সংবিধান ‘সংশোধন’ নাকি ‘সংস্কার’–এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে সরকার ও বিরোধী জোটের মধ্যে চলমান রাজনৈতিক অচলাবস্থা এখনো কাটেনি, বরং ‘ক্ষত’ গভীরতর হয়েছে।
জুলাই সনদের সাংবিধানিক বিষয়গুলো বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকার ১৭ সদস্যের একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনের প্রস্তুতি নিয়েছে। সংসদে বিরোধী দলের কাছেও এই কমিটির সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্তির জন্য নাম চাওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং তাদের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট শুরু থেকেই এ ধরনের কমিটির বিরোধিতা করেছে। দলগুলো ঘোষণা করেছে, এই কমিটিতে কোনো প্রতিনিধি দেওয়া হবে না। বারবার সরকারের পক্ষ থেকে আহ্বান জানানো সত্ত্বেও আগের ঘোষণায় অনড় বিরোধীদলীয় জোট। তাদের দাবি, গণভোটে জনগণ সংবিধান সংশোধনের নয়, বরং মৌলিক সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে। তাই সংবিধান সংশোধন কমিটি নয়, আগে গণভোটের রায় অনুযায়ী ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন করতে হবে।
সরকার ও বিরোধী জোটের এমন মৌলিক মতপার্থক্যের কারণে প্রস্তাবিত বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন প্রক্রিয়ায় কার্যত অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। চলতি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও চলমান বাজেট অধিবেশন শেষ পর্যায়ে পৌঁছালেও এ বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। সংবিধান বিশ্লেষকদের মতে, সংবিধান সংশোধনের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে সর্বদলীয় ঐকমত্যই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পথ। এ ছাড়া সমঝোতা না হলে শুধু কমিটি গঠন নিয়ে বিতর্ক নয়, জুলাই সনদের সাংবিধানিক বাস্তবায়নও দীর্ঘসূত্রতায় পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সংসদীয় কার্যপ্রণালি বিধির ২৬৬ বিধির আওতায় ১৭ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই কমিটির দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে–জুলাই সনদের আলোকে প্রয়োজনীয় সংবিধান সংশোধনী বিলের খসড়া প্রস্তুত করে সংসদে সুপারিশ পাঠানো। গত ২৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এই কমিটি গঠনের ঘোষণা দেন। তিনি জানান, সরকারি দলের সাতজন সদস্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বাকি সদস্যদের মধ্যে বিরোধী দল, স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য এবং অন্য রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করতে নাম চাওয়া হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য, সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সব রাজনৈতিক শক্তিকে নিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য কমিটি গঠন করা।
কমিটি গঠনের সর্বশেষ অগ্রগতি জানতে চাইলে সংসদের সরকারদলীয় চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘কমিটি গঠনের সব ধরনের প্রস্তুতি আমাদের রয়েছে। সংসদে প্রতিনিধিত্বের অনুপাত বিবেচনায় রেখে কমিটিতে সব ধারার রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। বিরোধী দলগুলোর কাছ থেকে প্রতিনিধি তালিকা পেলেই আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষ হবে।
সরকারের অবস্থান: সংশোধনই সাংবিধানিক পথ
জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট–সনদের সাংবিধানিক বিষয়গুলো সংসদের মাধ্যমে সংশোধনের বিকল্প নেই। গত ১ এপ্রিল সর্বদলীয় বৈঠকের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এ প্রসঙ্গে বলেন, সরকার সব রাজনৈতিক দলকে সঙ্গে নিয়েই সংবিধান সংশোধনের কাজ করতে চায়। সে লক্ষ্যেই বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনের উদ্যোগ, যে কমিটিতে বিরোধী দলগুলোর প্রতিনিধিরা থাকবেন।
চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনিও একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, ‘সংস্কার যা হওয়ার হয়েছে, এখন হবে সংবিধান সংশোধন।’ তার মতে, জুলাই সনদের সুপারিশগুলোকে সাংবিধানিক রূপ দিতে সংসদীয় সংশোধন ছাড়া অন্য কোনো কার্যকর পথ নেই। তিনি এখনো আশাবাদী, বিরোধী দলগুলো শেষ পর্যন্ত প্রতিনিধি দেবে, আলোচনায় অংশ নেবে এবং ঐকমত্যের ভিত্তিতেই পুরো প্রক্রিয়া এগোবে।
সংস্কার পরিষদের দাবিতে অনড় বিরোধী জোট
সরকারের এই উদ্যোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট। সম্প্রতি সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সংবিধান সংশোধন একটি নিয়মিত সংসদীয় প্রক্রিয়া হলেও বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন। কারণ জনগণ গণভোটে সংবিধানের মৌলিক সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে। সেই গণরায় উপেক্ষা করে কেবল সংশোধনের উদ্যোগ গ্রহণ জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তিনি আরও বলেন, সরকার যদি গণভোটের রায় অনুযায়ী জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করে, তাহলে বিষয়টির ফয়সালা রাজপথেই হবে। একই সঙ্গে তিনি ঘোষণা দেন, সংবিধান সংশোধন কমিটিতে জামায়াত কোনো প্রতিনিধি দেবে না।
জামায়াতের অবস্থানের সঙ্গে এ বিষয়ে একাত্মতা প্রকাশ করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার খবরের কাগজকে বলেছেন, ‘গণভোটের রায় অনুযায়ী সরকারের প্রথম দায়িত্ব ছিল সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা। সেই সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা পালন না করে যদি সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠন করা হয়, তাহলে সেখানে এনসিপির কোনো প্রতিনিধি থাকবে না। আমরা চাই গণভোটের রায়ের বাস্তবায়ন। সংবিধান সংস্কার পরিষদ ছাড়া অন্য কোনো প্রক্রিয়ায় আমরা অংশ নেব না।’
সংসদে বিতর্ক, কিন্তু সমাধান অধরাই
মার্চের শেষ সপ্তাহে সংবিধান সংশোধন ও সংস্কার নিয়ে সংসদে দীর্ঘ বিতর্ক হয়। সরকার বিশেষ সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব দিলেও বিরোধী দল সংস্কার পরিষদ গঠন এবং আলোচনায় সমান প্রতিনিধিত্বের দাবি তোলে। পরে এ ইস্যুতে বিরোধী দল ওয়াকআউটও করে। এরপর সরকার কমিটি গঠনের আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ নিলেও বিরোধী দলগুলোর প্রতিনিধি না পাওয়ায় তা আর এগোয়নি। চলমান বাজেট অধিবেশনের শেষ পর্যায়েও এ বিষয়ে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
সংবিধান বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু শুধু শব্দগত নয়; বরং গণভোটের রায়ের ব্যাখ্যা ও বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে। আসলে সংবিধানের যেকোনো মৌলিক বিষয় পরিবর্তন বা সংশোধনে সর্বসম্মত রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়ে তোলা খুব কঠিন হবে। আর সে কারণে রাজনৈতিক সংলাপ ও সমঝোতা ছাড়া সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রভাব খাটিয়ে সংবিধান সংশোধন-সংস্কার বিতর্কের দ্রুত সমাধান হওয়ার সম্ভাবনা আপাতত ক্ষীণ।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া মনে করেন, সংবিধান সংশোধন নাকি সংস্কার–এই বিতর্কের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি রাজনৈতিকভাবেই হতে হবে এবং সেই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গা সংসদ। খবরের কাগজকে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক এক রায়ে সুপ্রিম কোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও গণভোট পুনর্বহালের প্রশ্নে কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত না দিয়ে আদালত বিষয়টিকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে সংসদের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। ফলে সংবিধান সংশোধনের প্রশ্নেও সংসদীয় আলোচনাই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পথ।
জ্যোতির্ময় বড়ুয়া আরও বলেন, বর্তমান সংবিধানের অধীনে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সংশোধনের সাংবিধানিক সুযোগ সরকারের রয়েছে। তবে সংবিধানের মতো মৌলিক বিষয়ে সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে ঐকমত্যে পৌঁছানোই হবে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য সমাধান। রাজনীতিতে মতপার্থক্য থাকাটা স্বাভাবিক। কিন্তু আলোচনার মাধ্যমে সেই দূরত্ব কমানোর চেষ্টা করতে হবে। বিরোধী দল প্রতিনিধি না দিলে সরকার সাংবিধানিকভাবে এগোতে পারলেও রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।
ফলে উভয় পক্ষের মধ্যে রাজনৈতিক সমঝোতা না হলে সরকারের প্রস্তাবিত ১৭ সদস্যের বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন, সংবিধান সংশোধনী বিল প্রণয়ন এবং জুলাই সনদের সাংবিধানিক বাস্তবায়ন–পুরো প্রক্রিয়া বিলম্বিত হওয়ার পাশাপাশি অনিশ্চয়তায় পড়তে পারে।