ঢাকা ২৯ আষাঢ় ১৪৩৩, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
স্পেনকে ভয় নয়, সমীহ করছে ফ্রান্স ফুসফুস ক্যানসারের ওষুধের ট্রায়ালে বড় সাফল্য আগামী ১৫ জুলাই সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বৃক্ষরোপণের নির্দেশ সুনামগঞ্জে বিপৎসীমার ওপরে পানি, প্লাবিত হচ্ছে নতুন এলাকা ফ্লাইট এক্সপার্টের বিরুদ্ধে ৩৫ কোটি টাকার মানিলন্ডারিং মামলা মুষলধারে বৃষ্টিতে ডুবল কুমিল্লা, চরম দুর্ভোগে এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা ১৬ জুলাই শুরু হচ্ছে ইসকনের ৯ দিনব্যাপী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা মহোৎসব ফরাসি দল নিয়ে স্পেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিতর্কিত মন্তব্য, নিন্দার ঝড় পড়ে পাওয়া গল্পের ৩টি বহুনির্বাচনি প্রশ্ন ও উত্তর, ৮ম পর্ব, অষ্টম শ্রেণির বাংলা চুল পড়া ৯২ শতাংশ কমিয়ে দেয় ‘লাইট থেরাপি’ বিশ্বকাপে ভিএআর সুবিধাভোগী আর্জেন্টিনা-মেক্সিকো, খেসারত দিলো ক্রোয়েশিয়া-ইরান দুই দিনের ব্যবধানে কমল স্বর্ণের দাম, ভরিতে কত? নওগাঁয় স্বামী-স্ত্রীর রহস্যজনক মৃত্যু আর্জেন্টিনার সাফল্যকে অস্বাভাবিক বললেন মেসি পেকুয়ায় পাহাড়ধসে মাটির নিচে পানের বরজ, নিঃস্ব প্রবাস ফেরত চাষিরা আগামী ৫ বছরে দেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানো হবে: প্রধানমন্ত্রী মুন্সীগঞ্জে ৫ মোটরসাইকেলসহ চোর চক্রের ৩ সদস্য গ্রেপ্তার হাতিয়ায় পানিবন্দিদের পাশে ছাত্রদল গাজীপুর থেকে হেঁটে ১৫০ কিলোমিটার পরিভ্রমণে তিন রোভার স্কাউট গোপালগঞ্জে ১২ লাখ টাকার অবৈধ চিংড়ির পোনা জব্দ চাঁদাবাজির মামলায় কথিত সাংবাদিক শফিকুলসহ ৩ জনের কারাদণ্ড মালয়েশিয়ায় বয়লার বিস্ফোরণে বাংলাদেশি যুবক নিহত গৌরনদীতে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে প্রধানমন্ত্রী যমজ ৩ বোনের ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি ব্যাংককে বারে আগুন, নিহত ২৭ নোবিপ্রবিতে গুচ্ছ ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের ভর্তির সময়সীমা বৃদ্ধি, ক্লাস শুরু ১৯ জুলাই শুল্কায়ন প্রক্রিয়া সহজ, ব্যবসার খরচ কমানোর দাবি শিবচরে প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় আপন দুই ভাইয়ের অনন্য সাফল্য জাককানইবিতে শুরু হলো ৪র্থ আন্তর্জাতিক নাট্যোৎসব সংবিধান সংশোধন-সংস্কার: মুখোমুখি সরকারি ও বিরোধী দল

অপরূপা প্রজাপতি নীল পুনম

প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬, ০৯:১১ এএম
আপডেট: ১৩ জুলাই ২০২৬, ০৯:১৮ এএম
অপরূপা প্রজাপতি নীল পুনম
ক্যাপশন: সাভারে দেখা নীল পুনম প্রজাপতি ছবি: লেখক

এ বছরের মে মাসের ঘটনা। রোদ দেখে এক দিন বাড়ি থেকে বের হলাম। সাভার যেতে যেতে বেলা বেড়ে গেল। রোদটা বেশ চড়িয়ে উঠেছে। যেতে যেতে পথে ক্যান্টনমেন্টের পাশে ডিসি নার্সারিতে ঢুকে পড়লাম। ওখানে গেলে মাঝে মাঝে কিছু নতুন গাছপালা দেখা যায়। উদ্দেশ্য হচ্ছে সেগুলোর খোঁজ নেওয়া আর ছবি তোলা। অনেক গাছেই ফুল ফুটেছে। সেসব ফুলে মধু খেয়ে বেড়াচ্ছে প্রজাপতিরা। এগুলোর ছবি তোলা বড্ড মুশকিল। দুই সেকেন্ড সময়ও ফুলে থিতু হয়ে বসে না।

চোখ পড়ল একটা গাছের তলায়। মাটির কাছাকাছি একটা গাছের পাতার ওপর ঘাপটি মেরে ডানা মেলে বসে আছে এক কৃষ্ণসুন্দরী। অপরূপা সে, যেন তার কালো ডানা থেকে নীল অভ্রের ছটা ঠিকরে বের হচ্ছে। ছবি তোলার বেশ ভালো পজিশনও পাওয়া গেল। ছবি তোলার পর তাকে শনাক্ত করা গেল, প্রজাপতির নাম নীল পুনম। যে প্রজাপতির ছবি তুললাম, সেটি মেয়ে প্রজাপতি। পুরুষটার ডানায় নীল দাগগুলো বড় হয়, বিশেষ করে পেছনের ডানা জোড়ায় দুটি বড় নীলাভ সাদা ছোপ থাকে।

নীল পুনম প্রজাপতির ইংরেজি নাম ব্লু মুন বাটারফ্লাই বা গ্রেট এগফ্লাই, প্রজাতিগত নাম Hypolimnas bolina, লেপিডোপ্টেরা বর্গের নিমফালিডি গোত্রের পোকা। প্রজাতিগত নামের শেষাংশ বোলিনা এসেছে গ্রিক পুরাণের একটি চরিত্র থেকে। গ্রিক ভুগোলবিদ পসানিয়াসের বিবরণ অনুযায়ী, বোলিনা ছিলেন প্রাচীন গ্রিসের আচাইয়া অঞ্চলের একজন সুন্দরী কুমারী। সূর্য ও আলোর দেবতা অ্যাপোলো তার প্রেমে পড়েন। কিন্তু বোলিনা সে প্রণয় নিবেদন ফিরিয়ে দেন ও অ্যাপোলের হাত থেকে বাঁচতে তিনি সাগরে ঝাঁপ দেন। তখন অ্যাপোলো তাকে জলপরীতে রূপান্তর করেন। নীল পুনমের ডানা যেন সেই জলপরীর ডানার মতো!

এরা এ দেশে এসেছে মাদাগাস্কার ও অস্ট্রেলিয়া থেকে। তবে এখন এশিয়ার অনেক দেশেই এদের দেখা যায়। এ দেশের প্রায় সর্বত্র এদের দেখা যায়। সাধারণত ঘন ও স্যাঁতসেঁতে ঝোপঝাড়, ফুলের বাগান, বন ও বনের প্রান্তে এলাকা, আবাসিক এলাকা প্রভৃতি স্থানে এদের দেখা যায়। এরা সোজাসুজি ওড়ে। ফুলের মধু পান করার সময় এরা ডানা চারটি আধা ভাঁজ করে রাখে। ডানা প্রসারিত করলে সেসব ডানার এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তের বিস্তার হয় ৭০ থেকে ৮৫ মিলিমিটার।

জিনগত পলিমরফিজম ও ফেনোটাইপিক প্লাস্টিসিটির কারণে স্ত্রী নীল পুনম প্রজাপতি ব্যাপকভাবে পরিবর্তনশীল বা বহুরূপী স্বভাবের হয়। এই পরিবর্তনের চিহ্ন প্রথম প্রকাশিত হয় পৃষ্ঠদেশে, সেখানে সাদা ও নীল দাগগুলো পরিবর্তিত হয়। কিন্তু স্ত্রীদের নিচের বা অঙ্কীয় দেশের চেহারা পুরুষের মতো একই থাকে। শীতল দিনে রং বেশি গাঢ় হয়। স্ত্রী প্রজাপতির আকার পুরুষের চেয়ে একটু বড় হয়। গাঢ় কালো রঙের প্রতিটি ডানার মাঝখানে একটি করে সাদাটে ছোপ থাকে, যার কিনারা থেকে নীল দ্যুতি বের হয়। সামনের ডানায় এক সারি সাদা ছোট বৃত্ত থাকে। পক্ষান্তরে পুরুষ নীল পুনম হয় একরূপী। ডানার পৃষ্ঠদেশ কুচকুচে কালো, তাতে সুস্পষ্ট তিনটি ছোপ বা দাগ থাকে, সামনের ডানায় থাকে দুটি ও পেছনের ডানায় থাকে একটি। 

স্ত্রী নীল পুনম পাতার নিচের দিকে ফ্যাকাশে ও স্বচ্ছ কাচের মতো সবুজাভ গম্বুজাকৃতির ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে বের হওয়ার পর এরা প্রায় ১৪ থেকে ২৪ দিন পর্যন্ত বাচ্চা বা কীড়া (Caterpillar) অবস্থায় থাকে। এই সময়ে এরা মূলত উদ্ভিদের কচি পাতা খেয়ে বেঁচে থাকে। বেড়েলা, বড় নুনিয়া, পর্তুলিকা, মিষ্টিআলু ও তুঁত ইত্যাদি গাছ এদের প্রধান আশ্রয়স্থল এবং খাবার উৎস। স্ত্রী নীল পুনম প্রজাপতি বেশ মাতৃত্বপরায়ণ, তাদের মধ্যে চরম মাতৃত্ব স্বভাব দেখা যায়। কোথাও ডিম পাড়ল–এ নিয়ে সাধারণত অন্য প্রজাপতিরা তার কোনো খোঁজখবর রাখে না। কিন্তু নীল পুনম প্রজাপতি ডিম পাড়ার আগে ভালো করে দেখে নেয় যে সে পাতায় কোনো পিঁপড়ে আছে কি না। ডিম ফুটে বাচ্চা বের না হওয়া পর্যন্ত ওরা সক্রিয়ভাবে ডিমগুলো পাহারা দেয়।

ডিমগুলোর ওপর তারা একধরনের সুরক্ষামূলক ছাতা তৈরি করে, যা তাদের সন্তানদের বিভিন্ন পরজীবী বোলতার আক্রমণ থেকে রক্ষা করে। অন্য দিকে পুরুষ প্রজাপতিরা নিজেদের এলাকা নিয়ে অত্যন্ত রক্ষণশীল স্বভাবের হয়। তারা হয় প্রচণ্ড ঝগড়াটে ও আক্রমণাত্মক। তার এলাকায় অন্য প্রজাপতি ঢুকে পড়লে তাদের দাবড়িয়ে তাড়িয়ে দেয়। এমনকি অন্য কোনো প্রাণী বা মানুষ দেখলেও তারা সতর্কভাবে তাকে পর্যবেক্ষণ করে। ওদের আর একটা বেশ মজার স্বভাব আছে। প্রজাপতিরা সাধারণত ফুলের মধু ও শিশির খায়। এরাও খায়। তবে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ নীল পুনম প্রজাপতি তা খায় না, ওরা খায় মানুষের কপালের ঘাম ও প্রাণীর মূত্র। ফুলে এদের সহজে দেখা যায় না।

পুরুষ নীল পুনম প্রজাপতির জীবন সত্যিই অদ্ভুত ও ট্র্যাজিক। এরা ফুলের মধুর চেয়ে পচা ফলমূল, ভেজা মাটি বা পচনশীল উপাদান থেকে পুষ্টি উপাদান বেশি গ্রহণ করে। তার ওপর এদের বড় শত্রু ওলবাকিয়া নামের একটি বিশেষ ব্যাকটেরিয়া। এই ব্যাকটেরিয়াটি পুরুষ প্রজাপতিদের বংশই ধ্বংস করে দেয়। প্রজাপতি ডিম পাড়ার পর যেসব ডিম থেকে পুরুষ ছানা জন্ম নেওয়ার কথা, ওলবাকিয়া ব্যাকটেরিয়া শুধু সেসব ডিমেই সংক্রমণ ঘটায়। এর ফলে পুরুষ প্রজাপতিগুলো ডিম ফুটে বের হওয়ার আগেই মারা যায়। সত্যিই অবিশ্বাস্য ওলবাকিয়া ব্যাকটেরিয়ার কর্মকাণ্ড।

সম্প্রতি গবেষকরা এসব দেখতে পেয়েছেন। তবে তারা এটিও দেখতে পেয়েছেন যে সামোয়া দ্বীপপুঞ্জের নীল পুনম প্রজাপতিরা ওলবাকিয়ার এই পুরুষ হত্যার বিরুদ্ধে এক অবিশ্বাস্য প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। প্রজাপতিদের দেহে একটি বিশেষ দমনকারী জিন বিবর্তিত হয়েছে, যা ওলবাকিয়ার এই ক্ষতিকর প্রভাবকে নিষ্ক্রিয় করে দেয় এবং ওলবাকিয়া থাকা সত্ত্বেও পুরুষ ভ্রূণগুলো সফলভাবে বেঁচে থাকতে ও ফুটে বের হতে পারে।

লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ

অপরূপা প্রজাপতি নীল পুনম

প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬, ০৯:১১ এএম
আপডেট: ১৩ জুলাই ২০২৬, ০৯:১৮ এএম
অপরূপা প্রজাপতি নীল পুনম
ক্যাপশন: সাভারে দেখা নীল পুনম প্রজাপতি ছবি: লেখক

এ বছরের মে মাসের ঘটনা। রোদ দেখে এক দিন বাড়ি থেকে বের হলাম। সাভার যেতে যেতে বেলা বেড়ে গেল। রোদটা বেশ চড়িয়ে উঠেছে। যেতে যেতে পথে ক্যান্টনমেন্টের পাশে ডিসি নার্সারিতে ঢুকে পড়লাম। ওখানে গেলে মাঝে মাঝে কিছু নতুন গাছপালা দেখা যায়। উদ্দেশ্য হচ্ছে সেগুলোর খোঁজ নেওয়া আর ছবি তোলা। অনেক গাছেই ফুল ফুটেছে। সেসব ফুলে মধু খেয়ে বেড়াচ্ছে প্রজাপতিরা। এগুলোর ছবি তোলা বড্ড মুশকিল। দুই সেকেন্ড সময়ও ফুলে থিতু হয়ে বসে না।

চোখ পড়ল একটা গাছের তলায়। মাটির কাছাকাছি একটা গাছের পাতার ওপর ঘাপটি মেরে ডানা মেলে বসে আছে এক কৃষ্ণসুন্দরী। অপরূপা সে, যেন তার কালো ডানা থেকে নীল অভ্রের ছটা ঠিকরে বের হচ্ছে। ছবি তোলার বেশ ভালো পজিশনও পাওয়া গেল। ছবি তোলার পর তাকে শনাক্ত করা গেল, প্রজাপতির নাম নীল পুনম। যে প্রজাপতির ছবি তুললাম, সেটি মেয়ে প্রজাপতি। পুরুষটার ডানায় নীল দাগগুলো বড় হয়, বিশেষ করে পেছনের ডানা জোড়ায় দুটি বড় নীলাভ সাদা ছোপ থাকে।

নীল পুনম প্রজাপতির ইংরেজি নাম ব্লু মুন বাটারফ্লাই বা গ্রেট এগফ্লাই, প্রজাতিগত নাম Hypolimnas bolina, লেপিডোপ্টেরা বর্গের নিমফালিডি গোত্রের পোকা। প্রজাতিগত নামের শেষাংশ বোলিনা এসেছে গ্রিক পুরাণের একটি চরিত্র থেকে। গ্রিক ভুগোলবিদ পসানিয়াসের বিবরণ অনুযায়ী, বোলিনা ছিলেন প্রাচীন গ্রিসের আচাইয়া অঞ্চলের একজন সুন্দরী কুমারী। সূর্য ও আলোর দেবতা অ্যাপোলো তার প্রেমে পড়েন। কিন্তু বোলিনা সে প্রণয় নিবেদন ফিরিয়ে দেন ও অ্যাপোলের হাত থেকে বাঁচতে তিনি সাগরে ঝাঁপ দেন। তখন অ্যাপোলো তাকে জলপরীতে রূপান্তর করেন। নীল পুনমের ডানা যেন সেই জলপরীর ডানার মতো!

এরা এ দেশে এসেছে মাদাগাস্কার ও অস্ট্রেলিয়া থেকে। তবে এখন এশিয়ার অনেক দেশেই এদের দেখা যায়। এ দেশের প্রায় সর্বত্র এদের দেখা যায়। সাধারণত ঘন ও স্যাঁতসেঁতে ঝোপঝাড়, ফুলের বাগান, বন ও বনের প্রান্তে এলাকা, আবাসিক এলাকা প্রভৃতি স্থানে এদের দেখা যায়। এরা সোজাসুজি ওড়ে। ফুলের মধু পান করার সময় এরা ডানা চারটি আধা ভাঁজ করে রাখে। ডানা প্রসারিত করলে সেসব ডানার এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তের বিস্তার হয় ৭০ থেকে ৮৫ মিলিমিটার।

জিনগত পলিমরফিজম ও ফেনোটাইপিক প্লাস্টিসিটির কারণে স্ত্রী নীল পুনম প্রজাপতি ব্যাপকভাবে পরিবর্তনশীল বা বহুরূপী স্বভাবের হয়। এই পরিবর্তনের চিহ্ন প্রথম প্রকাশিত হয় পৃষ্ঠদেশে, সেখানে সাদা ও নীল দাগগুলো পরিবর্তিত হয়। কিন্তু স্ত্রীদের নিচের বা অঙ্কীয় দেশের চেহারা পুরুষের মতো একই থাকে। শীতল দিনে রং বেশি গাঢ় হয়। স্ত্রী প্রজাপতির আকার পুরুষের চেয়ে একটু বড় হয়। গাঢ় কালো রঙের প্রতিটি ডানার মাঝখানে একটি করে সাদাটে ছোপ থাকে, যার কিনারা থেকে নীল দ্যুতি বের হয়। সামনের ডানায় এক সারি সাদা ছোট বৃত্ত থাকে। পক্ষান্তরে পুরুষ নীল পুনম হয় একরূপী। ডানার পৃষ্ঠদেশ কুচকুচে কালো, তাতে সুস্পষ্ট তিনটি ছোপ বা দাগ থাকে, সামনের ডানায় থাকে দুটি ও পেছনের ডানায় থাকে একটি। 

স্ত্রী নীল পুনম পাতার নিচের দিকে ফ্যাকাশে ও স্বচ্ছ কাচের মতো সবুজাভ গম্বুজাকৃতির ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে বের হওয়ার পর এরা প্রায় ১৪ থেকে ২৪ দিন পর্যন্ত বাচ্চা বা কীড়া (Caterpillar) অবস্থায় থাকে। এই সময়ে এরা মূলত উদ্ভিদের কচি পাতা খেয়ে বেঁচে থাকে। বেড়েলা, বড় নুনিয়া, পর্তুলিকা, মিষ্টিআলু ও তুঁত ইত্যাদি গাছ এদের প্রধান আশ্রয়স্থল এবং খাবার উৎস। স্ত্রী নীল পুনম প্রজাপতি বেশ মাতৃত্বপরায়ণ, তাদের মধ্যে চরম মাতৃত্ব স্বভাব দেখা যায়। কোথাও ডিম পাড়ল–এ নিয়ে সাধারণত অন্য প্রজাপতিরা তার কোনো খোঁজখবর রাখে না। কিন্তু নীল পুনম প্রজাপতি ডিম পাড়ার আগে ভালো করে দেখে নেয় যে সে পাতায় কোনো পিঁপড়ে আছে কি না। ডিম ফুটে বাচ্চা বের না হওয়া পর্যন্ত ওরা সক্রিয়ভাবে ডিমগুলো পাহারা দেয়।

ডিমগুলোর ওপর তারা একধরনের সুরক্ষামূলক ছাতা তৈরি করে, যা তাদের সন্তানদের বিভিন্ন পরজীবী বোলতার আক্রমণ থেকে রক্ষা করে। অন্য দিকে পুরুষ প্রজাপতিরা নিজেদের এলাকা নিয়ে অত্যন্ত রক্ষণশীল স্বভাবের হয়। তারা হয় প্রচণ্ড ঝগড়াটে ও আক্রমণাত্মক। তার এলাকায় অন্য প্রজাপতি ঢুকে পড়লে তাদের দাবড়িয়ে তাড়িয়ে দেয়। এমনকি অন্য কোনো প্রাণী বা মানুষ দেখলেও তারা সতর্কভাবে তাকে পর্যবেক্ষণ করে। ওদের আর একটা বেশ মজার স্বভাব আছে। প্রজাপতিরা সাধারণত ফুলের মধু ও শিশির খায়। এরাও খায়। তবে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ নীল পুনম প্রজাপতি তা খায় না, ওরা খায় মানুষের কপালের ঘাম ও প্রাণীর মূত্র। ফুলে এদের সহজে দেখা যায় না।

পুরুষ নীল পুনম প্রজাপতির জীবন সত্যিই অদ্ভুত ও ট্র্যাজিক। এরা ফুলের মধুর চেয়ে পচা ফলমূল, ভেজা মাটি বা পচনশীল উপাদান থেকে পুষ্টি উপাদান বেশি গ্রহণ করে। তার ওপর এদের বড় শত্রু ওলবাকিয়া নামের একটি বিশেষ ব্যাকটেরিয়া। এই ব্যাকটেরিয়াটি পুরুষ প্রজাপতিদের বংশই ধ্বংস করে দেয়। প্রজাপতি ডিম পাড়ার পর যেসব ডিম থেকে পুরুষ ছানা জন্ম নেওয়ার কথা, ওলবাকিয়া ব্যাকটেরিয়া শুধু সেসব ডিমেই সংক্রমণ ঘটায়। এর ফলে পুরুষ প্রজাপতিগুলো ডিম ফুটে বের হওয়ার আগেই মারা যায়। সত্যিই অবিশ্বাস্য ওলবাকিয়া ব্যাকটেরিয়ার কর্মকাণ্ড।

সম্প্রতি গবেষকরা এসব দেখতে পেয়েছেন। তবে তারা এটিও দেখতে পেয়েছেন যে সামোয়া দ্বীপপুঞ্জের নীল পুনম প্রজাপতিরা ওলবাকিয়ার এই পুরুষ হত্যার বিরুদ্ধে এক অবিশ্বাস্য প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। প্রজাপতিদের দেহে একটি বিশেষ দমনকারী জিন বিবর্তিত হয়েছে, যা ওলবাকিয়ার এই ক্ষতিকর প্রভাবকে নিষ্ক্রিয় করে দেয় এবং ওলবাকিয়া থাকা সত্ত্বেও পুরুষ ভ্রূণগুলো সফলভাবে বেঁচে থাকতে ও ফুটে বের হতে পারে।

লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ

টেকনাফে পাহাড় থেকে পড়ে আহত হাতির মৃত্যু

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬, ০২:৫৭ পিএম
আপডেট: ১২ জুলাই ২০২৬, ০৩:০৫ পিএম
টেকনাফে পাহাড় থেকে পড়ে আহত হাতির মৃত্যু
ছবি: খবরের কাগজ

কক্সবাজারের টেকনাফে প্রায় ১০০ ফুট উঁচু পাহাড় থেকে পিছলে পড়ে গুরুতর আহত হাতিটি ১৯ ঘণ্টা মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে মারা গেছে।

শনিবার (১২ জুলাই) সকাল ৯টা দিকে পৌরসভার নাইট্যাংপাড়া এলাকার শিয়াল্যাঘোনা পাহাড়ের পাদদেশে হাতিটির মৃত্যু হয়।

বর্তমানে বন বিভাগের সদস্যরা হাতিটির মরদেহ পুঁতে ফেলার উদ্দেশ্য কাজ করছেন।

স্থানীয় সূত্র জানায়, শুক্রবার (১১ জুলাই) দুপুরে খাবারের সন্ধানে পাহাড়ি এলাকায় আসে হাতিটি। টানা ভারী বৃষ্টিতে পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে যাওয়ায় ১০০ ফুট উঁচু পাহাড় থেকে পা পিছলে নিচে পড়ে যায়। এতে হাতিটির পেটের নিচের অংশসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাত লাগে।

খবর পেয়ে বন বিভাগের কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেন। উন্নত চিকিৎসার জন্য ডুলাহাজরা সাফারি পার্ক থেকে ভেটেরিনারি চিকিৎসকদের একটি দল এনে হাতিটির চিকিৎসা দেওয়া হয়।

হাতিটি দেখতে আসা ইমরান হোসেন জানান, হাতিটিকে বাঁচানোর জন্য বন বিভাগের লোকজন চেষ্টা করেছিলেন। তাদের মতে, হাতিটির শরীরের আঘাত খুবই গুরুতর হওয়ায় মারা যায়। কিন্তু তারা একটি বন্য প্রাণীর হৃদয়বিদারক মৃত্যুতে দুঃখ প্রকাশ করছেন।

টেকনাফ উপজেলা বন কর্মকর্তা আব্দুর রশিদ বলেন, শুক্রবার দুপুরে পাহাড় থেকে পড়ে আহত হওয়ার পর থেকেই বন বিভাগের সদস্যরা ঘটনাস্থলে কাজ করেছেন। পরে ডুলাহাজরা সাফারি পার্কের ভেটেরিনারি চিকিৎসকদের দ্বারা চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। 

 টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, আহত হাতিটির পেছনের দুটি পা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এ ছাড়া পেটেও গুরুতর আঘাত ছিল। দুর্গম অবস্থানের কারণে ঘটনাস্থলেই চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা হয়।

তিনি আরও জানান, উপজেলা প্রাণীসম্পদ কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে একটি টিম ময়নাতদন্তের কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং মৃত হাতিটির ময়নাতদন্ত শেষে সৎকার করা হবে।

শাহীন/খাদিজা রুমি/

গাজীপুরে জখম হাতির চিকিৎসায় থাই বিশেষজ্ঞ

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬, ১১:০২ এএম
আপডেট: ১১ জুলাই ২০২৬, ১১:৫০ এএম
গাজীপুরে জখম হাতির চিকিৎসায় থাই বিশেষজ্ঞ
ছবি: খবরের কাগজ

গাজীপুর সাফারি পার্কে ‘জয়িতা’ নামের একটি হাতির আক্রমণে অপর হাতি ‘রাজু বাহাদুর’ গুরুতর আহত হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে, হাতিটির উন্নত চিকিৎসার জন্য দেশীয় মেডিকেল বোর্ডের পাশাপাশি থাইল্যান্ড থেকে বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আনা হয়েছে।

চলতি বছরের ২৪ মে গাজীপুর সাফারি পার্কের হাতিশালায় শেকলে বাঁধা ১০ বছর বয়সী রাজু বাহাদুরের উপর হামলা করে চার বছর বয়সী হাতি জয়িতা। আক্রমণে রাজু বাহাদুরের একটি পা ভেঙে গেছে।

সাফারি পার্কের বন্যপ্রাণী চিকিৎসক হাতেম সাজ্জাদ মো. জুলকার নাইন বলেন, হামলার শিকার হাতি রাজু বাহাদুর পার্কের হাতিশালায় শেকলে বাঁধা ছিল। পার্কে থাকা অন্য একটি হাতি থেকে চার বছর আগে জয়িতার জন্ম হয়। বাচ্চা হাতি হওয়ায় জয়িতাকে শেকলে বেঁধে রাখা হতো না। গত ২৪ মে সকালে শেকলে বাঁধা রাজু বাহাদুরের উপর হঠাৎ করে আক্রমণ করে জয়িতা। শেকলে বাঁধা রাজু বাহাদুরের সামনে দুটি পা দুদিকে ছড়িয়ে যায়। এতে একটি পা ভেঙে গেছে। অন্য একটি পায়েও আঘাত পেয়েছে। বর্তমানে রাজু বাহাদুর দাঁড়াতে পারছে না। গঠন করা হয়েছে মেডিকেল বোর্ড। ধীরে ধীরে তার স্বাস্থ্যের অবনতি হওয়ায় থাইল্যান্ড থেকে আনা হয় চিকিৎসক। বর্তমানে থাইল্যান্ড থেকে আসা মেডিকেল টিমের পরামর্শ ও দেশের মেডিকেল বোর্ডের যৌথ তত্ত্বাবধানে রাজু বাহাদুরের চিকিৎসা চলছে। পাশাপাশি শ্রীলঙ্কার চিকিৎসকদের সঙ্গেও পরামর্শ করা হয়েছে।

পার্কের একটি সূত্র জানায়, বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট বিগত ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে নারায়নগঞ্জের কাঁচপুর থেকে ‘রাজু বাহাদুর’ নামের এই হাতিটিকে উদ্ধার করে। জনৈক এক ব্যক্তি হাতিটি দিয়ে বিভিন্ন বাজারে চাঁদাবাজির কাজে ব্যবহার হচ্ছিল। খবর পেয়ে বন বিভাগ হাতিটি উদ্ধার করে গাজীপুর সাফারি পার্কের হাতিশালায় নিয়ে আসে। উদ্ধারের সময় রাজু বাহাদুরের বয়স ছিল ৯ বছর। তবে এখন এর বয়স ১০ বছরের বেশি।

পলাশ প্রধান/খাদিজা রুমি/

ডাবল পাপড়ির অলকানন্দা ফুল

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬, ০৯:০৩ এএম
আপডেট: ১০ জুলাই ২০২৬, ০৯:১২ এএম
ডাবল পাপড়ির অলকানন্দা ফুল
জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে ফোটা ডাবল পাপড়ির অলকানন্দা ফুল। ছবি: লেখক

গরমকাল ফুরিয়ে যায় যায়। এ সময় হঠাৎ একটা ফুল দেখে মনে হলো তার ফোটা বোধহয় শুরু হয়েছে। এ যেন ‘তোমার হলো শুরু/ আমার হলো সারা’ অবস্থা। গ্রীষ্ম ফুরালেও ফুল ফুরায় না। অলকানন্দা ফুলেরা গ্রীষ্মকালেও ফোটে। তবে বর্ষাকালে ওরা যেন নবধারা জলে স্নান সেরে হয়ে ওঠে দারুণ স্নিগ্ধ ও সুন্দরী। হলদে ঘণ্টার মতো ফুল ফুটে লতানো গাছটি যেন চারপাশ আলোকিত করে তোলে। অলকানন্দার এ রূপ এ দেশে দীর্ঘদিন ধরে আমরা দেখে আসছি।

কিন্তু এমন একটা রূপ অলকানন্দার দেখব তা ছিল কল্পনারও অতীত। মাইকের চোঙা বা ঘণ্টার মতো অলকানন্দা ফুলগুলো ফোটে এক সারি পাপড়ি নিয়ে। জাত ও প্রজাতিভেদে তার আকার ও আকৃতি হয় ভিন্ন। রং প্রধানত হলুদ হলেও এখন এ দেশে অন্তত পাঁচ রঙের অলকানন্দা ফুল দেখা যাচ্ছে–হলুদ, সাদা, ঘিয়া, মেরুন ও গোলাপি। তাই বলে ডাবল পাপড়ির অলকানন্দা? ঘন পাপড়িগুলো এমনভাবে রয়েছে যেন গোলাপ ফুল। গত ১৩ জুন মিরপুরে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের নার্সারির ভেতরে একটা গাছে সে রকম কিছু ডাবল পাপড়ির অলকানন্দা ফুল দেখলাম। মালিরা বললেন, এ জাতের গাছ আগে ছিল না, নতুন এসেছে। বৃক্ষমেলায় নেওয়ার জন্য টব রেডি করছি।

অ্যাপোসাইনেসি গোত্রের অ্যালামান্ডাগণের উদ্ভিদগুলো এ দেশে সাধারণভাবে বাংলায় অলকানন্দা নামে পরিচিত হয়ে উঠেছে। ১৭৭১ সালে সুইডিশ উদ্ভিদবিজ্ঞানী কার্ল লিনিয়াস অ্যালামান্ডা-গণকে শ্রেণিবিন্যস্ত ও বর্ণনা করেন। তিনি সুইস উদ্ভিদবিজ্ঞানী ও চিকিৎসক ফ্রেডেরিক লুই অ্যালামান্ডের (১৭৩৬-১৮০৯) সম্মানে এ গণের নামকরণ করেন অ্যালামান্ডা। ‘উইলিয়ামসি’ নামটি ১৮৯১ সালে ব্রিটিশ উদ্যানতত্ত্ব বিষয়ক প্রকাশনা ‘গার্ডেন’-এ প্রথম অন্তর্ভুক্ত হয়। সে সময় এই ফুল ইংল্যান্ডে প্রবেশ করে। পরে বিশ শতকের প্রথম দিকে উদ্ভিদবিজ্ঞানী এল এইচ বেইলি একে অ্যালামান্ডা ক্যাথার্টিকা ভার উইলিয়ামসি নামে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি স্বতন্ত্র জাত হিসেবে স্বীকৃতি দেন। 

অ্যালামান্ডা-গণে সারা পৃথিবীতে ১২ থেকে ১৫টি প্রজাতির গাছ রয়েছে। বাংলাদেশে তালিকাভুক্ত প্রজাতি পাওয়া গেছে দুটি। গাছটি এসেছে ব্রাজিল থেকে। বিদেশি সেই ফুলকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলায় অলকানন্দা নাম দিয়ে আপন করে নিয়েছেন- ‘রাত্রিজাগর রজনীগন্ধা-/ করবী রূপসীর অলকানন্দা-/ গোলাপে গোলাপে মিলিয়া মিলিয়া রচিবে মিলনের পালা।’ আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর লেখা কালজয়ী আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো গানেও অলকানন্দার উল্লেখ পাওয়া যায়- ‘পথে পথে ফোটে রজনীগন্ধা অলকানন্দা যেন,/ এমন সময় ঝড় এলো, এক ঝড় এলো খ্যাপা বুনো।’ কিন্তু কবিদের এই অলকানন্দাই আসল হলদে অলকানন্দা। ডাবল পাপড়ির অলকানন্দা ফুলও হলুদ, তবে যেন একটু বেশি হলুদ, সুমিষ্ট ঘ্রাণ আর ব্যতিক্রমী রূপ যেন অলকানন্দাদের জগতে তাকে আলাদা আসন দিয়েছে। ডাবল অলকানন্দার ইংরেজি নাম রাখা হয়েছে গোল্ডেন ট্রাম্পিট ভাইন, প্রজাতিগত নাম Allamanda cathartica var. williamsii. কেউ কেউ একে পৃথক প্রজাতি হিসেবে অ্যালামান্ডা উইলিয়ামসি উল্লেখ করেছেন। কিন্তু কিউ সায়েন্সের ‘প্ল্যান্টস অব দ্য অনলাইন’ অনুসারে একে স্বতন্ত্র প্রজাতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। বরং তাকে ১৯৩৩ সালে অ্যালামান্ডা ক্যাথার্টিকার একটি জাত হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। অন্য অলকানন্দা গাছের মতো এটিও লতানে গুল্ম প্রকৃতির চিরসবুজ গাছ। পাতা সবুজ, চকচকে, উজ্বল, আয়তাকার থেকে বর্শাকৃতি, দৈর্ঘ্য ৬ থেকে ১২ সেন্টিমিটার, অগ্রভাগ তীক্ষ্ণ।

এ গাছের ডাল ভাঙলে সাদা দুধের মতো কষ বা রস বের হয়। এই কষ অনেক সময় ত্বকে লাগলে ত্বক চুলকায়। তাই গাছ ছাঁটার সময় সতর্ক থাকতে হয়। আধো-ছায়া জায়গায় এ গাছ ভালো জন্মে। নিয়মিত পানি দিতে হয়। প্রায় সারা বছরই ফুল ফোটে, তবে বর্ষাকালে বেশি ফোটে। ফুল ঘণ্টাকৃতির হলেও তার পাপড়ি থাকে দুই স্তরে সাজানো। বাইরের স্তরে পাঁচটি পাপড়ির অগ্রপ্রান্ত বিযুক্ত, ভেতরের স্তরে থাকা পাপড়িগুলো গুচ্ছিত ও কুঁচকানো। পাপড়ির রং উজ্জ্বল হলুদ বা কমলা-হলুদ, সুগন্ধ আছে। পূর্ণ ফোটা ফুলের পাপড়ির বিস্তার প্রায় তিন ইঞ্চি। বাগানের যে অংশের মাটি স্যাঁতসেঁতে বা ভেজা ও কিছুটা ছায়াময় থাকে সেখানে এ গাছ লাগানো যায়। লতাকে কোনো অবলম্বনে বাইয়ে দিলে ঝোপ করতে পারে। বড় পাত্র বা ড্রামে লাগালে প্রতি বছর গাছ ছাঁটতে হয়। না হলে গাছের লতা বা ডালপালা ছড়িয়ে বেয়াড়া ও বেঢপ হয়ে পড়ে। শীতের শেষে বা বসন্তের শুরুতে গাছ ছাঁটা ভালো। কেটে ফেলা শক্ত কাঠের ডাল কাটিং করে চারা তৈরি করা যায়। যেকোনো বাগানে ডাবল অলকানন্দা বৈচিত্র্য আনতে পারে।

ছোট সরালির কথা

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬, ০৯:৩৬ এএম
আপডেট: ০৯ জুলাই ২০২৬, ০৯:৩৯ এএম
ছোট সরালির কথা
ছবি: খবরের কাগজ

গত ৬ জুলাই আমার কর্মস্থল গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আমার বিভাগের অধীন বন্যপ্রাণী প্রজনন ও সংরক্ষণ গবেষণাগারের ময়ূরশালার (ময়ূরের খাঁচা) পাশ দিয়ে হাঁটছিলাম। হঠাৎ একটি কমলা দোয়েলের দেখা পেয়ে ওর পিছু নিলাম। তবে সঙ্গে ক্যামেরা না থাকায় ওর ছবি তুলতে পারলাম না। তাই রুমে ফিরে গিয়ে ক্যামেরা নিয়ে আবারও নিচে নামলাম। কিন্তু অনেক খুঁজেও পাখিটিকে পেলাম না। ওর খোঁজে হাঁটতে হাঁটতে পাশের মাৎস্য বিজ্ঞান অনুষদের মাঠ গবেষণাগারের দিকে গেলাম। কিন্তু ওখানেও খুঁজে পেলাম না। 

মাঠ গবেষণাগারের পেছনে একটি ছোট পুকুর রয়েছে। হঠাৎই মনে হলো গত বছর ওখানে কয়েকটি বুনো হাঁস দেখেছিলাম। এবার ওরা আবার এসেছে কি না, দেখা দরকার। যেই ভাবা সেই কাজ। এক মিনিটের মধ্যে পুকুরের সামনে চলে এলাম। পুকুরের ঠিক মাঝখানে পোঁতা খুঁটি দুটিতে দুটি হাঁস বসে থাকতে দেখলাম। নিজেকে যতটা সম্ভব ওদের কাছ থেকে আড়াল করে কয়েকটি ক্লিক করে চুপচাপ চলে এলাম। এবারও ওদের পুকুরে দেখতে পেয়ে মনটাই ভালো হয়ে গেল। মাৎস্য বিজ্ঞান অনুষদের মাঠ গবেষণাগারের পুকুর থেকে বেরিয়ে কমলা দোয়েলের খোঁজে আবারও ময়ূরশালার কাছে চলে এলাম।
 
গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ছোট পুকুরের খুঁটিতে বসা হাঁস দুটি আর কিছু নয়, এ দেশের পরিচিত বুনো হাঁস ছোট সরালি। প্রতিবছরই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের লেক, বাইক্কা বিলসহ অন্যান্য জায়গায় দেখি। তবে সংখ্যায় অত্যন্ত কম হলেও তিন-চার বছর ধরে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখছি। ছোট সরালি এ দেশের বহুল দৃশ্যমান ও স্বল্প ঝুঁকিসম্পন্ন আবাসিক পাখি। এটি সরাল, শরাল, গেছো হাঁস বা সিঙ্গেল হাঁস নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম Lesser Whistling Duck, Lesser Tree Duck, Indian Whistling Duck বা Javan Whistling Duck। অ্যানাটিডি (Anatidae) গোত্রের এই হাঁসটির বৈজ্ঞানিক নাম Dendrocygna javanica (ডেনড্রোসিগনা জাভানিকা)। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, পাকিস্তান, নেপাল হয়ে চীন ও ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত এদের আবাস এলাকা বিস্তৃত।
 
ছোট সরালির দেহের দৈর্ঘ্য ৩৮-৪২ সেন্টিমিটার, প্রসারিত ডানা ৭০-৭৪ সেন্টিমিটার ও ওজন ৪৫০-৫০০ গ্রাম। একনজরে পালক কালচে-বাদামি ও ধূসরাভ। হাঁসা ও হাঁসি দেখতে একই রকম। প্রাপ্তবয়স্ক পাখির হলদে মাথার চাঁদি গাঢ় ধূসর-বাদামি। ঘাড়ের ওপরটা ধূসর-বাদামি। বাদামি গলাটি বড় সরালির চেয়ে খর্বাকার। পিঠে রয়েছে আঁশের মতো দাগ। ওড়ার পালক কালচে। ডানার অগ্রভাগ, কোমর ও লেজ-ঢাকনি উজ্জ্বল তামাটে। বগল হালকা হলদে। বুক, পেট ও তলপেট তামাটে। চোখের পাতা উজ্জ্বল হলুদ ও চোখ ফ্যাকাশে বাদামি। চঞ্চু কালচে-ধূসর। পা ও পায়ের পাতা হালকা নীলচে। আঙুলের পর্দা ও নখ কালচে। অপ্রাপ্তবয়স্ক হাঁসের পালক অনুজ্জ্বল ও দেহতল ধূসরাভ-হলুদ। 

ওদের বিচরণক্ষেত্র হলো জলাভূমি, হাওর, বিল, পুকুর ও ধানখেত। সচরাচর বড় বড় ঝাঁকে থাকে। নিশাচর হাঁসগুলো রাতে জলমগ্ন জমিতে অল্প ডুব দিয়ে, হেঁটে বা সাঁতার কেটে আহার খোঁজে। জলজ আগাছা, শস্যদানা, মাছ, পোকামাকড় ইত্যাদি খায়। দিনের বেলা গাছে, মাটিতে বা পানিতে বিশ্রাম নেয় ও ঘুমায়। শিস দিয়ে ‘হুই-হুয়ি--হুই-হুয়ি---’ স্বরে ডাকে।

জুন থেকে অক্টোবর প্রজননকাল। এ সময় গাছের গর্ত, নলবন, উলুবন, খেতের আইল বা জলাসংলগ্ন ঘাসবনে বাসা বানায়। ৭ থেকে ১২টি সাদা রঙের ডিম পাড়ে। হাঁসা-হাঁসি উভয়ে মিলেই ডিমে তা দেয়। হাঁসি তা দিতে ব্যস্ত থাকলে হাঁসা বাসা পাহারা দেয়। ডিম ফোটে ২৪-২৫ দিনে। হাঁসা-হাঁসি উভয়েই ছানাদের লালনপালন করে ও পাহারা দেয়। ছানারা ৩৩-৩৫ দিনে উড়তে শিখে। আয়ুষ্কাল ৫-৬ বছর।