যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চরম উত্তেজনা এবং পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র-ড্রোন হামলার জেরে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি মারাত্মক রূপ নিয়েছে। তেহরান মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে নজিরবিহীন হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে তারা ‘হরমুজ প্রণালী’ আবারও সম্পূর্ণ বন্ধ ঘোষণা করেছে।
গত দুই দিন দুই পক্ষের মধ্যে এই তীব্র যুদ্ধ চলে। এর আগে গত সপ্তাহে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী ইরানের ওপর কয়েক দফা হামলা চালায়। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, তারা ইরানের তিন শতাধিক সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। হরমুজ প্রণালীতে বেসামরিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ করতেই তারা এই পদক্ষেপ নিয়েছে।
অন্যদিকে ইরান পাল্টা জবাব হিসেবে ওমান, কাতার, কুয়েত, জর্ডান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়।
এই যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের দাম আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালীদিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। ইরান সেখানে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায় এবং অননুমোদিত জাহাজের যাতায়াত রুখতে কর আদায়ের একটি স্থায়ী ব্যবস্থা চালুর চেষ্টা করছে।
রবিবার (১২ জুলাই) ইরানের নবগঠিত ‘পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথরিটি’ এক বিবৃতিতে জানায়, এই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক বাহিনীর অবৈধ তৎপরতার কারণে হরমুজ প্রণালীদিয়ে আপাতত সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ থাকবে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে নতুন করে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হবে। ইরানের শীর্ষ আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘একতরফা চুক্তির দিন শেষ। আমরা আপনাদের বলেছিলাম–কথা রাখুন, নয়তো মূল্য চোকান।’
এদিকে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড ইরানের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। মার্কিন বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালীইরানের নিয়ন্ত্রণে নেই এবং সেখানে এখনো নৌযান চলাচল করছে। মার্কিন নৌবাহিনীর যৌথ সামুদ্রিক তথ্যকেন্দ্রও জানিয়েছে, নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও ওমানের কাছ দিয়ে একটি বিকল্প দক্ষিণ রুট জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে।
সর্বশেষ সংঘর্ষের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের উপ-সাগরীয় দেশগুলো নতুন করে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। কাতার, ওমান, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, তাদের আকাশসীমা লঙ্ঘন করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রবেশ করেছে এবং তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সেগুলো প্রতিহত করেছে। কাতার জানিয়েছে, ইরানের হামলায় তাদের দেশে এক শিশুসহ তিনজন আহত হয়েছে। ওমান সাগর উপকূলে একটি কনটেইনার জাহাজে হামলার পর ওমান ২৩ জন ক্রু সদস্যকে উদ্ধার করলেও একজন ভারতীয় নাগরিক এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ফলে গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিটি সম্পূর্ণ ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। ওই চুক্তির লক্ষ্য ছিল হরমুজ প্রণালীপুনরায় উন্মুক্ত করা এবং ৬০ দিনের আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধের অবসান ঘটানো। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত সপ্তাহে এই যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে ‘বাতিল’ বলে ঘোষণা করেছেন, যদিও আলোচনার পথ খোলা রাখার কথা বলেছেন তিনি। কূটনৈতিক পর্যায়ে কাতার, ওমান ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আলোচনার চেষ্টা চললেও যুদ্ধ থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সূত্র: রয়টার্স, আল-জাজিরা, বিবিসি