ঢাকা ২৭ আষাঢ় ১৪৩৩, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
মিসরকে হারানোর পর এএফএর ই-মেইল সিস্টেমে সাইবার হামলা শত বছরের অমলিন কীর্তি তাজহাট জমিদারবাড়ি জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিন ময়মনসিংহে লালনের গানে শেকড়ের সংস্কৃতি তুলে ধরল ‘ভাব তরঙ্গ’ নীলাম্বরী সাজে লালপুরে মেয়ের ধর্ষণের মামলায় গ্রেপ্তার বাবা কোয়ার্টারের আগে রক্ষণে সতর্ক আর্জেন্টিনা জেলা-উপজেলার হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে কাজ করছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী ফিফা বিক্রি করছে, আপনি কিনবেন বিশ্বকাপ ফাইনাল ভেন্যুর মাঠের ঘাস? কেরানীগঞ্জে গ্যাসলাইনে বিস্ফোরণ, দগ্ধ ৩ খুলনায় নিখোঁজ তরুণীর মরদেহ উদ্ধার, দুই বার পালিয়ে বিয়ে করায় হত্যা! মিসর কোচের অভিযোগ ভিত্তিহীন: লিওনেল স্কালোনি ১১ দলের রংপুর বিভাগীয় সমাবেশ বয়কট : সহকারী পরিচালক মাগুরার সেতু ধস, বিচ্ছিন্ন সড়ক যোগাযোগ সেন্টমার্টিনে কোস্টগার্ডের ত্রাণ বিতরণ সাঙ্গুর পানি বিপৎসীমার উপরে, লোকালয়ে কমছে বন্যার পানি পেনাল্টিতে মেসির সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত: স্কালোনি বীরগঞ্জে ধানের চারা রোপণ করে শিশুদের নীরব প্রতিবাদ জ্বালানি সংকটে কিউবাজুড়ে লোডশেডিং ভোমরা স্থলবন্দরে বিজিবির অভিযানে ডায়মন্ডের নাকফুলসহ ২ ভারতীয় আটক ফ্রান্সকে হারাতে আমরা প্রস্তুত: স্প্যানিশ কোচ ঢামেকের ৮০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে যোগ দিলেন প্রধানমন্ত্রী টাঙ্গাইল মেডিকেলে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত মাধবদী পৌরসভার নিখোঁজ গাড়ি উদ্ধার জাপানের দক্ষিণাঞ্চলে টাইফুন বাভির আঘাত বেলকুচিতে পানির পাম্পে আবারও পাওয়া গেল গ্যাসসদৃশ পদার্থ গাজীপুরে জখম হাতির চিকিৎসায় থাই বিশেষজ্ঞ ফ্রান্সেরই স্পেনকে ভয় পাওয়া উচিত: ইয়ামাল জয়পুরহাটে জমি নিয়ে বিরোধে সংঘর্ষ, আহত ১০ বারবার দুর্যোগ নয়, স্থায়ী সমাধানের পরিকল্পনার আহ্বান জামায়াত আমিরের

গাজীপুরে জখম হাতির চিকিৎসায় থাই বিশেষজ্ঞ

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬, ১১:০২ এএম
আপডেট: ১১ জুলাই ২০২৬, ১১:৫০ এএম
গাজীপুরে জখম হাতির চিকিৎসায় থাই বিশেষজ্ঞ
ছবি: খবরের কাগজ

গাজীপুর সাফারি পার্কে ‘জয়িতা’ নামের একটি হাতির আক্রমণে অপর হাতি ‘রাজু বাহাদুর’ গুরুতর আহত হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে, হাতিটির উন্নত চিকিৎসার জন্য দেশীয় মেডিকেল বোর্ডের পাশাপাশি থাইল্যান্ড থেকে বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আনা হয়েছে।

চলতি বছরের ২৪ মে গাজীপুর সাফারি পার্কের হাতিশালায় শেকলে বাঁধা ১০ বছর বয়সী রাজু বাহাদুরের উপর হামলা করে চার বছর বয়সী হাতি জয়িতা। আক্রমণে রাজু বাহাদুরের একটি পা ভেঙে গেছে।

সাফারি পার্কের বন্যপ্রাণী চিকিৎসক হাতেম সাজ্জাদ মো. জুলকার নাইন বলেন, হামলার শিকার হাতি রাজু বাহাদুর পার্কের হাতিশালায় শেকলে বাঁধা ছিল। পার্কে থাকা অন্য একটি হাতি থেকে চার বছর আগে জয়িতার জন্ম হয়। বাচ্চা হাতি হওয়ায় জয়িতাকে শেকলে বেঁধে রাখা হতো না। গত ২৪ মে সকালে শেকলে বাঁধা রাজু বাহাদুরের উপর হঠাৎ করে আক্রমণ করে জয়িতা। শেকলে বাঁধা রাজু বাহাদুরের সামনে দুটি পা দুদিকে ছড়িয়ে যায়। এতে একটি পা ভেঙে গেছে। অন্য একটি পায়েও আঘাত পেয়েছে। বর্তমানে রাজু বাহাদুর দাঁড়াতে পারছে না। গঠন করা হয়েছে মেডিকেল বোর্ড। ধীরে ধীরে তার স্বাস্থ্যের অবনতি হওয়ায় থাইল্যান্ড থেকে আনা হয় চিকিৎসক। বর্তমানে থাইল্যান্ড থেকে আসা মেডিকেল টিমের পরামর্শ ও দেশের মেডিকেল বোর্ডের যৌথ তত্ত্বাবধানে রাজু বাহাদুরের চিকিৎসা চলছে। পাশাপাশি শ্রীলঙ্কার চিকিৎসকদের সঙ্গেও পরামর্শ করা হয়েছে।

পার্কের একটি সূত্র জানায়, বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট বিগত ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে নারায়নগঞ্জের কাঁচপুর থেকে ‘রাজু বাহাদুর’ নামের এই হাতিটিকে উদ্ধার করে। জনৈক এক ব্যক্তি হাতিটি দিয়ে বিভিন্ন বাজারে চাঁদাবাজির কাজে ব্যবহার হচ্ছিল। খবর পেয়ে বন বিভাগ হাতিটি উদ্ধার করে গাজীপুর সাফারি পার্কের হাতিশালায় নিয়ে আসে। উদ্ধারের সময় রাজু বাহাদুরের বয়স ছিল ৯ বছর। তবে এখন এর বয়স ১০ বছরের বেশি।

পলাশ প্রধান/খাদিজা রুমি/

ডাবল পাপড়ির অলকানন্দা ফুল

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬, ০৯:০৩ এএম
আপডেট: ১০ জুলাই ২০২৬, ০৯:১২ এএম
ডাবল পাপড়ির অলকানন্দা ফুল
জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে ফোটা ডাবল পাপড়ির অলকানন্দা ফুল। ছবি: লেখক

গরমকাল ফুরিয়ে যায় যায়। এ সময় হঠাৎ একটা ফুল দেখে মনে হলো তার ফোটা বোধহয় শুরু হয়েছে। এ যেন ‘তোমার হলো শুরু/ আমার হলো সারা’ অবস্থা। গ্রীষ্ম ফুরালেও ফুল ফুরায় না। অলকানন্দা ফুলেরা গ্রীষ্মকালেও ফোটে। তবে বর্ষাকালে ওরা যেন নবধারা জলে স্নান সেরে হয়ে ওঠে দারুণ স্নিগ্ধ ও সুন্দরী। হলদে ঘণ্টার মতো ফুল ফুটে লতানো গাছটি যেন চারপাশ আলোকিত করে তোলে। অলকানন্দার এ রূপ এ দেশে দীর্ঘদিন ধরে আমরা দেখে আসছি।

কিন্তু এমন একটা রূপ অলকানন্দার দেখব তা ছিল কল্পনারও অতীত। মাইকের চোঙা বা ঘণ্টার মতো অলকানন্দা ফুলগুলো ফোটে এক সারি পাপড়ি নিয়ে। জাত ও প্রজাতিভেদে তার আকার ও আকৃতি হয় ভিন্ন। রং প্রধানত হলুদ হলেও এখন এ দেশে অন্তত পাঁচ রঙের অলকানন্দা ফুল দেখা যাচ্ছে–হলুদ, সাদা, ঘিয়া, মেরুন ও গোলাপি। তাই বলে ডাবল পাপড়ির অলকানন্দা? ঘন পাপড়িগুলো এমনভাবে রয়েছে যেন গোলাপ ফুল। গত ১৩ জুন মিরপুরে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের নার্সারির ভেতরে একটা গাছে সে রকম কিছু ডাবল পাপড়ির অলকানন্দা ফুল দেখলাম। মালিরা বললেন, এ জাতের গাছ আগে ছিল না, নতুন এসেছে। বৃক্ষমেলায় নেওয়ার জন্য টব রেডি করছি।

অ্যাপোসাইনেসি গোত্রের অ্যালামান্ডাগণের উদ্ভিদগুলো এ দেশে সাধারণভাবে বাংলায় অলকানন্দা নামে পরিচিত হয়ে উঠেছে। ১৭৭১ সালে সুইডিশ উদ্ভিদবিজ্ঞানী কার্ল লিনিয়াস অ্যালামান্ডা-গণকে শ্রেণিবিন্যস্ত ও বর্ণনা করেন। তিনি সুইস উদ্ভিদবিজ্ঞানী ও চিকিৎসক ফ্রেডেরিক লুই অ্যালামান্ডের (১৭৩৬-১৮০৯) সম্মানে এ গণের নামকরণ করেন অ্যালামান্ডা। ‘উইলিয়ামসি’ নামটি ১৮৯১ সালে ব্রিটিশ উদ্যানতত্ত্ব বিষয়ক প্রকাশনা ‘গার্ডেন’-এ প্রথম অন্তর্ভুক্ত হয়। সে সময় এই ফুল ইংল্যান্ডে প্রবেশ করে। পরে বিশ শতকের প্রথম দিকে উদ্ভিদবিজ্ঞানী এল এইচ বেইলি একে অ্যালামান্ডা ক্যাথার্টিকা ভার উইলিয়ামসি নামে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি স্বতন্ত্র জাত হিসেবে স্বীকৃতি দেন। 

অ্যালামান্ডা-গণে সারা পৃথিবীতে ১২ থেকে ১৫টি প্রজাতির গাছ রয়েছে। বাংলাদেশে তালিকাভুক্ত প্রজাতি পাওয়া গেছে দুটি। গাছটি এসেছে ব্রাজিল থেকে। বিদেশি সেই ফুলকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলায় অলকানন্দা নাম দিয়ে আপন করে নিয়েছেন- ‘রাত্রিজাগর রজনীগন্ধা-/ করবী রূপসীর অলকানন্দা-/ গোলাপে গোলাপে মিলিয়া মিলিয়া রচিবে মিলনের পালা।’ আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর লেখা কালজয়ী আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো গানেও অলকানন্দার উল্লেখ পাওয়া যায়- ‘পথে পথে ফোটে রজনীগন্ধা অলকানন্দা যেন,/ এমন সময় ঝড় এলো, এক ঝড় এলো খ্যাপা বুনো।’ কিন্তু কবিদের এই অলকানন্দাই আসল হলদে অলকানন্দা। ডাবল পাপড়ির অলকানন্দা ফুলও হলুদ, তবে যেন একটু বেশি হলুদ, সুমিষ্ট ঘ্রাণ আর ব্যতিক্রমী রূপ যেন অলকানন্দাদের জগতে তাকে আলাদা আসন দিয়েছে। ডাবল অলকানন্দার ইংরেজি নাম রাখা হয়েছে গোল্ডেন ট্রাম্পিট ভাইন, প্রজাতিগত নাম Allamanda cathartica var. williamsii. কেউ কেউ একে পৃথক প্রজাতি হিসেবে অ্যালামান্ডা উইলিয়ামসি উল্লেখ করেছেন। কিন্তু কিউ সায়েন্সের ‘প্ল্যান্টস অব দ্য অনলাইন’ অনুসারে একে স্বতন্ত্র প্রজাতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। বরং তাকে ১৯৩৩ সালে অ্যালামান্ডা ক্যাথার্টিকার একটি জাত হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। অন্য অলকানন্দা গাছের মতো এটিও লতানে গুল্ম প্রকৃতির চিরসবুজ গাছ। পাতা সবুজ, চকচকে, উজ্বল, আয়তাকার থেকে বর্শাকৃতি, দৈর্ঘ্য ৬ থেকে ১২ সেন্টিমিটার, অগ্রভাগ তীক্ষ্ণ।

এ গাছের ডাল ভাঙলে সাদা দুধের মতো কষ বা রস বের হয়। এই কষ অনেক সময় ত্বকে লাগলে ত্বক চুলকায়। তাই গাছ ছাঁটার সময় সতর্ক থাকতে হয়। আধো-ছায়া জায়গায় এ গাছ ভালো জন্মে। নিয়মিত পানি দিতে হয়। প্রায় সারা বছরই ফুল ফোটে, তবে বর্ষাকালে বেশি ফোটে। ফুল ঘণ্টাকৃতির হলেও তার পাপড়ি থাকে দুই স্তরে সাজানো। বাইরের স্তরে পাঁচটি পাপড়ির অগ্রপ্রান্ত বিযুক্ত, ভেতরের স্তরে থাকা পাপড়িগুলো গুচ্ছিত ও কুঁচকানো। পাপড়ির রং উজ্জ্বল হলুদ বা কমলা-হলুদ, সুগন্ধ আছে। পূর্ণ ফোটা ফুলের পাপড়ির বিস্তার প্রায় তিন ইঞ্চি। বাগানের যে অংশের মাটি স্যাঁতসেঁতে বা ভেজা ও কিছুটা ছায়াময় থাকে সেখানে এ গাছ লাগানো যায়। লতাকে কোনো অবলম্বনে বাইয়ে দিলে ঝোপ করতে পারে। বড় পাত্র বা ড্রামে লাগালে প্রতি বছর গাছ ছাঁটতে হয়। না হলে গাছের লতা বা ডালপালা ছড়িয়ে বেয়াড়া ও বেঢপ হয়ে পড়ে। শীতের শেষে বা বসন্তের শুরুতে গাছ ছাঁটা ভালো। কেটে ফেলা শক্ত কাঠের ডাল কাটিং করে চারা তৈরি করা যায়। যেকোনো বাগানে ডাবল অলকানন্দা বৈচিত্র্য আনতে পারে।

ছোট সরালির কথা

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬, ০৯:৩৬ এএম
আপডেট: ০৯ জুলাই ২০২৬, ০৯:৩৯ এএম
ছোট সরালির কথা
ছবি: খবরের কাগজ

গত ৬ জুলাই আমার কর্মস্থল গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আমার বিভাগের অধীন বন্যপ্রাণী প্রজনন ও সংরক্ষণ গবেষণাগারের ময়ূরশালার (ময়ূরের খাঁচা) পাশ দিয়ে হাঁটছিলাম। হঠাৎ একটি কমলা দোয়েলের দেখা পেয়ে ওর পিছু নিলাম। তবে সঙ্গে ক্যামেরা না থাকায় ওর ছবি তুলতে পারলাম না। তাই রুমে ফিরে গিয়ে ক্যামেরা নিয়ে আবারও নিচে নামলাম। কিন্তু অনেক খুঁজেও পাখিটিকে পেলাম না। ওর খোঁজে হাঁটতে হাঁটতে পাশের মাৎস্য বিজ্ঞান অনুষদের মাঠ গবেষণাগারের দিকে গেলাম। কিন্তু ওখানেও খুঁজে পেলাম না। 

মাঠ গবেষণাগারের পেছনে একটি ছোট পুকুর রয়েছে। হঠাৎই মনে হলো গত বছর ওখানে কয়েকটি বুনো হাঁস দেখেছিলাম। এবার ওরা আবার এসেছে কি না, দেখা দরকার। যেই ভাবা সেই কাজ। এক মিনিটের মধ্যে পুকুরের সামনে চলে এলাম। পুকুরের ঠিক মাঝখানে পোঁতা খুঁটি দুটিতে দুটি হাঁস বসে থাকতে দেখলাম। নিজেকে যতটা সম্ভব ওদের কাছ থেকে আড়াল করে কয়েকটি ক্লিক করে চুপচাপ চলে এলাম। এবারও ওদের পুকুরে দেখতে পেয়ে মনটাই ভালো হয়ে গেল। মাৎস্য বিজ্ঞান অনুষদের মাঠ গবেষণাগারের পুকুর থেকে বেরিয়ে কমলা দোয়েলের খোঁজে আবারও ময়ূরশালার কাছে চলে এলাম।
 
গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ছোট পুকুরের খুঁটিতে বসা হাঁস দুটি আর কিছু নয়, এ দেশের পরিচিত বুনো হাঁস ছোট সরালি। প্রতিবছরই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের লেক, বাইক্কা বিলসহ অন্যান্য জায়গায় দেখি। তবে সংখ্যায় অত্যন্ত কম হলেও তিন-চার বছর ধরে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখছি। ছোট সরালি এ দেশের বহুল দৃশ্যমান ও স্বল্প ঝুঁকিসম্পন্ন আবাসিক পাখি। এটি সরাল, শরাল, গেছো হাঁস বা সিঙ্গেল হাঁস নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম Lesser Whistling Duck, Lesser Tree Duck, Indian Whistling Duck বা Javan Whistling Duck। অ্যানাটিডি (Anatidae) গোত্রের এই হাঁসটির বৈজ্ঞানিক নাম Dendrocygna javanica (ডেনড্রোসিগনা জাভানিকা)। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, পাকিস্তান, নেপাল হয়ে চীন ও ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত এদের আবাস এলাকা বিস্তৃত।
 
ছোট সরালির দেহের দৈর্ঘ্য ৩৮-৪২ সেন্টিমিটার, প্রসারিত ডানা ৭০-৭৪ সেন্টিমিটার ও ওজন ৪৫০-৫০০ গ্রাম। একনজরে পালক কালচে-বাদামি ও ধূসরাভ। হাঁসা ও হাঁসি দেখতে একই রকম। প্রাপ্তবয়স্ক পাখির হলদে মাথার চাঁদি গাঢ় ধূসর-বাদামি। ঘাড়ের ওপরটা ধূসর-বাদামি। বাদামি গলাটি বড় সরালির চেয়ে খর্বাকার। পিঠে রয়েছে আঁশের মতো দাগ। ওড়ার পালক কালচে। ডানার অগ্রভাগ, কোমর ও লেজ-ঢাকনি উজ্জ্বল তামাটে। বগল হালকা হলদে। বুক, পেট ও তলপেট তামাটে। চোখের পাতা উজ্জ্বল হলুদ ও চোখ ফ্যাকাশে বাদামি। চঞ্চু কালচে-ধূসর। পা ও পায়ের পাতা হালকা নীলচে। আঙুলের পর্দা ও নখ কালচে। অপ্রাপ্তবয়স্ক হাঁসের পালক অনুজ্জ্বল ও দেহতল ধূসরাভ-হলুদ। 

ওদের বিচরণক্ষেত্র হলো জলাভূমি, হাওর, বিল, পুকুর ও ধানখেত। সচরাচর বড় বড় ঝাঁকে থাকে। নিশাচর হাঁসগুলো রাতে জলমগ্ন জমিতে অল্প ডুব দিয়ে, হেঁটে বা সাঁতার কেটে আহার খোঁজে। জলজ আগাছা, শস্যদানা, মাছ, পোকামাকড় ইত্যাদি খায়। দিনের বেলা গাছে, মাটিতে বা পানিতে বিশ্রাম নেয় ও ঘুমায়। শিস দিয়ে ‘হুই-হুয়ি--হুই-হুয়ি---’ স্বরে ডাকে।

জুন থেকে অক্টোবর প্রজননকাল। এ সময় গাছের গর্ত, নলবন, উলুবন, খেতের আইল বা জলাসংলগ্ন ঘাসবনে বাসা বানায়। ৭ থেকে ১২টি সাদা রঙের ডিম পাড়ে। হাঁসা-হাঁসি উভয়ে মিলেই ডিমে তা দেয়। হাঁসি তা দিতে ব্যস্ত থাকলে হাঁসা বাসা পাহারা দেয়। ডিম ফোটে ২৪-২৫ দিনে। হাঁসা-হাঁসি উভয়েই ছানাদের লালনপালন করে ও পাহারা দেয়। ছানারা ৩৩-৩৫ দিনে উড়তে শিখে। আয়ুষ্কাল ৫-৬ বছর।

রাতের রানিতে সেজেছে পেকুয়ার পাহাড়

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬, ০৩:৩৮ পিএম
রাতের রানিতে সেজেছে পেকুয়ার পাহাড়
ড্রাগন ফুল। ছবি: সংগৃহীত

দিনের আলোয় যাকে দেখে সাধারণ মনে হতে পারে, রাতের আঁধার নামতেই সে রূপ নেয় প্রকৃতির এক অপার্থিব বিস্ময়ে। সূর্য ডোবার পরপরই সবুজ ডালের বুকে ধীরে ধীরে মেলে ধরে ধবধবে সাদা পাপড়ি। রাত যত গভীর হয়, ততই বাড়তে থাকে তার মোহনীয়তা। আবার ভোরের প্রথম আলো ফোটার আগেই নিঃশব্দে ঝরে যায় তার সৌন্দর্যের আয়োজন। ক্ষণস্থায়ী অথচ মুগ্ধতায় ভরা এই ফুলের নাম ড্রাগন ফুল। যাকে অনেকেই ভালোবেসে ডাকেন ‘রাতের রানি’।

কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার শীলখালী, টৈটং ও বারবাকিয়ার পাহাড়ি এলাকায় এখন যেন নেমে এসেছে সাদা ফুলের উৎসব। রাত নামলেই পাহাড়ের ঢালজুড়ে থাকা ড্রাগন বাগানগুলো ভরে উঠছে অসংখ্য সাদা ফুলে। দূর থেকে তাকালে মনে হয়, অন্ধকারের বুক চিরে জ্বলে উঠেছে অসংখ্য আলোকমালা। প্রকৃতির এই ক্ষণিক অথচ অপরূপ সৌন্দর্য দেখতে প্রতিদিন সন্ধ্যার পর স্থানীয়দের পাশাপাশি দূর-দূরান্ত থেকেও ছুটে আসছেন প্রকৃতিপ্রেমী ও দর্শনার্থীরা।

ড্রাগন ফলের উৎপাদনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই ফুল প্রকৃতির এক বিস্ময়কর রহস্যও বটে। পেকুয়া উপজেলা কৃষি বিভাগের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা সৈয়দ আলম জানান, ড্রাগন ফুল সাধারণত সন্ধ্যার পর ফোটা শুরু করে এবং গভীর রাতে পূর্ণ বিকশিত হয়। প্রতিটি ফুল মাত্র একটি রাতের জন্য তার সৌন্দর্য বিলিয়ে দেয়। এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই পরাগায়নের কাজ সম্পন্ন হয়, যা পরবর্তীতে ফলে রূপ নেয়। ফলে ড্রাগন চাষিদের কাছে ফুল ফোটার এই রাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

স্থানীয় চাষিদের ভাষায়, ড্রাগন ফুল কেবল ফলনের পূর্বাভাস নয়, এটি প্রকৃতির দেওয়া এক অনন্য উপহার। ধবধবে সাদা পাপড়িতে মোড়া ফুলগুলো রাতের নিস্তব্ধতায় এমন এক আবহ তৈরি করে, যা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। ক্ষণিকের জন্য ফুটলেও এই ফুলের সৌন্দর্য দীর্ঘদিন ধরে থেকে যায় দর্শনার্থীদের স্মৃতিতে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পেকুয়ার পাহাড়ি এলাকায় ড্রাগন চাষের বিস্তার ঘটেছে। সেই সঙ্গে ড্রাগন ফুলের এই অনন্য সৌন্দর্যও হয়ে উঠেছে নতুন এক আকর্ষণ। রাতের অন্ধকারে সাদা ফুলে সেজে ওঠা পাহাড়ি বাগান যেন নীরবে জানিয়ে দেয় প্রকৃতির সবচেয়ে মোহনীয় সৌন্দর্যগুলো কখনো কখনো খুব অল্প সময়ের জন্যই ধরা দেয়, আর সেই ক্ষণস্থায়ী সৌন্দর্যই মানুষের মনে সবচেয়ে গভীর ছাপ রেখে যায়।

রকিবুল হাসান/রিফাত/

মায়াবী আভার বন পিটুনিয়া

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬, ০৮:২১ এএম
মায়াবী আভার বন পিটুনিয়া
কাচারিঘাটের নার্সারিতে গোলাপি বন পিটুনিয়া। ছবি: লেখক

প্রকৃতির এক অদ্ভুত সুন্দর ও কষ্টসহিষ্ণু ফুল হলো বন পিটুনিয়া। এর বৈজ্ঞানিক নাম Ruellia simplex, এটি Acanthaceae পরিবারের একটি উদ্ভিদ। ইংরেজিতে এই উদ্ভিদ Mexican Petunia, Mexican Bluebell, Brittons Wild Petunia নামে পরিচিত। এর নামের সঙ্গে বিখ্যাত ‘পিটুনিয়া’ ফুলের মিল থাকলেও এটি কিন্তু প্রকৃত পিটুনিয়া নয়। কেবল ফুলের আকৃতিগত মিলের কারণে একে বন পিটুনিয়া বা মেক্সিকান পিটুনিয়া বলা হয়। এর চোখজুড়ানো বেগুনি, নীল বা গোলাপি আভা যেকোনো বাগানকে মুহূর্তেই সতেজ করে তোলে।

নামেই প্রকাশ পায় এর আদি নিবাস মেক্সিকো, ক্যারিবিয়ান অঞ্চল এবং দক্ষিণ আমেরিকা। তবে এর চমৎকার অভিযোজনক্ষমতার কারণে এটি বর্তমানে বাংলাদেশ, ভারতসহ বিশ্বের বহু ক্রান্তীয় ও উপক্রান্তীয় অঞ্চলে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের গৃহকোণ, ছাদবাগান, সরকারি পার্ক এবং রাস্তার ডিভাইডারে এখন প্রায়ই এই ফুলের দেখা মেলে।

বন পিটুনিয়া বহুবর্ষজীবী গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। গাছটি সাধারণত ৩ থেকে ৪ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। এর কাণ্ড খাড়া এবং কিছুটা চৌকো আকৃতির হয়। কাণ্ডের রং গাঢ় সবুজ, তবে অনেক সময় এতে বেগুনি বা কালচে রঙের ছোঁয়া দেখা যায়।

এর পাতাগুলো ল্যান্সের মতো (Lance-shaped) লম্বাটে ও সূক্ষ্ম অগ্রভাগযুক্ত হয়। পাতাগুলো গাঢ় সবুজ রঙের এবং কাণ্ডের বিপরীতমুখী জোড়ায় জোড়ায় বিন্যস্ত থাকে। পাতার শিরাগুলো বেশ স্পষ্ট। 

ডালের ডগায় বা পাতার কোণ থেকে এককভাবে বা থোকায় থোকায় ফুল ফোটে। ফুলগুলো দেখতে অনেকটা ফানেল বা মাইকের মতো। এর পাঁচটি নরম পাপড়ি থাকে। সাধারণত উজ্জ্বল বেগুনি বা নীলচে বেগুনি রঙের ফুল বেশি দেখা গেলেও এর কিছু প্রজাতিতে গোলাপি কিংবা সাদা রঙের ফুলও ফুটতে দেখা যায়। এই ফুলের একটি দারুণ বৈশিষ্ট্য হলো, প্রতিটি ফুল ফোটার পর মাত্র এক দিন বা কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হয়। সাধারণত সকালে ফোটে এবং বিকেলের দিকে ঝরে যায়। তবে গাছটিতে প্রতিদিন এত বিপুল পরিমাণে নতুন ফুল ফোটে যে বাগান কখনোই ফুলশূন্য মনে হয় না। মে থেকে শরৎকাল পর্যন্ত এতে সবচেয়ে বেশি ফুল ফোটে।

বন পিটুনিয়া শুধু বাগানের সৌন্দর্যই বাড়ায় না, এর কিছু বিশেষ পরিবেশগত ও ব্যবহারিক গুরুত্বও রয়েছে। কম যত্নে দারুণ ফলন পাওয়ায় আধুনিক ল্যান্ডস্কেপিং বা বাগান সাজানোর জন্য এটি একটি আদর্শ উদ্ভিদ। বর্ডার প্ল্যান্ট (সীমানা ঘেঁষে লাগানো গাছ) হিসেবে কিংবা দলবদ্ধভাবে লাগালে এটি দারুণ এক বেগুনি চাদরের আবহ তৈরি করে।
 
এই উদ্ভিদটি অত্যন্ত শক্ত প্রকৃতির। তীব্র খরা, প্রচণ্ড গরম কিংবা অতিরিক্ত আর্দ্রতা–সব ধরনের প্রতিকূল পরিবেশেই এটি বেঁচে থাকতে পারে। এমনকি প্রায় সব ধরনের মাটিতেই এটি সহজে মানিয়ে নেয়। যারা বাগানে খুব বেশি সময় দিতে পারেন না, তাদের জন্য এটি দারুণ পছন্দ।

এর উজ্জ্বল রং এবং মিষ্টি মধু মৌমাছি, প্রজাপতি ও হামিং বার্ডের মতো পরাগায়নকারী পাখিদের ভীষণভাবে আকর্ষণ করে। ফলে আশপাশের পরিবেশের বাস্তুতন্ত্র বা ইকোসিস্টেম সচল রাখতে এটি সাহায্য করে।

লোকজ চিকিৎসায় রুয়েলিয়া গণের কিছু উদ্ভিদের মূল ও পাতা গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা, প্রদাহ এবং শ্বাসকষ্ট উপশমে ব্যবহারের ইতিহাস রয়েছে, তবে আধুনিক চিকিৎসায় এর ব্যবহার সীমিত।

বন পিটুনিয়ার একটি নেতিবাচক দিক হলো এর দ্রুত বংশবৃদ্ধি করার ক্ষমতা। এর বীজ ক্যাপসুল ফেটে দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে এবং দ্রুত নতুন চারা গজায়। আমেরিকার ফ্লোরিডায় একে আক্রমণাত্মক আগাছা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাই বাগানে লাগানোর সময় এটি যেন চারপাশের দেশীয় উদ্ভিদকে গ্রাস না করে, সেদিকে খেয়াল রাখা উচিত। টবে বা নির্দিষ্ট সীমানার মধ্যে চাষ করা এর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ।

কিছুটা আক্রমণাত্মক স্বভাব থাকা সত্ত্বেও সঠিক নিয়মনীতি ও ছাঁটাইয়ের মাধ্যমে বন পিটুনিয়াকে ঘরের সৌন্দর্যবর্ধনে চমৎকারভাবে ব্যবহার করা যায়। কম পরিশ্রমে দীর্ঘ সময় ধরে ফুলের মায়া উপভোগ করতে চাইলে বন পিটুনিয়ার জুড়ি মেলা ভার।

লেখক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মুমিনুন্নিসা সরকারি কলেজ, ময়মনসিংহ 

কালো লেডিবার্ড বিটল

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:২৪ এএম
আপডেট: ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:৩২ এএম
কালো লেডিবার্ড বিটল
চট্টগ্রামের চকবাজার এলাকায় সম্প্রতি দেখা কালো লেডি বিটল। ছবি: লেখক

২০১০ সালের বর্ষাকাল, মাঠে মাঠে আমন ধানের চারাগুলো কুশি ছেড়ে সোমত্ত হয়ে উঠছে। খুলনার দৌলতপুর হর্টিকালচার সেন্টারে আমার দিনের পর দিন কাটে সেসব ধানখেতের পোকা দেখতে দেখতে। রোজই এক-দুবার চক্কর দিই। হঠাৎ একটা ছোট্ট কালো রঙের চকচকে বিটল চোখে পড়ল।

হাওয়ায় দোলা সবুজ পাতার ওপর তাকে বেশ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কুচকুচে কালো ডানা, আলো পড়ে ঠিকরে উঠছে, প্রায় গোলাকার সেই পোকাটি ছিল লেডিবার্ড বিটল, কালো রং, তাই তাকে বলা হয় কালো লেডিবার্ড বিটল। লেডিবার্ড বিটলদের রং আসলে লাল, কমলা বা হলুদ হয়। কিন্তু কালো কেন? আগ্রহের বশে সেখানে বসে একটা ছোটখাটো পর্যবেক্ষণের কাজেও নেমে পড়লাম যা আসলে গবেষকদের কাজ। কিন্তু আমার কৌতূহল ছিল, কত রকমের লেডি বিটল আসলে এ দেশে আছে, তা খুঁজে দেখা। যখনই কোনো এক প্রজাতির লেডিবার্ড বিটল দেখতাম তখনই তার ছবি তুলতাম, রাতে রুমে বসে তার স্কেচ করতাম। যখন জানলাম যে, পৃথিবীতে প্রায় ৬ হাজার প্রজাতির লেডিবার্ড বিটল আছে তখন সে কাজের উৎসাহে ভাটা পড়ল। বাংলাদেশে কত প্রজাতির আছে, তা জানতে মনে হয় আমার জীবন পার হয়ে যাবে। সাকল্যে মাত্র ১২ প্রজাতির লেডিবার্ড বিটলের ছবি তুলে ও এঁকে সে যাত্রা ক্ষান্ত দিয়েছিলাম। এ নিয়ে আর কখনো কাজে নামিনি।

গত ২০ জুন চট্টগ্রামের ষোলশহর এলাকায় চকবাজার থেকে কেবি আমান আলী রোড ধরে নুর বেগম জামে মসজিদ পেরিয়ে হজরত ভোলা শাহ (র.)-এর মাজার প্রাঙ্গণের ভেতরে ঢুকে পড়লাম। বনজঙ্গল আর ঝোপঝাড়ের মধ্যে কয়েকটি তিতবেগুন ও ফোস্কাবেগুনের গাছ চোখে পড়ল। সেসব গাছের পাতাতেই আবার এত বছর পর দেখতে পেলাম সেই কালো লেডিবার্ড বিটলকে। অন্য লেডিবার্ড বিটলের তুলনায় এদের খুব কমই দেখা যায়। এসব পোকা উত্তর আমেরিকায় বলে লেডিবাগ, যুক্তরাজ্যে বলে লেডিবার্ড। কীটতত্ত্ববিদদের কাছে এরা লেডিবার্ড বিটল বা লেডি বিটল নামে পরিচিত। যুক্তরাজ্যে এ পোকাকে লেডি বিটল বলার কারণ হলো, সেখানকার সবচেয়ে সাধারণ একটি লেডি বিটলের চেহারার সঙ্গে সে দেশের একটি ছবিতে আঁকা একজন প্রাচীন রমণীর মিল ছিল। ছবিতে ছিল, সেই প্রাচীন রমণী একটা লাল আলখাল্লা পরে রয়েছেন যার ওপর রয়েছে কালো ফোঁটা। কক্সিনেলা সেপ্টেমপাংটাটা প্রজাতির লেডি বিটলও লাল, আর তার ডানায় রয়েছে সাতটি কালো ফোঁটা। অঙ্কিত সে ছবির প্রাচীন রমণীর পোশাকে ছিল ৭টি ফোঁটা, যা ছিল সাত রকমের আনন্দ ও দুঃখের প্রতীক। সে চিত্রকর্মের সঙ্গে এ প্রজাতির পোকাটির এরূপ সাযুজ্যই তাকে লেডি বিটল নামে পরিচিত করে তোলে। এ প্রজাতির লেডি বিটল এ দেশে সচরাচর দেখা যায়। 

কালো লেডি বিটলের সাধারণ ইংরেজি নাম মালয়েশিয়ান লেডিবার্ড বিটল, প্রজাতিগত নাম Chilocorus nigrita  ও গোত্র কক্সিনেলিডি। এ জন্য এ গোত্রের পোকাদের অনেকে কক্সিনেলিডি বিটলও বলে। জনৈক ড্যানিশ কীটতত্ত্ববিদ জোহান ক্রিস্টিয়ান ফেব্রিকাস ১৭৯৮ সালে প্রথম এ পোকার প্রজাতিগত নাম ও বিবরণ দেন। তখন এর প্রজাতিগত নাম ছিল Coccinella nigrita। 

কালো লেডি বিটল গম্বুজের মতো গোলাকার বা ডিম্বাকার দেহের একটি ক্ষুদ্র পোকা। লেডি বিটলদের আকার মাত্র দশমিক ৮ থেকে ১৮ মিলিমিটার। তবে এর আকার বেশ ছোট, দেহের দৈর্ঘ্য মাত্র ৩.২ থেকে ৪ মিলিমিটার। চকচকে কালো শক্ত সামনের ডানাজোড়া পুরো দেহকে ঢেকে রাখে, এর তলেই থাকে পাতলা ঝিল্লির মতো দুটি পিছনের ডানা, ওড়ার সময় তা বের হয়। এরা দিনের বেলায় বিচরণ করে ও ওড়ে। প্রয়োজনে এরা ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটার বেগে উড়তে পারে। খাদ্য বা প্রজননের জন্য কোনো কোনো লেডি বিটলের ১২০ কিলোমিটার পর্যন্ত যাওয়ার রেকর্ড আছে। এমনকি এরা উড়তে উড়তে ১ হাজার ১০০ মিটার উঁচু পর্যন্ত যেতে পারে। এর ডিম মাকু আকৃতির, উজ্জ্বল হলুদ। এককভাবে বা গ্রুপে ২০ থেকে ৫০টি ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়, বাচ্চা অবস্থায় থাকে ১২-১৮ দিন, এরপর পুত্তলি দশায় কাটায় ৫-৯ দিন। প্রাপ্তবয়স্ক পোকা বাঁচে ৪-৮ সপ্তাহ। এরা বছরে ৮-১০ বার বংশবৃদ্ধি করতে পারে।

কালো লেডি বিটল একটি পরভোজী উপকারী পোকা। এরা গাছের বিভিন্ন ক্ষতিকর পোকা যেমন লাল খোস পোকা বা স্কেল ইনসেক্ট, সাদা মাছি, সাইলিড, জাব পোকা ইত্যাদি শিকার করে খায়। বাচ্চা থেকে শুরু করে একটি কালো লেডি বিটল তার সম্পূর্ণ বৃদ্ধি পর্যায়ে গড়ে ৫০০টির মতো ক্ষতিকর পোকা খেতে পারে। তাই গবেষক ও বালাই ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞরা ফসলের এসব বালাই নিয়ন্ত্রণে জৈবিক নিয়ন্ত্রক এজেন্ট বা জীব হিসেবে এর ভালো সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন। ভারত, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানেই এ পোকার উৎপত্তি। তাই এ পোকাটির ব্যবহারিক গুরুত্ব ও বংশবৃদ্ধি নিয়ে আরও বিস্তারিত গবেষণার সুযোগ আছে। বিশেষ করে গ্রিনহাউসে জন্মানো ফসলের কীট দমনে ইতোমধ্যে প্রতি ৫০ বর্গমিটারে মাত্র ৩০টি এই পোকা ছেড়ে সুফল পাওয়া গেছে।