স্পেন, ফ্রান্স, আর্জেন্টিনাও ইংল্যান্ড/ ছবি: সংগৃহীত
বিশ্বকাপের ইতিহাসে অনেক গল্প মাঠে লেখা হয়েছে। আবার কিছু গল্প শুরু হয়েছে মাঠে বল গড়ানোরও আগে। ২০২৬ বিশ্বকাপে তেমনই এক গল্পের জন্ম হয়েছিল ড্রয়ের দিন। ফিফা এবার শুধু সূচি বানায়নি। তারা পথও এঁকেছিল। সেই পথ ধরে হেঁটেই সেমিফাইনালে দাঁড়িয়ে চার দৈত্য–স্পেন, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড। ইতিহাসে প্রথমবার ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ চার দল একসঙ্গে পৌঁছে গেছে বিশ্বকাপের শেষ চারে। ফ্রান্স র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ। পরের তিনটি স্থানে রয়েছে যথাক্রমে আর্জেন্টিনা, স্পেন ও ইংল্যান্ড।
শীর্ষ চার দলের সেমিতে উঠে আসার পেছনে রয়েছে ফিফার একটি পরিকল্পনা। ২০২৬ বিশ্বকাপের আগে ড্রয়ের নিয়মে পরিবর্তন আনে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা। বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ চার দলকে রাখা হয় চারটি আলাদা কোয়াড্রান্টে। উদ্দেশ্য ছিল খুব স্পষ্ট। সেমিফাইনালের আগে যেন তারা একে অপরের মুখোমুখি না হয়। তবে এই সুবিধা পাওয়ার জন্য একটি শর্তও ছিল। প্রতিটি দলকে নিজেদের গ্রুপের শীর্ষে থেকে শেষ করতে হতো। স্পেন, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড চার দলই সেই কাজ করেছে। ফলে ড্রয়ের পরিকল্পনাও বাস্তবে রূপ পায়।
স্পেনের জন্য ফাইনালের আগে আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ ছিল না। একইভাবে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সকে রাখা হয়েছিল নকআউট পর্বের দুই ভিন্ন দিকে। সব হিসাব মিলিয়ে শেষ পর্যন্ত সেমিফাইনালের লাইনআপ দাঁড়িয়েছে ঠিক ফিফার পরিকল্পনা অনুযায়ী। মঙ্গলবার রাতে মুখোমুখি হবে ফ্রান্স ও স্পেন। বুধবার রাতে লড়বে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা। ফিফা এই পরিবর্তনের নাম দিয়েছে প্রতিযোগিতামূলক ভারসাম্য। ক্রীড়াঙ্গনে এমন ধারণা একেবারে নতুন নয়। টেনিসের বিশ্বকাপখ্যাত উইম্বলডনেও শীর্ষ বাছাই খেলোয়াড়দের আলাদা রাখা হয়। নতুন চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফরম্যাটেও একই নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। তবে বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে এটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
ফিফা বিশ্ব র্যাঙ্কিং চালু হয় ১৯৯২ সালে। তবে সেই বছরের বিশ্বকাপে এটি ব্যবহার করা হয়নি। এরপর বহুবার শীর্ষ চার দল হতাশ করেছে। ২০০২ সালে ফ্রান্স গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয়। ২০১০ সালে একই পরিণতি হয় ইতালির। ২০১৪ সালে বিদায় ঘণ্টা বাজে স্পেনের। এরপর ২০১৮ সালে জার্মানি ও ২০২২ সালে বেলজিয়াম বিদায় নেয়। কোনো আসরেই শীর্ষ চার দল একসঙ্গে সেমিফাইনালে উঠতে পারেনি। ২০২৬ বিশ্বকাপ সেই ইতিহাস বদলে দিয়েছে।
এর পেছনে আরেকটি বাস্তব কারণও ছিল। ৪৮ দলের বিশ্বকাপে যুক্ত হয়েছে অতিরিক্ত একটি নকআউট পর্ব। ফলে গ্রুপ চ্যাম্পিয়নদের আগেই মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। এই আসরের শেষ ষোলোর তিনটি ম্যাচেই এমন দৃশ্য দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্র খেলেছে বেলজিয়ামের বিপক্ষে। ইংল্যান্ডের প্রতিপক্ষ ছিল মেক্সিকো। সুইজারল্যান্ড খেলেছে কলম্বিয়ার সঙ্গে। ফিফা বুঝেছিল এই নতুন কাঠামোতে বড় দলগুলো খুব দ্রুতই একে অপরকে বিদায় করে দিতে পারে। তাতে টুর্নামেন্ট হারাতে পারে তার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। সেই কারণেই ড্রয়ের নিয়মে আনা হয় পরিবর্তন।
ফিফা শুরু থেকেই বিষয়টি গোপন করেনি। বরং প্রকাশ্যেই জানিয়েছিল কেন এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাদের লক্ষ্য ছিল বড় লড়াইগুলোকে টুর্নামেন্টের শেষ ভাগের জন্য ধরে রাখা। এক অর্থে সেটিই হয়েছে। সেমিফাইনালে আছে বিশ্ব ফুটবলের চার পরাশক্তি। চারটি সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। চারটি দলই বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ চার। বলা বাহুল্য, বিশ্বকাপ ইতিহাসে এটি মাত্র তৃতীয় আসর, যেখানে চারটি সেমিফাইনালিস্ট দলই সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন (১৯৭০ ও ১৯৯০ সালের পর)।
এ নিয়ে সমালোচনা থাকতেই পারে। কেউ বলবেন এটি পরিকল্পিত সুবিধা। আবার কেউ বলবেন এটি নিখাদ কৌশল। তবে একটি বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেই–ফিফা যে চিত্র কল্পনা করেছিল, ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল ঠিক সেই ছবিই এঁকে দিয়েছে।