ঢাকা ২৯ আষাঢ় ১৪৩৩, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
ফতুল্লায় অটোরিকশার ধাক্কায় শিশুর মৃত্যু বিপৎসীমার ওপরে তিস্তার পানি, খোলা হলো তিস্তা ব্যারেজের ৪৪ জলকপাট ইন্টারন্যাশনাল স্কুল ঢাকার নতুন ডিরেক্টর ড. মাইক মিলার কাপ্তাই হ্রদের পানি বাড়ায় রাঙামাটির ৬ উপজেলায় বন্যার শঙ্কা সাতকানিয়ায় বন্যার্তদের পাশে দাঁড়াল সিস্টেম গ্রুপ সংসদের বিভিন্ন কক্ষে ছাদ দিয়ে পানি পড়ার অভিযোগ হুইপের তিস্তার পানি বিপৎসীমার ওপরে, স্বল্পমেয়াদি বন্যার শঙ্কা বঙ্গোপসাগরে ট্রলারডুবে কুতুবদিয়ার ৫ জেলে নিখোঁজ বৃষ্টির সময় কেন দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না? বরিশালে সেনাবাহিনীর গ্রীষ্মকালীন প্রশিক্ষণ দেখলেন প্রধানমন্ত্রী বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে চাই: জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের মুখে হাসি ফোটানোর গল্প বিদেশি বিনিয়োগে অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করবে সরকার: তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী সাতকানিয়ায় বন্যায় ১০০ কোটি টাকার বেশি ক্ষয়ক্ষতি চা-শিল্পের সংকট ও টেকসই উন্নয়নের পথ নাগেশ্বরীতে এইচএসসিতে ধার করা ট্যাগ অফিসারে পরীক্ষা! হাসপাতালের নিকৃষ্ট সিন্ডিকেট নির্মূল করুন ডিজিটাল জুয়ার মরণফাঁদ মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, হত্যাযজ্ঞ এবং ট্রাম্পের হাসি ফরিদপুরে বৃষ্টির মধ্যে গাছের নিচে আশ্রয়, বজ্রপাতে নিহত ১ ১৫ হাসপাতালে হেমাটোলজি মেশিন দিল 'ইজিমেড ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড' বন্যার্তদের পাশে তৌসিফ, দিলেন আর্থিক সহায়তা বদ্বীপ থেকে ডিজিটাল ক্যানভাস: বাংলাদেশি লোকশিল্পের রূপান্তর স্পেন জাতীয় ফুটবল দলকে কেন বলা হয় ‘লা রোজা’? ম্যাচ বিরতিতে বারবার কুলকুচি কেন করেন ফুটবলাররা? জাহিদ হাসানের ‘পথহারা মন’ ধোলাইখালে সড়ক ধসে যান চলাচল বন্ধ ডাকসুর ভিপিসহ ছাত্রশিবির ছাড়লেন কেন্দ্রীয় ৯ নেতা ফ্রান্সকে কেন লে ব্লুজ বলা হয়? ইংল্যান্ড–আর্জেন্টিনা সেমিফাইনাল ঘিরে আটলান্টায় কঠোর নিরাপত্তা

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, হত্যাযজ্ঞ এবং ট্রাম্পের হাসি

প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬, ০৬:২১ পিএম
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, হত্যাযজ্ঞ এবং ট্রাম্পের হাসি
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

ইরানের ওপর হামলার সময় ট্রাম্প কিন্তু ন্যাটো তার সঙ্গে থাকবে কি থাকবে না তা নিয়ে চিন্তাও করেননি, নেমে পড়েছেন মানুষ হত্যার অভিযানে। ভয় কীসের? খামেনি ও তার কমান্ডারদের ভয় থাকে আক্রান্ত হওয়ার এবং প্রাণ হারানোর, বিশেষ করে দেশের অভ্যন্তরে মার্কিনি ও ইসরায়েলি গুপ্তচররা সক্রিয় থাকায়, ট্রাম্প তো নিরাপদে হাসছেন এবং হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন মেঘের আড়ালে থেকে।...

অ্যান ফ্রাঙ্কের প্রাণ হরণের ৮০ বছর পরে ২০২৬ সালে নিপীড়িত ইহুদি জনগোষ্ঠীর জায়নবাদী অংশের নায়ক নেতানিয়াহুর সহযোগী এবং তার চেয়েও ভয়াবহ রকমের দানবীয় এক ব্যক্তি, ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে পরিচালিত এক হামলায় অ্যান ফ্রাঙ্কেরই বয়সী (অনেকেরই হয়তো কিছু কম হবে) ১৬৫ জন ইরানি কন্যাশিশু ও কিশোরী প্রাণ হারিয়েছে। অ্যানের মতোই তারাও ছিল সম্পূর্ণ নিষ্পাপ, এবং অ্যানের মতোই তাদের একমাত্র ‘অপরাধ’ ছিল তাদের সম্প্রদায়গত পরিচয়। কিশোরী অ্যান ফ্রাঙ্কের নাম এক সময়ে অনেকেই জানতেন, বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে। ইহুদি বংশোদ্ভূত মেয়েটি তার পরিবারের সঙ্গে হিটলারের নাৎসি বাহিনীর লোকদের হাতে বন্দি হয়েছিল, একটি নির্যাতনশালায়। বন্দি অবস্থাতেই তার মৃত্যু ঘটে, যেমনটা ঘটেছিল তার পরিবারের সব সদস্যের সঙ্গে অসংখ্য ইহুদি বন্দির। নির্যাতনের অবধি ছিল না। অ্যান ফ্রাঙ্ক অসামান্য ছিল বিশেষ করে এদিক থেকে যে, চরম নির্যাতন ও হতাশার মধ্যেও সে ভেঙে পড়েনি। স্থির চিত্তে নিজের অভিজ্ঞতাগুলো তার ডায়েরিতে লিখে রেখেছে। জন্ম তার ১৯২৯-এ, প্রাণ হারায় ১৯৪৫-এ; অর্থাৎ বেঁচে ছিল মাত্র ১৬ বছর। অত অল্পবয়সে প্রাণ না হারালে মেয়েটি নিশ্চয়ই আরও বড় মাপের সাহিত্যসৃষ্টি করতে পারত, যার সম্ভাবনা তার দিনলিপির পাতায় পাতায় পরিস্ফূট। অ্যান চলে গেছে, কিন্তু তার ডায়েরিটি বেঁচে গেছে। নাৎসিদের পরাজয়ের পর ১৯৪৭ সালে ডায়েরিটি মুদ্রিত হয়ে প্রকাশ পায়। সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন ভাষায় তার অনুবাদ হতে থাকে, এবং বিশ্ববাসীর কাছে নাৎসিদের বর্বরতার একটি জীবন্ত দলিল হিসেবে গৃহীত হয়।

অ্যান ছিল ইহুদি; ইরানের ওই ১৬৫ জন কন্যাশিশু জন্মগত পরিচয়ে ছিল মুসলমান। বেঁচে থাকলে কে জানে এদের মধ্যে কেউ অ্যান ফ্রাঙ্কের মতো অসাধারণ একজন হয়ে উঠতে পারত কি না। তা বিশ্বখ্যাতি অর্জন করুক বা না-ই করুক, এদের প্রত্যেকেরই তো ছিল বেঁচে থাকার অধিকার, যে অধিকার নিঃশেষ করে দেওয়া হয়েছে অ্যান ফ্রাঙ্কেরই ধর্মসম্প্রদায়ভুক্ত নেতানিয়াহু এবং তার বড় ভাই খ্রিষ্টান ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষেপণাস্ত্রের এক আঘাতে। যিশু খ্রিষ্ট এসেছিলেন শান্তির বাণী নিয়ে, ডোনাল্ড ট্রাম্পও দ্বিতীয় মেয়াদে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হয়ে এবং ধর্মগ্রন্থ ছুঁয়ে শপথ নিয়ে আগ বাড়িয়ে ঘোষণা করেছিলেন ‘অন্তহীন’ যুদ্ধগুলোর অবসান ঘটিয়ে বিশ্বে তিনি শান্তির বন্যা বইয়ে দেবেন। এবং শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার পাবেন বলেও আশা রেখেছিলেন, কেবল যে বুকের গোপন কুঠরিতে তা নয়, মুখর মুখেও। সেটা না পাওয়ায় তিনি অসন্তুষ্ট হয়েছেন। পুরস্কারটি পেয়েছেন অবশ্য তারই আজ্ঞাবহ হতে সর্বদা-প্রস্তুত ভেনেজুয়েলার এক রাজনীতিবিদ; তবে সে পাওয়াতেও ট্রাম্প সাহেবের শান্তি কোথায়? নোবেল না পাওয়ার ক্রোধেই যে তিনি বিশ্বকে ছারখার করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা নিশ্চয়ই নয়। তার আবির্ভাব আসলে যিশু খ্রিষ্টের উল্টো ভূমিকা পালনের জন্যই, এবং সেটা হচ্ছে মানবিক ও প্রাকৃতিক উভয় বিশ্বকেই যতটা পারা যায় নষ্ট করে ফেলবার। নষ্টের রাজা তিনি। যৌন-নিপীড়নসহ নানা ধরনের অপরাধে অপরাধী সাব্যস্ত এপেস্টাইন নামে অধুনা-জগৎবিখ্যাত এক সফল ব্যবসায়ীর সঙ্গেও তার খাতিরের নথি প্রকাশিত হওয়া শুরু করেছে। সমগ্র বিশ্বের বিরুদ্ধে তিনি যে শুল্কযুদ্ধ জারি করেছেন, তাতে মানুষের জীবন-ব্যয় খোদ আমেরিকাতেও বৃদ্ধি পাচ্ছিল এবং তার জনপ্রিয়তার পারদ দ্রুত নিচের দিকে নামছিল। এ অবস্থায় দুকান কাটা যাওয়াদের মতো মানসম্মানের ক্ষেত্রে তিনি অবশ্য প্রায় সর্বহারাই। কেউ কেউ বলছেন লোকটি উন্মাদ, কেউ বলছেন মাতাল; মনে হয় দুটোই সত্য। ক্ষমতালোলুপতার উন্মাদনা তাকে গ্রাস করেছে, এবং আচরণ তিনি করছেন আত্মনিয়ন্ত্রণহীন মাতালের মতো। তাকে গুন্ডা বললেও অপমান করা হয় না। আসলেই তার অনেক মুখ, তদুপরি মুখোশও বিবিধ।

ইতোমধ্যে আমেরিকার মানুষ, সবাই না হলেও অনেকেই, টের পেয়ে গেছেন যে লেজে আগুন লাগা হনুমানের মতো ট্রাম্প সাহেব যে খেলাটা খেলছেন সেটা আমেরিকার যুদ্ধ নয়, ইসরায়েলের ফিলিস্তিন দখলের প্রচেষ্টা মাত্র এবং এটাও তাদের কাছে অস্পষ্ট নেই যে, যেটাকে যুদ্ধ বলা হচ্ছে, সেটা মোটেই যুদ্ধ নয়; নির্লজ্জ এবং বর্বর হামলা বটে। হামলার প্রথমটিই ছিল এমন অতর্কিত যে, ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা, তার কয়েকজন ঘনিষ্ঠজনসহ ৪২ জন একসঙ্গে প্রাণ হারিয়েছেন। পরবর্তী হামলাগুলোতে নিহত হয়েছেন অসংখ্য মানুষ, এবং স্কুলে পড়তে আসা ১৬৫ জন কন্যাশিশু।

আমাদের একটি জাতীয় দৈনিক শিশুহত্যার ওই খবরটি দিয়েছে এভাবে: ‘তারা পড়ত, খেলত একসঙ্গে, শুয়ে থাকবে পাশাপাশি। মাত্র কয়েকদিন আগে তাদের চাঞ্চল্যে মুখর থাকত যে পরিবেশ, সেটা ভারী হয়ে উঠেছে পাথরের মতো তাদেরই নীরবতায়। ডুকরে কেঁদে উঠেছেন হাজারো মানুষ [...] ইরানের পতাকায় ছোট ছোট কফিনগুলো ঢেকে দেওয়া হয়েছে।’ ওই শিশুদের তো অন্য কোনো অপরাধ ছিল না, ইরানি পরিচয়টি ছাড়া; কিন্তু সে পরিচয়টি ওই শিশুরা মুছে ফেলবে কী করে? মৃত্যুর পরে অবশ্য তাদের অতিরিক্ত এই পরিচয়টিও রয়ে যাবে যে, তারা শহিদ হয়েছে পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদীদের নৃশংস অস্ত্রাঘাতে।

শিশু হত্যাকারী কাপুরুষরা অস্ত্র হাতে স্থলপথে আসেনি; এলে প্রতিহত হতো; তারা হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে দূরে বসে, নিরাপদে থেকে, আকাশপথে মিসাইল ছুড়ে। এমন হত্যাকাণ্ড অনুন্নয়নের যুগে সম্ভব ছিল না, আজ সভ্যতা ও বিজ্ঞান উভয়েই যখন উন্নতির চূড়ান্ত স্তরে গিয়ে পৌঁছেছে, তখনই এটা সম্ভব হয়েছে। বিজ্ঞান এখন অত্যাচারীদের ক্রীতদাস বৈ নয়। ইসরায়েলের নেতানিয়াহুর একার পক্ষে ওই তাণ্ডবলীলা অসম্ভব হতো, যদি বড় ভাই ট্রাম্পের সহায়তা না পেত। তাদের তাণ্ডব কেবল যে বস্তুগত ধ্বংসলীলা ও গভীর অর্থনৈতিক ক্ষতেরই সৃষ্টি করছে তা নয়, শিশু ও নারীসহ নিরীহ মানুষকে হত্যার ক্ষেত্রেও নতুন ধরনের একটি রেকর্ড প্রতিষ্ঠা করেছে। ১৪ মার্চ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যে প্রকাশ পেয়েছে যে, যৌথ হামলায় ইরানে প্রাণ হারিয়েছেন ১ হাজার ৪৪২ জন; লেবাননে ৮২৬ জন। এর বিপরীতে ইরানের জবাবে ইসরায়েলিদের মৃত্যুসংখ্যা সর্বমোট ১৪ জন। ১৪ জনের বেশি মানুষ তো আমাদের এ অনুন্নত দেশে একদিনেই প্রাণ হারাচ্ছেন। একটি মাত্র সড়ক-দুর্ঘটনাতেই।

জর্জ ডব্লিউ বুশ যখন ইরাক আক্রমণ করেন তার আগে অন্তত এক মাস তিনি আমেরিকার মানুষের সমর্থন আদায়সহ বিশ্বজনমতকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ধরনের প্রচার কার্য চালিয়েছিলেন; ট্রাম্প সাহেবের কর্মসূচিতে ওই সবের বালাই নেই। জর্জ বুশের আচরণ দেখে মনে হয়েছিল নতুন হিটলারের অভ্যুদয় ঘটেছে, কিন্তু ট্রাম্পের কাণ্ডকারখানা দেখে তো স্বয়ং হিটলারই লজ্জা পাচ্ছেন, কবরে শুয়ে।

হিটলার তবু দেখাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, ইহুদিরা জার্মানদের অর্থনৈতিক জীবনের ওপর কর্তৃত্ব করছে। তার পক্ষে সম্ভব হয়েছিল ওই সম্প্রদায়ের ধনীদের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা। কিন্তু কোথায় ইরান আর কোথায় আমেরিকা? ইরানের মানুষ তো আমেরিকার জন্য বিন্দুমাত্র হুমকি তৈরি করেনি। গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে, ইরাকের বিরুদ্ধে বুশ এই অভিযোগ দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছিলেন; সেটা যে ভুয়া ছিল তা প্রমাণিত হওয়ায় এবং ইরাকে ধ্বংস ছাড়া তার পক্ষে অন্যকিছু ঘটানো যে সম্ভব হয়নি, তা দেখে পরবর্তীতে তিনি কিছুটা লজ্জাতেও পড়েছিলেন; কিন্তু আমেরিকার নতুন নায়কের না আছে লজ্জা না আছে ভয়। তার জন্য হারানোর কিছু নেই, এবং জগৎ খোলা রয়েছে জয় করার। সেটাই তিনি করতে চান। ভেনেজুয়েলার নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে তিনি অপহরণ করে নিয়ে আসেন, বলেন বিচার করবেন; বেচারার অপরাধ প্রতিবেশী হয়েও ট্রাম্প সাহেবকে নিয়মিত সালাম না জানানো, আরও বড় অপরাধ ভেনেজুয়েলার বিপুল পরিমাণ তেলের মজুতের ওপর মার্কিনি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় সুযোগদানে অসম্মতি। ইরানকে ট্রাম্প কাবু করবেন; কারণ ইরান বেয়াদবের মতো আচরণ করে এবং ইরানকে দমাতে পারলে তেলসমৃদ্ধ গোটা মধ্যপ্রাচ্য মার্কিনি আধিপত্য একচ্ছত্র হবে। ইরানের পরে বিশাল আমেরিকার অতিশয় ক্ষুদ্র প্রতিবেশী ‘বেয়াদব’ কিউবার ওপর যে হামলা চালাবেন, সে ঘোষণা তো দিয়েই রেখেছেন। গ্রিনল্যান্ডই বা স্বতন্ত্র থাকবে কেন, আমরা নিয়ে নেব। প্রতিবেশী-অনুগত কানাডাকে দখলে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য করবেন বলেও ঘোষণা দিয়েছেন। এসব কথা বলে জনগণকে সন্তুষ্ট রাখবেন, এবং পারলে ক্ষেপিয়ে তুলবেন, এই হলো অভিসন্ধি। ওদিকে ইউরোপই বা বাদ যাবে কোন দুঃখে, তার মেরুদণ্ডও ভেঙে দেওয়া দরকার। সারা দুনিয়া হবে আমেরিকার পদানত। সে লক্ষ্যে ইউরোপকেও ভাগ করে ফেলা চাই। পুতিন যে ইউক্রেন আক্রমণ করেছিলেন সে কাজের অজুহাতে ছিল ইউক্রেন ন্যাটোতে যোগ দেবে এই শঙ্কা। চিন্তাটা যে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ছিল তাও নয়। ন্যাটোর বাহুতে মূল শক্তি জোগাত আমেরিকা। আমেরিকার সমর্থনই ছিল ইউক্রেনের জন্য ভরসা। ইউক্রেন আক্রান্ত হলে সেখানকার মানুষ যে দুর্দশায় নিক্ষিপ্ত হয়েছিল, তাতে ইউরোপজুড়ে প্রতিবাদ তো বটেই, ক্রন্দনের ধ্বনিও শোনা গেছে। আমেরিকাও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যত প্রকার সাহায্য প্রয়োজন দুহাতে তা সরবরাহ করবে। ইরানের ওপর হামলার সময় ট্রাম্প কিন্তু ন্যাটো তার সঙ্গে থাকবে কি থাকবে না তা নিয়ে চিন্তাও করেননি, নেমে পড়েছেন মানুষ হত্যার অভিযানে। ভয় কীসের? খামেনি ও তার কমান্ডারদের ভয় থাকে আক্রান্ত হওয়ার এবং প্রাণ হারানোর, বিশেষ করে দেশের অভ্যন্তরে মার্কিনি ও ইসরায়েলি গুপ্তচররা সক্রিয় থাকায়, ট্রাম্প তো নিরাপদে হাসছেন এবং হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন মেঘের আড়ালে থেকে।

লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ডিজিটাল জুয়ার মরণফাঁদ

প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬, ০৬:৩৭ পিএম
ডিজিটাল জুয়ার মরণফাঁদ
আলম শাইন

দেশের তরুণদের মেধা, পরিশ্রম ও স্বপ্ন যেন কোনো প্রতারণার ফাঁদে নষ্ট না হয়, সে দায়িত্ব আমাদের সবার। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র একসঙ্গে কাজ করলে তরুণরা নিজেদের যোগ্যতা ও প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পাবে। তরুণদের শক্তিকে সঠিক পথে কাজে লাগাতে পারলেই গড়ে উঠবে একটি দক্ষ, সচেতন ও সমৃদ্ধ প্রজন্ম।...

প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু এর অপব্যবহার নতুন কিছু সংকটও তৈরি করেছে। অনলাইন জুয়া তারই একটি ভয়াবহ উদাহরণ। একসময় জুয়া ছিল নির্দিষ্ট কিছু স্থান ও মাধ্যমের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এখন মোবাইল ফোনের পর্দায় কয়েক ক্লিকেই তা মানুষের হাতের নাগালে চলে এসেছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম এই ফাঁদের প্রধান শিকার হচ্ছে।

বাংলাদেশে অনলাইন জুয়ার বিস্তার একসময় নীরবে ঘটলেও বর্তমানে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন, খেলাধুলার ম্যাচ ঘিরে বাজির প্রলোভন এবং অনলাইন গেমের নামে অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দেখিয়ে অনেক তরুণকে এতে যুক্ত করা হচ্ছে। শুরুতে অল্প অর্থ দিয়ে বড় লাভের স্বপ্ন দেখানো হয়। কেউ কেউ সামান্য লাভ করলেও পরে সেই আশাই তাদের আরও বড় ঝুঁকির দিকে ঠেলে দেয়। ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে একসময় তারা বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়ে।

এই প্রবণতার সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো আসক্তি। মাদকের মতো এটিও ধীরে ধীরে মানুষের আচরণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। দ্রুত ধনী হওয়ার মোহে অনেক তরুণ পড়াশোনা, পরিবার ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা থেকে দূরে সরে যায়। সারাক্ষণ বাজির হিসাব নিয়ে ব্যস্ত থাকার কারণে শিক্ষাজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, বাড়ে মানসিক চাপ ও হতাশা। অনেক ক্ষেত্রে এর পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

অনলাইন জুয়ার প্রভাব পড়ে পারিবারিক জীবনেও। অনেক তরুণ পরিবারের অজান্তে টাকা খরচ করে, ঋণ করে কিংবা গোপনে অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা করে। কেউ কেউ পরিবারের সঞ্চিত অর্থও ব্যবহার করে। সেই সত্য গোপন করতে গিয়ে মিথ্যার আশ্রয় নেওয়ায় পারিবারিক বিশ্বাস নষ্ট হয় এবং তৈরি হয় অশান্তি।

শুধু ব্যক্তি বা পরিবার নয়, সমাজও এ সমস্যার প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। সহজে অর্থ উপার্জনের মানসিকতা তরুণদের পরিশ্রম ও সৎ উপার্জনের মূল্যবোধ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। কেউ কেউ আর্থিক ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে গিয়ে প্রতারণা বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। অথচ একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তরুণদের মেধা, দক্ষতা ও সৃজনশীলতার ওপর। সেই শক্তি যদি ভাগ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তবে তা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

অনলাইন জুয়া ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ হলো এর সহজলভ্যতা এবং এ সম্পর্কে সচেতনতার অভাব। অনেকেই এটিকে নিছক বিনোদন বা সহজে অর্থ আয়ের মাধ্যম মনে করেন। বাস্তবে অধিকাংশ জুয়ার প্ল্যাটফর্ম এমনভাবে পরিচালিত হয়, যাতে দীর্ঘমেয়াদে লাভবান হয় এর পরিচালকরাই। ব্যবহারকারীরা সাময়িকভাবে কিছু অর্থ পেলেও শেষ পর্যন্ত অধিকাংশই ক্ষতির মুখে পড়ে।

এই অবৈধ ব্যবসার বিস্তারে বিদেশি সার্ভারনির্ভর ওয়েবসাইট ও অ্যাপের ভূমিকাও রয়েছে। এসব প্ল্যাটফর্ম দেশের বাইরে থেকে পরিচালিত হওয়ায় সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। মোবাইল ব্যাংকিং ও ডিজিটাল লেনদেনের সহজ ব্যবস্থার কারণে অল্প সময়ে অর্থ জমা ও উত্তোলন করা সম্ভব হচ্ছে। তাই শুধু ওয়েবসাইট বন্ধ করলেই হবে না, এর সঙ্গে জড়িত অর্থ লেনদেনের পথও চিহ্নিত করে বন্ধ করতে হবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত ব্যক্তি ও প্রভাবশালীদের মাধ্যমে এসব প্ল্যাটফর্মের প্রচারণা সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। জনপ্রিয় ব্যক্তিদের প্রচারণা দেখে অনেক তরুণ এসবকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করে যুক্ত হয়। অথচ এর পেছনে থাকে বাণিজ্যিক স্বার্থ। তাই ছদ্মবেশী বিজ্ঞাপন ও প্রচারণার বিরুদ্ধেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

আইনের কার্যকর প্রয়োগ অনলাইন জুয়া নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অবৈধ ওয়েবসাইট, অ্যাপ এবং অর্থ লেনদেনের মাধ্যম বন্ধ করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে আরও সক্রিয় হতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জুয়ার বিজ্ঞাপন ও প্রচারণা নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। প্রযুক্তির অপব্যবহার ঠেকাতে সরকারি প্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং তথ্যপ্রযুক্তি-সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

পরিবারের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের অনলাইন কার্যক্রম সম্পর্কে খোঁজ রাখা এবং তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা। শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে নয়, বরং যুক্তি, সচেতনতা ও পারস্পরিক বিশ্বাসের মাধ্যমে তাদের সঠিক পথে পরিচালিত করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও ডিজিটাল নিরাপত্তা, আর্থিক সচেতনতা এবং অনলাইন জুয়ার ক্ষতিকর দিক নিয়ে আলোচনা করা দরকার।

নৈতিক ও মূল্যবোধের শিক্ষাও এ সমস্যা মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে। জুয়া মানুষের মধ্যে পরিশ্রম ছাড়া অর্থ লাভের প্রবণতা তৈরি করে, যা ব্যক্তি ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সততা, পরিশ্রম এবং দায়িত্বশীলতার শিক্ষা গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরতে হবে।

গণমাধ্যমেরও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অনলাইন জুয়ার প্রকৃত চিত্র ও এর ক্ষতিকর দিক সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরার পাশাপাশি এসব প্ল্যাটফর্মের বিজ্ঞাপন প্রচার বন্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।

তরুণদের এ ধরনের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখতে তাদের জন্য ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিকচর্চা, স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ, প্রযুক্তি শিক্ষা এবং উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ বাড়ানো গেলে তারা নিজেদের দক্ষতা বিকাশে মনোযোগী হবে। নিজের যোগ্যতা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে সাফল্য অর্জনের সুযোগ পেলে ভাগ্যনির্ভর আয়ের প্রতি আকর্ষণ কমে আসবে।

অনলাইন জুয়ার আসক্তিতে যারা ইতোমধ্যে জড়িয়ে পড়েছে, তাদের প্রতিও সহানুভূতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। শুধু তিরস্কার বা শাস্তি দিয়ে এই সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। কাউন্সেলিং, মানসিক সহায়তা এবং প্রয়োজনে চিকিৎসার মাধ্যমে তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।

অনলাইন জুয়া কেবল ব্যক্তিগত সমস্যা নয়; এটি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নৈতিক সংকটেরও একটি কারণ। তরুণ সমাজকে এই বিপদ থেকে রক্ষা করতে হলে রাষ্ট্র, পরিবার ও সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। আইনের প্রয়োগ, প্রযুক্তিগত নজরদারি, পারিবারিক সচেতনতা এবং সামাজিক প্রতিরোধ–এই বিষয়গুলো কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা গেলে এর বিস্তার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

দেশের তরুণদের মেধা, পরিশ্রম ও স্বপ্ন যেন কোনো প্রতারণার ফাঁদে নষ্ট না হয়, সে দায়িত্ব আমাদের সবার। তাদের সঠিক দিকনির্দেশনা, ভালো পরিবেশ এবং গঠনমূলক কাজে যুক্ত করার সুযোগ দিতে হবে। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র একসঙ্গে কাজ করলে তরুণরা নিজেদের যোগ্যতা ও প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পাবে। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার, শিক্ষা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তারা দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। তরুণদের শক্তিকে সঠিক পথে কাজে লাগাতে পারলেই গড়ে উঠবে একটি দক্ষ, সচেতন ও সমৃদ্ধ প্রজন্ম।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, পরিবেশ ও 
জলবায়ুবিষয়ক কলামিস্ট

পুঁজিবাজারে স্থিতিশীল গতি প্রয়োজন

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬, ০৬:০৬ পিএম
পুঁজিবাজারে স্থিতিশীল গতি প্রয়োজন
ড. আবদুর রহমান

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতার গতিময়তা বাড়াতে হবে এসএমই প্লাটফর্ম চালু করা, ডিজিটাল ট্রেডিং ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা, বিনিয়োগকারীদের শেয়ারব্যবস্থা বিষয়ে প্রতিটি ব্রোকার হাউসে যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা অত্যাবশ্যক। পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করা ছাড়া জাতীয় অর্থনীতিতে রক্ত প্রবাহের গতি বেগবান করা অসম্ভব।...

প্রত্যেক দেশের পুঁজিবাজারের স্থিতিশীল অগ্রগতি সংশ্লিষ্ট দেশের শিল্পায়নকে এগিয়ে নিয়ে ওই দেশের জাতীয় অর্থনীতি বিকাশের ক্ষেত্রে রক্ত সঞ্চালন করে থাকে। দুনিয়ার অন্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের তুলনা করলে কোনোভাবেই মেলানো সম্ভব নয়। এর কারণ হচ্ছে, বিশ্বে এমন কোনো দেশ আছে কি যেখানে সকালবেলা অর্থমন্ত্রী কিংবা প্রধানমন্ত্রীর কুশপুত্তলিকা দাহ করলে বিকেলে শেয়ারমূল্য বেড়ে যায় কিংবা বিকেলে উল্লিখিত ব্যক্তিদের কুশপুত্তলিকা দাহ করলে পরের দিন শেয়ারমূল্য বাড়ে? লোকের ধারণা এমন বিষয়ের তাত্ত্বিক ভিত্তি প্রস্তুত করার জন্য হয়তোবা প্রয়াত অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে একটা যোগসাধনের চেষ্টা করলেও করা যেতে পারে। বর্তমানে বেঁচে থাকা অর্থনীতিবিদদের পক্ষে বাংলাদেশে সংঘটিত উপরোল্লিখিত কর্মযজ্ঞের কোনো খোঁড়া যুক্তি দাঁড় করানো সম্পূর্ণভাবেই অসম্ভব। আর এসব কারণেই বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা আনয়নের কাজ জরুরি। সরকার ইতোমধ্যে কমিশনের চেয়ারম্যানসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগও দিয়েছে।

আমরা চলমান শেয়ারবাজারের গতিবিধি যথার্থভাবে বোঝার জন্য গত কয়েকটি অর্থবছরের হালহকিকত একটু বুঝে এলে ভালো হয়। ভয়াবহ কোভিড-পরবর্তী ২০২০-২১ অর্থবছরে পুঁজিবাজারের দৈনিক গড় লেনদেন ছিল প্রায় ২ হাজার  থেকে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে দৈনিক গড় লেনদেন ছিল ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা (বছরের শুরুতে ভালোই ছিল কিন্তু বছরের শেষের দিকে পতনের প্রবণতা দেখা গেল)। আস্থাহীনতা ও তারল্যসংকটের প্রভাবে ২০২২-২৩ অর্থবছরে পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় প্রায় ১.৩ অংশে নেমে ৬০০-৮০০ কোটি টাকায় চলে আসে। পরবর্তী অর্থবছরে (২০২৩-২৪) দীর্ঘমেয়াদি মন্দাভাব ও বিনিয়োগকারী সংকটের কারণে আরও হ্রাস পেয়ে ওই অর্থ ৫০০-৭০০ কোটি টাকায় নেমে আসে; যা ২০২০-২১ সালের তুলনায় মোটামুটি ১.৪ অংশ।

বিভিন্ন সময়ের গড়ের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, বাজারে স্থবিরতা, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দৈনিক লেনদেনের গড় ৪০০-৬০০ কোটি টাকায় নেমে আসে। সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের (CDBL) তথ্যানুযায়ী, বিও (Beneficiary Owner) হিসাব খোলার প্রবণতা পুঁজিবাজারে ২০২১ জুন থেকে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত ২৮-৩০ লাখ থেকে ৩৭-৩৮ লাখে পৌঁছায়। তবে এ ক্ষেত্রে একটি কথা এড়িয়ে যাওয়া যথার্থ হবে না যে, উল্লিখিত বিও হিসাবধারীরা সব সময় কর্মদিবসে কতটা Active থেকে শেয়ার বেচাকেনায় ভূমিকা রাখছেন, সেটাও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার বিষয়।

এ ক্ষেত্রে আমরা মামুন রশীদের (অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও ফাইন্যান্সিয়াল এক্সেলেন্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান) উক্তি–‘বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের বর্তমান দুর্বলতার সবচেয়ে উদ্বেগজনক প্রতীক হলো ২০২৫ সালে বছরজুড়ে একটি নতুন আইপিও না আসা। এটা নিছক বাজার মন্দা নয়; বরং এটি একটি গভীর কাঠামোগত সংকেত। আইপিও মানে শুধু শেয়ার নয়, এর অর্থ নতুন উদ্যোক্তা, নতুন শিল্প, নতুন কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীল বিনিয়োগ। যখন একটি অর্থনীতিতে দীর্ঘ সময় নতুন আইপিও বন্ধ থাকে, তখন তা বোঝায় যে, উদ্যোক্তারা পুঁজিবাজারকে আর কার্যকর মূলধন সংগ্রহের প্লাটফর্ম হিসেবে বিবেচনা করছেন না। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে শিল্প সম্প্রসারণ, প্রযুক্তি বিনিয়োগ ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের ওপর। অর্থাৎ আইপিও-সংকট আসলে বৃহত্তর অর্থনৈতিক গতিশীলতার সংকট’। বিষয়টি বিশেষভাবে প্রবিধানযোগ্য।

আমরা এ পর্যায়ে যদি বিগত পাঁচ বছরের পুঁজিবাজারের প্রধান সমস্যাগুলো মোটাদাগে চিহ্নিত করি তাহলে দেখতে পাব যে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের লোকসান এবং বাজারে দীর্ঘদিন ধরে সূচকের পতন। যদি ধরে ধরে কথা বলি তাহলে এভাবে বলা যায় যে, অনেক কিছু উপেক্ষা না করেই বলা যায়, পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ অতীতে শুধু ব্যর্থই হয়নি বরং যে কথা নিকট অতীতে বলেছি, কুশপুত্তলিকা দাহভিত্তিক প্রশাসন ও শেয়ারের মূল্য হ্রাস-বৃদ্ধিতে অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছে। 
ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের লোকসান তো শুধু শেয়ারবাজারের মধ্যেই থাকে না বরং তার বিস্তৃতি অনেক দূরে।  ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা সীমিত নিজস্ব অর্থ, ভাইবোন ও নিকটাত্মীয়দের কাছ থেকে ঋণ নেওয়া অর্থই তার পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে এবং যখন শেয়ারবাজার মন্দা অবস্থায় পড়ে যায় তখন তো তারা অনেকে আত্মহত্যার পথও বেছে নেয়!
রাষ্ট্রায়ত্ত লাভজনক প্রতিষ্ঠান কেন জানি পুঁজিবাজারে অংশগ্রহণে অনীহা দেখাচ্ছে। এটা পুঁজিবাজারের জন্য আদৌ ভালো নয়। শুধু সরকারি লাভজনক প্রতিষ্ঠানই নয়, বেসরকারি বড় বড় লাভজনক প্রতিষ্ঠান পুঁজিবাজারে তাদের শেয়ার নিয়ে আসছে না।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিন ধরেই সিন্ডিকেট-ভিত্তিক লেনদেনের অভিযোগ আছে। প্রসঙ্গত, প্রয়াত অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের জাতীয় সংসদে দেওয়া একটি বক্তব্য মনে পড়ে। তিনি বলেছিলেন, ‘পুঁজিবাজারে সংগঠিত লুটপাটের বিষয়ে তদন্ত রিপোর্ট জমা দিয়েছেন এবং অভিযুক্ত রাঘববোয়ালরা তার আশপাশেই আছেন।’ তার এমন বক্তব্যে বুঝতে আর অসুবিধা হয় না যে, রাজনৈতিক এবং ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়াবিহীন সিন্ডিকেট পরিচালনা করা অসম্ভব। সাংবাদিক মুন্নী সাহার একটি উক্তি স্মরণে এসে যায়–‘আপনি কি সেই দরবেশ...’।

তারল্যসংকট পুঁজিবাজারে সংকট সৃষ্টিতে আর একটি বাধা। এজন্য ব্যাংকিং খাতে বজায় থাকে উচ্চ সুদের হার, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ কমে যায় এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ হ্রাস পায়।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রায়শই ঘন ঘন নীতিগত পরিবর্তনসহ ফ্লোর প্রাইস আরোপ ও প্রত্যাহার বিষয়গুলোও পুঁজিবাজারের জন্য মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি করে।

দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানির তালিকাভুক্তি ও অতি মূল্যায়নের বিষয়টি পুঁজিবাজারের শেয়ার ব্যবসার মূলে আঘাত করে। যে অভিঘাতে বিনিয়োগকারীদের রাতারাতি পথে বসতে হয়।

পুঁজিবাজারের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় বাজারে রয়েছে গভীরতার অভাব। ডলারসংকট ও মুদ্রাবিনিময় ঝুঁকি তো এ খাতকে মনে হয় স্থায়ীভাবে ঘ্রাস করে বসে আছে। উল্লিখিত কারণে বিদেশি বিনিয়োগও কমে যায়।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজার ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা বিষয়ে প্রবন্ধে আমার নিজের একটু অভিজ্ঞতা শেয়ার করা যথার্থ বলে মনে করছি। ২০০৭ সালে মশিহর সিকিউরিটি কোম্পানির (তখনকার সময়ের টপ টেনের একটি সংশ্লিষ্ট হাউস) অর্থনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে বেশ কিছু দিন কাজ করেছি। কর্মকালীন বাস্তব অভিজ্ঞতা এ কথা বলে যে, একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিনিয়োগকারী পুঁজিবাজারের শেয়ার ব্যবসা বিষয়ে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতাবিহীন এ ব্যবসায় বিনিয়োগ করে এবং হুজুগে নিজে না বুঝেই শেয়ার বেচাকেনা করে। মূলত, হুজুগটা যারা ছড়ায় তারাই সিন্ডিকেটের প্রতিনিধি এবং অভিজ্ঞতাহীন বিনিয়োগকারীরা যথাযথ অভিজ্ঞতার অভাবে প্রায়শই ঝুঁকিতে পড়ে এবং একসময় বিনিয়োগের অর্থ হারিয়ে নামে রাজপথে বিক্ষোভে!

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতার গতিময়তা বাড়াতে হবে এসএমই প্লাটফর্ম চালু করা, ডিজিটাল ট্রেডিং ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা, করপোরেট ব্যবসায় সুশাসন বিধিমালা শক্তিশালী করাসহ কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, বিও হিসাবের সংখ্যা বৃদ্ধি, বন্ড মার্কেট উন্নয়নের প্রচেষ্টা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যারা জাতীয় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে তাদের পুঁজিবাজারের ব্যবসায় সম্পৃক্ত করাসহ বিনিয়োগকারীদের শেয়ারব্যবস্থা বিষয়ে প্রতিটি ব্রোকার হাউসে যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা অত্যাবশ্যক। পরিশেষে বলব, পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করা ছাড়া জাতীয় অর্থনীতিতে রক্ত প্রবাহের গতি বেগবান করা অসম্ভব এবং স্থিতিশীলতা আনয়নও অসম্ভব।

লেখক: উপ-উপাচার্য (ভারপ্রাপ্ত) ও কোষাধ্যক্ষ
প্রাইম ইউনিভার্সিটি, অর্থনীতিবিদ ও কলামিস্ট

পরিকল্পনাহীন নগরায়ণ ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংস্কার নিশ্চিত করা জরুরি

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬, ০৫:২০ পিএম
ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংস্কার নিশ্চিত করা জরুরি
ইকবাল হাবিব

প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে মনুষ্যসৃষ্ট ঝুঁকিও বাড়ছে। অনুমোদনহীন ও অপরিকল্পিতভাবে বহুতল ভবন নির্মাণ, জোনিং বিধি লঙ্ঘন, অগ্নিনিরাপত্তা ও জরুরি বহির্গমনব্যবস্থার ঘাটতির কারণে অগ্নিকাণ্ড ও ভবন ধসের ঘটনা বাড়ছে। একই সঙ্গে আইনের দুর্বল প্রয়োগ ও তদারকির অভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নগরকে অনিরাপদ করে তুলছে।...

বিকেন্দ্রীকৃত নগরায়ণ নিশ্চিতে, আগামীর লক্ষ্য হওয়া উচিত জেলা ও উপজেলা শহরগুলোকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলে সেবার ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করা। এ জন্য নগরায়ণ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, স্থল, বিমান ও সমুদ্রবন্দরভিত্তিক সংযোগ উন্নয়নের মাধ্যমে আঞ্চলিক বৈষম্য কমানো এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে আঞ্চলিক সক্ষমতা জোরদার করা জরুরি। বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতায় ‘হাব-অ্যান্ড-স্পোক’ মডেলে জেলা শহরগুলোকে আঞ্চলিককেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলে গণপরিবহনের মাধ্যমে পার্শ্ববর্তী এলাকার সঙ্গে সংযুক্ত করা গেলে রাজধানীমুখী চাপ কমবে এবং দেশজুড়ে উন্নয়নের ভারসাম্য তৈরি হবে।

বাংলাদেশের নগরসংকট কোনো একক শহরের সমস্যা নয়; দীর্ঘদিনের বৈষম্যপূর্ণ উন্নয়ন কাঠামোর ফল। শিল্প, কর্মসংস্থান ও সেবার কেন্দ্রীকরণের কারণে মানুষ বাধ্য হয়ে বড় শহরমুখী হচ্ছে, ফলে নগরগুলো অতিরিক্ত চাপে পড়ছে এবং জেলা ও উপজেলা শহরগুলো তাদের সম্ভাবনা হারাচ্ছে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ ঢাকা। যেখানে দেশের মাত্র ১ শতাংশ ভূমিতে প্রায় ১১ শতাংশ মানুষ বসবাস করে এবং জাতীয় জিডিপির এক-তৃতীয়াংশের বেশি উৎপন্ন হয়। দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও জলবায়ু চাপের প্রেক্ষাপটে স্পষ্ট, কার্যকর বিকেন্দ্রীকরণ ছাড়া নগরসংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের শহরগুলোয় যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ ব্যক্তিগত গাড়িনির্ভরতা ও গণপরিবহনে পথচারীবান্ধব পরিকল্পনার অভাব। নগরের সড়কগুলোতে ফুটপাত, সাইকেল লেন ও কার্যকর গণপরিবহন উপেক্ষিত থাকা। ঢাকায় এর চরম উদাহরণ দেখা যায়। মাত্র ১৫ শতাংশ মানুষের ব্যক্তিগত গাড়ি সড়কের ৭৭ শতাংশ দখল করে আছে, অথচ ৮৫ শতাংশ মানুষ হাঁটা, রিকশা ও গণপরিবহনের ওপর নির্ভরশীল। শহরের অধিকাংশ যাতায়াত হেঁটে হলেও উপযোগী ফুটপাতের অভাব স্পষ্ট করে যে, বর্তমান পরিবহননীতি টেকসই নয়।

গণপরিবহন ও পথচারীবান্ধব নগরী গড়ে তুলতে, স্থায়িত্বশীল নগরায়ণের ভিত্তি হিসেবে গণপরিবহন, হাঁটা ও সাইকেলকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ব্যক্তিগত গাড়িনির্ভরতা কমাতে না পারলে যানজট নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয় বিধায় বড় সড়কে ব্যক্তিগত গাড়ির লেন সীমিত রেখে গণপরিবহনের জন্য অধিকাংশ লেন নির্ধারণ করে মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করা জরুরি। বাস মালিকদের সিন্ডিকেট ভেঙে যৌক্তিক ভাড়ায় সব রুটে নগরের বাসব্যবস্থাকে সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনায় কার্যকর চলাচল নিশ্চিত করতে হবে; একই সঙ্গে সরকারি খাতেও দক্ষভাবে পর্যাপ্ত বাস পরিচালনার ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি, ফুটপাত দখল ও অসংগতিপূর্ণ ব্যবহার বন্ধ করে সেগুলোকে পথচারীবান্ধব করতে হবে এবং আলাদা সাইকেল লেন ও কর রেয়াতের মাধ্যমে সাইকেলকে সহজলভ্য করে তুলতে হবে। সর্বোপরি, যাতায়াত ও পরিবহন-সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করে নির্বিচার অবকাঠামো নির্মাণের পরিবর্তে সুচিন্তিত নীতি ও তার কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমেই নগরের পরিবহন সংকটের টেকসই সমাধান সম্ভব।

জলাবদ্ধতা, তাপপ্রবাহ ও পরিবেশগত ঝুঁকি এখন নগরের নিত্য বাস্তবতা, যার প্রধান কারণ খাল, জলাশয় ও সবুজ এলাকার দখল ও ধ্বংস। ফলে প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ ও তাপ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে এবং অল্প বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে। একটি বাসযোগ্য নগরীতে কমপক্ষে ১২ শতাংশ উন্মুক্ত স্থান ও ১৫ শতাংশ সবুজ আচ্ছাদন থাকা প্রয়োজন। রাজধানী ঢাকাসহ অন্যান্য প্রধান প্রধান নগরীর প্রণীত মহাপরিকল্পনায় ‘উন্মুক্ত স্থান, পার্ক, খেলার মাঠ’ এবং ‘ব্লু ও গ্রিন নেটওয়ার্ক’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবনা থাকলেও তার কার্যকর বাস্তবায়ন পরিকল্পনা অনুপস্থিত। একই সঙ্গে পার্ক, খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত স্থানের অবৈধ দখল উচ্ছেদ, জলাশয় ভরাট ও বর্জ্য পানি প্রবেশ বন্ধের পাশাপাশি প্রাকৃতিক ঢাল অনুযায়ী পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার উন্নয়ন প্রয়োজন। খেলার মাঠ ও পার্কের বাণিজ্যিক ব্যবহার বন্ধ, ভূমিতথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং সরকারি সংস্থাও নাগরিকদের অভিভাবকত্বে জবাবদিহিমূলক শাসন কাঠামোর মাধ্যমে মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নগরজীবনের ভিত্তি তৈরিতে কার্যকর ও টেকসই ‘ব্লু ও গ্রিন নেটওয়ার্ক’ গড়ে তোলা সম্ভব।

নগরে বায়ু ও শব্দদূষণ বর্তমানে ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য সমস্যায় রূপ নিয়েছে। যানবাহনের ধোঁয়া, শিল্পকারখানার বর্জ্য নির্গমন, নির্মাণকাজের ধুলা ও ইটভাটার কারণে বিশেষ করে শীতকালে ঢাকাসহ বড় শহরগুলোর বায়ুর মান বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছে যায়। একই সঙ্গে অতিরিক্ত হর্ন, নির্মাণকাজ ও শিল্পকারখানার শব্দে শহরের মানুষ ক্রমাগত শব্দচাপে রয়েছে। এর ফলে শ্রবণশক্তি হ্রাসের পাশাপাশি মানসিক চাপ, ঘুমের সমস্যা ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ছে এবং শিক্ষার্থী ও কর্মজীবীদের মনোযোগ ও উৎপাদনশীলতা ব্যাহত হচ্ছে।

নগরে বায়ু ও শব্দদূষণ হ্রাসে করণীয়, বায়ু ও শব্দদূষণ কমাতে তাৎক্ষণিক, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। নগরের আশপাশের বেআইনি ইটভাটা দ্রুত বন্ধ করে অনুমোদিত ইটভাটায় পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ও মানসম্মত প্রযুক্তি ব্যবহারে কঠোর নজরদারির পাশাপাশি উন্নত ও কম দূষণকারী ইট ব্যবহারে উৎসাহ দিতে উদ্যোক্তাদের সহজ ঋণ ও কর রেয়াত দিতে হবে। ধোঁয়া নির্গতকারী যানবাহনের ফিটনেস নিয়ম কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে এবং প্লাস্টিকবর্জ্য থেকে বায়ুদূষণ ও মাইক্রোপ্লাস্টিক ছড়ানো রোধমূলক বর্জ্যব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে মনুষ্যসৃষ্ট ঝুঁকিও বাড়ছে। অনুমোদনহীন ও অপরিকল্পিতভাবে বহুতল ভবন নির্মাণ, জোনিং বিধি লঙ্ঘন, অগ্নিনিরাপত্তা ও জরুরি বহির্গমনব্যবস্থার ঘাটতির কারণে অগ্নিকাণ্ড ও ভবন ধসের ঘটনা বাড়ছে। একই সঙ্গে আইনের দুর্বল প্রয়োগ ও তদারকির অভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নগরকে অনিরাপদ করে তুলছে। এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন ও সবুজ জলাশয় ধ্বংস যুক্ত হয়ে নগরের তাপদাহ তীব্রতর করছে। গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকার তাপমাত্রা আশপাশের এলাকার তুলনায় গড়ে প্রায় সাড়ে ৩ ডিগ্রি বেশি, যা হিট আইল্যান্ড প্রভাবের স্পষ্ট উদাহরণ।

নগরকে ভূমিকম্প, অগ্নিকাণ্ড ও তাপদাহের মতো বহুমাত্রিক দুর্যোগ থেকে সুরক্ষিত করতে, দুর্যোগ মোকাবিলায় ঝুঁকি নিরূপণভিত্তিক সামঞ্জস্যপূর্ণ আপদকালীন পরিকল্পনা (কন্টিনজেন্সি), বিদ্যমান ভবনের ভূমিকম্প সহিষ্ণুতা জরিপ এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের দ্রুত সংস্কার নিশ্চিত করা জরুরি। ভূমি ব্যবহার ও জোনিং বিধি কঠোরভাবে মানা, বহু মন্ত্রণালয়ভিত্তিক টাস্কফোর্স গঠন, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা প্রকাশ, বার্ষিক ভবন ব্যবহারযোগ্যতা সনদ ও ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড অনুযায়ী নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন। পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স শক্তিশালীকরণ, পাড়া-মহল্লাভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবক গড়ে তোলা এবং সচেতনতা ও প্রস্তুতি বৃদ্ধির মাধ্যমে দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে তাপদাহ ও পরিবেশগত ঝুঁকি মোকাবিলায় নগরবন সৃষ্টি, দেশজ বৃক্ষরোপণ, কাচনির্ভর ভবনসংস্কৃতি পরিহার এবং জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত নগর সবুজায়ন নীতিমালা বাস্তবায়নের মধ্যদিয়েই একটি নিরাপদ, সহনশীল ও মানবিক নগর গড়ে তোলা সম্ভব।

পরিবেশ সংরক্ষণ, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সামাজিক ন্যায়বিচার–এ তিনটির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখেই স্থায়িত্বশীল নগরায়ণ অর্জন করতে হয়। বাংলাদেশে অত্যন্ত দ্রুতগতির এবং অনেকাংশে অপরিকল্পিত ও অসম নগরায়ণের ফলে নগর অভিঘাতগুলো বৃহৎ আকার ধারণ করছে। এ বাস্তবতায় স্থায়িত্বশীল নগরায়ণ ও সুষ্ঠু নগরব্যবস্থাপনা এখন সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। তাই স্থায়িত্বশীল নগরায়ণ ও সুষ্ঠু নগরব্যবস্থাপনা নিশ্চিতে, জাতীয় ও নগর–দুই পর্যায়েই কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।

আগামীর নগরায়ণে, জাতীয় পর্যায়ে কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবস্থাপনার জন্য পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি আলাদা বিভাগ গঠন জরুরি। নগর পর্যায়ে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষগুলোকে ডেভেলপার নয়, নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে কাজ করতে হবে এবং নগর পরিচালনায় পেশাজীবী, জনপ্রতিনিধি ও নাগরিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নগর সুব্যবস্থাপনায় এবং উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণে, ‘উন্নয়ন স্বত্ব বিনিময় বা ট্রান্সফার অব ডেভেলপমেন্ট রাইটস (টিডিআর)’ এবং ‘ব্লকভিত্তিক উন্নয়ন বা ব্লক ডেভেলপমেন্ট’–এ দুটি ধারণাকে উপাদান হিসেবে শহরের পুনঃউন্নয়নকল্পে যথাযথভাবে ব্যবহার করতে হবে। জমির মালিকার অধিকার থেকে উন্নয়ন করার অধিকার, স্থানান্তর বা বিক্রির ব্যবস্থা। কৃষিজমি, জলাধার বা সংরক্ষিত এলাকায় উন্নয়ন সীমিত থাকলে মালিকরা তাদের অব্যবহৃত এফএআর অন্য এলাকার ডেভেলপারের কাছে বিক্রি করতে পারেন। এতে সংবেদনশীল এলাকা সুরক্ষিত থাকে, মালিক আর্থিক ক্ষতি এড়ায় এবং নির্ধারিত এলাকায় পরিকল্পিত উন্নয়ন সম্ভব হয়।

নগরায়ণ মানেই কেবল ভবন ও রাস্তা নয়–এটি একটি গভীর সামাজিক প্রক্রিয়া, যা মানুষের জীবনমান, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও পরিবেশের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। পরিকল্পনাহীন নগরায়ণ বাংলাদেশকে ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ ও অমানবিক শহরের দিকে ঠেলে দিচ্ছে এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সুষম বিকেন্দ্রীকরণ, গণপরিবহননির্ভর চলাচল, সাশ্রয়ী আবাসন, জলাধার সংরক্ষণ, কার্যকর বর্জ্যব্যবস্থাপনা ও সবুজ নগর গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া জরুরি। সঠিক নীতি, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে একটি নিরাপদ, মানবিক ও স্থায়িত্বশীল নগর ভবিষ্যৎ গড়া সম্ভব।

লেখক: পরিবেশকর্মী ও নগরবিদ

বাংলাদেশ-চীন বাণিজ্যিক করিডর: সম্ভাবনা ও বাস্তবতা

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬, ০৫:৫০ পিএম
আপডেট: ১১ জুলাই ২০২৬, ০৫:৫৩ পিএম
বাংলাদেশ-চীন বাণিজ্যিক করিডর: সম্ভাবনা ও বাস্তবতা
মো. মহিদুল ইসলাম

ইচ্ছা থাকলে উপায় হবেই।  বাংলাদেশ-চীন বাণিজ্যিক করিডর দুই দেশ, অঞ্চল, এশিয়া ও বিশ্বকে এগিয়ে নেবে। বাংলাদেশকে রেল রোডে বৃহত্তর সংযোগ দিয়ে শিল্প-বাণিজ্যে অকল্পনীয় অগ্রগতি দেবে। চীনের শক্তি-সামর্থ্য বৃদ্ধি করবে। মানুষের অভাব পূরণ ও দারিদ্র্যবিমোচনে দ্রুত এগিয়ে যাবে দেশ।...

দীর্ঘ দৃষ্টিতে লক্ষ্য করে দেখেছি রেল যোগাযোগ যাতায়াত সেবা দিলেও সেবার মান আঞ্চলিক ও বিশ্বমানের নয়। ১৮৬২ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার বাংলাদেশের মাটিতে দর্শনা-কুষ্টিয়া-গোয়ালন্দে প্রথম যে রেলপথ বানিয়েছিল তা আজ আরও উন্নত হওয়ার কথা। জগতি আজ বিরানভূমি প্রায়। অথচ এটাই বাংলাদেশের প্রথম রেলস্টেশন। একে বহুমুখী করা জরুরি।

বাংলাদেশ-চীন বাণিজ্যিক করিডর বাংলাদেশ তথা গোটা অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য জরুরি। কক্সবাজার-কুনমিং রেল রোড হলে বাংলাদেশকে সমগ্র এশিয়া ও ইউরোপের সঙ্গে সংযোগ করবে। শুধু তাই নয়, এর প্রতিটি স্টেশনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠবে আরও গতিশীল, আরও উৎপাদনশীল সমাজ। মাত্র দুই দশকের মধ্যে চীন বিশ্বের বৃহত্তম হাইস্পিড রেল নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে, যা বর্তমানে পৃথিবীর বাকি সব দেশের সম্মিলিত নেটওয়ার্কের চেয়েও বড়। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে চীনের প্রচলিত যোগাযোগব্যবস্থা তীব্র যানজট এবং ধীরগতির সমস্যায় জর্জরিত ছিল। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে চীনে রেলের আধুনিকায়ন জরুরি হয়ে পড়। ২০০৪ থেকে ২০১৪, এ সময়ে চীন ১০ হাজার কিলোমিটার রেলপথ বানায়, যার গতি ২০০ কিলোমিটারের অধিক। চীনের রেলপথ গড়ার এ কাজকে বলে রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন ওয়্যার বা রেল গড়ার যুদ্ধ। ঘণ্টায় ২০০ কিলোমিটার বা তার চেয়ে বেশি গতির রেলকে উচ্চ গতি বা হাইস্পিড রেল বলা হয়। জাপান ১৯৬৪ সালে প্রথম ২১০ কিলোমিটার গতির রেল গড়ে তোলে, যাকে সিনকানসেন বা বুলেট ট্রেন বলা হয়।

প্রশ্ন হলো, একটি বিশ্বমানের রেল গঠন, সেবাদান, যাত্রী তৈরি, শিল্পায়ন ব্যতীত বাংলাদেশ আর কতদিন অপেক্ষা কববে? এখানে বাংলাদেশ ও চীনের মেলবন্ধন দরকার। বাংলাদেশ পৃথিবীর সপ্তম বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশ। বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম। আছে পৃথিবীর একমাত্র ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। উত্তরে হিমালয়, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। ভূরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু আজকের বাংলাদেশ। মাটি, মানুষ, পানি, ভূপ্রকৃতি, খনিজ–সব মিলিয়ে বিপুল সম্ভাবনার ভূকেন্দ্র। সত্যি বলতে, বাংলাদেশ গঠনে যুদ্ধের তেজ দরকার। রেল দেখার লোভ আজন্ম। আমি একবার ঢালারচর গিয়েছিলাম। শুনেছি ঈশ্বরদী থেকে ঢালারচর রেললাইন হয়েছে। কিন্তু অবাক হয়ে লক্ষ করলাম, স্টেশনে ঢোকার রাস্তা সংকীর্ণ। রেলস্টেশনে যাওয়ার রাস্তা সুগম হতে হবে। ঈশ্বরদী জংশন দেখে বিস্মিত হতাম সেই শৈশব থেকে।

মানুষ ও মালামাল পরিবহনের জন্য রেল। সবচেয়ে নিরাপদ ও আরামদায়ক পরিবেশবান্ধব যোগাযোগ হলো রেল। রেল-নীতিপদ্ধতি পরিকল্পনা তৈরি বিশাল কাজ। সে কাজের দক্ষতা, যোগ্যতা দু-এক দিনে হয় না। আমাদের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রেলপাঠের সিলেবাস ছোট। নেই কোনো রেল বিশ্ববিদ্যালয়। নেই তেমন গবেষণা প্রতিষ্ঠান। মিডিয়ায় প্রচারও কম। রেলভবনে বড় একটি লাইব্রেরি থাকতে পারত। বাংলাদেশ-চীন বাণিজ্যিক করিডর নয় শুধু। দরকার বাংলাদেশ-চীন একাডেমি অব রেলওয়ে সায়েন্স অ্যান্ড গভর্নেন্স।

বাংলাদেশ রেলওয়েকে আঞ্চলিক ও বিশ্বমানের করতে করণীয়: ১. বাংলাদেশ-চীন রেল করিডর, ২. বাংলাদেশ-চীন রেল বিশ্ববিদ্যালয়, ৩. বাংলাদেশ-চীন পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট একাডেমি অব রেলওয়ে সায়েন্স অ্যান্ড গভর্নেন্স, ৪. রোহনপুর-সান্তাহার-বগুড়া-কালীতলা ঘাট রেল, ৫. কালীতলা সারিয়াকান্দী নৌবন্দর, ৬. জগতি রেলস্টেশন বিশ্বমানের করা, ৭. কুষ্টিয়া কোর্ট ও বড় স্টেশনকে মাটির নিচ দিয়ে স্টেশনকে বহুমুখী করা, ৮. দৌলতদিয়া-নগরবাড়ী-আরিচায় নতুন নগরায়ণ ও ত্রিমুখী রেল ব্রিজ বা টানেল করা, ৯. মানিকগঞ্জ-নারায়ণগঞ্জ-কুমিল্লা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-কুনমিং হাইস্পিড রেল, ১০. খুলনা-বরিশাল-ভোলা-লক্ষ্মীপুর রেল, ১১. বরিশাল-কুয়াকাটা রেল, ১২. বগুড়া-জামালপুর রেল ও সারিয়াকান্দী রেল টানেল, ১৩. দেশের সব জেলায় রেল সংযোগ, ১৪. ঢাকা সার্কুলার রেল-নৌ-রোড, ১৫. আমাদের রেল কারখানাগুলো আরও উৎপাদনমুখী করা। আমরা কেন রেল ইঞ্জিন ও ওয়াগন বানাব না। আর তা না পারলে আমরা ভারী শিল্পে এগিয়ে যেতে পারব না। ইচ্ছা থাকলে উপায় হবেই। চুরির নিয়ত ত্যাগ করতে হবে। ইন্দোনেশিয়া ইরান কোরিয়া জাপান জার্মানি পারলে বাংলাদেশকে পারতেই হবে। ব্রিটিশের গড়া সৈয়দপুর রেল কাখানাকে কীভাবে তিলে তিলে পিছিয়ে দিয়েছি আমরা, তা দেখেছি।

যাদের জন্য রেল তারা কেমন হবেন? উদ্যোগী, উৎপাদনশীল, পরিশ্রমী, মানবপ্রেম-দেশপ্রমী, প্রশিক্ষিত, মেধাবী। লাখ লাখ মানুষ রিকশা-অটোরিকশা চালিয়ে জীবনযুদ্ধে লিপ্ত। নগর-বন্দর, হাটবাজার সর্বত্র তারা ছড়িয়ে। তাদের সঙ্গে তাদের জীবনসঙ্গী, সন্তান ও তাদের মা-বাবা তথা নির্ভরশীলরা। আর তার জন্য দরকার দক্ষ, যোগ্য ও শক্তিশালী মানুষ গড়ার শিক্ষা।

পরিশেষে বলব, বাংলাদেশ-চীন বাণিজ্যিক করিডর দুই দেশ, অঞ্চল, এশিয়া ও বিশ্বকে এগিয়ে নেবে। বাংলাদেশকে রেল রোডে বৃহত্তর সংযোগ দিয়ে শিল্প-বাণিজ্যে অকল্পনীয় অগ্রগতি দেবে। চীনের শক্তি-সামর্থ্য বৃদ্ধি করবে। মানুষের অভাব পূরণ ও দারিদ্র্যবিমোচনে দ্রুত এগিয়ে যাবে দেশ। 

লেখক: কর কমিশনার, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড

কল্যাণমূলক রাষ্ট্র তৈরিতে উন্নয়ন সক্ষমতা জরুরি

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬, ০৫:৩০ পিএম
কল্যাণমূলক রাষ্ট্র তৈরিতে উন্নয়ন সক্ষমতা জরুরি
ড. এম শামসুল আলম

সরকার যেন ব্যবসায়ীদের প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়। কারণ, আমাদের এখন দরকার বিনিয়োগ। এই বিনিয়োগের জন্য যা যা করা দরকার সরকার তা করবে। এখানে শেষ পর্যন্ত মানুষের কাছে এই প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবে রূপান্তর হয় সেটাই হচ্ছে বড় প্রশ্ন। তাদের জীবনে স্বস্তি আনে কি না, চাকরি আসে কি না, বিনিয়োগ বাড়ে কি না, জানের নিরাপত্তা আসে কি না, সদিচ্ছা থাকে কি না, সেটাই দেখার বিষয়।...

এবারের বাজেট নতুন সরকারের প্রথম বাজেট। সেই দৃষ্টিভঙ্গিতে যদি আমরা দেখি, তাহলে বলতে হবে নিঃসন্দেহে এই বাজেটের মধ্যদিয়ে সরকার চেষ্টা করছে তাদের যে রাজনৈতিক দর্শন, আগামীর যে চিন্তাভাবনা এবং দেশটাকে কোথায় তারা নিয়ে যেতে চায়, এটা সামগ্রিকভাবে এই বাজেটের মধ্যদিয়ে পরিস্ফুটনের চেষ্টা করছে। নিঃসন্দেহে এটা একটা ভালো উদ্যোগ। যাতে জনগণ বুঝতে পারে এবং সবাই জানতে পারে যে, আসলে সরকার আগামী দিনগুলোতে কী করতে চায়, দেশকে কোথায় নিয়ে যেতে চায়। সরকার এই বাজেটের মধ্যে অনেক কিছু নিয়ে এসেছে।

সরকার যেহেতু বলছে এটা জনগণের বাজেট; কাজেই সব জনগোষ্ঠীকে তাদের যে আকাঙ্ক্ষা, তাদের যে ভবিষ্যতের চিন্তাভাবনা, সবাইকে তাদের একটা সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে আনার প্রচেষ্টা করেছে। যার জন্য দেখা যায়, এখানে বাজেটে মোটামুটিভাবে সব শ্রেণিপেশা থেকে আরম্ভ করে সব গোষ্ঠীর কথাই আছে। এটাই এই বাজেট বাস্তবায়নের দিক থেকে একটা চ্যালেঞ্জিং বাজেট হিসেবে মনে করা হচ্ছে।  এই বাজেটকে যদি আমরা বাস্তবায়ন করতে চাই তাহলে কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে। প্রথম কথা হচ্ছে, এখানে অর্থায়নের সমস্যা আছে। বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অর্থায়নের আরেকটা বিষয় দেখা উচিত হবে–সেটা হচ্ছে বাজেটে যে অর্থ আমরা ব্যয় করছি, সেই অর্থ ব্যয়ের গুণমান রক্ষা করার ক্ষেত্রে আমরা কতটুকু সতর্ক হচ্ছি। যে অর্থটা আমাদের উন্নয়ন খাতে ব্যয় করছি বা বিভিন্ন সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে ব্যয় করছি, যেমন রাজস্ব ব্যয়, এটার গুণমান আমরা কতটুকু রক্ষা করতে পারছি। অপচয়-দুর্নীতি বাদ দিয়ে এটাকে যদি সত্যিকার অর্থে আমরা ব্যয় করতে পারি, তাহলে বাজেটকে আমরা অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারব। বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শুধু নয় বরং এর থেকে আমরা যে সুবিধাটা পেতে চাই সেগুলো অর্জনের ক্ষেত্রে একটা বড় ভূমিকা রাখবে।

আমরা বারবার বলি যে, আড়াই লাখ অর্থাৎ প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার যে ঘাটতির বাজেট পেশ হয়েছে, এটা ঘাটতির উৎস মানে বিভিন্ন দিক থেকে অভ্যন্তরীণ উৎস ও বৈদেশিক উৎস। এখন সরকার বড় আকারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে চাইছে। কিন্তু এত টাকা কোন খাতে এবং কীভাবে কাজে লাগাবে সে প্রশ্ন কিন্তু বারবার চলে আসে। এক সময় শুনতাম ছোটবেলায় যে, ঋণ করে ঘি খাওয়া যায়। এটা প্রবাদ বাক্য। সেই ঋণ করে ঘি খাওয়ার কালচারটা বাজেটে ধারাবাহিকভাবে হয়ে এসেছে। সেই সংস্কৃতি সরকারকে পেয়ে বসেছে। সেখান থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। খাদ্য-নিরাপত্তা, জ্বালানি-নিরাপত্তা এবং বিনিয়োগ-নিরাপত্তা সমানভাবে কাজ না করলে কোনো লক্ষ্যই সরকার বাস্তবায়ন করতে পারবে না। কল্যাণমূলক রাষ্ট্র তৈরি করতে সক্ষমতা উন্নয়নের বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। বাজেট যদি জনমুখী না হয় এবং সেই জিনিসগুলো আমরা মোকাবিলা করতে যদি বিভ্রান্ত হই, তাহলে আমাদের দুই বছরের সময়টা দুই যুগ কেটে গেলে ভালো ফল হবে না।

জ্বালানিতে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই বললেই চলে। নতুন একটা ধারণা এসেছে অর্থাৎ আমি এক জায়গায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করে গ্রিডে দেব কিন্তু আমি অন্য জায়গায় নেব। এতে সরকারের কোনো দায় থাকবে না। সরকারের সঙ্গে কোনো চুক্তি হবে না। সরকারের কোনো দায় নিতে হবে না। পুরোটাই প্রাইভেট; যিনি তৈরি করবেন উনি বিক্রি করবেন। হুইলিং চার্জ বলে একটা কথা আছে যে, বিদ্যুৎ আমি তৈরি করে গ্রিডে দেব সেটা ছিল ৩২ পয়সা প্রতি কিলোওয়াট। এখানে সরকারের কোনো বিনিয়োগ লাগবে না। সরকারের কোনো দায় লাগবে না। সরকারের কোনো ক্যাপাসিটি চার্জ লাগবে না। সেটাকে আতুর ঘরে মেরে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে। এজন্য শুরুতে বলেছিলাম যে, বাস্তবায়ন তো অর্থমন্ত্রী করবেন। তৃণমূলে যারা আছেন উনার থেকে শুরু করে সচিব পর্যন্ত সবাই করবেন। উনাদের চিন্তাভাবনা যদি পরিবর্তন না হয় তাহলে হবে না।

বাজেটে অনেক ভালো ভালো কথা আছে। এগুলাকে বাস্তবায়ন করতে হবে। আর যে ২  লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, এটা নিয়ে এ বছর চিন্তা না করলেও চলবে। এজন্য যারা সত্যি সত্যি শিল্প উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী, কিংবা লুটপাটকারী নয়, তাদের যদি আপনি সাধেনও তাও টাকা নেবে না। কারণ টাকা নিয়ে তা ফেরত দিতে পারবে না। আমার অবকাঠামো থাকতে হবে। বাজেটের যে ঘোষণাগুলো আছে সেগুলো যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে আমি আশাবাদী। এখন সবচেয়ে বড় যেটা সেটা হচ্ছে মূল্যস্ফীতির চাপ। কারণ বিগত প্রায় তিন বছরের বেশি সময় কিন্তু আমরা একটা উচ্চমূল্যস্ফীতির মধ্যে বসবাস করছি। এটা কিন্তু ওই নিচের যারা স্বল্প আয়ের জনগোষ্ঠী, দরিদ্র জনগোষ্ঠী তাদের কিন্তু একেবারে দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। কাজেই তাদের জন্য যেটা সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সেটা হচ্ছে, কীভাবে এই উচ্চমূল্যস্ফীতি থেকে তাদের কিছুটা স্বস্তি দেওয়া যায়।

ঋণ প্রবাহের ক্ষেত্রে ব্যাংকের যে প্রশ্নটা আসছে সেখানে যেন সরকার ব্যবসায়ীদের প্রতিপক্ষ হয়ে না দাঁড়ায়। দুই নম্বর হচ্ছে জ্বালানি নিরাপত্তার কথা যেটা এসেছে, সেখানে যেন সরকার ব্যবসা না করে। সরকার যদি নিজে ব্যবসা করে মুনাফা অর্জনের মাধ্যমে বাজেটের ঘাটতি কমায়, অর্থাৎ উচ্চাবিলাসী বাজেট বাস্তবায়নের জন্য যদি জ্বালানি সেক্টর এবং বিদ্যুৎ সেক্টরকে বেছে নেয়, তাহলে এই প্রত্যাশাটা হতাশায় রূপান্তরিত হবে। এখন যে জিনিস আমি দেশে উৎপাদন করি না, সেই জিনিসের ওপর যদি কর আরোপ করি, পক্ষান্তরে যদি বলি আমি ভর্তুকি দিচ্ছি, এটা কিন্তু সত্যিকারের ভর্তুকি নয়। আমরা এটা তুলে ধরব যে, যদি ভর্তুকি দেওয়া হয় সেটা যেন সত্যি হয়।

সরকার যেন ব্যবসায়ীদের প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়। কারণ, আমাদের এখন দরকার বিনিয়োগ। এই বিনিয়োগের জন্য যা যা করা দরকার সরকার তা করবে। এখানে শেষ পর্যন্ত মানুষের কাছে এই প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবে রূপান্তর হয় সেটাই হচ্ছে বড় প্রশ্ন। তাদের জীবনে স্বস্তি আনে কি না, চাকরি আসে কি না, বিনিয়োগ বাড়ে কি না, জানের নিরাপত্তা আসে কি না, সদিচ্ছা থাকে কি না এবং সরকার যে কথাটা বলেছে অর্থাৎ প্রতিটি ক্ষেত্রে সুশাসন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যে সক্ষমতা, সে বিষয়গুলো নিয়ে বারবার আলোচনা হয়েছে। কর কাঠামোকে আরও কার্যকর করার বিষয়টি আলোচনা হয়েছে। যাতে রাজস্ব আহরণের বিষয়টি আরও বাস্তবসম্মত হয়। কাজেই আমরা বলব, চ্যালেঞ্জ বড় কিন্তু সুযোগও বড়। এখন দেখার বিষয় এই বাজেট শুধু কাগজে-কলমে সীমিত থাকবে নাকি বাস্তবে আমাদের অর্থনীতিতে, সাধারণ মানুষের জীবনে, বিনিয়োগে–সামগ্রিকভাবে একটা পরিবর্তন বয়ে আনতে পারে কি না, সেটাই দেখার বিষয়। 

লেখক: জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) উপদেষ্টা