জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাককানইবি) নাট্যকলা ও পরিবেশনা বিদ্যা বিভাগের উদ্যোগে শুরু হয়েছে সাত দিনব্যাপী ৪র্থ আন্তর্জাতিক নাট্যোৎসব-২০২৬। বিভাগের স্নাতকোত্তর ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের নির্দেশনা শাখার শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পরিচিত করে তোলার লক্ষ্যে এ আয়োজন করা হয়েছে।
রবিবার (১২ জুলাই) সন্ধ্যা ৭ টায় নবগঠিত ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ইস্রাফীল এই নাট্যোৎসবের উদ্বোধন করেন।
এ সময় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন, বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইমদাদুল হুদা এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের অধ্যাপক ড. আরিফ হায়দার।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন সহকারী অধ্যাপক মো. মাজহারুল হোসেন তোকদার। নাট্যকলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. ইসমত আরা ভূঁইয়া ইলার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানটির সঞ্চালনা করেন সহযোগী অধ্যাপক ড. সৈয়দ মামুন রেজা। অনুষ্ঠানে বিশেষ নাট্যজন সম্মাননা দেওয়া হয় বাংলাদেশের প্রখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব আবুল হায়াতকে।
উদ্বোধনী বক্তব্যে অধ্যাপক ড. মো. ইস্রাফীল বলেন, আবুল হায়াত আমাদের দেশের অভিনয়ের বড় একজন শিল্পী। এত বড় শিল্পী হওয়া সহজ নয়। এর জন্য আধ্যাত্মিকতা প্রয়োজন, সাধনা প্রয়োজন। আবুল হায়াত ভাই সেটা অর্জন করেছেন। আপনারা যারা আবুল হায়াত ভাইকে দেখেন টেলিভিশনে অভিনয় করতে, আমরা যারা নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষার্থী শিক্ষক ও গবেষক আছি, তাদের গবেষণা করতে হবে আবুল হায়াতকে নিয়ে। অভিনয় শুধু করলেই হবে না, চরিত্র বুঝতে হবে, পরিস্থিতি বুঝতে হবে। ফুটবল খেলার সঙ্গে তুলনা করলে আবুল হায়াত সেই খেলার মেসি কিংবা রোনালদো। আসাদুজ্জামান নূর, আবুল হায়াত এনাদের মতো প্রখ্যাত অভিনেতাদের কাছ থেকে শেখার আছে অনেক কিছু।
এ সময় তিনি কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃত্যকলা বিভাগ খোলার জন্য উপাচার্যকে অনুরোধ করেন এবং সংগীত বিভাগ, নাট্যকলা বিভাগ ও নৃত্যকলা নিয়ে পারফরমিং আর্টস বা পরিবেশন কলা অনুষদ নামে নতুন একটি অনুষদ খোলার পরামর্শ দেন।
সংক্ষিপ্ত বক্তব্য শেষে তিনি এই নাট্যোৎসবের সাফল্য কামনা করে উদ্বোধন ঘোষণা করেন।
নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে আবুল হায়াত বলেন, আজকের এই সম্মাননা আমার কাছে শুধু সম্মাননা নয়, সকলের ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। শিল্প মানে শিক্ষা। আমি এখনো শিখি। আজকে ত্রিশালের মাটিতে দাঁড়িয়ে বারবার মনে পড়ছে আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কথা। তিনি ছিলেন বিদ্রোহী, সাহিত্যের স্মারক। আমি নাটককে ভালোবাসি। ১০ বছর বয়সে নাটক শুরু করেছিলাম, যা এখন আমার রক্তের বিষ অর্থাৎ সমগ্র রক্তে মিশে গেছে। হয়তো পরিবার থেকেই এসেছে এই ভালোবাসা। কারণ আমার বাবাও সংস্কৃতিমনা ছিলেন। ১৯৫৪ তে আমি প্রথন মঞ্চে উঠি। আর এখন আমার অভিনয়ে বয়স ৭২ বছর আর আমার বয়স এখন ৮১ এর বেশি।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, অভিনয় মানেই শুধু মঞ্চে দাঁড়িয়ে কথা বলা, চেহারা দেখানো নয়। অভিনয় মানে শিল্প। অভিনয় মানে বাস্তবতা তুলে ধরা। জীবনে সাফল্য আসবেই, কিন্তু সাফল্যের চেয়ে বড় হলো সততা, নিষ্ঠা। নাটক মানুষকে মানুষ হতে শেখায়, অন্যের আনন্দ অনুভূতি দুঃখ অনুভূত করতে শেখায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখায়। মনে রাখবে, অভিনয় হলো মিথ্যা। কিন্তু অভিনেতা কিংবা নাট্যকলার শিক্ষার্থী হিসেবে সেই মিথ্যাটাকে বাস্তবিক করে তুলতে হবে, সত্ত বানাতে হবে এবং বিশ্বাসযোগ্য করে গড়ে তুলতে হবে। এসব করতে পারলেই একজন প্রকৃত অভিনেতা হতে পারবে।
এ সময় তিনি তার নাট্যজীবনের বিভিন্ন স্মৃতিচারণ করেন।
উপস্থিত সকলের প্রতি সম্মান জানিয়ে প্রধান অতিথি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন বলেন, আবুল হায়াতকে এই বিদ্যাপীঠে আনতে পেরে আমরা ধন্য। উনি আমার স্বপ্ন পুরুষ। আমি তার অভিনয় দেখতাম টিভিতে আর মুগ্ধ হতাম। আমি কখনো তাকে অভিনেতা হিসেবে দেখিনি। আমি তাকে দেখেছি বাস্তববাদী, সত্য ও জীবনচরিতের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে। সাদা কালো টিভিতে শুরু হয়েছিল তার নাটক দেখা। আর আজ তাকে চোখের সামনে দেখে আমি আবেগাপ্লুত।
নতুন বিভাগ ও অনুষদ খোলার বিষয়ে তিনি বলেন, এই বিষয়টা আমি একান্তভাবে ভাববো এবং আলোচনা করে সময়ের প্রয়োজনে খোলার উদ্যোগ গ্রহণ করবো।
আয়োজকরা জানান, নাট্যচর্চার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ও আন্তর্জাতিক নাট্যচর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত করাই এই উৎসবের অন্যতম লক্ষ্য।
উল্লেখ্য, সাত দিনব্যাপী এই নাট্যোৎসব চলবে ১৮ জুলাই পর্যন্ত এবং প্রতিদিন একটি করে নাটক মঞ্চায়িত হবে। নাট্যোৎসবে অংশ নিতে ঢাকা থেকে এসেছে নাট্যদল ক্ষ্যাপাটে। এছাড়াও ভারত থেকে আসবে আরও একটি নাট্যদল।
অন্তরা/