দিল্লি ও ঢাকা–দুই রাজধানীর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে তোলপাড় সৃষ্টি করেছেন বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ভারতে নির্বাসিত এই নেত্রী আগামী ডিসেম্বর মাসের দিকে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন।
তিনি জানিয়েছেন, দেশে ফিরে তিনি আদালতের মুখোমুখি হবেন এবং আত্মসমর্পণ করবেন।
শেখ হাসিনার এই আকস্মিক ঘোষণা বাংলাদেশ এবং ভারত–উভয় দেশের জন্যই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বার্তা বহন করছে। বিশ্লেষকদের মতে, তার এই মন্তব্যের পর শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ নিয়ে নয়াদিল্লির দীর্ঘদিনের নীরবতা বা ধোঁয়াশাপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখা এখন বেশ কঠিন হয়ে পড়বে। বাংলাদেশ সরকার এখন ভারতকে বলতে পারবে, যেহেতু শেখ হাসিনা নিজেই আদালতে আত্মসমর্পণ করতে চান, তাই তাকে দ্রুত ফেরত পাঠানো হোক। গতকাল রবিবার ভারতের সংবাদ সংস্থা ‘স্ক্রল ডট ইন’-এর এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে।
সম্প্রতি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক দীর্ঘ টেলিফোন সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পরিকল্পনার কথা জানান। প্রায় এক ঘণ্টার এই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘দেশে ফেরার পর তারা আমাকে গ্রেপ্তার করতে পারে, এমনকি মেরেও ফেলতে পারে। তাও আমাকে যেতে হবে। মৃত্যু যদি আসে, তবে আমি নিজের মাটিতেই মরতে চাই।’ একই সঙ্গে তার অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশের আদালতে হওয়া বিচার ও সাজাকে তিনি ‘প্রহসনমূলক’ বলে আখ্যায়িত করেন।
এর আগেও শেখ হাসিনা বিভিন্ন সময়ে দেশে ফেরার কথা বলেছেন। গত জুনের শেষে এনডিটিভি এবং একটি নিবন্ধে তিনি চলতি বছরের মধ্যেই দেশে ফেরার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তবে এবারের রয়টার্সের সাক্ষাৎকারটি দুটি কারণে আলাদা। প্রথমত, তিনি এবারই প্রথম ‘ডিসেম্বর’ মাসের একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমা উল্লেখ করেছেন। দ্বিতীয়ত, অডিও বা লিখিত বার্তার বাইরে গিয়ে তিনি সরাসরি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেন।
যদিও বাংলাদেশের আদালত শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে রেখেছেন, তবুও গত শুক্রবারের ছুটির দিনে এই সাক্ষাৎকারটি দেশের রাজনৈতিক মহলে প্রধান আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়। তবে শেখ হাসিনা সত্যিই ডিসেম্বরে ফিরবেন কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মনে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
অধিকাংশ বিশ্লেষক মনে করছেন, এটি আসলে বাস্তবে ফেরার কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নয়, বরং হতাশ ও বিপর্যস্ত আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের মনোবল চাঙা করার একটি কৌশল। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর থেকে আওয়ামী লীগ এক চরম নেতৃত্ব সংকটে ভুগছে। তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় শুরুর দিকে কিছুদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব থাকলেও এখন তিনি দৃশ্যপটের আড়ালে চলে গেছেন। ফলে তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের ধরে রাখার মতো শেখ হাসিনা ছাড়া দলে দ্বিতীয় কোনো মুখ নেই।
আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য মহিবুল হাসান চৌধুরীর দেওয়া তথ্যমতে, দলটির ১৪০ জনেরও বেশি সাবেক সংসদ সদস্য, মেয়র ও চেয়ারম্যান বর্তমানে কারাগারে আছেন। গ্রেপ্তার হয়েছেন হাজার হাজার কর্মী। দলটির দাবি অনুযায়ী, গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে দেড় বছরে তাদের বহু কর্মী নিহত হয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে দলের শীর্ষ নেতারা যখন বিদেশে নিরাপদ আশ্রয়ে আছেন, তখন দেশের ভেতরে সাধারণ কর্মীরা চরম ঝুঁকিতে দিন কাটাচ্ছেন। ফলে কর্মীদের ক্ষোভ ও হতাশা দূর করতেই শেখ হাসিনা এই ঘোষণা দিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই ঘোষণার পেছনে টাইমিং বা সময় নির্বাচনও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দুই বছর পূর্তি বা গণ-অভ্যুত্থানের মাস হিসেবে জুলাই মাস উদযাপন করা হচ্ছে। এই রাজনৈতিক প্রচারের মধ্যেই শেখ হাসিনা নিজের ফেরার বার্তা দিয়ে আলোচনার মোড় ঘুরিয়ে দিতে চেয়েছেন।
পাশাপাশি সামনেই স্থানীয় সরকার বা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। আওয়ামী লীগের ওপর নানা বিধিনিষেধ থাকলেও স্থানীয় নির্বাচনে আইনি প্রক্রিয়া মেনে দলটির নেতাদের অংশ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, স্থানীয় নির্বাচনের আগে তৃণমূলের কর্মীদের মাঠে নামাতে এবং দলের ভিত্তি পুনর্গঠন করতেই শেখ হাসিনা এই রাজনৈতিক চাল চেলেছেন।
তবে এই সাক্ষাৎকার বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। ঢাকা দীর্ঘদিন ধরেই শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর জন্য নয়াদিল্লির কাছে আনুষ্ঠানিক দাবি জানিয়ে আসছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ সম্প্রতি জানিয়েছেন, শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করা হয়েছে।
ভারত এত দিন এই বিষয়ে বেশ সতর্ক অবস্থান নিয়ে আসছিল। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল গত এপ্রিল মাসে জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ অনুরোধটি ভারতের আইনি প্রক্রিয়ার অধীনে পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। সাধারণত কোনো রাজনৈতিক নেতা অন্য দেশে রাজনৈতিক আশ্রয় বা ‘অ্যাসাইলাম’ চাইলে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া জটিল হয়ে পড়ে। কিন্তু শেখ হাসিনা নিজেই যেহেতু প্রকাশ্যে দেশে ফিরে গ্রেপ্তার বা মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, তাই ভারতের জন্য এখন রাজনৈতিক আশ্রয়ের অজুহাতে বিষয়টিকে ঝুলিয়ে রাখা কঠিন হবে। বাংলাদেশ এখন ভারতকে বলতে পারবে, যেহেতু শেখ হাসিনা নিজেই আদালতে আত্মসমর্পণ করতে চান, তাই তাকে দ্রুত ফেরত পাঠানো হোক। তবে শেখ হাসিনা শেষ পর্যন্ত ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন কি না, কিংবা ভারত তাকে হস্তান্তর করবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে। সূত্র: স্ক্রল ডট কম