আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে আগের সরকারের নেওয়া ঋণ কর্মসূচিকে ‘সম্পূর্ণ জনস্বার্থবিরোধী’ বলে মন্তব্য করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। জনস্বার্থ ও দেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয় এমন কোনো চুক্তি আইএমএফের সঙ্গে হবে না, এমন মন্তব্যও করেছেন তিনি।
ঢাকা সফরত আইএমএফ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক শেষে গতকাল রবিবার (১২ জুলাই) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
পাঁচ দিনের সফরে আইএমএফের ১২ সদস্যের প্রতিনিধিদল গতকালই ঢাকায় এসেছে। প্রথম দিনই দাতা সংস্থার প্রতিনিধিরা অর্থ বিভাগের সঙ্গে বৈঠক করেছে। চলতি সপ্তাহজুড়ে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে বৈঠক করবে এ মিশন। গতকাল মিশনটির আটটি নির্ধারিত বৈঠক ছিল। এর মধ্যে বেলা দুপুর ১টায় ছিল অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে। তবে জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার ও সাবেক অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের জানাজায় অংশ নিতে যাওয়ায় ওই বৈঠক বাতিল করা হয় বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানায়।
আইএমএফের বাংলাদেশ মিশনপ্রধান ইভো ক্রজনারের নেতৃত্বে গতকাল দিনের প্রথম বৈঠকটি হয় অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদারের সঙ্গে। এরপর অর্থ বিভাগের কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধিদের কাছে নিজেদের নীতি পরিকল্পনা উপস্থাপন করে আইএমএফ মিশন।
অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে বের হওয়ার সময় আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আরও বলেন, ‘আমাদের মূল চিন্তা টাকা পাওয়া নয়, দেশের স্বার্থ রক্ষা করা। দেশের মানুষের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে আইএমএফের সঙ্গে কোনো কর্মসূচিতে সরকার যাবে না।’
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আরও বলেন, পূর্ববর্তী ফ্যাসিস্ট সরকারের নেওয়া আইএমএফের কর্মসূচিতে এমন অনেক শর্ত ছিল, যা একটি গণতান্ত্রিক ও নির্বাচিত সরকারের পক্ষে গ্রহণযোগ্য নয়। এই কারণে বর্তমান সরকার আগের প্রোগ্রাম থেকে বেরিয়ে এসে নতুন প্রোগ্রাম নিচ্ছে। নতুন করে ঋণচুক্তি করতে আলোচনা চলছে। দেশের স্বার্থে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘একটি নির্বাচিত সরকার হিসেবে বাংলাদেশের মানুষের এবং দেশের অর্থনীতির স্বার্থ সুরক্ষিত রাখাই আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার। জনগণের অর্থনৈতিক স্বার্থ নিশ্চিত করে আইএমএফের সঙ্গে এমন একটি নতুন কর্মসূচিতে আমরা যাচ্ছি। যে কর্মসূচিতেই যাই না কেন, সেখানে বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ শতভাগ সংরক্ষিত থাকবে।’
এ সময় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দেশের চলমান রাজনীতি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক সহযোগিতা বিষয়ে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ও পরিকল্পনা তুলে ধরেন সাংবাদিকদের সামনে। এই সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে বলে জানান তিনি।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গতকালের বৈঠকগুলোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল সম্ভাব্য দ্বিতীয় সহনশীলতা ও টেকসই সুবিধা (আরএসএফ) কর্মসূচি। এ কর্মসূচির প্রস্তুতি, সম্ভাব্য কাঠামো ও শর্ত নিয়ে বেলা ২ থেকে ৩টা পর্যন্ত আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি আগের সরকারের সময়ে নেওয়া প্রথম আরএসএফ কর্মসূচির আওতায় সংস্কার বাস্তবায়নের অগ্রগতিও পর্যালোচনা করা হয়েছে।
বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বৈঠকগুলোয় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ও মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য, রাজস্ব আহরণের পরিকল্পনা, ভর্তুকি ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি), বড় উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন পরিকল্পনা এবং অর্থায়নের উৎস নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এ ছাড়া ২০২৬-২৭ অর্থবছর ও মধ্যম মেয়াদে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড কর্মসূচির ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলো একীভূত করার পরিকল্পনা, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, নতুন নিয়োগ, জনবলকাঠামো এবং বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি নিয়েও আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।
পরিবর্তন আসবে ভিসানীতিতে
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার জন্যই কাজ করছে সরকার। দেশের অর্থনৈতিক গতিশীলতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আস্থা বাড়াতে বর্তমান ভিসানীতিতে পরিবর্তন আনা হবে। একটি আধুনিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হলে আমাদের বর্তমান ভিসানীতি রিভাইস বা সংশোধন করা দরকার। এই নীতিকে আরও সহজ ও আধুনিক করা হবে।
ভিসানীতি আধুনিকীকরণের ফলে দেশে বিদেশি পর্যটকদের আগমন বাড়বে, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা স্বাচ্ছন্দ্যে বিনিয়োগ করতে পারবেন এবং বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশের ওপর আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতা আরও সুদৃঢ় হবে বলে তিনি জানান।