অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সিলেট বিভাগের বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত হলেও এ বছর খোয়াই অববাহিকার দুর্যোগ ভাবিয়ে তুলেছে প্রশাসন ও পরিবেশবিদদের। হবিগঞ্জের বাল্লা সীমান্ত হয়ে চুনারুঘাট, হবিগঞ্জ সদর হয়ে বয়ে যাওয়া এই নদী বর্ষায় দুর্ভোগের কারণ হয় প্রতিবছর। তবে এই বছর বন্যা পরিস্থিতি আগের সব দুর্যোগকে ছাপিয়ে গেছে। আবহাওয়াবিদ, পরিবেশবিদদের অভিযোগ, এবারের এই আতঙ্কের নাম ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের ‘চাকমা গেট’ বা চাকমাঘাট ব্যারাজ।
উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং আকস্মিকভাবে এই গেট খুলে দেওয়ার ফলে হবিগঞ্জের খোয়াই নদীর পানি বিপৎসীমার ২২০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ভয়াবহ প্লাবনের সৃষ্টি করেছে।
খোয়াই নদীর উৎপত্তিস্থল ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আঠারোমুড়া পাহাড়ের পূর্ব দিকে। হবিগঞ্জের বাল্লা স্থলবন্দরের কাছে এ নদী বাংলাদেশে ঢুকেছে। ১৬০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের নদীটির ৯৪ কিলোমিটার অংশ পড়েছে বাংলাদেশে। ৯০ দশকের মাঝামাঝি সময় ভারত সরকার ত্রিপুরার তেলিয়ামুড়া এলাকায় ‘চাকমা গেট’ নামে ব্যারাজ তৈরি করে। গত এক সপ্তাহে ত্রিপুরায় ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। তখন চাকমাগেটের সব কপাট খুলে দেওয়া হয়। ফলে ঢলে ভেসে যায় খোয়াই অববাহিকা।
গত এক সপ্তাহ ধরে হবিগঞ্জে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত হলেও খোয়াই নদীর পানি বিপৎসীমার নিচেই ছিল। কিন্তু গত ৯ জুলাই পরিস্থিতি হঠাৎ বদলে যায়। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে পানি বেড়ে রাতে বিপৎসীমার ২২০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। আকস্মিক এই স্রোতে জেলার কয়েকটি উপজেলায় বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়ে। আবার একদিনের ব্যবধানে নদীর পানি নেমে আসে বিপৎসীমার ৭ সেন্টিমিটার নিচে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড, পরিবেশকর্মী ও বিশেষজ্ঞ পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ত্রিপুরায় ভারী বৃষ্টির পর চাকমা গেট খুলে দেওয়ায় স্বল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পানি খোয়াই নদী দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এতে ঢলের স্বাভাবিক প্রবাহপথে পরিবর্তন দেখা দেয় এবং হবিগঞ্জের নদী অববাহিক এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
এবারের ঢলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছে হবিগঞ্জ শহর রক্ষা বাঁধের মাছুলিয়া পয়েন্ট। স্থানীয়দের আশঙ্কা, বাঁধ ভেঙে গেলে শহরের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি বড় ধরনের প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতি হতে পারে।
পাউবো হবিগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাইদুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘ভারী বর্ষণ হলে আমরা উদ্বিগ্ন থাকি, কখন ভারতীয় কর্তৃপক্ষ চাকমা গেট খুলে দেয়। হঠাৎ গেট খুলে দিলে খোয়াই নদীর পানির স্তর ৮ থেকে ১০ ফুট বেড়ে যায়।’
‘খোয়াই রিভার ওয়াটার কিপার’-এর সংগঠক তোফাজ্জল সোহেল বলেন, ‘চাকমা ব্যারাজের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে তারা (ভারতীয় কর্তৃপক্ষ) পানি ধরে রাখে, আর বর্ষা মৌসুমে পানি ছেড়ে দেয়। গত ৯ জুলাই ভারত ঠিক এ কাজটিই করেছে। তাদের বেশি বৃষ্টিপাত হওয়ায় গেট খুলে দিয়েছে। এমন ঘটনা আন্তর্জাতিক নদী আইনের লঙ্ঘন।
সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল-পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আনোয়ারুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘এবারের রেইনফলের প্যাটার্নে দেখা যাচ্ছে, আপস্ট্রিমে বিশেষ করে বরাক ভ্যালিতে বৃষ্টির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে করিমগঞ্জ ও ত্রিপুরা ভ্যালির থেকে কম। এ কারণে ওয়াটার ফ্লো খোয়াই নদীতে বেশি।’
সিলেটের সীমান্ত নদীগুলো যেসব পয়েন্টে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে, তার প্রায় সবই অবাধে বালু, পাথর উত্তোলন করা হয়েছে। যার কারণে নদীর স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হয়েছে। ‘এ কারণে পানির স্বাভাবিক ড্রেনেজ ক্যাপাসিটি বা নরমাল ওয়াটার ফ্লো ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে সুরমার আপস্ট্রিমে।’ যোগ করেন ড. মোহাম্মদ আনোয়ারুল ইসলাম।