বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা দুই ফুটবলার পেলে ও ম্যারাডোনোর পাশে নাম লিখিয়েছেন ইংল্যান্ডের সোনার ছেলে জুড বেলিংহ্যাম। কোথায় পেলে-ম্যারাডানো আর কোথায় ২২ বছরের টগবগে যুবক বেলিংহ্যাম। কিভাবে এই অসম্ভবকে সম্ভব করলেন বেলিংহ্যাম? নকআউট পর্বে পরপর দুই ম্যাচে বেলিংহ্যাম জোড় গোল করেন। এই কাজটিই করেছিলেন ৪০ বছর আগে ১৯৮৬ সালের আসরে ম্যারাডোনা। তারও আগে ১৯৫৮ সালে করেছিলেন পেলে। আর এভাবেই শতবর্ষ ছুঁই ছুঁই বিশ্বকাপ ফুটবলে পেলে-ম্যারাডানোর পাশে নাম লিখিয়েছেন বেলিংহ্যাম। তবে এই তিনজন ছাড়াও হাঙ্গেরির পিটার ককসিস (১৯৫২) ও ব্রাজিলের গারিঞ্চা (১৯৬২ সালে) নকআউট পর্বে কোয়ার্টার ফাইনাল ও সেমিফাইনালে জোড়া গোল করেছিলেন।
১৯৫৮ সালে পেলে কীর্তি গড়েছিলেন সেমিফাইনাল ও ফাইনালে। আসরে তিনি গোল করেছিলেন ৬টি। যার ৫টিই এসেছিল এই দুই ম্যাচ থেকে। সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে ৫-২ গোলে হারানো ম্যাচে পেলে হ্যাটট্রিক করেছিলেন দলের শেষ তিন গোল করে। ফাইনালে ব্রাজিলের প্রতিপক্ষ ছিল স্বাগতিক সুইডেন। এবারও ব্রাজিল জয়ী হয় ৫-২ গোলে। পেলে দলের তৃতীয় ও চতুর্থ গোল দুটি করেছিলেন।
২৮ বছর পর পেলের পাশে নাম লেখান আরেক কিংবদন্তি ম্যারাডানো। পেলের মতো ১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনাও আর্জেন্টিনাকে চ্যাম্পিয়ন করাতে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। বলা যায় অনেকটা এককভাবে ভূমিকা রেখেছিলেন ম্যারাডোনা। কোয়ার্টার ফাইনালে। প্রতিপক্ষ ছিল এই ইংল্যান্ড। ম্যারাডোনার প্রথম গোলটিতো ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নেয় ‘হ্যান্ড অব গড’ নামে। জটলার মধ্য থেকে তিনি লাফিয়ে উঠে হাত দিয়ে গোল করেছিলেন। রেফারির নজর এড়ালেও নজর এড়াতে পারেনি ব্রিটিশ গোলরক্ষক অধিনায়ক পিটার শিলটনের। তিনি তিউনিসিয়ার রেফারি আলী বিন নাসেরের নজরে আনেন। কিন্তু রেফারি তাতে কর্ণপাত করেননি। এরপরই ম্যারাডোনা যে গোলটি করেন তা ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ হিসেবে আখ্যায়িত হয়। নিজেদের সীমানা থেকে বল ধরে একে একে ইংল্যান্ডের চার ফুটবলার পিটার ব্রাডলি, পিটার রেইড, টেরি বুচার (দুইবার) ও টেরি ফ্রেন উইককে কাটিয়ে পরে গোলরক্ষক পিটার শিলটনকেও ফাঁকি দিয়ে গোলটি করেছিলেন। তার এই গোল আড়ালে পড়ে যায় মাত্র ৪ মিনিট আগে ম্যারাডোনার হাত দিয়ে করা গোলটি। সেমিতে আর্জেন্টিনা পেয়েছিল বেলিজিয়ামকে। ম্যারাডোনা একাই ৫১ ও ৬৩ মিনিটে গোল দুটি করে দলকে ফাইনালে নিয়ে যান। ফাইনালে জামার্নিকে ৩-২ গোলে হারালেও ম্যারাডোনা কোনো গোল পাননি। এ ছাড়া হাঙ্গেরির পিটার ককসিস ১৯৫২ সালে কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রাজিলে ও সেমিফাইনালে উরুগুয়ের বিপক্ষে এবং ১৯৬২ সালে গারিঞ্চা কোয়াটার ফাইনালে ইংল্যান্ড ও সেমিফাইনালে চিলির বিপক্ষে দুইটি করে গোল করেছিলেন। তবে এরা কেউই ফাইনালে গোল করতে পারেননি।
পেলে-ম্যারাডোনার পাশে এবার নাম লিখিয়েছেন বেলিংহ্যাম। কিন্তু তিনি যখন এ কীর্তি গড়েন, তখন পেলে-ম্যারাডোনার মতো জগত জুড়া পরিচিত হয়নি। তবে একজন জাত ফুটবলার হিসেবে তার সুখ্যাতি ছিল। রিয়াল মাদ্রিদের এই ফুটবলার মূলত মধ্যমাঠ সামাল দেন। সেখানে তিনি নকআউট পর্বে স্ট্রাইকারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে ইংল্যান্ডের ত্রাতা হয়ে উঠেন। শেষ ষোলো থেকে শেষ আটে। শেষ আট থেকে শেষ চারে। ইংল্যান্ডকে এই পর্যায়ে নিয়ে আসতে বেলিংহ্যাম একাই রেখেছেন ভূমিকা। শেষ ষোলোতে প্রতিপক্ষ ছিল মেক্সিকো, শেষ আটে নরওয়ে।
গ্রুপ পর্বে ক্রোয়েশিয়া ও পানামার বিপক্ষে একটি করে গোল করেছিলেন বেলিংহ্যাম। নকআউট পর্বে মেক্সিকোর বিপক্ষে ৩-২ গোলে জয়ী হওয়া ম্যাচে প্রথম দুই গোল তিনি করেন মাত্র ২ মিনিটের ব্যবধানে। কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়ের বিপক্ষে প্রথমার্ধেই দল যখন ১-০ গোলে পিছিয়ে সে সময় ত্রাতা হয়ে উঠেন বেলিংহ্যাম। প্রথমার্ধেরই ইনজুরি টাইমে গোল করে তিনি সমতা নিয়ে আসেন। ১-১ গোলে খেলা শেষ হওয়ার পর অতিরিক্ত সময়ের শুরুতেই (৯৩ মিনিট) গোল করে বেলিংহ্যাম দলকে এগিয়ে নিয়ে যান। যা পরে খেলার ভাগ্য নির্ধারিত করে দেয়। সামনে সেমিফাইনাল। প্রতিপক্ষ বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। দেখার বিষয় বেলিংহ্যাম কী করতে পারেন। এখানে সাফল্যের মালা গাঁথতে পারলে তখন সুযোগ আসবে ফাইনালেও ভূমিকা রাখার।
নরওয়েকে বিদায় করে সেমির টিকিট পাওয়া ম্যাচ নিয়ে বেলিংহ্যাম বলেন, ‘চমৎকার প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ একটি ম্যাচ ছিল। ভাগ্যক্রমে আমরা এই ধাপ পার হতে পেরেছি।’
পেলে-ম্যারাডোনার পাশে নাম লেখানো ম্যাচে বেলিংহ্যামকে খুবই সাবধানে খেলতে হয়েছে। হলুদ কার্ড পাওয়ার ভয় ছিল তার। আগেই একটি হলুদ কার্ড পাওয়াতে সেমিফাইনালের কথা মাথায় রেখে তাকে নির্ভেজাল খেলতে হয়েছে। কারণ কার্ড খেলে আর দল সেমিতে গেলে তিনি খেলতে পারবেন না। অবশেষে তিনি নির্বিঘ্নেই ম্যাচটি পার করে দেন পেলে-ম্যারাডোনার পাশে নাম লিখিয়ে।
হলুদ কার্ড না দেখাতে বেলিংহ্যাম তার মা ডেনিস বেলিংহামের অবদানের কথা স্মরণ করেছেন। ম্যাচে যাতে তিনি কার্ড না দেখেন, সে জন্য তার মা তাকে সব সময় বুঝিয়েছেন। বেলিংহ্যাম বলেন, ‘সব সময় তিনি আমাকে হলুদ কার্ডের ব্যাপারে সতর্ক করে গেছেন। আমি যেন আমার মুখের ভাষা, মুখের ভাব, ট্যাকেল, আবেগ–এসবের ব্যাপারে সতর্ক থাকি। শেষ পর্যন্ত আমি তা এড়াতে পেরেছি।’ এই মা কিন্তু বেলিংহ্যামের সার্বক্ষণিক সঙ্গী। ২০১৯-২০ মৌসুমে ১৬ বছর বয়সে বার্মিংহাম সিটির ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে অভিষেক হওয়ার পর পরের মৌসুমে তিনি প্রথমে বুন্দেসলিগায় বুরুসিয়া ডর্টুমুন্ড এবং ২০২৩-২৪ মৌসুমে লা-লিগায় রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেওয়ার সময় মা তার সঙ্গী হন। এখনো তিনি ছেলের পাশে আছেন ছায়া হয়ে।
বিংশ শতাব্দীতে জন্ম নেওয়া খেলোয়াড়দের মাঝে বেলিংহ্যাম হলেন প্রথম ইংলিশ ফুটবলার, যিনি জাতীয় দলের হয়ে প্রথম গোল করেছেন। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে তিনি ইরানের বিপক্ষে ৬-১ গোলে জেতা ম্যাচে এক গোল করে এই নজির গড়েছিলেন। তখন তার বয়স ছিল ১৯। এই গোল করে তিনি আবার অলটাইম দ্বিতীয় সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতাও হয়ে যান। সবচেয়ে কম বয়সে গোল করা ফুটবলার হলেন মাইকেল ওয়েন।
জুড বিলিংহাম ৬ গোল করে সতীর্থ হ্যারি কেইন (৬ গোল) ও মেসি (৮ গোল)-এমবাপ্পের(৮ গোল) সঙ্গে আছেন গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে।