একটা দেশ ও জাতির অনাগত ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ করতে হলে সবার আগে রাজনীতিবিদদের দূরদৃষ্টি, দূরদর্শিতা ও রাষ্ট্রের সার্বিক উন্নয়নের জন্য বড় স্বপ্ন দেখা অপরিহার্য। স্বপ্ন ছাড়া মানুষের বেঁচে থাকা প্রায় নিরর্থক। স্বপ্ন থাকতেই হবে। ‘মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়’ এই উক্তিটি বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ প্রায়ই বলেন। তিনি বিশ্বাস করেন, মানুষের অস্তিত্ব ও মহত্ত্ব তার স্বপ্নের বিশালতার ওপর নির্ভরশীল। আর দেশ রাজনীতিবিদদের স্বপ্নের সমান বড়। সুতরাং স্বপ্নের বিশালতার ওপর নির্ভর করে রাজনীতিবিদদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করার অবিচল ব্রত ও অঙ্গীকার থাকা অপরিহার্য। দেশ গড়ার স্বপ্ন পূরণে রাজনীতিবিদদের মাঝে দেশের প্রতি তীব্র ভালোবাসা ও কর্ম সম্পাদনের উন্মাদ প্রেরণা সৃষ্টির মাধ্যমে একটি দেশ, একটি জাতি পৃথিবীর মাঝে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে সমাসীন হয়।
আধুনিক চীন মাও সেতুংয়ের স্বপ্নের ডালি। টেংকু আব্দুর রহমানের স্বপ্ন এবং মাহাথির মোহাম্মদ ও তার ডেপুটি আনোয়ার ইব্রাহিমের কর্মযজ্ঞ সম্পাদনের ফসল আজকের মালয়েশিয়া। বর্তমানের সিঙ্গাপুর লি কুয়ানের দৃঢ়সংকল্প ও স্বপ্নের বহিঃপ্রকাশ। নেলসন ম্যান্ডেলার স্বপ্ন ছিল দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে বর্ণবাদের নিপাত করা। তিনি বর্ণবাদ নিপাত করতে পেরেছিলেন দীর্ঘ সংগ্রাম ও ত্যাগের মহিমা উদ্ভাসিত হয়ে ২৯ বছর জেল জীবনের ঘানি টানার পর। এমনিভাবে রাজনীতিবিদদের নিজ দেশ ও জাতিকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ও প্রতিজ্ঞার হাজারো উদাহরণ আছে। অপরপক্ষে, নিজ দেশ-জাতিকে অন্য দেশের কাছে বিক্রি করে দেওয়ার উদাহরণ নেহায়েত কম নেই।
১৯৭১ সালের অব্যবহিত পর হতে গত ৫৫ বছরে এ দেশের জনগণের কাছে রাজনীতিবিদরা কমবেশি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে এ যাবৎ জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে তার ফিরিস্তি টেনে শেষ করা যাবে না। প্রতিশ্রুতির ধারাবাহিকতা জারি রেখে ২০২৬ সালের নির্বাচনে সব দল নির্বাচনি ইশতেহারে কমবেশি চটকদার ও জনতুষ্টিমূলক প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বাস্তবায়ন কতটুকু হবে তা আল্লাহ মালুম। জনগণকে আকৃষ্ট করতে নির্বাচনের আগ মুহূর্তে সব রাজনৈতিক দল ধানাই-পানাই কম করে না। মাদক, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, খুন, ধর্ষণ বন্ধ করা, খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল প্রতিরোধ, লাগামহীন দ্রব্যমূলের ঊর্ধ্বগতি রোধ করা, শিক্ষার মানোন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ আরও কত শত প্রতিশ্রুতিই না দেয়। অর্থনীতি নিয়ে যেসব ভারী ভারী শব্দ ব্যবহার করে, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রছাত্রীদের ভালোমতো বুঝতে বা গলাধঃকরণ করতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়, সেখানে গ্রামের হতদরিদ্র শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত মানুষগুলো কি-বা বুঝবে।
বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার বেশ কিছু নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে উল্লিখিত প্রতিশ্রুতিগুলোর মধ্যে অন্যতম বললে ভুল হবে না। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু গত ১১ মার্চ বলেন, ‘আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে অগ্রাধিকারভিত্তিতে ২৫ কোটি গাছের চারা রোপণ করা হবে। তিনি আরও বলেন, বন, বন্যপ্রাণী, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ‘ন্যাশনাল গ্রিন মিশন’ নামে পাঁচ দফা পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।’
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণ করার কথা জানা যায়। ১৯৬০-এর দশকে আলজেরিয়ার প্রয়াত রাষ্ট্রপতি হুয়ারি বৌমেদিয়েন, মরুকরণ প্রতিরোধ, মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি ও টেকসই ভূমি ব্যবহারের জন্য ‘আলজেরিয়া গ্রিন ড্যাম’ নামে প্রকল্প শুরু করেছিলেন। কিন্তু বড় ধরনের লক্ষ্য, ভুল গাছ নির্বাচন, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, মাঝেমধ্যে কাজ বন্ধ রাখা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ’৯০-এর গৃহযুদ্ধের জন্য এ প্রকল্প আশানুরূপ সফলতা পায়নি। তবে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও সাহারা মরুভূমির লু হাওয়া থেকে বাঁচতে এ প্রকল্প ২০০০ সালে পুনরায় চালু করা হয়েছে। আলজেরিয়ার মতো একই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে বিশেষত সাহারা মরুভূমির মরুকরণ প্রতিরোধে ২০০৫ সালে আফ্রিকান ইউনিয়নের নেতৃত্বে সাহারা ও সাহেল অঞ্চলে ‘গ্রেট গ্রিন ওয়াল’ তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। এর লক্ষ্য ছিল জিবুতির রাজধানী জিবুতি থেকে সেনেগালের ডাকার পর্যন্ত সমগ্র সাহেলজুড়ে একটি বৃক্ষ প্রাচীর তৈরি করা। ‘গ্রেট গ্রিনওয়াল বা সবুজ মহাপ্রাচীর’ প্রকল্পের অংশ হিসেবে ১৯৭৮ সাল থেকে চীন প্রায় ৬৬ বিলিয়ন বৃক্ষরোপণ করেছে। এ কাজের প্রধানতম লক্ষ্য হলো গোবি ও তাকলামাকান মরুভূমি বিস্তারকে ধীর করে দেওয়া। এ ছাড়া চীন ২০৫০ সালের মধ্যে আরও ৩৪ বিলিয়ন বৃক্ষরোপণের প্রাক্কলন করেছে। চীনের বৃক্ষরোপণ প্রকল্পের বয়স ৪৮ বছর, আলজেরিয়া ৫৬ বছর এবং আফ্রিকান ইউনিয়নের ২১ বছর হয়েছে। আমাদের দেশে এ প্রকল্প সবেমাত্র শুরু হয়েছে। পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের আন্দাজ করা হলে, ২০২৬ সালের মধ্যে ৫ কোটি বৃক্ষরোপণ করতে হবে। বর্ষার মৌসুম বৃক্ষরোপণের উপযুক্ত সময়। কিন্তু কত কোটি চারা রোপণের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে বা আদৌ প্রস্তুত আছে কি না, এ ব্যাপারে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। ৫ কোটি সংখ্যা একেবারে ছোটও না। এটা নির্মম সত্য যে, আমাদের দেশে দীর্ঘমেয়াদি কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের হার খুবই কম। এই প্রকল্পগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতি এবং প্রতিজ্ঞার শিকলে বন্দি থাকে। কোনো প্রকল্পের সুফল পেতে হলে দীর্ঘমেয়াদে কাজ করার বিকল্প নেই। অন্যান্য দেশে ‘হাকিম নড়ে তো হুকুম নড়ে না।’ কিন্তু আমাদের দেশে হাকিম এবং হুকুম দুটোই নড়ে যায়। সঙ্গত কারণে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের ফলাফল শূন্য থেকে যায়।
বাংলাদেশে বর্তমান বনভূমির পরিমাণ ১০ থেকে ১৫ শতাংশের মধ্যে। রংপুর ও রাজশাহী বিভাগে বনভূমির পরিমাণ দেশের অন্যান্য বিভাগ থেকে সর্বনিম্নে আছে। শুষ্ক মৌসুমে এই দুই বিভাগে অস্বাভাবিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ ধ্বংসের সঙ্গে কৃষি খাতও মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। সুতরাং, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার জন্য বৃক্ষরোপণ মোটাদাগে সফলতা বয়ে আনবে বলে আশা করা যায়। আবার বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বৃদ্ধিতেও সহায়ক হবে। শীতকাল ও গ্রীষ্মকালে ফারাক্কা ও তিস্তা দিয়ে পানি প্রবাহ হ্রাস পেলেও বৃষ্টির কারণে পানি-সংক্রান্ত সমস্যাগুলো অনেকাংশে পুষিয়ে নেওয়া যাবে। ফলে নদী খননপূর্বক নাব্য বৃদ্ধি করে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করা গেলে পরিবেশগত ঝুঁকি, অত্যধিক তাপমাত্রা রোধ এবং কৃষি ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসবে। অবশ্যই সবকিছু নির্ভর করছে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির সফলতার ওপর।
বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার হলেও এটাকে দলমতনির্বিশেষে সমর্থন করে জাতীয় ইস্যু হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। অতিবৃষ্টি-অনাবৃষ্টির কারণে সৃষ্ট বন্যা ও খরা, অস্বাভাবিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি, ঋতু পরিবর্তন, জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মুখ্য নিয়ামক হলো বৃক্ষনিধন এবং পর্যাপ্ত বনভূমি না থাকা। সুতরাং এখনই দীর্ঘমেয়াদে পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে সামনের দিনগুলোতে আরও ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি নিয়ে অনেকেই নানাভাবে সমালোচনা করছে। কিন্তু বৃক্ষরোপণ ছাড়া পরিবেশে ভারসাম্য নিয়ে আসা সম্ভব নয়। এ উদ্যোগের সফলতা ও ব্যর্থতা নির্ভর করছে রাজনীতিবিদদের সদিচ্ছা, দূরদর্শিতা, দেশের প্রতি তীব্র ভালোবাসা এবং কর্ম সম্পাদনের উন্মাদ প্রেরণায়। তা না হলে বৃক্ষরোপণের এই মহান উদ্যোগও ইতিহাসে ‘তুঘলকি কাণ্ড’ হিসেবে লিপিবদ্ধ থাকবে।
লেখক: কলামিস্ট ও সংবাদ বিশ্লেষক
[email protected]