দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের বিস্তৃত সামুদ্রিক এলাকার দাবিকে ২০১৬ সালের আন্তর্জাতিক সালিশি ট্রাইব্যুনালের রায়ের ভিত্তিতে আবারও অবৈধ বলে ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ ১৪টি দেশ। একই সঙ্গে পৃথক বিবৃতিতে ওই রায়কে শান্তিপূর্ণ বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে একটি ‘ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত’ হিসেবে উল্লেখ করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)।
রবিবার (১২ জুলাই) প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে দেশগুলো বলেছে, দক্ষিণ চীন সাগরে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ব্যাহত করে এমন ‘উসকানিমূলক’ কর্মকাণ্ড তারা প্রত্যাখ্যান করছে।
২০১৬ সালের ১২ জুলাই জাতিসংঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক সনদ (ইউএনসিএলওএস) অনুযায়ী নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে গঠিত সালিশি ট্রাইব্যুনাল যে রায় দিয়েছিলেন, তার দশম বার্ষিকী উপলক্ষে এই বিবৃতি দেওয়া হয়। দেশগুলো বলেছে, ওই রায় চূড়ান্ত এবং আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক।
চীন আগের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে জানায়, ওই রায় ‘অকার্যকর, বাতিল এবং এর কোনো বাধ্যবাধকতা নেই’। বেইজিং এ রায়কে না স্বীকার করে, না মেনে নেয়।
ফিলিপিন্স ২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক সালিশির আবেদন করলেও চীন শুরু থেকেই সেই প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়নি। এর এক বছর আগে বিতর্কিত প্রবালপ্রাচীর (স্কারবোরো শোল) নিয়ে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনার পর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেয় বেইজিং।
২০১৬ সালে ট্রাইব্যুনাল ফিলিপাইনের পক্ষে রায় দিয়ে জানায়, জাতিসংঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক সনদ (ইউএনসিএলওএস) অনুযায়ী দক্ষিণ চীন সাগরে স্বীকৃত জলসীমার বাইরে ‘ঐতিহাসিক অধিকার’-এর ভিত্তিতে সম্পদের ওপর চীনের দাবির কোনো আইনগত ভিত্তি নেই।
রায় প্রত্যাখ্যান করলেও চীন এখনো প্রায় পুরো দক্ষিণ চীন সাগরের ওপর নিজেদের কর্তৃত্ব বহাল রেখেছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ হিসেবে পরিচিত এই সমুদ্রপথ দীর্ঘদিন ধরেই এশিয়ার অন্যতম বিরোধপূর্ণ অঞ্চল। এখানে চীনের পাশাপাশি ফিলিপিন্স, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, ব্রুনেই ও তাইওয়ানেরও আংশিক দাবি রয়েছে।
যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, “দক্ষিণ চীন সাগরে ‘ঐতিহাসিক অধিকার’-এর ভিত্তিসহ চীনের বিস্তৃত সামুদ্রিক দাবির কোনো আইনগত ভিত্তি নেই–সালিশি ট্রাইব্যুনালের এই সিদ্ধান্ত আমরা পুনর্ব্যক্ত করছি।”
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বলপ্রয়োগ, ভয়ভীতি বা একতরফা পদক্ষেপের মাধ্যমে আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা নষ্ট করার যেকোনো প্রচেষ্টার বিরোধিতা করা হবে।
এতে উপকূলরক্ষী বাহিনী, সামরিক বাহিনী বা সামুদ্রিক মিলিশিয়া ব্যবহার করে অন্য দেশের বৈধ নৌ ও আকাশপথের কার্যক্রমে বাধা দেওয়া, হয়রানি বা ভয়ভীতি প্রদর্শনেরও তীব্র বিরোধিতা করা হয়। এসব কর্মকাণ্ড নৌযান, জেলে ও সংশ্লিষ্ট কর্মীদের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে এবং আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে উল্লেখ করা হয়।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ইউএনসিএলওএস অনুযায়ী নৌ ও আকাশপথে অবাধ চলাচলের স্বাধীনতা এবং সমুদ্রের অন্যান্য বৈধ ব্যবহারের অধিকার অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ১৯৮২ সালের জাতিসংঘের সমুদ্র আইন সনদের ভিত্তিতে শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিরোধ নিষ্পত্তির আহ্বান জানানো হয়।
বেইজিংয়ে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, সালিশি ট্রাইব্যুনাল এবং তার রায় আন্তর্জাতিক সালিশি প্রক্রিয়ার সাধারণ চর্চার পরিপন্থি এবং ইউএনসিএলওএসের সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে চীনের সার্বভৌম অধিকারকে গুরুতরভাবে লঙ্ঘন করেছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘চীন ওই রায়ের ভিত্তিতে উত্থাপিত কোনো দাবি বা পদক্ষেপ কখনোই মেনে নেবে না। তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি কিংবা চীনের ওপর কোনো সমাধান চাপিয়ে দেওয়ার যেকোনো প্রচেষ্টাও বেইজিং প্রত্যাখ্যান করে।’
সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ চীন সাগরে বিশেষ করে চীন, ফিলিপিন্স ও ভিয়েতনামের উপকূলরক্ষী বাহিনী এবং মাছ ধরার নৌবহরের মধ্যে মুখোমুখি অবস্থান বেড়েছে।
ফিলিপিন্সের অভিযোগ, চীনের উপকূলরক্ষী জাহাজগুলো শক্তিশালী ওয়াটার ক্যানন, সামরিক মানের লেজার এবং বিপজ্জনকভাবে পথরোধের কৌশল ব্যবহার করছে। এতে সমুদ্রে একাধিক সংঘর্ষ ও আকাশে ঝুঁকিপূর্ণ মুখোমুখি অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই চীনকে ২০১৬ সালের সালিশি ট্রাইব্যুনালের রায় মেনে চলার আহ্বান জানিয়ে আসছে।
সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন এবং বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন–উভয়ই সতর্ক করেছে, দক্ষিণ চীন সাগরের বিরোধপূর্ণ এলাকায় ফিলিপিন্সের সেনা, জাহাজ বা বিমান সশস্ত্র হামলার শিকার হলে এশিয়ায় তাদের দীর্ঘদিনের মিত্র ফিলিপিন্সকে রক্ষার চুক্তিগত বাধ্যবাধকতা যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে।