প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান আজ সোমবার (১৩ জুলাই) বরিশাল সফরে আসছেন। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর বিএনপি চেয়ারম্যানের এটিই প্রথম বরিশাল সফর। প্রধানমন্ত্রীর দিনব্যাপী এ সফরকে ঘিরে বরিশালজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। বিশেষ করে স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা ও আনন্দের জোয়ার বইছে।
দলীয় সূত্র জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে কয়েক দিন ধরে বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনগুলো প্রস্তুতি সভা, আনন্দ মিছিল ও বিভিন্ন সাংগঠনিক কর্মসূচি পালন করেছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ অনুযায়ী কোথাও তোরণ, ব্যানার বা ফেস্টুন ব্যবহার করা হচ্ছে না। তবে গৌরনদী থেকে বরিশাল পর্যন্ত প্রায় ৪০ কিলোমিটার সড়কের দুই পাশে মানবপ্রাচীরের মাধ্যমে তাকে স্বাগত জানানো হবে। এ সফরকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করেছে প্রশাসন। কর্মসূচিস্থলগুলোতে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। প্রশাসনের বিভিন্ন সংস্থা সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করছে। এদিকে প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ঘোষণা করবেন–এ প্রত্যাশা করছেন এই বিভাগের মানুষ।
দলীয় সূত্র আরও জানিয়েছে, গত শনিবার (১১ জুলাই) রাতে বরিশাল সার্কিট হাউসে অনুষ্ঠিত সমন্বয় সভা হয়। এতে তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট মজিবর রহমান সরোয়ার ও মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন, জেলা পরিষদের প্রশাসক আকন কুদ্দুসুর রহমানসহ প্রশাসন ও দলের অন্য শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
সভা শেষে অ্যাডভোকেট মজিবর রহমান সরোয়ার বলেন, সফরকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা এড়াতে নেতা-কর্মীদের শৃঙ্খলা মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত দায়িত্বের বাইরে কোনো কর্মসূচিতে অংশ না নেওয়ারও আহ্বান জানানো হয়েছে। এর মধ্যে বরিশাল নগরের ত্রিশ গোডাউন এলাকায় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া প্রায় ৫০০ নেতা-কর্মীকেও ওই কর্মসূচির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বলেন, কয়েক দিন ধরেই সফর সফল করতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও সমন্বয় করা হচ্ছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, প্রধানমন্ত্রীর সফর শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হবে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে গতকাল রবিবারও নগরজুড়ে বিএনপির বিভিন্ন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। সকালে বরিশাল জেলা (দক্ষিণ) বিএনপির উদ্যোগে নগরের অশ্বিনী কুমার হলসংলগ্ন দলীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও সংসদ সদস্য মজিবর রহমান সরোয়ারের নেতৃত্বে আনন্দ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে আবার দলীয় কার্যালয়ের সামনে গিয়ে সমাবেশে মিলিত হয়। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন জেলা (দক্ষিণ) বিএনপির আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য আবুল হোসেন।
বক্তব্য দেন কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক আকন কুদ্দুসুর রহমান, কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এবায়েদুল হক চাঁন ও মেজবাউদ্দিন ফরহাদ, জেলা বিএনপির সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট আবুল কালাম শাহীন, মহানগর বিএনপির সাবেক সদস্যসচিব মীর জাহিদুল কবির, সাবেক যুগ্ম সম্পাদক আনোয়ারুল হক তারিন, সৈয়দ আকবর ও ফারহানা তিথি।
সমাবেশে আকন কুদ্দুসুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়–এমন কোনো আয়োজন রাখা হয়নি।
অন্যদিকে একই সময়ে মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আফরোজা খানম নাসরিনের উদ্যোগে পৃথক একটি আনন্দ র্যালি বের করা হয়।
জেলা প্রশাসক মামুন খন্দকার বলেন, গৌরনদীতে প্রধানমন্ত্রী একযোগে দুই হাজার গাছের চারা রোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন। এ ছাড়া ফ্যামিলি কার্ডের উপকারভোগীদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর মতবিনিময়ের কর্মসূচিও রয়েছে।
বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফর নির্বিঘ্ন করতে প্রশাসনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। কর্মসূচি স্থলগুলোর নিরাপত্তার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা সংস্থাগুলো গ্রহণ করেছে।
উন্নয়ন ঘোষণার প্রত্যাশায় দক্ষিণাঞ্চল
প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশা বেড়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীদের আশা, এ সফরে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্পের ঘোষণা আসবে। এ বিষয়ে বরিশাল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি এবায়েদুল হক চান বলেন, পদ্মা সেতু চালুর পর ঢাকা-কুয়াকাটা মহাসড়কে যানবাহনের চাপ অনেক বেড়েছে। সরু সড়কের কারণে যানজট ও দুর্ঘটনাও বেড়েছে। মহাসড়কটি ছয় লেনে উন্নীত হলে যোগাযোগের পাশাপাশি শিল্প ও বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে।
বিএনপির কেন্দ্রীয় প্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক ও পটুয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য এ বি এম মোশাররফ হোসেন বলেন, সমুদ্রভাঙনের কারণে কুয়াকাটা ঝুঁকির মুখে রয়েছে। পরিকল্পিত উন্নয়নের মাধ্যমে এটিকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা প্রত্যাশা করছেন এ অঞ্চলের মানুষ।
বাংলাদেশ সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের বরিশাল বিভাগীয় সদস্যসচিব ডা. মিজানুর রহমান বলেন, উন্নত চিকিৎসাসেবার জন্য দক্ষিণাঞ্চলের মানুষকে এখনো রাজধানীতে যেতে হয়। বরিশালে একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা এ অঞ্চলের দীর্ঘদিনের দাবি।
ভোলা জেলা পরিষদের প্রশাসক গোলাম নবী আলমগীর বলেন, ভোলা-বরিশাল সেতু নির্মিত হলে সড়ক যোগাযোগের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। একই সঙ্গে ভোলায় শিল্পায়নের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
এদিকে বরিশাল জেলা ও দায়রা জজ আদালতের আইনজীবী নুরুল আলম রাজু প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়ার জন্য সম্প্রতি ১৫ দফা উন্নয়ন দাবিসংবলিত একটি স্মারকলিপি প্রস্তুত করেন। সেটি তিনি ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসকের কাছে জমা দিয়েছেন। স্মারকলিপিতে বরিশালে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন। এ ছাড়া তিনি ঢাকা-বরিশাল রেলপথের জন্য নেওয়া প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়ন করা। বরিশাল বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীতকরণ, শিল্পাঞ্চল, আইটি পার্ক নির্মাণ, নদীভাঙন প্রতিরোধ এবং দক্ষিণাঞ্চল উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের দাবি জানিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রীর সফরসূচি
প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের প্রকাশিত সফরসূচি অনুযায়ী আজ সকাল সাড়ে ৬টায় প্রধানমন্ত্রী সড়কপথে ঢাকা থেকে বরিশালের উদ্দেশে রওনা হবেন। সকাল সাড়ে ১০টায় তিনি গৌরনদীর বাটাজোর ইউনিয়নে নতুন খনন করা সরিকল-বাটাজোর খালের পাশে এবং দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বরিশাল নগরের ত্রিশ গোডাউন বধ্যভূমিসংলগ্ন সাগরদী খালের পাশে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে অংশ নেবেন। সার্কিট হাউসে সংক্ষিপ্ত বিরতির পর বেলা ৩টায় বরিশাল জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে বিএনপির সাংগঠনিক সভায় যোগ দেবেন। নির্ধারিত কর্মসূচি শেষে বিকেলেই তার ঢাকায় ফেরার কথা রয়েছে।