়ত্ত লাভজনক প্রতিষ্ঠান কেন জানি পুঁজিবাজারে অংশগ্রহণে অনীহা দেখাচ্ছে। এটা পুঁজিবাজারের জন্য আদৌ ভালো নয়। শুধু সরকারি লাভজনক প্রতিষ্ঠানই নয়, বেসরকারি বড় বড় লাভজনক প্রতিষ্ঠান পুঁজিবাজারে তাদের শেয়ার নিয়ে আসছে না।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিন ধরেই সিন্ডিকেট-ভিত্তিক লেনদেনের অভিযোগ আছে। প্রসঙ্গত, প্রয়াত অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের জাতীয় সংসদে দেওয়া একটি বক্তব্য মনে পড়ে। তিনি বলেছিলেন, ‘পুঁজিবাজারে সংগঠিত লুটপাটের বিষয়ে তদন্ত রিপোর্ট জমা দিয়েছেন এবং অভিযুক্ত রাঘববোয়ালরা তার আশপাশেই আছেন।’ তার এমন বক্তব্যে বুঝতে আর অসুবিধা হয় না যে, রাজনৈতিক এবং ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়াবিহীন সিন্ডিকেট পরিচালনা করা অসম্ভব। সাংবাদিক মুন্নী সাহার একটি উক্তি স্মরণে এসে যায়–‘আপনি কি সেই দরবেশ...’।
তারল্যসংকট পুঁজিবাজারে সংকট সৃষ্টিতে আর একটি বাধা। এজন্য ব্যাংকিং খাতে বজায় থাকে উচ্চ সুদের হার, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ কমে যায় এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ হ্রাস পায়।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রায়শই ঘন ঘন নীতিগত পরিবর্তনসহ ফ্লোর প্রাইস আরোপ ও প্রত্যাহার বিষয়গুলোও পুঁজিবাজারের জন্য মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি করে।
দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানির তালিকাভুক্তি ও অতি মূল্যায়নের বিষয়টি পুঁজিবাজারের শেয়ার ব্যবসার মূলে আঘাত করে। যে অভিঘাতে বিনিয়োগকারীদের রাতারাতি পথে বসতে হয়।
পুঁজিবাজারের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় বাজারে রয়েছে গভীরতার অভাব। ডলারসংকট ও মুদ্রাবিনিময় ঝুঁকি তো এ খাতকে মনে হয় স্থায়ীভাবে ঘ্রাস করে বসে আছে। উল্লিখিত কারণে বিদেশি বিনিয়োগও কমে যায়।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজার ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা বিষয়ে প্রবন্ধে আমার নিজের একটু অভিজ্ঞতা শেয়ার করা যথার্থ বলে মনে করছি। ২০০৭ সালে মশিহর সিকিউরিটি কোম্পানির (তখনকার সময়ের টপ টেনের একটি সংশ্লিষ্ট হাউস) অর্থনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে বেশ কিছু দিন কাজ করেছি। কর্মকালীন বাস্তব অভিজ্ঞতা এ কথা বলে যে, একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিনিয়োগকারী পুঁজিবাজারের শেয়ার ব্যবসা বিষয়ে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতাবিহীন এ ব্যবসায় বিনিয়োগ করে এবং হুজুগে নিজে না বুঝেই শেয়ার বেচাকেনা করে। মূলত, হুজুগটা যারা ছড়ায় তারাই সিন্ডিকেটের প্রতিনিধি এবং অভিজ্ঞতাহীন বিনিয়োগকারীরা যথাযথ অভিজ্ঞতার অভাবে প্রায়শই ঝুঁকিতে পড়ে এবং একসময় বিনিয়োগের অর্থ হারিয়ে নামে রাজপথে বিক্ষোভে!
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতার গতিময়তা বাড়াতে হবে এসএমই প্লাটফর্ম চালু করা, ডিজিটাল ট্রেডিং ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা, করপোরেট ব্যবসায় সুশাসন বিধিমালা শক্তিশালী করাসহ কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, বিও হিসাবের সংখ্যা বৃদ্ধি, বন্ড মার্কেট উন্নয়নের প্রচেষ্টা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যারা জাতীয় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে তাদের পুঁজিবাজারের ব্যবসায় সম্পৃক্ত করাসহ বিনিয়োগকারীদের শেয়ারব্যবস্থা বিষয়ে প্রতিটি ব্রোকার হাউসে যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা অত্যাবশ্যক। পরিশেষে বলব, পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করা ছাড়া জাতীয় অর্থনীতিতে রক্ত প্রবাহের গতি বেগবান করা অসম্ভব এবং স্থিতিশীলতা আনয়নও অসম্ভব।
লেখক: উপ-উপাচার্য (ভারপ্রাপ্ত) ও কোষাধ্যক্ষ
প্রাইম ইউনিভার্সিটি, অর্থনীতিবিদ ও কলামিস্ট
.jpg)
