ঢাকা ২৯ আষাঢ় ১৪৩৩, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
আগামী ৫ বছরে দেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানো হবে: প্রধানমন্ত্রী হাতিয়ায় পানিবন্দিদের পাশে ছাত্রদল গাজীপুর থেকে হেঁটে ১৫০ কিলোমিটার পরিভ্রমণে তিন রোভার স্কাউট গোপালগঞ্জে ১২ লাখ টাকার অবৈধ চিংড়ির রেণু জব্দ চাঁদাবাজির মামলায় কথিত সাংবাদিক শফিকুলসহ ৩ জনের কারাদণ্ড মালয়েশিয়ায় বয়লার বিস্ফোরণে বাংলাদেশি যুবক নিহত গৌরনদীতে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে প্রধানমন্ত্রী যমজ ৩ বোনের ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি ব্যাংককে বারে আগুন, নিহত ২৭ নোবিপ্রবিতে গুচ্ছ ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের ভর্তির সময়সীমা বৃদ্ধি, ক্লাস শুরু ১৯ জুলাই শুল্কায়ন প্রক্রিয়া সহজ, ব্যবসার খরচ কমানোর দাবি শিবচরে প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় আপন দুই ভাইয়ের অনন্য সাফল্য জাককানইবিতে শুরু হলো ৪র্থ আন্তর্জাতিক নাট্যোৎসব সংবিধান সংশোধন-সংস্কার: মুখোমুখি সরকারি ও বিরোধী দল প্রকৌশলীর কাজে চিকিৎসক, লক্ষ্যের নেই অগ্রগতি বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের সংকট দুর্গম এলাকায় পৌঁছেনি ত্রাণ দেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয় এমন কোনো চুক্তি আইএমএফের সঙ্গে হবে না: অর্থমন্ত্রী বরিশালের পথে প্রধানমন্ত্রী, একঝলক দেখতে মহাসড়কে নেতাকর্মীদের ভিড় হবিগঞ্জে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে ত্রিপুরার ‘চাকমা গেট’ পূবালী ব্যাংকের ‘ক্যাশলেস রাজশাহী’ অনুষ্ঠানে ১৪টি ইলেকট্রনিক বুথের উদ্বোধন জুলাই-সেপ্টেম্বরে রিটার্ন জমা দিলেই কর ছাড় পানিবন্দি ৫ শতাধিক পরিবার হাত নেড়ে নেতাকর্মীদের ভালোবাসার জবাব দিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণা ঢাকা ও দিল্লির জন্য তাৎপর্যপূর্ণ প্রধানমন্ত্রীর বরিশাল যাত্রা, শুভেচ্ছা জানালেন ফরিদপুরের হাজারো নেতাকর্মী প্রধানমন্ত্রীকে দেখতে মাওয়া প্রান্তে জনতার ঢল অপরূপা প্রজাপতি নীল পুনম শিল্প-শিক্ষা সহযোগিতা জোরদার করতে একসঙ্গে কাজ করবে ইউসিবিডি ও কারমো গ্রুপ ইউসিটিসিতে ‘ফ্রেশারস মিট অ্যান্ড গ্রিট’ অনুষ্ঠিত সেমিফাইনালে চার দৈত্য

সংবিধান সংশোধন-সংস্কার: মুখোমুখি সরকারি ও বিরোধী দল

প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬, ০৯:৫৩ এএম
আপডেট: ১৩ জুলাই ২০২৬, ১০:০৯ এএম
সংবিধান সংশোধন-সংস্কার: মুখোমুখি সরকারি ও বিরোধী দল
খবরের কাগজ ইনফোগ্রাফ

সংবিধান ‘সংশোধন’ নাকি ‘সংস্কার’–এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে সরকার ও বিরোধী জোটের মধ্যে চলমান রাজনৈতিক অচলাবস্থা এখনো কাটেনি, বরং ‘ক্ষত’ গভীরতর হয়েছে।

জুলাই সনদের সাংবিধানিক বিষয়গুলো বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকার ১৭ সদস্যের একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনের প্রস্তুতি নিয়েছে। সংসদে বিরোধী দলের কাছেও এই কমিটির সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্তির জন্য নাম চাওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং তাদের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট শুরু থেকেই এ ধরনের কমিটির বিরোধিতা করেছে। দলগুলো ঘোষণা করেছে, এই কমিটিতে কোনো প্রতিনিধি দেওয়া হবে না। বারবার সরকারের পক্ষ থেকে আহ্বান জানানো সত্ত্বেও আগের ঘোষণায় অনড় বিরোধীদলীয় জোট। তাদের দাবি, গণভোটে জনগণ সংবিধান সংশোধনের নয়, বরং মৌলিক সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে। তাই সংবিধান সংশোধন কমিটি নয়, আগে গণভোটের রায় অনুযায়ী ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন করতে হবে। 

সরকার ও বিরোধী জোটের এমন মৌলিক মতপার্থক্যের কারণে প্রস্তাবিত বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন প্রক্রিয়ায় কার্যত অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। চলতি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও চলমান বাজেট অধিবেশন শেষ পর্যায়ে পৌঁছালেও এ বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। সংবিধান বিশ্লেষকদের মতে, সংবিধান সংশোধনের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে সর্বদলীয় ঐকমত্যই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পথ। এ ছাড়া সমঝোতা না হলে শুধু কমিটি গঠন নিয়ে বিতর্ক নয়, জুলাই সনদের সাংবিধানিক বাস্তবায়নও দীর্ঘসূত্রতায় পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। 

সংসদীয় কার্যপ্রণালি বিধির ২৬৬ বিধির আওতায় ১৭ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই কমিটির দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে–জুলাই সনদের আলোকে প্রয়োজনীয় সংবিধান সংশোধনী বিলের খসড়া প্রস্তুত করে সংসদে সুপারিশ পাঠানো। গত ২৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এই কমিটি গঠনের ঘোষণা দেন। তিনি জানান, সরকারি দলের সাতজন সদস্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বাকি সদস্যদের মধ্যে বিরোধী দল, স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য এবং অন্য রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করতে নাম চাওয়া হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য, সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সব রাজনৈতিক শক্তিকে নিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য কমিটি গঠন করা।

কমিটি গঠনের সর্বশেষ অগ্রগতি জানতে চাইলে সংসদের সরকারদলীয় চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘কমিটি গঠনের সব ধরনের প্রস্তুতি আমাদের রয়েছে। সংসদে প্রতিনিধিত্বের অনুপাত বিবেচনায় রেখে কমিটিতে সব ধারার রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। বিরোধী দলগুলোর কাছ থেকে প্রতিনিধি তালিকা পেলেই আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষ হবে।

সরকারের অবস্থান: সংশোধনই সাংবিধানিক পথ

জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট–সনদের সাংবিধানিক বিষয়গুলো সংসদের মাধ্যমে সংশোধনের বিকল্প নেই। গত ১ এপ্রিল সর্বদলীয় বৈঠকের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এ প্রসঙ্গে বলেন, সরকার সব রাজনৈতিক দলকে সঙ্গে নিয়েই সংবিধান সংশোধনের কাজ করতে চায়। সে লক্ষ্যেই বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনের উদ্যোগ, যে কমিটিতে বিরোধী দলগুলোর প্রতিনিধিরা থাকবেন।

চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনিও একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, ‘সংস্কার যা হওয়ার হয়েছে, এখন হবে সংবিধান সংশোধন।’ তার মতে, জুলাই সনদের সুপারিশগুলোকে সাংবিধানিক রূপ দিতে সংসদীয় সংশোধন ছাড়া অন্য কোনো কার্যকর পথ নেই। তিনি এখনো আশাবাদী, বিরোধী দলগুলো শেষ পর্যন্ত প্রতিনিধি দেবে, আলোচনায় অংশ নেবে এবং ঐকমত্যের ভিত্তিতেই পুরো প্রক্রিয়া এগোবে।

সংস্কার পরিষদের দাবিতে অনড় বিরোধী জোট

সরকারের এই উদ্যোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট। সম্প্রতি সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সংবিধান সংশোধন একটি নিয়মিত সংসদীয় প্রক্রিয়া হলেও বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন। কারণ জনগণ গণভোটে সংবিধানের মৌলিক সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে। সেই গণরায় উপেক্ষা করে কেবল সংশোধনের উদ্যোগ গ্রহণ জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তিনি আরও বলেন, সরকার যদি গণভোটের রায় অনুযায়ী জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করে, তাহলে বিষয়টির ফয়সালা রাজপথেই হবে। একই সঙ্গে তিনি ঘোষণা দেন, সংবিধান সংশোধন কমিটিতে জামায়াত কোনো প্রতিনিধি দেবে না।

জামায়াতের অবস্থানের সঙ্গে এ বিষয়ে একাত্মতা প্রকাশ করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার খবরের কাগজকে বলেছেন, ‘গণভোটের রায় অনুযায়ী সরকারের প্রথম দায়িত্ব ছিল সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা। সেই সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা পালন না করে যদি সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠন করা হয়, তাহলে সেখানে এনসিপির কোনো প্রতিনিধি থাকবে না। আমরা চাই গণভোটের রায়ের বাস্তবায়ন। সংবিধান সংস্কার পরিষদ ছাড়া অন্য কোনো প্রক্রিয়ায় আমরা অংশ নেব না।’

সংসদে বিতর্ক, কিন্তু সমাধান অধরাই

মার্চের শেষ সপ্তাহে সংবিধান সংশোধন ও সংস্কার নিয়ে সংসদে দীর্ঘ বিতর্ক হয়। সরকার বিশেষ সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব দিলেও বিরোধী দল সংস্কার পরিষদ গঠন এবং আলোচনায় সমান প্রতিনিধিত্বের দাবি তোলে। পরে এ ইস্যুতে বিরোধী দল ওয়াকআউটও করে। এরপর সরকার কমিটি গঠনের আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ নিলেও বিরোধী দলগুলোর প্রতিনিধি না পাওয়ায় তা আর এগোয়নি। চলমান বাজেট অধিবেশনের শেষ পর্যায়েও এ বিষয়ে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।

সংবিধান বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু শুধু শব্দগত নয়; বরং গণভোটের রায়ের ব্যাখ্যা ও বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে। আসলে সংবিধানের যেকোনো মৌলিক বিষয় পরিবর্তন বা সংশোধনে সর্বসম্মত রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়ে তোলা খুব কঠিন হবে। আর সে কারণে রাজনৈতিক সংলাপ ও সমঝোতা ছাড়া সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রভাব খাটিয়ে সংবিধান সংশোধন-সংস্কার বিতর্কের দ্রুত সমাধান হওয়ার সম্ভাবনা আপাতত ক্ষীণ।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া মনে করেন, সংবিধান সংশোধন নাকি সংস্কার–এই বিতর্কের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি রাজনৈতিকভাবেই হতে হবে এবং সেই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গা সংসদ। খবরের কাগজকে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক এক রায়ে সুপ্রিম কোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও গণভোট পুনর্বহালের প্রশ্নে কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত না দিয়ে আদালত বিষয়টিকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে সংসদের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। ফলে সংবিধান সংশোধনের প্রশ্নেও সংসদীয় আলোচনাই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পথ।

জ্যোতির্ময় বড়ুয়া আরও বলেন, বর্তমান সংবিধানের অধীনে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সংশোধনের সাংবিধানিক সুযোগ সরকারের রয়েছে। তবে সংবিধানের মতো মৌলিক বিষয়ে সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে ঐকমত্যে পৌঁছানোই হবে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য সমাধান। রাজনীতিতে মতপার্থক্য থাকাটা স্বাভাবিক। কিন্তু আলোচনার মাধ্যমে সেই দূরত্ব কমানোর চেষ্টা করতে হবে। বিরোধী দল প্রতিনিধি না দিলে সরকার সাংবিধানিকভাবে এগোতে পারলেও রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে। 

ফলে উভয় পক্ষের মধ্যে রাজনৈতিক সমঝোতা না হলে সরকারের প্রস্তাবিত ১৭ সদস্যের বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন, সংবিধান সংশোধনী বিল প্রণয়ন এবং জুলাই সনদের সাংবিধানিক বাস্তবায়ন–পুরো প্রক্রিয়া বিলম্বিত হওয়ার পাশাপাশি অনিশ্চয়তায় পড়তে পারে।

প্রকৌশলীর কাজে চিকিৎসক, লক্ষ্যের নেই অগ্রগতি

প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬, ০৯:৪৫ এএম
আপডেট: ১৩ জুলাই ২০২৬, ১০:৩২ এএম
প্রকৌশলীর কাজে চিকিৎসক, লক্ষ্যের নেই অগ্রগতি
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়

২০১৯ সালে কাজ শুরু হয়েছে। তিনবারে চার বছর সময় বাড়ানো হয়েছে, যার মেয়াদ ২০২৬ সালের ৩০ জুনে শেষ হয়েছে। কিন্তু এ পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৩১ শতাংশ, যা সন্তোষজনক না। আট বিভাগীয় শহরে অবকাঠামো (বিল্ডিং) নির্মাণকাজ এখনো শেষ হয়নি। এক টাকারও কোনো যন্ত্রপাতি ও আসবাবপত্র কেনা হয়নি। এখন আবার দুই বছর সময় বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। খরচও বাড়ছে ১ হাজার ৩০ কোটি টাকা। ফিজিবিলিটি স্টাডি (সম্ভাব্যতা সমীক্ষা) করার পরও প্রকল্পের এ দশা।

ভবন নির্মাণকাজে নেই কোনো প্রকৌশলী। প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসেবে প্রকৌশলী নিয়োগ করার কথা থাকলেও সেখানে চিকিৎসক নিয়োগ করা হয়েছে। এটা হচ্ছে ‘আট বিভাগীয় শহরে পূর্ণাঙ্গ ক্যানসার, হৃদরোগ এবং কিডনি চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন’ প্রকল্পের বাস্তব চিত্র।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

প্রকল্পটির বাস্তবায়নকারী সংস্থা হচ্ছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। জানা গেছে, দেশে প্রতিবছরে প্রায় দেড় লাখ মানুষ নতুন করে ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছেন। মারা যান এক লাখের বেশি। অথচ রাজধানীতে জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ছাড়া সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে কোনো বিশেষায়িত ক্যানসার সেবাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। বাধ্য হয়ে অনেকেই বিদেশে যাচ্ছেন, হচ্ছেন নিঃস্ব। এই অবস্থা থেকে দেশের মানুষকে রক্ষা করতে এবং ঢাকায় ক্যানসার, কিডনি ও হৃদরোগীদের চাপ এড়াতে প্রতিটি বিভাগীয় শহরে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করার উদ্যোগ নেয় সরকার। 

প্রকল্পের লক্ষ্য সারা দেশের ক্যানসার, কিডনি ও হৃদরোগে আক্রান্ত বিশাল জনগোষ্ঠীকে উন্নত চিকিৎসাসেবার আওতায় আনা ও বিদেশনির্ভরতা বন্ধ করা। এ জন্য ২০১৯ সালের ১৪ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়। এর খরচ ধরা হয়েছিল ২ হাজার ৩৮৮ কোটি টাকা। তিন বছরে অর্থাৎ ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২২ সালের জুনে এটি বাস্তবায়ন করার জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়। এরপর তিনবার সময় বাড়ানো হয়। খরচও বেড়ে ঠেকেছে ৩ হাজার ৪৩৩ কোটি টাকায়। 

প্রকল্পের প্রধান খরচ ধরা হয় ঢাকাসহ আট বিভাগীয় শহরে প্রায় দুই লাখ বর্গমিটার ভবন নির্মাণে। এতে খরচ ধরা হয় ১ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা, যা মোট খরচের ৫৫ শতাংশ। সাতটি বিভাগীয় শহরে ১৫ তলা করে নির্মাণ করা হবে সাতটি ভবন এবং ঢাকা বিভাগের উত্তরায় কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালের পাশে ভবন নির্মাণ করা হবে ১২ তলা। এসব বিশেষায়িত চিকিৎসা কেন্দ্রের জন্য ক্যানসার চিকিৎসার যন্ত্রপাতি কেনার কথা ২৩ হাজার ৮টি। তাতে খরচ ধরা হয়েছে ৮৫৩ কোটি টাকা, যা মোট খরচের ২৫ শতাংশ। ১৬৯ কোটি টাকায় কিডনি চিকিৎসার যন্ত্রপাতি কেনার কথা ১৪ হাজার ৯৬৭টি। হৃদরোগের চিকিৎসার জন্য ৩৬৯ কোটি টাকায় ২১ হাজার ৪৫৪টি যন্ত্রপাতি কেনার কথা। 

৩ বছরের কাজ ৯ বছরে

আইএমইডির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৭৩টি প্যাকেজের ক্রয় পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে পূর্তকাজ ১২০টি, পণ্য কেনা ৫৫টি ও সেবা ক্রয় ৩টি। অবকাঠামো নির্মাণের কাজটি করছে গণপূর্ত অধিদপ্তর। কিন্তু বাস্তবায়নকারী সংস্থা হচ্ছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। দুই সংস্থার মধ্যে নেই কোনো সমন্বয়। ফলে কাজে কোনো গতি আসেনি। নির্ধারিত তিন বছরের পর চার বছর সময় বাড়ানো হয়েছে, যার মেয়াদ গত জুনে শেষ হয়েছে। কিন্তু এ পর্যন্ত অগ্রগতি হয়েছে ৩১ শতাংশ। টাকা খরচ হয়েছে ১ হাজার ৫৮ কোটি টাকা। বাকি কাজ শেষ করার জন্য দুই বছর সময় (২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত) বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। খরচও বাড়ছে ১ হাজার ৩০ কোটি টাকা। এ পর্যন্ত ঢাকা বিভাগের কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালের অগ্রগতি হয়েছে ৫৯ শতাংশ। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৩৮ শতাংশ, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৩৮ শতাংশ। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কাজ ৩৩ শতাংশ, সিলেটের ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অগ্রগতি ৬৩ শতাংশ, বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অগ্রগতি ৭৫ শতাংশ, রংপুর মেডিকেল হাসপাতালের ৪৯ শতাংশ ও ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের অগ্রগতি হয়েছে ২৪ শতাংশ। 

অবকাঠামো নির্মাণকাজে নেই কোনো প্রকৌশলী

আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পের কাজ দেখভাল করতে তিন মাস পরপর প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিআইসি) ও প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটি (পিএসসি) করার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ ৮৪ মাসে প্রকল্প সংশোধনের আগে মাত্র তিনটি পিআইসি ও ১১টি পিএসসি সভা হয়েছে। ৫০ কোটি টাকার বেশি প্রকল্পের জন্য পূর্ণকালীন অভিজ্ঞ ও যোগ্য প্রকৌশলীকে পিডি হিসেবে নিয়োগের বিধান থাকলেও প্রথম প্রকল্প পরিচালক ছিলেন একজন চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এফ এম মুছা আল মানসুর। দ্বিতীয় জন ছিলেন সহযোগী অধ্যাপক ডা. খান মোহাম্মদ আরিফ ও তৃতীয় জন সহকারী অধ্যাপক ডা. এস এম মাসুদ আলম। ২০২৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে পিডির দায়িত্বে আছেন ডা. মো. তৌফিক হাসান ফিরোজ। প্রকল্পটির প্রধান অঙ্গ হচ্ছে অবকাঠামো নির্মাণকাজ। কিন্তু উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রণয়ন থেকে শুরু করে সিভিল কাজের বিভিন্ন ধাপে কারিগরি ত্রুটি, নকশার জটিলতা, কাজের মান নিয়ন্ত্রণ বুঝে নেওয়ার মতো কোনো প্রকৌশলী নিয়োগ দেওয়া হয়নি। পিডিসহ মোট ১৫ জন কাজ করলেও প্রকল্প অফিস কাঙ্ক্ষিত সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি। ঠিকাদার ও গণপূর্ত বিভাগের সঙ্গে বসে কারিগরি বিষয় বুঝে নেওয়ার মতো দক্ষ জনবলও প্রকল্প অফিসে নেই। এটি সার্বিক প্রকল্প বাস্তবায়ন নীতির পরিপন্থি।

বিভাগীয় শহরগুলোতে ক্যানসার, কিডনি ও হৃদরোগ মেডিকেল সেন্টার স্থাপন করা হলে আধুনিক যন্ত্রপাতিতে রোগীদের আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। বিশেষায়িত চিকিৎসায় নতুন করে উন্নতি হবে। অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবেন জনগণ। বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা কমবে। তার পরও গণপূর্ত ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের টানাপোড়েন প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা যন্ত্রপাতি, আসবাবপত্র কেনার কাজ এখনো শুরু হয়নি। তাই প্রকল্পের ভবন নির্মাণ শেষ হলেও হাসপাতালগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করতে আরও দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। চিকিৎসা সরঞ্জাম আমদানিতে বিলম্ব হলে হাসপাতালগুলো সময়মতো কার্যক্রম শুরু করা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই বাস্তবধর্মী কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন প্রয়োজন। 

ব্যয়বহুল নির্মাণসামগ্রী কেনায় প্রশ্ন

ভবনের ডিজাইন আকর্ষণীয় হলেও প্রতিটি ফ্লোরে বাড়তি রড দেখা গেছে। তা কাটা হয়নি। ঢালাইয়ে জয়েন্ট, ফিনিশিং ভালো হয়নি। এটা গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। কিছু ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় খরচ করা হচ্ছে। ব্যয়বহুল গ্রানাইট পাথর, অলংকারধর্মী ফলস ওয়াল এবং বাইরের দেয়ালে ফলস ব্রিক টাইলস ব্যবহারের যৌক্তিকতা কতটুকু, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। একই সঙ্গে নির্মাণসামগ্রীর মান, কিউরিং, গ্রেডেশন এবং বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) অনুসরণে কিছু কারিগরি দুর্বলতা রয়েছে। সার্বিক পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি রয়েছে। 

সার্বিক ব্যাপারে প্রকল্প পরিচালক ডা. মো. তৌফিক হাসান ফিরোজ খবরের কাগজকে বলেন, ‘প্রথমে আট বিভাগীয় শহরে ১০০ শয্যার পূর্ণাঙ্গ ক্যানসার চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন প্রকল্প ছিল। ২০১৯ সালে কাজ শুরু হয়। ২০২২ সালের ৩০ নভেম্বর প্রকল্প সংশাধন করে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়। এরপর কিডনি ও হৃদরোগের চিকিৎসার জন্য কেন্দ্র নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে ২০২৪ সালের ২৮ মার্চ প্রকল্পটি দ্বিতীয়বারের মতো সংশোধন করা হয়। সময় বাড়ানো হয় ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত। এ সময় খরচ বাড়িয়ে ধরা হয় ৩ হাজার ৪৩৩ কোটি টাকা। এরপর ২০২৫ সালের ১৭ জুলাই তৃতীয়বারের মতো সংশোধন করে সময় বাড়িয়ে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়। এ পর্যন্ত আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ৩১ শতাংশ। বাকি কাজ শেষ করার জন্য আরও দুই বছর সময় বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। ৩০ শতাংশ খরচ বাড়ানো হচ্ছে। এখনো লিফটসহ কোনো যন্ত্রপাতি ও আসবাবপত্র কেনা হয়নি। এসব কিনতে অনেক টাকা লাগবে। ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে কেনা যাচ্ছে না। করোনা, জমি অধিগ্রহণ, প্রকল্প সংশোধন ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে কাজের গতি কম হয়েছে।’ 

এক প্রশ্নের উত্তরে এই সহযোগী অধ্যাপক বলেন, ‘এর আগে তিনজন ডাক্তার পিডি ছিলেন। আমি চতুর্থ পিডি। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছিল। পরিকল্পনায় কোনো ভুল ছিল না। সময়ের চাহিদায় কিডনি ও হৃদরোগ কেন্দ্র নির্মাণ যোগ করা হয়েছে।’

অন্য এক প্রশ্নের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘আমি ডাক্তার হলেও সব কাজ বুঝে নিচ্ছি। কোনো সমস্যা হচ্ছে না। নিজে নির্মাণাধীন ভবনের কাজ তদারকি করছি। কোনো সমস্যা হচ্ছে কি না, তা দেখার জন্যই আইএমইডিকে নিবিড় পরিবীক্ষণ রিপোর্ট করতে বলা হয়েছে। কোনো ভুলত্রুটি পেলে তা সংশোধন করা হচ্ছে।’ 

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘এ ধরনের প্রকল্পের বড় সমস্যা হলো ঠিকমতো ফিজিবিলিটি স্টাডি না হওয়া। কাজের মধ্যে সমন্বয় না থাকা। অর্থের ঘাটতি থাকলেও দেদার খরচ করা হয়। ঠিকমতো পিডি নিয়োগ না হওয়ায় বাস্তবায়নে সমস্যা হচ্ছে। জনগণের করের টাকার অপচয় হচ্ছে, যা অর্থনীতির জন্য কোনোভাবেই কাম্য নয়। তাই প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের দক্ষতা বাড়ানো ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে অর্থের অপচয় রোধ হবে।’

কচুয়া-বেতাগী সেতু: নকশা জটিলতায় অপচয় শতকোটি

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬, ০৯:০৪ এএম
আপডেট: ১২ জুলাই ২০২৬, ০৯:১৭ এএম
কচুয়া-বেতাগী সেতু: নকশা জটিলতায় অপচয় শতকোটি
ছবি: সংগৃহীত

নকশা জটিলতায় নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার চার বছরের মধ্যে বড় ধরনের জটিলতায় পড়েছে কচুয়া-বেতাগী সেতু প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের তথ্যের সঙ্গে মিলছে না বাস্তবতা। তাই একাধিকবার নকশা পরিবর্তন করা হয়েছে। বেড়েছে সময় ও ব্যয়, যা প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতিকে ধীর করে দিয়েছে। পরিবহন অডিটের তথ্য বলছে, যথাযথ সম্ভাব্যতা যাচাই না করার কারণে সরকারের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৯৯ কোটি ২৬ লাখ ১৫ হাজার ৪০৭ টাকা।
 
১ হাজার ৪২ কোটি টাকা ব্যয়ে ১ হাজার ৬৯০ মিটার দীর্ঘ এই সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০২২ সালে। এ বছরের মে মাস পর্যন্ত এই প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতির হার মাত্র ২৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ। 

বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভূমিকম্প ঝুঁকি মূল্যায়নে প্রাথমিক সমীক্ষার তথ্য বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে মিলছে না। তাই সেতু কতটা দুর্যোগ সহনশীল সেই স্থায়িত্ব পুনরায় নিরীক্ষা করতে হচ্ছে। নদীর গতিপথ এবং মাটির গুণাগুণ পরিবর্তনের কারণে প্রকল্পের নকশায় আবারও পরিবর্তন আনতে হচ্ছে। এর ফলে বাড়ছে খরচ।

নতুন মূল নকশা পাস হয়নি

এই প্রকল্পের মূল বাধা বা বড় চিন্তার কারণ হলো মূল সেতুর নতুন নকশা এখনো পাস হয়নি। এ পর্যায়ে নকশা চূড়ান্ত না হওয়ায় সেতুর কাজ (সুপার স্ট্রাকচার) এক চুলও এগোতে পারছে না। সড়ক তৈরির একদম প্রাথমিক পর্যায়ের মাটি ভরাট থেকে শুরু করে ওপরের পিচ ঢালাই পর্যন্ত কোনো কাজই শুরু করা যায়নি। ফলে সংযোগ সড়কটির কোনো অস্তিত্বই এখনো তৈরি হয়নি। নদীর পাড় বাঁধানোর জন্য যে ১ হাজার মিটার দীর্ঘ বাঁধ তৈরির কথা ছিল, সেটিও থেমে আছে। টোল সংগ্রহের জন্য যে অবকাঠামো তৈরির কথা ছিল, সেটির কাজও শুরু হয়নি।

প্রকল্পের ওয়ার্কিং পাইলের অগ্রগতি ৬৯ দশমিক ২৩ শতাংশ এবং পাইল ক্যাপের কাজ ৬২ দশমিক ৫ শতাংশে আটকে আছে। সাব-স্ট্রাকচার পর্যায়ের এই ধীরগতির কারণে সুপার-স্ট্রাকচারের কাজ শুরু করতে দেরি হচ্ছে।

পটুয়াখালী প্রান্তে সেতুর যে মূল ভিত্তি বা ‘পাইল ক্যাপ’ (যার ওপর সেতুর পুরো ভার থাকে) তৈরি হওয়ার কথা ছিল, তার অর্ধেক কাজ এখনো বাকি। এ ছাড়া সেতুর দুই প্রান্তের দেয়ালের কাজও এখনো শেষ হয়নি।

প্রকল্প পরিচালক মো. তোফাজ্জল হোসেনও এই দায় স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, ঠিকাদারের নকশা প্রণয়ন ও জমা দিতে দেরি হওয়ার কারণেই মূল কাজে বিলম্ব ঘটছে। কাজের গতি বজায় রাখতে ভায়াডাক্ট অংশের নকশা অনুমোদন দিয়ে নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এখন মূল সেতুর নকশা দ্রুত অনুমোদনের জন্য দপ্তর থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

তিনি জানান, মূল সেতু ও সংযোগ অবকাঠামোর কাজ শুরু না হওয়ায় প্রকল্পের গতি অত্যন্ত ধীর। তাই মূল সেতুর নকশা দ্রুত চূড়ান্ত করা, সাব-স্ট্রাকচার কাজের গতি বাড়ানো এবং সুপার স্ট্রাকচারের কাজ শুরু করতে সমন্বিত কারিগরি ও ব্যবস্থাপনাগত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।

এই সেতু প্রকল্পের নকশা মূল্যায়ন ও নির্মাণ তদারকির জন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ প্রক্রিয়া চলছে। এই প্রকল্পের জন্য জমা দেওয়া কারিগরি প্রস্তাবগুলো মূল্যায়ন করেছে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের সাত সদস্যের একটি কমিটি। প্রকল্প অফিস জানিয়েছে, তাদের মূল্যায়নে তিনটি কনসোর্টিয়াম এগিয়ে রয়েছে। এগুলো হলো কুনহোয়া (কোরিয়া) ও ইন্টারকন্টিনেন্টাল (ভারত) জোট; রেন্ডেল লিমিটেড (যুক্তরাজ্য) ও দেশীয় জোট; এইউকম (হংকং) ও বিসিএল অ্যাসোসিয়েটস। তাদের মধ্যে যেকোনো একটি কনসোর্টিয়ামের কাছে এখন মূল দায়িত্ব অর্পণ করা হবে। 

বাজেট বাস্তবায়নে মন্থরতা 

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মোট ১ হাজার ৪২ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ের বিপরীতে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ক্রমপুঞ্জিত আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ১৮৩ কোটি টাকা। প্রকল্পের আর্থিক ও ভৌত অগ্রগতির পর্যালোচনায় দেখা যায়, রাজস্ব খাতে ৬০ কোটি টাকার বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ১২ কোটি টাকা। এই খাতে বেতন-ভাতা ও অফিস ভাড়ার মতো নিয়মিত খরচে অগ্রগতি থাকলেও বৈদেশিক প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা সেবা ও অডিও-ভিডিও নির্মাণের মতো খাতে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যয়ই হয়নি।

অন্যদিকে মূলধন খাতে ৯৫১ কোটি টাকার বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ১৭১ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ১৭ দশমিক ৯৯ শতাংশ। এটি প্রকল্পের মূল কাজের ধীরগতির একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সেতু (ভায়াডাক্টসহ) খাতে মোট ব্যয়ের প্রায় ৭২ দশমিক ২৪ শতাংশ সংস্থান থাকলেও এর অগ্রগতি মাত্র ১০ দশমিক ৯৯ শতাংশ। এ ছাড়া সংযোগ সড়ক ও অন্য নির্মাণকাজের কোনো অগ্রগতিই হয়নি। নদী শাসন কাজের অগ্রগতিও সন্তোষজনক নয়, যা দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৬ শতাংশ।
 
তবে প্রকল্পের একটি ইতিবাচক দিক হলো ভূমি অধিগ্রহণ খাত। এই খাতে প্রায় শতভাগ অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। এ ছাড়া প্রকল্পের নকশা পরিবর্তন ও শ্রমসংক্রান্ত জরুরি তহবিল থেকে এখন পর্যন্ত কোনো অর্থ ব্যয় হয়নি।

এর আগে প্রকল্পের এডিবি বরাদ্দের চিত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, মোট ৩৯০ কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ২৩৮ কোটি টাকা অর্থছাড় হয়েছে, যার মধ্যে ব্যয় হয়েছে ২০৬ কোটি টাকা। প্রকল্প শুরুর প্রারম্ভিক পর্যায়ে (২০১৯-২০) কোনো বরাদ্দ ও ব্যয় না থাকায় কার্যক্রম শুরুতেই বাধার সম্মুখীন হয়েছিল। চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত প্রকল্পের তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট বরাদ্দের বিপরীতে ৩৬ দশমিক ৭৯ শতাংশ অর্থ ছাড় হয়েছে এবং ৩৬ দশমিক ৪৫ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয়েছে।

১১৫ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম

২০২২-২৩ এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে নানা অনিয়মে এই প্রকল্পে ১১৫ কোটি টাকারও বেশি আর্থিক অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে পরিবহন অডিটের প্রতিবেদনে।

২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রাক্কলন ছাড়াই অগ্রিম ফান্ড ট্রান্সফারের মাধ্যমে ১১ কোটিরও বেশি টাকা অনিয়মিত ব্যয়ের তথ্য উঠে এসেছে অডিট প্রতিবেদনে। সেই অর্থবছরে পরিবহন অডিটে ধরা পড়ে আরও বড় অনিয়ম। যথাযথ সম্ভাব্যতা যাচাই না করার কারণে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয় ৯৯ কোটি ২৬ লাখ টাকা। প্রকল্পের বাজেট থেকে পরামর্শককে কিছু টাকা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আয়কর কাটার সময় ভুলবশত নিয়মের চেয়ে বেশি টাকা কেটে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে। এতে সরকারের ৪ লাখ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে। সেই টাকার হিসাব মেলাতে গিয়ে প্রকল্প কর্মকর্তারা আরেক বিপত্তি বাধিয়েছেন। ঠিকাদারের দায়বদ্ধতা ছিল তার বিল থেকে ভ্যাট ও আয়কর প্রদান করা। কিন্তু কর্তৃপক্ষ ঠিকাদারকে পুরো টাকা দিয়ে দেওয়ায় পরে সরকারি কোষাগারে সেই ভ্যাট ও আয়কর আবারও প্রকল্পের টাকা থেকে শোধ করতে হয়েছে। এতে করে প্রকল্পের বাজেটের ১৯ লাখ টাকা গচ্চা গেছে। ওই অর্থবছরে ভূমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত মামলায় ৩ কোটি ৪৯ লাখ টাকা অনিয়মিতভাবে পরিশোধ করা হয়েছে। 

সেতু নির্মাণের একটি প্যাকেজে দুটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ২০২১ সালের জুনে চুক্তি হলেও মূল ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি হয় ২০২২ সালের মার্চে। এই ৯ মাসের ব্যবধানে কোনো নির্মাণকাজ হয়নি। তা সত্ত্বেও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান দুটি বিলের মাধ্যমে প্রায় ৩৮ কোটি টাকার বেশি অর্থ গ্রহণ করেছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। এ সময় পরামর্শক প্রতিষ্ঠান দরপত্র প্রক্রিয়া ও প্রশাসনিক কাজে যুক্ত হলেও নির্মাণকাজে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। 

আইএমএফের সঙ্গে আলোচনায় গুরুত্ব পাবে ঋণচুক্তি

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬, ০৯:৪৭ এএম
আপডেট: ১১ জুলাই ২০২৬, ১০:১৬ এএম
আইএমএফের সঙ্গে আলোচনায় গুরুত্ব পাবে ঋণচুক্তি
ছবি: সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বাংলাদেশ মিশন প্রধান ইভো ক্রজনারের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফরে আসছেন। আগামীকাল রবিবার তারা আসতে পারেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ (এনবিআর) সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের  কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রতিনিধিদল বৈঠকে বসবে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে। 

অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবারে আইএমএফ প্রতিনিধিদল রবিবার (আগামীকাল) থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বাংলাদেশে অবস্থান করবে। সূচি অনুযায়ী সফরের প্রথম দিন তারা অর্থ বিভাগের সঙ্গে দুই দফা বৈঠক করবে। প্রথম বৈঠকে সরকারের নতুন ঋণ চুক্তি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।

একই সঙ্গে নতুন বাজেট, রাজস্ব ঘাটতি, রাজস্ব নীতি, রাজস্ব সংস্কার, মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক অর্থায়ন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করার কথা আছে। দ্বিতীয় বৈঠকে প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীর গতি, নতুন জাতীয় পে-স্কেলের অর্থায়ন এবং এ খাতে সরকারের ব্যয় পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হবে। ব্যাংক খাতের সুশাসন প্রতিষ্ঠান, রিজার্ভ পরিস্থিতি নিয়েও বৈঠকে কথা হবে। 

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেন, রাজস্ব আদায় বাড়াবে এমন শর্তে আইএমএফ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারকে ঋণ দিলেও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছিল। এরপর সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারও রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারবে বলে অঙ্গীকার করলেও পারেনি। এখন বর্তমান সরকারের সঙ্গে নতুন চুক্তির বিষয়ে আলোচনা চলছে। এবারে রাজস্ব আদায়ে অনেক বড় ঘাটতি রয়েছে। এর মধ্যে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের চাপ আছে। এমন অবস্থায় নতুন ঋণ চুক্তি করতে হলে সরকারকে অবশ্যই রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারবে এমন নিশ্চয়তা দিতে হবে। 

এরই মধ্যে আইএমএফ থেকে এনবিআরের কাছে পাঠানো প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এনবিআরকে ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা শুল্ক-কর আদায়ের লক্ষ্য দেওয়া হয়। পরে লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে আইএমএফ ৩ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা আদায়ের জন্য বলা হলেও আদায় হয় ৩ লাখ ৩১ হাজার ৫০২ কোটি টাকা।

আইএমএফ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশের কর–জিডিপির অনুপাত দশমিক ৫ শতাংশ বাড়িয়ে ৮ দশমিক ৩ করার শর্ত দেয়। এই শর্ত পূরণ করতে হলে ৬৫ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত আয় করা প্রয়োজন থাকলেও তা পারেনি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শেষে কর-জিডিপির অনুপাত ৮ দশমিক ৮ শতাংশ এবং অতিরিক্ত ৭৩ হাজার কোটি টাকার ওপরে রাজস্ব আদায়ের কথা থাকলেও আদায় করতে ব্যর্থ হয় এনবিআর। আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির সর্বশেষ বছর অর্থাৎ চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কর-জিডিপির অনুপাতের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয় ৯ দশমিক ৫ শতাংশ।

এই অর্থবছরে অতিরিক্ত আরও ৯৬ হাজার কোটি টাকা আয় করার লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়। কিন্তু সদ্য শেষ হওয়া অর্থবছরে কর জিডিপি অনুপাত কমে দাঁড়িয়েছে ৮ শতাংশ এবং অতিরিক্ত আদায় দূরে থাক, ঘাটতি প্রায় এক লাখ কোটি টাকা। রাজস্ব আদায়ের এমন পরিস্থিতিতে চলতি অর্থবছরে এনবিআর ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা কোন কৌশলে আদায় করবে, তা জানতে চেয়েছে আইএমএফ।

দাতা সংস্থা থেকে পাঠানো প্রতিবেদনে নতুন পে-স্কেল কার্যকরে অর্থের উৎস কী, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এবারের বৈঠকে এসব আলোচনা বিশেষ গুরুত্ব পাবে। চলতি অর্থবছরে প্রজ্ঞাপন জারি করে সব পণ্যে অভিন্ন ভ্যাটের হার ১৫ শতাংশ আরোপের বিষয় নিয়েও এবারের বৈঠকে আলোচনা হওয়ার কথা আছে।   

বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায় পরিস্থিতি নিয়ে এনবিআর কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। তিনি বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি আশাবাদী এনবিআর চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে সক্ষম হবে।’ 

অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে আইএমএফের বৈঠকে উপস্থাপনের জন্য প্রণীত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠিত হয়েছে। এরই মধ্যে বিনিয়োগের জন্য দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যোগাযোগ করছেন। বন্ধ কলকারখানা চালু করতে সরকার ধাপে ধাপে ৬০ হাজার কোটি টাকা অর্থায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারি ৪৪ কারখানা বেসরকারি খাতে সরবরাহের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এর ফলে সমগ্র অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

বাজার ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে সরকার কঠোর অবস্থানে আছে। মূল্যস্ফীতি কমানো সম্ভব হবে। এসবের প্রভাবে রাজস্ব আদায় বাড়বে। এ ছাড়া সরকার অপ্রত্যাশিত ব্যয় খাতে বড় অঙ্কের অর্থ রেখেছে, যা চলতি অর্থবছরে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে কাজে লাগানো হবে। নতুন পে-স্কেল ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের কথা জানাবে সরকার। বর্তমান সরকার নতুন ঋণ কর্মসূচির আওতায় আইএমএফের কাছে ৪৫০ থেকে ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ পাওয়ার প্রত্যাশা করছে।

অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মানীয় ফেলো প্রফেসর ড. মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, নতুন ঋণ পেতে হলে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের বিষয়ে সন্তোষজনক পরিকল্পনা জানাতে হবে। এ ছাড়া নতুন পে-স্কেলের বিষয়ে প্রয়োজনীয় অর্থ জোগানের বিষয়েও নিশ্চয়তা দিতে হবে। রাজস্ব খাতের সংস্থার নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হবে বলে মনে করছি। ব্যাংক খাতের সুশাসন নিয়ে বর্তমান সরকার কী করতে চায় তা নিয়েও আলোচনা হওয়ার কথা। এসব নিয়ে বহুবার দাতা সংস্থা কথা বলেছে। এখন দেখার বিষয় বর্তমান সরকার আইএমএফ-কে কতটা সন্তুষ্ট করে ঋণ নিতে পারে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা আনতে বর্তমান সরকার কী পদক্ষেপ নিয়েছে তাও বিস্তারিত জানানো হবে। বিশেষভাবে কতগুলো প্রকল্প বাতিল করা হচ্ছে, কেন বাতিল করা হচ্ছে এবং বিদ্যমান ও নতুন প্রকল্পে গতি আনতে সরকার কী করতে যাচ্ছে, তা নিয়েও আলোচনা হবে। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলেন, বর্তমান সরকার প্রকল্পের নানামুখী দুর্নীতি কমাতে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের একটি করে ড্যাশ বোর্ড করা হচ্ছে। এখানে উল্লেখ করতে হবে প্রকল্পের অগ্রগতি। এ ছাড়া কী কারণে প্রকল্পে গতি আসছে না তার কারণও উল্লেখ করতে হবে।

কাজে লাগছে না কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬, ০৮:৫৪ এএম
আপডেট: ১১ জুলাই ২০২৬, ০৯:০৩ এএম
কাজে লাগছে না কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী
তৈরি পোশাকশিল্পে কাজ করছেন প্রায় ৫০ লাখ কর্মী (বয়স ২৫-৪৯)

বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি। একে অনেকেই বোঝা মনে করলেও আসলে তা জনসম্পদ। জনসংখ্যার ৬৪ শতাংশের বেশি কর্মক্ষম। তাদের বয়স ১৫ থেকে ৬৪ বছরের মধ্যে। এই বয়সের জনসংখ্যাই বিভিন্ন খাতে কর্মরত আছেন। বয়সের দিক দিয়ে তারা কাজের উপযোগী। কৃষি, শিল্প, সেবা ক্ষেত্রে অবদান রাখছেন।

  • বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৬৫ শতাংশের বেশি কর্মক্ষম (১৫–৬৪ বছর), যা দেশের জন্য একটি বড় জনমিতিক লভ্যাংশের সুযোগ তৈরি করেছে।
  • গুণগত শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাবে এই বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর পূর্ণ সম্ভাবনা এখনো কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি; ফলে শিক্ষিত বেকারত্বও বাড়ছে।
  • বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০৪১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ জনমিতিক লভ্যাংশের সর্বোচ্চ সুবিধা পাওয়ার সুযোগ পাবে। তাই এখনই শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি

রপ্তানি আয় বাড়াচ্ছেন। বিদেশেও উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছেন। রেমিট্যান্স, প্রবাসী আয়েও রেকর্ড করছেন এই তারাই। তারপরও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে কাজে লাগানো যায়নি ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতিক লভ্যাংশ। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড হলো কোনো দেশের মোট জনসংখ্যার বয়স কাঠামো পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি সুযোগ বা সম্ভাবনা। এর পূর্ণ সুফল অর্জনের জন্য গুণগত শিক্ষা, শোভন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ক্রমবর্ধমান কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল কাজে সম্পৃক্ত করা, স্বাস্থ্যসেবা এবং অবকাঠামো উন্নয়নে অগ্রাধিকার দেওয়া অত্যন্ত জরুরি, যা আমাদের দেশ এখনো অর্জন করতে পারেনি।

আজ ১১ জুলাই বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস। ১৯৯০ সালের ১১ জুলাই প্রথমবারের মতো ৯০টি দেশে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস উদযাপিত হয়। তারই ধারাবাহিকতায় নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশও বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস পালন করছে। ১৯৮৭ সালের ১১ জুলাই বিশ্বের জনসংখ্যা ৫০০ কোটি অতিক্রম করে। তার ধারাবাহিকতায় ১৯৮৯ সালে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) পরিচালনা পরিষদ এই দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত নেয়।

ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড থাকা মানে একটি দেশের উন্নতি সাধন করার অপার সম্ভবনার দুয়ারে অবস্থান করা। কর্মক্ষম জনসংখ্যা ব্যবহার করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করাই ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড। জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপি) সংজ্ঞা অনুযায়ী, যখন কোনো দেশের কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বেশি থাকে এবং সেটা যখন অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখে, তখনই তাকে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বলা হয়। জনমিতির হিসাবে, ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীকে একটি রাষ্ট্রের জন্য উৎপাদনশীল, কর্মমুখী ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য সক্রিয় বিবেচনা করা হয় এবং একটি দেশের মানবগোষ্ঠীর এ পর্যায়কে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য মানবসম্পদ হিসেবে দেখা হয়।

১৫ থেকে ৬৪ বছরের মানুষের সংখ্যা বেশি

বিবিএস বলছে, ১৫ থেকে ৬৪ বছরের মানুষের সংখ্যাই দেশে বেশি, যা ৬৫ দশমিক ১ শতাংশ। এর মধ্যে ২৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সের মানুষ ৩৪ দশমিক ৫১ শতাংশ। তারাই দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অবদান রাখছেন। তৈরি পোশাক শিল্পে এই বয়সের (২৫-৪৯) প্রায় ৫০ লাখ কর্মী কাজ করছেন। এই তালিকার বাইরেও কয়েক লাখ শ্রমিক কাজ করছেন, যাদের অবদান রয়েছে রপ্তানি আয়ে। তাদের অবদানের কারণেই বিদায়ী (২০২৫-২৬) অর্থবছরে ৪৮ বিলিয়ন (৪ হাজার ৮০০ কোটি) ডলার ছাড়িয়েছে রপ্তানি আয়।

২৫ থেকে ৪৯ বছরের লাখ লাখ মানুষ কাজ করছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। তারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে সদ্য সমাপ্ত বছরে মোট ৩৫.৫৬ বিলিয়ন (৩ হাজার ৫৫৬ কোটি ২০ লাখ) ডলারের রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। তবে প্রযুক্তি জ্ঞানের অভাবে বিশ্ববাজারে তাদের মাসিক বেতন অনেক কম। তাই এ বিশাল জনসংখ্যাকে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্য ইত্যাদি ক্ষেত্রে উপযুক্ত করে গড়ে তোলা অপরিহার্য, যেন ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুফল কাজে লাগানো যায়।

সাম্প্রতিক সময়ে বেকার বা কর্মহীন মানুষ বেড়ে গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে শ্রমিক অসন্তোষের কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছে। শিক্ষিত বেকারের সংখ্যাও প্রতিনিয়ত বাড়ছে। প্রতি বছর ২০ লাখেরও বেশি শিক্ষিত মানুষ বেকারের খাতায় নাম লেখাচ্ছে। বিআইডিএসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিক্ষিত বেকারের সংখ্যার মধ্যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েশন করার তিন বছর পরও শিক্ষার্থীদের ২৮ শতাংশ বেকার থাকছেন।

বাজেটে কর্মসংস্থানের দিকে নজর

বিএনপি সরকার দায়িত্ব নিয়েই চলতি অর্থবছরের বাজেটে কর্মসংস্থানের দিকে নজর দিচ্ছে। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, ২৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশীয় কৃষি খাত, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প, এসএমই শিল্প এবং রুগ্‌ণ ও বন্ধ কলকারখানাগুলোর জন্য সহজ শর্তে ঋণ দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল-২০২৬ ঘোষণা করেছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) উপপরিচালক (ডেমোগ্রাফি অ্যান্ড হেলথ উইং) মো. আলমগীর হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সহায়তা অনুপাত ইকোনমিক সাপোর্ট রেশিও (ইএসআর) ১৯৯১ সালে ০.৫৫ থেকে ধারাবাহিকভাবে বেড়ে ২০২২ সালে ০.৯১-এ পৌঁছেছে। ২০৪১ সালের দিকে প্রায় ০.৯৮-এ পৌঁছে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উপনীত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এজন্য ২০৪১ সালকে বাংলাদেশের জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনের সর্বোচ্চ সম্ভাবনাময় সময় নির্দেশ করা হচ্ছে। মনে রাখা দরকার, ২০৪১ সালের পর ইএসআর ধীরে ধীরে হ্রাস পেয়ে ২০৭১ সালে ০.৮৬-এ নেমে আসতে পারে। অর্থাৎ ২০৭১ সালের পর থেকে ক্রমবর্ধমান প্রবীণ জনগোষ্ঠীর ওপর নির্ভরশীলতার চাপ বাড়বে। জনমিতিক লভ্যাংশের পূর্ণ সুফল অর্জনের জন্য বাংলাদেশকে গুণগত শিক্ষা, শোভন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ক্রমবর্ধমান কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল কাজে সম্পৃক্ত করা, স্বাস্থ্যসেবা এবং অবকাঠামো উন্নয়নে অগ্রাধিকার দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।   

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান আবু হাসনাত মো. কিশোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমাদের জনসংখ্যা বোঝা না। কারণ নির্ভরশীলতার চেয়ে কর্মক্ষম জনসংখ্যাই বেশি। ডিভিডেন্ড বা লভ্যাংশ (মুনাফা) আসছে। দিন বদলের ধাক্কায় অধিকাংশ পরিবারে আয়মুখী মানুষ বাড়ছে। নির্ভরশীলতা কমছে। তবে যত মুনাফা পাওয়ার কথা, তা পাওয়া যায়নি। কারণ সম্প্রতি বেকারত্বের হার বেড়েছে। দক্ষ জনশক্তি বাড়ছে না। কর্মসংস্থান কমে যাচ্ছে। ফলে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে ডিভিডেন্ড কাজে লাগানো যায়নি। জিডিপির প্রবৃদ্ধি কমে গেছে। তরুণদের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কাজে লাগাতে হবে। কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে।’

পুলিশকে বারবার টার্গেট, অপ্রতিরোধ্য মব সহিংসতা!

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬, ০৮:৫২ এএম
আপডেট: ১১ জুলাই ২০২৬, ০৯:১৬ এএম
পুলিশকে বারবার টার্গেট, অপ্রতিরোধ্য মব সহিংসতা!
ছবি: খবরের কাগজ

মব সহিংসতা কোনোভাবেই বন্ধ হচ্ছে না, বরং এই অপরাধ প্রবণতা ছড়িয়ে পড়ছে। মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন করেই অনেকে উন্মাদের মতো ‘মব সন্ত্রাস’ চালিয়ে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও পরিকল্পিতভাবে বা টার্গেট করে মব সন্ত্রাস চালানো হচ্ছে। 

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে পুলিশের মনোবল ও সাংগঠনিক কাঠামো বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। সেই সুযোগে বিভিন্ন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে টার্গেট করে সংঘবদ্ধ মব সহিংসতা ঘটাতে শুরু করে, যা পরে একধরনের ‘মব কালচারে’ রূপ নেয়। সেই ভয়ানক তৎপরতার মাত্রা আপাতদৃষ্টিতে কিছুটা কমলেও মব সহিংসতার ধারাবাহিকতা এখনো যথেষ্ট চলমান। 

বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) এক আসামির মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে বরিশালের আগৈলঝাড়া থানায় ঢুকে একদল বিক্ষুব্ধ জনতা সংঘবদ্ধভাবে থানা ভবনে ভাঙচুর ও দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা চালায়। এতে কয়েকজন পুলিশ সদস্য মারপিটের শিকার হয়ে কষ্টে-দুঃখে কান্নায় ভেঙে পড়েন, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এতে সচেতন মহলসহ পুলিশ সদস্যদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। অনেক পুলিশ সদস্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়ে চরম ক্ষোভ ও সমাজের প্রতি হতাশা প্রকাশ করেন। 

পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, গত ছয় মাসে (জানুয়ারি থেকে জুন) সারা দেশে ৩১৯ পুলিশ সদস্য মব বা সংঘবদ্ধ হামলার শিকার হন বা আহত হয়েছেন। এ ছাড়া গত ছয় মাসে (জানুয়ারি থেকে জুন) দেশের বিভিন্ন স্থানে মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে ১১৩ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। 

এ প্রসঙ্গে অপরাধ বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক মনে করেন, মব সন্ত্রাসের ঘটনা অনেক আগে থেকেই ঘটে আসছে। কিন্তু চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের সময় থেকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে, ব্যক্তিগত শত্রুতার ফলে টার্গেট করে এবং গুজবসহ নানা প্রেক্ষাপটে একের পর এক যেভাবে মব সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটেছে, তা রাষ্ট্রের আইন ও বিচারব্যবস্থাকে চরম আঘাত হেনেছে। মবের ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের একধরনের সমর্থন বা উসকানি দেখা যায়।

এ ছাড়া ওই সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ‘ভঙ্গুর’ অবস্থার সুযোগে এ ধরনের বেআইনি অপতৎপরতা ব্যাপক বেড়ে যায়। সে সময় সরকারের ঊর্ধ্বতন একাধিক কর্মকর্তা মব সন্ত্রাসকে যৌক্তিক করার জন্য ইঙ্গিতপূর্ণ নানা ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। কিন্তু দুঃখজনক হচ্ছে, বর্তমানে রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় বসার পরেও মব সহিংসতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, বরং সেই ধারাবাহিকতা এখনো চলছেই। সরকারকে মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেন মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের এই অধ্যাপক। 

এ প্রসঙ্গে সামাজিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক গতকাল খবরের কাগজকে বলেন, “মবের মতো আইনবিরুদ্ধ কাজও সমাজে যখন প্রতিনিয়ত ঘটে এবং একধরনের ‘বৈধতা পায়’, তখন একটা শ্রেণির কাছে তা ‘স্বাভাবিক’ বলে প্রতীয়মান হওয়া বিচিত্র নয়। কেউ কেউ মনে করেন, এভাবেও বিচার করা যায় বা বিচার হয়। বাংলাদেশে এই বাধা বা প্রতিবন্ধকতার সূত্র ধরে মব সহিংসতা ক্রমান্বয়ে দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে। স্বয়ং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও মবের আক্রমণ থেকে রেহাই পাচ্ছেন না, যা সচেতন নাগরিকদের মধ্যে উদ্বেগ ও শঙ্কা ছড়াচ্ছে। বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। ফলে মবের রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় বন্ধ ও মবের সঙ্গে যুক্ত রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোরতা অনুসরণ করা দরকার। সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।” 

বারবার টার্গেটের শিকার হচ্ছে পুলিশ

পুলিশ সদর দপ্তর থেকে জানা গেছে, কর্তব্যরত অবস্থায় অপরাধী ও দুষ্কৃতকারীদের মব সন্ত্রাস বা বিভিন্নভাবে পুলিশের ওপর ধারাবাহিকভাবে হামলার ঘটনা ঘটছে। গত ছয় মাসে (জানুয়ারি থেকে জুন) দেশজুড়ে মোট ৩১৯ জন পুলিশ সদস্যের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে ৪২ জন করে পুলিশ সদস্য হামলার শিকার হন। পরের মাসগুলোতে এই প্রবণতা আরও বাড়ে, যেখানে মার্চে ৬৩ জন, এপ্রিলে ৬৬ জন, মে মাসে ৫৫ এবং গত জুনে ৫১ জন পুলিশ সদস্য বিভিন্ন স্থানে মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে হামলার শিকার হন। 

গত ১৬ জুন রাজধানীর আদাবরে ‘কবজি কাটা’ নামে পরিচিত একটি ছিনতাইকারী চক্রের আস্তানায় অভিযান চালাতে গিয়ে ওসি জাহিদুল ইসলাম ও এসআই তরুণ চাপাতির কোপে আহত হন। তার আগে ১১ জুন শেরেবাংলা নগরের জিয়া উদ্যান এলাকায় ছিনতাইকারীদের ধাওয়া করতে গিয়ে ছুরিকাঘাতে আহত হন দুই পুলিশ সদস্য।

এমনকি দুর্যোগ-দুর্ঘটনায় অনন্য ভূমিকা রাখা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদস্যরাও বাদ যাচ্ছেন না মব সহিংসতা থেকে। গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার হেঁয়াকো বাজারের একটি শপিংমলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দেরিতে পৌঁছানোর অভিযোগ তুলে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের মারধর এবং গাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের চেষ্টা করা হয়। 

এ প্রসঙ্গে পুলিশের সাবেক আইজি মুহাম্মদ নুরুল হুদা গতকাল খবরের কাগজকে বলেন, ‘আগেও পুলিশ হামলার শিকার হয়েছে, কিন্তু বর্তমানে সংখ্যাটা অনেক বেড়েছে। সাধারণ মানুষও মবের শিকার হয়েছেন বা হচ্ছেন। ফলে এসব বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ দৃশ্যমান করতে হবে। সরকার এসব বিষয়ে নিশ্চয়ই কাজ করছে, সে কারণে আগের চেয়ে এই প্রবণতা কমেছে। কিন্তু পরিস্থিতির আরও উন্নয়নে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সরকার ও বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনীতিকের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। 

নব্য ‘মব সংস্কৃতি’ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান-জননিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি

একটি গুজবকে কেন্দ্র করে বরিশাল জেলার আগৈলঝাড়ায় থানায় সংঘটিত হামলা, ভাঙচুর এবং দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের ওপর ন্যক্কারজনক আক্রমণের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন। 

সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) শামীমা পারভীন বলেন, আগৈলঝাড়া থানা পুলিশ স্থানীয় রিয়াজ ফকির (২৬) নামে এক আসামিকে চুরির মামলায় গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে আসে। তার বিরুদ্ধে ইতোপূর্বে থানায় মাদকের মামলা ছিল। রিয়াজ ফকির সে সময়েও ছিলেন মাদকাসক্ত। মাদকের প্রভাবে তিনি থানা হাজতে নিজের মাথায় আঘাত করে রক্তাক্ত জখম হন। এতে রিয়াজ ফকির অসুস্থ হয়ে পড়লে পুলিশ সেই রাতেই রিয়াজ ফকিরকে আগৈলঝাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা শেষে উন্নত চিকিৎসার জন্য গভীর রাতে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়।

অথচ রিয়াজ ফকিরের মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়লে কতিপয় ব্যক্তি আগৈলঝাড়া থানায় হামলা ও ভাঙচুর চালায়। এ সময় তারা দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের ওপর আক্রমণ করে। গুজবনির্ভর এ ধরনের হামলা শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য হুমকিস্বরূপই নয়, বরং বাংলাদেশে গড়ে ওঠা নব্য ‘মব সংস্কৃতি’, প্রকারান্তরে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, বিচার-প্রক্রিয়া ও জননিরাপত্তার প্রতি মারাত্মক হুমকি, যা একটি শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ। এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়ে স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষ বাংলাদেশ পুলিশ তথা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে তাদের কায়েমি স্বার্থ হাসিলের অপচেষ্টায় লিপ্ত বলে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন আশঙ্কা করছে।

কারা কী কারণে করছে, খুঁজে বের করতে হবে

মুহাম্মদ নুরুল হুদা
আইনকানুন নিজের হাতে উঠিয়ে নেওয়ার প্রবণতা বেড়ে গেছে। পুলিশ আগেও মব হামলার শিকার হয়েছে, এখনো হচ্ছে। তবে মব কেন ঘটছে এবং কারা, কী কারণে করছে, সেগুলো খুঁজে বের করতে হবে। এ বিষয়ে কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হলে মব সন্ত্রাস দমন করা সম্ভব।
স্বাধীনতা যুদ্ধের পর ১৯৭২ সালেও মবের অনেক ঘটনা ছিল। ওই সময়ের পরিসংখ্যান দেখলে সেটি বোঝা যাবে। তখনো মানুষ মনে করেছিল, দেশ স্বাধীন, আমরাও স্বাধীন হয়েছি, তাই কোনো পরোয়া না করেই যেকোনো কিছুই করা যাবে। ঠিক ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পরও অনেকে মনে করেছে, তারা স্বাধীন, সেজন্য দেশে এমন মব পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
দেখা যাচ্ছে, অভ্যুত্থানের পর যত মব হয়েছিল, সেই পরিমাণ মবের ঘটনা নিশ্চয়ই এখন নেই। এরপরও সরকারের তরফ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিলে সেটিও কমে আসবে বলে আশা করছি। মবের ঘটনায় যেসব মামলা হয়েছে, তাড়াতাড়ি সেগুলোর চার্জশিট ও বিচার করা গেলে মব কালচার বা মব সন্ত্রাস কমে যাবে।
এ ছাড়া দেশের রাজনৈতিক দলগুলো এবং সরকারি দল মবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে মব সন্ত্রাস দমন করা সম্ভব। পাশাপাশি দেশের যে জায়গাগুলোতে মব ঝুঁকি রয়েছে, সেখানে সতর্ক থাকা এবং যারা মব সৃস্টির চেষ্টা করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। 

সাবেক আইজিপি

মবের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স হতেই হবে

মনজিল মোরসেদ

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ১৮ মাস ধরে যেভাবে মব সন্ত্রাসের চর্চা হয়েছে, এখন এটি কমতে সময় লাগবে। কিন্তু এটি কমাতে চাইলে/বন্ধ করতে চাইলে সরকারকে মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স হতেই হবে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তো মব সন্ত্রাসের চর্চা হয়েছে। এখন সরকার মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কিছু ব্যবস্থা নিচ্ছে। তার মানে অ্যাকশন শুরু হয়েছে। কিন্তু কেবল কিছু ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নিলে হবে না, সব ক্ষেত্রেই ব্যবস্থা নিতে হবে। যেমন সম্প্রতি বিভিন্ন মাধ্যমে দেখলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রনেতা একজন অভিনেত্রীকে উদ্দেশ করে বলেছেন, ‘ওই মহিলাকে যে জুতার বাড়ি মারতে পারবে তারে ১ লাখ টাকা পুরস্কার দেব। জুতার বাড়ি মেরে নাক-মুখ দিয়ে রক্ত বের করে দিতে পারলে ২ লাখ টাকা। এখন কেউ মব উস্কানি বলতে আসলে ওইডারে ভরা বাজারে পিটামু।’ এ রকম সাইবার মবও হচ্ছে এখন। কিন্তু এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা তো শুনলাম না। সশরীরে মব হচ্ছে, সাইবার মব হচ্ছে–কিন্তু এসবের কোনোটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হবে, আবার কোনোটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হবে না। তাতে তো মব সন্ত্রাস বন্ধ হবে না। বন্ধ করতে হলে সরকারকে মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স হতেই হবে।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ছে, প্রয়োজন কঠোর পদক্ষেপ

ড. তৌহিদুল হক 

বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে মব সহিংসতার নানা ধরন প্রকাশ পাচ্ছে। কোনো একটি সমাজে কিংবা দেশে আইনের শাসন যথাযথভাবে প্রয়োগে ঘাটতি থাকলে মব সহিংসতা সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ মানুষ নিজেই নিজের ওপর সংঘটিত কোনো অন্যায়, বৈষম্য কিংবা অবিচারের বিচার করতে উদ্যত হয়। বর্তমানে যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তাতে বাংলাদেশে মব সহিংসতা ক্রমান্বয়ে দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে সরকারের উচিত, এই বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া।

বাংলাদেশে মানুষের নাগরিক প্রাপ্যতা কিংবা মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের প্রশ্নে দায়িত্বশীল আচরণ এবং সামাজিক সংবেদনশীলতার প্রশ্নে প্রত্যাশিত সূচক অত্যন্ত নিম্নগামী। আইনের প্রয়োগ এবং রাষ্ট্র কর্তৃক ন্যায়বিচারের প্রশ্নে সামাজিক পরিচয় কিংবা শ্রেণি বিভাজনের কারণে সৃষ্ট সামাজিক কদর অর্থাৎ রাষ্ট্র কিংবা রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানের কাছে কোনো ব্যক্তি কত গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়গুলো আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে বিবেচ্য। 
এই বিষয়গুলো নিয়ে যথেষ্ট অভিযোগ রয়েছে। আবার এসব অভিযোগের সত্যতাও নানা সময়ে নানাভাবে প্রমাণিত। যখন আইনের প্রয়োগ কিংবা আইনের দৃষ্টি সব ব্যক্তির ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ না হয়, তখন রাষ্ট্র বিচার করবে এমন বিশ্বাস ব্যক্তি করতে পারে না। তখন নিজেই বিচার করতে আগ্রহী হয়ে ওঠে এবং নানা ধরনের আইন পরিপন্থি ব্যবস্থা নেয়। 

বাংলাদেশে মব সহিংসতার রাজনৈতিক ইতিহাস বেশ পুরোনো। দীর্ঘ সময় ধরে লক্ষণীয় যে কোনো দল কিংবা অর্থ-ক্ষমতার বিচারে প্রভাবশালী ব্যক্তি কতিপয় লোক একত্রিত করে চলমান রাজনৈতিক ধারার বিপরীত অবস্থানে থাকা কাউকে অভিযুক্ত করে শায়েস্তা করা বা উচিত শিক্ষা দেওয়ার নামে আইনবিরোধী ব্যবস্থা নেয়। আবার চলমান রাজনৈতিক ধারার বিপরীতে যারা আছেন, তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ দিয়ে এই ধরনের মব সহিংসতা চালালে সেটি সমাজের মধ্যে একটি শ্রেণি আছে যারা চলমান রাজনৈতিক ধারায় বিশ্বাস করে, তারা এই ঘটনার সামাজিক এবং রাজনৈতিক বৈধতা উৎপাদন করে। 

মবের মতো আইনবিরুদ্ধ কাজও সমাজে যখন প্রতিনিয়ত ঘটে এবং বৈধতা পায় তখন একটা শ্রেণির কাছে তা ‘স্বাভাবিক’ বলে বৈধতা পায়। কেউ কেউ মনে করে এভাবেও বিচার করা যায় বা বিচার হয়। 

আইনের বাইরে গিয়ে নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা বা ব্যক্তিস্বার্থ অর্জনের জন্য নিজের শক্তি কিংবা শক্তি ভাড়া করে অন্যের ওপরে অন্যায়ভাবে প্রয়োগ করার প্রেক্ষাপট কোনো একটি দেশে সার্বিক শৃঙ্খলা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা। বাংলাদেশে এই বাধা বা প্রতিবন্ধকতার সূত্র ধরে মব সহিংসতা ক্রমান্বয়ে দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে। ক্ষমতা এবং অর্থের বিচারে শক্তিশালী ব্যক্তিরা নিজ নিজ স্বার্থ আদায় এবং সমাজকে একটি অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যে অস্থিরতা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা। স্বয়ং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও মবের আক্রমণ থেকে রেহাই পাননি, যা আইনমান্যকারী নাগরিকদের মধ্যে উদ্বেগ ও শঙ্কা ছড়াচ্ছে। মব সহিংসতা থেকে পরিত্রাণের জন্য কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মবের রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় বন্ধ ও মবের সঙ্গে যুক্ত রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক কঠোরতা অনুসরণ করা দরকার।  

সহযোগী অধ্যাপক, সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট
এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়