এ বছরের মে মাসের ঘটনা। রোদ দেখে এক দিন বাড়ি থেকে বের হলাম। সাভার যেতে যেতে বেলা বেড়ে গেল। রোদটা বেশ চড়িয়ে উঠেছে। যেতে যেতে পথে ক্যান্টনমেন্টের পাশে ডিসি নার্সারিতে ঢুকে পড়লাম। ওখানে গেলে মাঝে মাঝে কিছু নতুন গাছপালা দেখা যায়। উদ্দেশ্য হচ্ছে সেগুলোর খোঁজ নেওয়া আর ছবি তোলা। অনেক গাছেই ফুল ফুটেছে। সেসব ফুলে মধু খেয়ে বেড়াচ্ছে প্রজাপতিরা। এগুলোর ছবি তোলা বড্ড মুশকিল। দুই সেকেন্ড সময়ও ফুলে থিতু হয়ে বসে না।
চোখ পড়ল একটা গাছের তলায়। মাটির কাছাকাছি একটা গাছের পাতার ওপর ঘাপটি মেরে ডানা মেলে বসে আছে এক কৃষ্ণসুন্দরী। অপরূপা সে, যেন তার কালো ডানা থেকে নীল অভ্রের ছটা ঠিকরে বের হচ্ছে। ছবি তোলার বেশ ভালো পজিশনও পাওয়া গেল। ছবি তোলার পর তাকে শনাক্ত করা গেল, প্রজাপতির নাম নীল পুনম। যে প্রজাপতির ছবি তুললাম, সেটি মেয়ে প্রজাপতি। পুরুষটার ডানায় নীল দাগগুলো বড় হয়, বিশেষ করে পেছনের ডানা জোড়ায় দুটি বড় নীলাভ সাদা ছোপ থাকে।
নীল পুনম প্রজাপতির ইংরেজি নাম ব্লু মুন বাটারফ্লাই বা গ্রেট এগফ্লাই, প্রজাতিগত নাম Hypolimnas bolina, লেপিডোপ্টেরা বর্গের নিমফালিডি গোত্রের পোকা। প্রজাতিগত নামের শেষাংশ বোলিনা এসেছে গ্রিক পুরাণের একটি চরিত্র থেকে। গ্রিক ভুগোলবিদ পসানিয়াসের বিবরণ অনুযায়ী, বোলিনা ছিলেন প্রাচীন গ্রিসের আচাইয়া অঞ্চলের একজন সুন্দরী কুমারী। সূর্য ও আলোর দেবতা অ্যাপোলো তার প্রেমে পড়েন। কিন্তু বোলিনা সে প্রণয় নিবেদন ফিরিয়ে দেন ও অ্যাপোলের হাত থেকে বাঁচতে তিনি সাগরে ঝাঁপ দেন। তখন অ্যাপোলো তাকে জলপরীতে রূপান্তর করেন। নীল পুনমের ডানা যেন সেই জলপরীর ডানার মতো!
এরা এ দেশে এসেছে মাদাগাস্কার ও অস্ট্রেলিয়া থেকে। তবে এখন এশিয়ার অনেক দেশেই এদের দেখা যায়। এ দেশের প্রায় সর্বত্র এদের দেখা যায়। সাধারণত ঘন ও স্যাঁতসেঁতে ঝোপঝাড়, ফুলের বাগান, বন ও বনের প্রান্তে এলাকা, আবাসিক এলাকা প্রভৃতি স্থানে এদের দেখা যায়। এরা সোজাসুজি ওড়ে। ফুলের মধু পান করার সময় এরা ডানা চারটি আধা ভাঁজ করে রাখে। ডানা প্রসারিত করলে সেসব ডানার এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তের বিস্তার হয় ৭০ থেকে ৮৫ মিলিমিটার।
জিনগত পলিমরফিজম ও ফেনোটাইপিক প্লাস্টিসিটির কারণে স্ত্রী নীল পুনম প্রজাপতি ব্যাপকভাবে পরিবর্তনশীল বা বহুরূপী স্বভাবের হয়। এই পরিবর্তনের চিহ্ন প্রথম প্রকাশিত হয় পৃষ্ঠদেশে, সেখানে সাদা ও নীল দাগগুলো পরিবর্তিত হয়। কিন্তু স্ত্রীদের নিচের বা অঙ্কীয় দেশের চেহারা পুরুষের মতো একই থাকে। শীতল দিনে রং বেশি গাঢ় হয়। স্ত্রী প্রজাপতির আকার পুরুষের চেয়ে একটু বড় হয়। গাঢ় কালো রঙের প্রতিটি ডানার মাঝখানে একটি করে সাদাটে ছোপ থাকে, যার কিনারা থেকে নীল দ্যুতি বের হয়। সামনের ডানায় এক সারি সাদা ছোট বৃত্ত থাকে। পক্ষান্তরে পুরুষ নীল পুনম হয় একরূপী। ডানার পৃষ্ঠদেশ কুচকুচে কালো, তাতে সুস্পষ্ট তিনটি ছোপ বা দাগ থাকে, সামনের ডানায় থাকে দুটি ও পেছনের ডানায় থাকে একটি।
স্ত্রী নীল পুনম পাতার নিচের দিকে ফ্যাকাশে ও স্বচ্ছ কাচের মতো সবুজাভ গম্বুজাকৃতির ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে বের হওয়ার পর এরা প্রায় ১৪ থেকে ২৪ দিন পর্যন্ত বাচ্চা বা কীড়া (Caterpillar) অবস্থায় থাকে। এই সময়ে এরা মূলত উদ্ভিদের কচি পাতা খেয়ে বেঁচে থাকে। বেড়েলা, বড় নুনিয়া, পর্তুলিকা, মিষ্টিআলু ও তুঁত ইত্যাদি গাছ এদের প্রধান আশ্রয়স্থল এবং খাবার উৎস। স্ত্রী নীল পুনম প্রজাপতি বেশ মাতৃত্বপরায়ণ, তাদের মধ্যে চরম মাতৃত্ব স্বভাব দেখা যায়। কোথাও ডিম পাড়ল–এ নিয়ে সাধারণত অন্য প্রজাপতিরা তার কোনো খোঁজখবর রাখে না। কিন্তু নীল পুনম প্রজাপতি ডিম পাড়ার আগে ভালো করে দেখে নেয় যে সে পাতায় কোনো পিঁপড়ে আছে কি না। ডিম ফুটে বাচ্চা বের না হওয়া পর্যন্ত ওরা সক্রিয়ভাবে ডিমগুলো পাহারা দেয়।
ডিমগুলোর ওপর তারা একধরনের সুরক্ষামূলক ছাতা তৈরি করে, যা তাদের সন্তানদের বিভিন্ন পরজীবী বোলতার আক্রমণ থেকে রক্ষা করে। অন্য দিকে পুরুষ প্রজাপতিরা নিজেদের এলাকা নিয়ে অত্যন্ত রক্ষণশীল স্বভাবের হয়। তারা হয় প্রচণ্ড ঝগড়াটে ও আক্রমণাত্মক। তার এলাকায় অন্য প্রজাপতি ঢুকে পড়লে তাদের দাবড়িয়ে তাড়িয়ে দেয়। এমনকি অন্য কোনো প্রাণী বা মানুষ দেখলেও তারা সতর্কভাবে তাকে পর্যবেক্ষণ করে। ওদের আর একটা বেশ মজার স্বভাব আছে। প্রজাপতিরা সাধারণত ফুলের মধু ও শিশির খায়। এরাও খায়। তবে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ নীল পুনম প্রজাপতি তা খায় না, ওরা খায় মানুষের কপালের ঘাম ও প্রাণীর মূত্র। ফুলে এদের সহজে দেখা যায় না।
পুরুষ নীল পুনম প্রজাপতির জীবন সত্যিই অদ্ভুত ও ট্র্যাজিক। এরা ফুলের মধুর চেয়ে পচা ফলমূল, ভেজা মাটি বা পচনশীল উপাদান থেকে পুষ্টি উপাদান বেশি গ্রহণ করে। তার ওপর এদের বড় শত্রু ওলবাকিয়া নামের একটি বিশেষ ব্যাকটেরিয়া। এই ব্যাকটেরিয়াটি পুরুষ প্রজাপতিদের বংশই ধ্বংস করে দেয়। প্রজাপতি ডিম পাড়ার পর যেসব ডিম থেকে পুরুষ ছানা জন্ম নেওয়ার কথা, ওলবাকিয়া ব্যাকটেরিয়া শুধু সেসব ডিমেই সংক্রমণ ঘটায়। এর ফলে পুরুষ প্রজাপতিগুলো ডিম ফুটে বের হওয়ার আগেই মারা যায়। সত্যিই অবিশ্বাস্য ওলবাকিয়া ব্যাকটেরিয়ার কর্মকাণ্ড।
সম্প্রতি গবেষকরা এসব দেখতে পেয়েছেন। তবে তারা এটিও দেখতে পেয়েছেন যে সামোয়া দ্বীপপুঞ্জের নীল পুনম প্রজাপতিরা ওলবাকিয়ার এই পুরুষ হত্যার বিরুদ্ধে এক অবিশ্বাস্য প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। প্রজাপতিদের দেহে একটি বিশেষ দমনকারী জিন বিবর্তিত হয়েছে, যা ওলবাকিয়ার এই ক্ষতিকর প্রভাবকে নিষ্ক্রিয় করে দেয় এবং ওলবাকিয়া থাকা সত্ত্বেও পুরুষ ভ্রূণগুলো সফলভাবে বেঁচে থাকতে ও ফুটে বের হতে পারে।
লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ