প্রকৃতির অন্যতম এক বিস্ময়কর নেয়ামত হলো বৃষ্টি। মহান রবের অসীম কুদরতের এক জীবন্ত নিদর্শন এটি। বৃষ্টির পানির ছোঁয়ায় মৃত পৃথিবী প্রাণ ফিরে পায়, শস্য-শ্যামল হয়ে ওঠে মাঠ-ঘাট, আর জীবকূল খুঁজে পায় বেঁচে থাকার রসদ। কিন্তু এই জীবনদায়ী বৃষ্টিই যখন অতিরিক্ত রূপ নেয় কিংবা দীর্ঘদিন উধাও থাকে, তখন তা মানবজাতির জন্য চরম বিপর্যয় ও মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ইসলাম আমাদের শেখায়, প্রকৃতির এই খামখেয়ালিপনা আসলে কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়; বরং এর পেছনে রয়েছে মহান স্রষ্টার গভীর হুকুম ও খোদায়ি রহস্য।
মহাবিশ্বের সবকিছুই এক সুনির্দিষ্ট নিয়মে ও মাপে পরিচালিত হচ্ছে। বৃষ্টি বর্ষণের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, আর আমি আকাশ থেকে পরিমিত পরিমাণে পানি বর্ষণ করি। (সুরা মুমিনুন, আয়াত: ১৮)
এই আয়াতটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জীবন ধারণের জন্য যা কিছু অপরিহার্য, তা যদি সীমার বাইরে চলে যায়, তবে তা রহমতের বদলে অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়। যে পানি ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে না, সেই পানিই যখন অতিবৃষ্টি আর বন্যার রূপ নেয়, তখন জনজীবন লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। তাই প্রজ্ঞাময় আল্লাহ সাধারণত সবকিছু পরিমাপ মতোই দেন। তবে মাঝে মাঝে তিনি এর ব্যতিক্রম ঘটান মানুষের চোখ খুলে দেওয়ার জন্য।
কখনো চারপাশ তীব্র খরায় পুড়তে থাকে, আবার কখনো অবিরাম বর্ষণে ভেসে যায় লোকালয়। কোরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ আসলে মানুষেরই কর্মের ফল এবং এক ধরনের ঐশী সতর্কবার্তা। আল্লাহ বলেন, মানুষের কৃতকর্মের দরুন স্থলে ও জলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে, যার ফলে আল্লাহ তাদের কোনো কোনো কর্মের শাস্তি আস্বাদন করান, যাতে তারা (সৎপথে) ফিরে আসে। (সুরা রূম, আয়াত: ৪১)
এই আয়াত থেকে স্পষ্ট যে—দুর্ভিক্ষ, অনাবৃষ্টি, মহামারি, জলোচ্ছ্বাস বা অতিবৃষ্টির মতো সামষ্টিক বিপদগুলোর মূল কারণ মানুষের পাপাচার ও স্রষ্টার অবাধ্যতা। তবে এই বিপর্যয়ের মধ্যেও আল্লাহর এক বিশেষ দয়া লুকিয়ে থাকে। কারণ, সাময়িক এই কষ্ট মানুষকে অহংকার ভুলে তওবা করার ও সঠিক পথে ফেরার সুযোগ করে দেয়।
অনাবৃষ্টি ও অতিবৃষ্টির সমাধান হিসেবে হাদিসে একটি চমৎকার ও শিক্ষণীয় ঘটনা রয়েছে। একবার জুমার দিন প্রিয় রাসুল (সা.) মদিনার মসজিদে খুতবা দিচ্ছিলেন। এমন সময় এক সাহাবি দাঁড়িয়ে আরজি জানালেন, হে আল্লাহর রাসুল! অনাবৃষ্টির কারণে খরা ও দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে। পশুপাখি ও মানুষ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। আপনি আল্লাহর দরবারে বৃষ্টির জন্য দোয়া করুন।
তখন আকাশে মেঘের দূরতম কোনো চিহ্নও ছিল না। রাসুল (সা.) হাত তুলে দোয়া করতেই চারদিক থেকে মেঘ জমা হতে শুরু করল এবং প্রবল বেগে বৃষ্টি নামল। সেই বৃষ্টি মদিনার মাঠ-ঘাট ভাসিয়ে একটানা পরবর্তী জুমা পর্যন্ত চলতে থাকল।
পরের জুমায় যখন রাসুল (সা.) আবারও খুতবা দিচ্ছিলেন, তখন সেই ব্যক্তি (বা অন্য কেউ) দাঁড়িয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! এবার তো অতিবৃষ্টির কারণে ঘরবাড়ি ভেঙে পড়ছে, চারপাশ ডুবে যাচ্ছে। দয়া করে বৃষ্টি বন্ধের দোয়া করুন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) মুচকি হাসলেন এবং আকাশের দিকে হাত তুলে দোয়া করলেন, আল্লাহুম্মা হাওয়ালাইনা ওয়া লা আলাইনা
অর্থ: হে আল্লাহ! আমাদের চারপাশে বৃষ্টি দাও, আমাদের ওপর (ক্ষতিগ্রস্ত করে) নয়। (বুখারি, ১০১৩-১০১৫)
অলৌকিক বিষয় হলো, রাসুল (সা.) হাত দিয়ে আকাশের যেদিকে ইশারা করছিলেন, সেদিকের মেঘ কেটে যাচ্ছিল। মদিনার ওপর রোদ হেসে উঠল, আর শহরের চারপাশের উপত্যকায় বৃষ্টি হতে লাগল। ইসলাম শুধু বৃষ্টির আবেদন করতেই শেখায় না, বরং অতিবৃষ্টির ক্ষতি থেকে বাঁচার উপায়ও বাতলে দেয়।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক