কক্সবাজারের চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরীর নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও লক্ষাধিক মানুষ এখনো পানিবন্দি অবস্থায় চরম মানবিক সংকটে রয়েছেন। তলিয়ে গেছে নলকূপ ও শৌচাগার। যার ফলে তীব্র বিশুদ্ধ পানি, খাবার ও স্যানিটেশন-সংকট দেখা দিয়েছে। রান্নার সুযোগ না থাকায় দুর্গতরা শুকনো খাবার খেয়ে দিন পার করছেন। তবে দুর্গম এলাকাগুলোতে এখনো সরকারি ত্রাণ না পৌঁছানোর অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। প্রশাসন অবশ্য দুর্গম এলাকায় ত্রাণ পৌঁছানো এবং দ্রুত পানি নিষ্কাশনের আশ্বাস দিয়েছে।
গতকাল রবিবার সরেজমিনে কয়েকটি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বন্যার পানিতে নলকূপ তলিয়ে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানির উৎস প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে বন্যার পানি ব্যবহার করছে।
অন্যদিকে বাজার, সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় চাল, ডাল, শিশুখাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী সংগ্রহ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক পরিবার গবাদিপশু ও সামান্য সহায়-সম্বল নিয়ে আশ্রয় নিয়েছে উঁচু স্থান কিংবা ঘরের মাচায়। বিচ্ছিন্ন এলাকাগুলোতে নৌকাই এখন যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা না গেলে পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে। চকরিয়া উপজেলার কাকারা, বরইতলী, রসুলাবাদ, হারবাং ও বিবিরখীল এলাকার অনেক বাসিন্দা অভিযোগ করেন, বন্যার কয়েক দিন পেরিয়ে গেলেও তাদের এলাকায় এখনো কোনো সরকারি ত্রাণ পৌঁছেনি।
লক্ষ্যারচর এলাকার শামশুল আলম বলেন, ‘ঘরে এখনো পানি। রাতে ঠিকমতো ঘুমানোর জায়গা নেই, মাচায় কোনোমতে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে থাকছি। চুলা জ্বালাতে না পারায় কয়েক দিন ধরে রান্না করতে পারিনি। নলকূপ ডুবে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানির সংকট। শৌচাগারও পানির নিচে থাকায় খুব কষ্টে দিন কাটছে। ঘরে যা খাবার ছিল সব শেষ। এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি আর দ্রুত ত্রাণ।’
বরইতলীর বাসিন্দা মোহাম্মদ আলম বলেন, ‘ঘরে যা খাবার ছিল সব শেষ। বাজারে যেতে পারছি না। ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে খুব কষ্টে আছি। এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন খাবার আর বিশুদ্ধ পানির।’
কাকারা ইউনিয়নের আবদুল কাদের বলেন, ‘নৌকা ছাড়া বের হওয়ার উপায় নেই। কয়েক দিন ধরে অর্ধাহারে দিন কাটছে। দ্রুত ত্রাণ না এলে আরও বড় বিপদ হবে।’
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শিক্ষার্থীরাও। অনেকের বই-খাতা, স্কুলব্যাগ ও শিক্ষা উপকরণ পানিতে ভেসে গেছে। রসুল্লাবাদের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী তানজিলা আক্তার বলে, ‘আমার সব বই-খাতা নষ্ট হয়ে গেছে। সামনে পরীক্ষা। এখন কীভাবে পড়াশোনা করব বুঝতে পারছি না।’
কক্সবাজার পরিবেশ ও বন সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি দীপক শর্মা দীপু বলেন, ‘মাতামুহুরী নদী খনন, অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং স্বাভাবিক পানি প্রবাহ নিশ্চিত করা না গেলে প্রতিবছরই এ ধরনের দুর্যোগ আরও ভয়াবহ হবে। শুধু ত্রাণ নয়, স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।’
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার পেছনে স্লুইসগেট ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও দায়ী। কিছু স্লুইসগেট ইজারা নিয়ে স্থানীয় প্রভাবশালীরা মাছ চাষ করায় বন্যার সময়ও সময়মতো গেট খোলা হয় না। স্থানীয় বাসিন্দা আজিজ উদ্দিন বলেন, ‘সময়ে গেট খুললে এতদিন পানি আটকে থাকত না। মানুষের দুর্ভোগও অনেক কম হতো।’
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম বলেন, ‘বান্দরবান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মাতামুহুরী নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় চকরিয়া ও পেকুয়ার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। নদীর পানির উচ্চতা বেশি থাকায় স্লুইসগেট খুললেও পানি বের হওয়ার সুযোগ ছিল না। নদীর পানি কমে গেলে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হবে।’
চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীন দেলোয়ার বলেন, ‘বন্যাকবলিত সব ইউনিয়নের জন্য পর্যাপ্ত ত্রাণ বরাদ্দ পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যে অনেক এলাকায় ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে। যেসব দুর্গম এলাকায় এখনো পৌঁছানো সম্ভব হয়নি, সেখানে নৌকার মাধ্যমে দ্রুত ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। কোনো ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সহায়তার বাইরে রাখা হবে না।’
জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নান বলেন, ‘জেলার ৬৪০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১৫ হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। দুর্গত মানুষের জন্য সরকারিভাবে ২০০ মেট্রিক টন চাল, ৪৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ১২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় দ্রুত ত্রাণ পৌঁছে দিতে কাজ চলছে।’
নগদ অর্থ ও ত্রাণসামগ্রী বিতরণ
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ৭ জুলাই থেকে গতকাল পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে মানবিক সহায়তা হিসেবে বড় অঙ্কের নগদ অর্থ ও চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে শুধু ত্রাণ হিসেবেই মোট ৫ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ৬৪টি জেলার জন্য পৃথকভাবে ত্রাণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে, এতে সর্বমোট চাল বরাদ্দ করা হয়েছে ৮ হাজার ৯৫০ মেট্রিক টন। দুর্যোগ সহায়তায় নগদ অর্থের পরিমাণ ৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা।
সাতটি উপদ্রুত জেলায় গত কয়েক দিনের ত্রাণসহায়তার মধ্যে চট্টগ্রাম জেলায় ৬৫ লাখ টাকা ও ১ হাজার ২০০ মেট্রিক টন চাল, কক্সবাজার জেলায় ৩০ লাখ টাকা ও ৪৫০ মেট্রিক টন চাল, বান্দরবান জেলায় ২০ লাখ টাকা ও ৪০০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ করা হয়েছে। খাগড়াছড়ি জেলায় ২০ লাখ টাকা ও ৪০০ মেট্রিক টন চাল, রাঙামাটিতে ২৫ লাখ টাকা ও ৫০০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ করেছে মন্ত্রণালয়। মৌলভীবাজারে ১০ লাখ টাকা ও ২০০ মেট্রিক টন চাল এবং হবিগঞ্জ জেলায় ৫ লাখ টাকা ও ১০০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি (বিডিআরসিএস) তাদের কেন্দ্রীয় জরুরি কার্যক্রম কেন্দ্রের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। বিভিন্ন জেলা ইউনিটে নগদ অর্থ ও উদ্ধার সরঞ্জামও পাঠাচ্ছে তারা। দুর্যোগের তীব্রতা মোকাবিলায় বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি, সেভ দ্য চিলড্রেন ও কারিতাস বাংলাদেশের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও তাদের আগাম সতর্কতামূলক ও সহায়তা কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।
বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে যুবদল
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, রাঙামাটি, কক্সবাজার, ফেনী, নোয়াখালী, কুমিল্লা, সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজারসহ বিভিন্ন জেলার দুর্গত মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে জাতীয়তাবাদী যুবদল কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির উদ্যোগে গঠিত মেডিকেল টিম মাঠপর্যায়ে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর অংশ হিসেবে চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে মেডিকেল টিম বন্যাদুর্গতদের জন্য ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প ও ত্রাণ বিতরণ কর্মসূচি পালন করে।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন যুবদলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ডা. লোহানী তাজুল ইসলাম, স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা.গালিব হাসান ও সহ স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা. মাহমুদুল হাসান খান সুমন ও ডা. আল মামুন হাসান খান এমিল ও ডা. সানিয়া নাসরিন।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদল কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সভাপতি আবদুল মোনায়েম মুন্না ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম নয়ন এমপির দিকনির্দেশনায় এই মানবিক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।