২০১৯ সালে কাজ শুরু হয়েছে। তিনবারে চার বছর সময় বাড়ানো হয়েছে, যার মেয়াদ ২০২৬ সালের ৩০ জুনে শেষ হয়েছে। কিন্তু এ পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৩১ শতাংশ, যা সন্তোষজনক না। আট বিভাগীয় শহরে অবকাঠামো (বিল্ডিং) নির্মাণকাজ এখনো শেষ হয়নি। এক টাকারও কোনো যন্ত্রপাতি ও আসবাবপত্র কেনা হয়নি। এখন আবার দুই বছর সময় বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। খরচও বাড়ছে ১ হাজার ৩০ কোটি টাকা। ফিজিবিলিটি স্টাডি (সম্ভাব্যতা সমীক্ষা) করার পরও প্রকল্পের এ দশা।
ভবন নির্মাণকাজে নেই কোনো প্রকৌশলী। প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসেবে প্রকৌশলী নিয়োগ করার কথা থাকলেও সেখানে চিকিৎসক নিয়োগ করা হয়েছে। এটা হচ্ছে ‘আট বিভাগীয় শহরে পূর্ণাঙ্গ ক্যানসার, হৃদরোগ এবং কিডনি চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন’ প্রকল্পের বাস্তব চিত্র।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
প্রকল্পটির বাস্তবায়নকারী সংস্থা হচ্ছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। জানা গেছে, দেশে প্রতিবছরে প্রায় দেড় লাখ মানুষ নতুন করে ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছেন। মারা যান এক লাখের বেশি। অথচ রাজধানীতে জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ছাড়া সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে কোনো বিশেষায়িত ক্যানসার সেবাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। বাধ্য হয়ে অনেকেই বিদেশে যাচ্ছেন, হচ্ছেন নিঃস্ব। এই অবস্থা থেকে দেশের মানুষকে রক্ষা করতে এবং ঢাকায় ক্যানসার, কিডনি ও হৃদরোগীদের চাপ এড়াতে প্রতিটি বিভাগীয় শহরে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করার উদ্যোগ নেয় সরকার।
প্রকল্পের লক্ষ্য সারা দেশের ক্যানসার, কিডনি ও হৃদরোগে আক্রান্ত বিশাল জনগোষ্ঠীকে উন্নত চিকিৎসাসেবার আওতায় আনা ও বিদেশনির্ভরতা বন্ধ করা। এ জন্য ২০১৯ সালের ১৪ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়। এর খরচ ধরা হয়েছিল ২ হাজার ৩৮৮ কোটি টাকা। তিন বছরে অর্থাৎ ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২২ সালের জুনে এটি বাস্তবায়ন করার জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়। এরপর তিনবার সময় বাড়ানো হয়। খরচও বেড়ে ঠেকেছে ৩ হাজার ৪৩৩ কোটি টাকায়।
প্রকল্পের প্রধান খরচ ধরা হয় ঢাকাসহ আট বিভাগীয় শহরে প্রায় দুই লাখ বর্গমিটার ভবন নির্মাণে। এতে খরচ ধরা হয় ১ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা, যা মোট খরচের ৫৫ শতাংশ। সাতটি বিভাগীয় শহরে ১৫ তলা করে নির্মাণ করা হবে সাতটি ভবন এবং ঢাকা বিভাগের উত্তরায় কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালের পাশে ভবন নির্মাণ করা হবে ১২ তলা। এসব বিশেষায়িত চিকিৎসা কেন্দ্রের জন্য ক্যানসার চিকিৎসার যন্ত্রপাতি কেনার কথা ২৩ হাজার ৮টি। তাতে খরচ ধরা হয়েছে ৮৫৩ কোটি টাকা, যা মোট খরচের ২৫ শতাংশ। ১৬৯ কোটি টাকায় কিডনি চিকিৎসার যন্ত্রপাতি কেনার কথা ১৪ হাজার ৯৬৭টি। হৃদরোগের চিকিৎসার জন্য ৩৬৯ কোটি টাকায় ২১ হাজার ৪৫৪টি যন্ত্রপাতি কেনার কথা।
৩ বছরের কাজ ৯ বছরে
আইএমইডির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৭৩টি প্যাকেজের ক্রয় পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে পূর্তকাজ ১২০টি, পণ্য কেনা ৫৫টি ও সেবা ক্রয় ৩টি। অবকাঠামো নির্মাণের কাজটি করছে গণপূর্ত অধিদপ্তর। কিন্তু বাস্তবায়নকারী সংস্থা হচ্ছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। দুই সংস্থার মধ্যে নেই কোনো সমন্বয়। ফলে কাজে কোনো গতি আসেনি। নির্ধারিত তিন বছরের পর চার বছর সময় বাড়ানো হয়েছে, যার মেয়াদ গত জুনে শেষ হয়েছে। কিন্তু এ পর্যন্ত অগ্রগতি হয়েছে ৩১ শতাংশ। টাকা খরচ হয়েছে ১ হাজার ৫৮ কোটি টাকা। বাকি কাজ শেষ করার জন্য দুই বছর সময় (২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত) বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। খরচও বাড়ছে ১ হাজার ৩০ কোটি টাকা। এ পর্যন্ত ঢাকা বিভাগের কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালের অগ্রগতি হয়েছে ৫৯ শতাংশ। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৩৮ শতাংশ, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৩৮ শতাংশ। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কাজ ৩৩ শতাংশ, সিলেটের ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অগ্রগতি ৬৩ শতাংশ, বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অগ্রগতি ৭৫ শতাংশ, রংপুর মেডিকেল হাসপাতালের ৪৯ শতাংশ ও ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের অগ্রগতি হয়েছে ২৪ শতাংশ।
অবকাঠামো নির্মাণকাজে নেই কোনো প্রকৌশলী
আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পের কাজ দেখভাল করতে তিন মাস পরপর প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিআইসি) ও প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটি (পিএসসি) করার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ ৮৪ মাসে প্রকল্প সংশোধনের আগে মাত্র তিনটি পিআইসি ও ১১টি পিএসসি সভা হয়েছে। ৫০ কোটি টাকার বেশি প্রকল্পের জন্য পূর্ণকালীন অভিজ্ঞ ও যোগ্য প্রকৌশলীকে পিডি হিসেবে নিয়োগের বিধান থাকলেও প্রথম প্রকল্প পরিচালক ছিলেন একজন চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এফ এম মুছা আল মানসুর। দ্বিতীয় জন ছিলেন সহযোগী অধ্যাপক ডা. খান মোহাম্মদ আরিফ ও তৃতীয় জন সহকারী অধ্যাপক ডা. এস এম মাসুদ আলম। ২০২৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে পিডির দায়িত্বে আছেন ডা. মো. তৌফিক হাসান ফিরোজ। প্রকল্পটির প্রধান অঙ্গ হচ্ছে অবকাঠামো নির্মাণকাজ। কিন্তু উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রণয়ন থেকে শুরু করে সিভিল কাজের বিভিন্ন ধাপে কারিগরি ত্রুটি, নকশার জটিলতা, কাজের মান নিয়ন্ত্রণ বুঝে নেওয়ার মতো কোনো প্রকৌশলী নিয়োগ দেওয়া হয়নি। পিডিসহ মোট ১৫ জন কাজ করলেও প্রকল্প অফিস কাঙ্ক্ষিত সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি। ঠিকাদার ও গণপূর্ত বিভাগের সঙ্গে বসে কারিগরি বিষয় বুঝে নেওয়ার মতো দক্ষ জনবলও প্রকল্প অফিসে নেই। এটি সার্বিক প্রকল্প বাস্তবায়ন নীতির পরিপন্থি।
বিভাগীয় শহরগুলোতে ক্যানসার, কিডনি ও হৃদরোগ মেডিকেল সেন্টার স্থাপন করা হলে আধুনিক যন্ত্রপাতিতে রোগীদের আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। বিশেষায়িত চিকিৎসায় নতুন করে উন্নতি হবে। অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবেন জনগণ। বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা কমবে। তার পরও গণপূর্ত ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের টানাপোড়েন প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা যন্ত্রপাতি, আসবাবপত্র কেনার কাজ এখনো শুরু হয়নি। তাই প্রকল্পের ভবন নির্মাণ শেষ হলেও হাসপাতালগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করতে আরও দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। চিকিৎসা সরঞ্জাম আমদানিতে বিলম্ব হলে হাসপাতালগুলো সময়মতো কার্যক্রম শুরু করা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই বাস্তবধর্মী কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন প্রয়োজন।
ব্যয়বহুল নির্মাণসামগ্রী কেনায় প্রশ্ন
ভবনের ডিজাইন আকর্ষণীয় হলেও প্রতিটি ফ্লোরে বাড়তি রড দেখা গেছে। তা কাটা হয়নি। ঢালাইয়ে জয়েন্ট, ফিনিশিং ভালো হয়নি। এটা গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। কিছু ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় খরচ করা হচ্ছে। ব্যয়বহুল গ্রানাইট পাথর, অলংকারধর্মী ফলস ওয়াল এবং বাইরের দেয়ালে ফলস ব্রিক টাইলস ব্যবহারের যৌক্তিকতা কতটুকু, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। একই সঙ্গে নির্মাণসামগ্রীর মান, কিউরিং, গ্রেডেশন এবং বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) অনুসরণে কিছু কারিগরি দুর্বলতা রয়েছে। সার্বিক পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি রয়েছে।
সার্বিক ব্যাপারে প্রকল্প পরিচালক ডা. মো. তৌফিক হাসান ফিরোজ খবরের কাগজকে বলেন, ‘প্রথমে আট বিভাগীয় শহরে ১০০ শয্যার পূর্ণাঙ্গ ক্যানসার চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন প্রকল্প ছিল। ২০১৯ সালে কাজ শুরু হয়। ২০২২ সালের ৩০ নভেম্বর প্রকল্প সংশাধন করে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়। এরপর কিডনি ও হৃদরোগের চিকিৎসার জন্য কেন্দ্র নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে ২০২৪ সালের ২৮ মার্চ প্রকল্পটি দ্বিতীয়বারের মতো সংশোধন করা হয়। সময় বাড়ানো হয় ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত। এ সময় খরচ বাড়িয়ে ধরা হয় ৩ হাজার ৪৩৩ কোটি টাকা। এরপর ২০২৫ সালের ১৭ জুলাই তৃতীয়বারের মতো সংশোধন করে সময় বাড়িয়ে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়। এ পর্যন্ত আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ৩১ শতাংশ। বাকি কাজ শেষ করার জন্য আরও দুই বছর সময় বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। ৩০ শতাংশ খরচ বাড়ানো হচ্ছে। এখনো লিফটসহ কোনো যন্ত্রপাতি ও আসবাবপত্র কেনা হয়নি। এসব কিনতে অনেক টাকা লাগবে। ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে কেনা যাচ্ছে না। করোনা, জমি অধিগ্রহণ, প্রকল্প সংশোধন ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে কাজের গতি কম হয়েছে।’
এক প্রশ্নের উত্তরে এই সহযোগী অধ্যাপক বলেন, ‘এর আগে তিনজন ডাক্তার পিডি ছিলেন। আমি চতুর্থ পিডি। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছিল। পরিকল্পনায় কোনো ভুল ছিল না। সময়ের চাহিদায় কিডনি ও হৃদরোগ কেন্দ্র নির্মাণ যোগ করা হয়েছে।’
অন্য এক প্রশ্নের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘আমি ডাক্তার হলেও সব কাজ বুঝে নিচ্ছি। কোনো সমস্যা হচ্ছে না। নিজে নির্মাণাধীন ভবনের কাজ তদারকি করছি। কোনো সমস্যা হচ্ছে কি না, তা দেখার জন্যই আইএমইডিকে নিবিড় পরিবীক্ষণ রিপোর্ট করতে বলা হয়েছে। কোনো ভুলত্রুটি পেলে তা সংশোধন করা হচ্ছে।’
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘এ ধরনের প্রকল্পের বড় সমস্যা হলো ঠিকমতো ফিজিবিলিটি স্টাডি না হওয়া। কাজের মধ্যে সমন্বয় না থাকা। অর্থের ঘাটতি থাকলেও দেদার খরচ করা হয়। ঠিকমতো পিডি নিয়োগ না হওয়ায় বাস্তবায়নে সমস্যা হচ্ছে। জনগণের করের টাকার অপচয় হচ্ছে, যা অর্থনীতির জন্য কোনোভাবেই কাম্য নয়। তাই প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের দক্ষতা বাড়ানো ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে অর্থের অপচয় রোধ হবে।’