চলতি করবর্ষে পাঁচ শ্রেণির করদাতা ছাড়া বাকিদের অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ব্যক্তিশ্রেণির করদাতারা সারা বছর রিটার্ন জমা দিতে পারবেন। এবার ১ জুলাই থেকে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে নির্দিষ্ট হারে কর ছাড় পাবেন।
আয়কর আইনের নতুন বিধান অনুযায়ী, রিটার্ন জমার জন্য চলতি করবর্ষকে (১ জুলাই থেকে ৩০ জুন) চার প্রান্তিকে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম প্রান্তিকে অর্থাৎ জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে পরিশোধযোগ্য করের ৫ শতাংশ অথবা সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা- যা কম, সেই পরিমাণ কর ছাড় পাওয়া যাবে। দ্বিতীয় প্রান্তিকে অর্থাৎ অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে অতিরিক্ত কোনো ছাড় বা জরিমানা থাকবে না। নির্ধারিত কর পরিশোধ করলেই হবে। তৃতীয় প্রান্তিকে অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে পরিশোধযোগ্য করের সঙ্গে অতিরিক্ত ২ শতাংশ অথবা ন্যূনতম ৩ হাজার টাকা– যা বেশি, তা পরিশোধ করতে হবে। চতুর্থ প্রান্তিকে অর্থাৎ এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে অতিরিক্ত ৫ শতাংশ অথবা ন্যূনতম ৫ হাজার টাকা– যা বেশি, সেই পরিমাণ অর্থ জরিমানা হিসেবে পরিশোধ করতে হবে।
আয়কর আইনানুযায়ী, চলতি করবর্ষে নতুন করদাতাকে ন্যূনতম এক হাজার টাকা কর পরিশোধ করে রিটার্ন জমা দিলেই হবে। তবে পুরোনো করদাতাদের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ৫ হাজার টাকা কর ধার্য আছে।
এনবিআর সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেন, চলতি করবর্ষে এনবিআর রিটার্ন উৎসাহিত করতে প্রণোদনা ও কর ছাড়ের বিধান রেখেছে। আশা করি, এতে অনেকে রিটার্ন জমা দিতে উৎসাহিত হবেন।
রাজস্ব খাতের এই বিশ্লেষক বলেন, বর্তমানে দেশে করদাতার সংখ্যা এক কোটি ছাড়িয়েছে। অথচ প্রতি করবর্ষে গড়ে ৪০ লাখ থেকে ৪৫ লাখ রিটার্ন জমা পড়ে। অন্যদিকে যারা রিটার্ন জমা দেন তাদের অনেকে আবার রিটার্নে মিথ্যা তথ্য দেন। এভাবে বড় অঙ্কের কর ফাঁকি হচ্ছে। এনবিআরকে রিটার্ন জমা বাড়াতে পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে রিটার্নে দেওয়া তথ্যের স্বচ্ছতাও নিশ্চিত করতে হবে।
এনবিআর সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরে বার্ষিক করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে ৩ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করা হয়েছে। এর বেশি করযোগ্য আয়ের প্রথম ৩ লাখ টাকার ওপর ১০ শতাংশ, পরবর্তী ৪ লাখ টাকার ওপর ১৫ শতাংশ, পরবর্তী ৫ লাখ টাকার ওপর ২০ শতাংশ, পরবর্তী ২০ লাখ টাকার ওপর ২৫ শতাংশ এবং এর বেশি আয়ের ওপর ৩০ শতাংশ হারে কর দিতে হবে।
করদাতারা ব্যাংক ট্রান্সফার, ডেবিট কার্ড, ক্রেডিট কার্ড, বিকাশ, রকেট, নগদ অথবা অন্য কোনো মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস অ্যাপ ব্যবহার করে ঘরে বসেই কর পরিশোধ করে অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে পারেন। অফিস চলাকালিন সময়ে করদাতা (০২) ৫৫৬৬৭০৭০ নম্বরে ফোন করে রিটার্ন জমা বা রাজস্বসংক্রান্ত সমস্যার সমাধান জানতে পারবেন। অনলাইইনে রিটার্ণ দাখিলের ঠিকানা www.etaxnbr.gov.bd.
অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার জন্য এনবিআরের ওয়সাইটে ই রিটার্ন পোর্টালে নিবন্ধন করতে হবে। অনলাইইনে রিটার্ন দাখিলের জন্য সংশিষ্ট কর অঞ্চল থেকে করদাতাকে নিজস্ব ইউজার আইডি এবং পাসওয়ার্ড সংগ্রহ করতে হবে। এ ইউজার আইডি এবং পাসওয়ার্ড দিয়ে প্রত্যেক করবর্ষে রিটার্ণ দাখিল করতে পারবেন। এরপর ইটিআইএন ও পাসওয়ার্ড দিয়ে লগইন করে রিটার্ন সাবমিশনে গিয়ে নিজের আয়, বিনিয়োগ, সম্পদ ও দায় এবং প্রযোজ্য তথ্য ধাপে ধাপে পূরণ করে অনলাইনে রিটার্ন জমা দেওয়া যাবে। রিটার্ন পরিশোধের সনদ অনলাইনেই আসবে।
এনবিআর থেকে বিশেষ আদেশ দিয়ে পাঁচ শ্রেণির করদাতাদের অনলাইইনে রিটার্ন জমা দেওয়ায় ছাড় দেওয়া হয়েছে। আয়কর আইন অনুসারে, ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সের প্রবীণ করদাতা, সনদপত্র দাখিল সাপেক্ষে শারীরিকভাবে অসমর্থ বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন করদাতা, বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি করদাতা, মৃত করদাতার পক্ষে আইনগত প্রতিনিধি এবং বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি নাগরিক।
এনবিআর সূত্র জানায়, অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নিজস্ব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর জমা দিয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর ফাঁকি ধরা পড়লে ওই কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে।
সূত্র আরও জানায়, কোন কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার পরিচালক বা শেয়ারহোল্ডার চাকরিজীবী ও কোন ফার্মের অংশীদার হলে রিটার্ন দাখিল করতে হবে। মোটরগাড়ির মালিক হলে, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদ হতে ট্রেড লাইসেন্স গ্রহণ করে কোনো ব্যবসা বা পেশা পরিচালন করলে, কোনো কোম্পানির বা গ্রুপ অব কোম্পানির পরিচালনা পরিষদে থাকলে বাধ্যতামূলক করদাতাকে আয়কর রিটার্ন জমা দিতে হবে। চিকিৎসক, আইনজীবী, চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট, কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্টেন্ট, প্রকৌশলী, স্থপতি অথবা সার্ভেয়ার বা সমজাতীয় পেশাজীবী হিসাবে নিবন্ধিত হলে আয়কর রিটান জমা দিতে হবে।
কোনো বণিক, শিল্পবিষয়ক চেম্বার, ব্যবসায়িক সংঘ বা সংস্থার সদস্য হলে, কোনো সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার কোনো পদে বা সংসদ সদস্য হিসেবে প্রার্থী হলে, সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা বা স্থানীয় সরকারের কোনো টেন্ডারে অংশ নিলে চলতি আয় বছরে আয়কর রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক। করদাতা বেতন প্রাপ্ত হলে আয়কর বিবরণীর সঙ্গে বেতন বিবরণী জমা দিতে হবে। ব্যাংক হিসাব থাকলে বা ব্যাংক সুদ থেকে আয় থাকলে ব্যাংক বিবরণী বা ব্যাংক সার্টিফিকেট দিতে হবে।