টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলায় সাঙ্গু নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে লোকালয়ে প্রবেশ করেছে। এতে বাজালিয়া ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বড়দুয়ারা গ্রামের ৫ শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, এ গ্রামের অধিকাংশ বসতঘরে হাঁটু থেকে বুকসমান পানি। অনেকে ঘরবাড়ি ছেড়ে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে চলে গেছেন। আবার অনেকে প্রতিবেশীদের বাড়ির দোতলায় অবস্থান নিয়েছেন। অনেক পুরুষকে মসজিদের দোতলায় অবস্থান নিতে দেখা গেছে। কাঁচা-পাকা সড়কগুলো এখন পানির নিচে। কোথাও কোথাও নৌকা ছাড়া চলাচলের উপায় নেই।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গ্রামটিতে ৫ শতাধিক পরিবার বসবাস করে। বন্যার পানি বসতঘরে প্রবেশ করার পর থেকে এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে মাত্র ৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। তবে শনিবার (১১ জুলাই) বিকেলে বড়দুয়ারা মাদক প্রতিরোধ ও সমাজ উন্নয়ন কমিটির উদ্যোগে ২ শতাধিক পানিবন্দি পরিবারের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়। এ ছাড়া গ্রামের বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও প্রবাসীর ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রতিদিন এক বেলা করে রান্না করা খাবার বিতরণ করা হচ্ছে।
আরও জানা যায়, পানিবন্দি অবস্থায় নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি কষ্টে রয়েছেন। নিরাপদ শৌচাগারের অভাব, বিশুদ্ধ পানির সংকট এবং স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ না থাকায় তারা বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। আবার বুড়ির দোকান ব্রিজ এলাকায় কেরানীহাট-বান্দরবান মহাসড়ক কোমরসমান পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় অনেক বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তি সরকারি কিংবা বেসরকারি হাসপাতালে স্বাভাবিকভাবে যাতায়াত করতে পারছেন না। এতে তারা চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ ছাড়া এ গ্রামের বিস্তীর্ণ কৃষিজমি, সবজিখেত, পুকুর ও মাছের প্রজেক্ট পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে অনেকেই আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
বড়দুয়ারা গ্রামের গর্জন্যাপাড়ার বাসিন্দা নুরুল ইসলাম বলেন, ‘তিন বছর পর এত বড় বন্যা দেখলাম। বাড়ির ভেতর পানি উঠে যাওয়ায় পরিবারের সদস্যদের এক নিকটাত্মীয়ের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়ে আমি এলাকায় অবস্থান করছি। বাড়িতে থাকা আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের অনেক ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের সরকারি শুকনো খাবার বা ত্রাণসামগ্রী পাইনি।’
ওই এলাকার বাসিন্দা সাজেদা বেগম বলেন, ‘ছেলেমেয়ে নিয়ে খুব কষ্টে আছি। এক প্রতিবেশীর বাড়ির দোতলায় আশ্রয় নিয়েছি। এখানে রান্না করার কোনো পরিবেশ নেই। সরকারিভাবে কোনো ত্রাণও পাইনি। তবে ব্যক্তি উদ্যোগে প্রতিদিন এক বেলা করে রান্না করা খাবার বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।’
একই গ্রামের বড় হুজুর পাড়ার যুবক মো. মহিউদ্দিন বলেন, ‘২০২৩ সালের পর এবার ভয়াবহ বন্যা দেখলাম। এ বন্যায় আমাদের গ্রামের প্রায় ৯৫ শতাংশ মানুষ পানিবন্দি ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অথচ যাদের ক্ষতি হয়নি তারাই ত্রাণসামগ্রী পাচ্ছেন। এখানকার বিস্তীর্ণ ফসলে জমি পানির নিচে চলে গেছে। অসংখ্য পুকুরের মাছ ভেসে গেছে।’
সাতকানিয়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মোহাম্মদ আলমগীর বলেন, ‘উপজেলার জন্য এখন পর্যন্ত ৯ লাখ টাকা ও ১৭৫ টন চাল বরাদ্দ পেয়েছি। এখন পর্যন্ত ওই টাকার শুকনো খাবার এবং ৯০ টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। আমরা পর্যায়ক্রমে প্রতিটি এলাকায় সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছি।’
তিনি বলেন, ‘বাজালিয়া ইউনিয়নের জন্য ১ টন চাল বারাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া দ্রুত সময়ের মধ্যে বড়দুয়ারা এলাকায় ত্রাণসামগ্রী পৌঁছানো হবে। এ বিষয়ে আমি প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং স্থানীয় ইউপি সদস্যের সঙ্গে কথা বলেছি।’