বিশ্বকাপ মানেই বিশ্বের সেরা ৩২ দল, এই ধারণা এখন ইতিহাস। ২০২৬ সালে প্রথমবারের মতো মাঠে গড়িয়েছে ৪৮ দল। সফল এই টুর্নামেন্টের সমাপ্তির আগেই শুরু হয়ে গেছে আরও বড় স্বপ্নের আলোচনা। সেই স্বপ্নের নাম– ৬৪ দলের বিশ্বকাপ।
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফ্যান্তিনো এবার স্পষ্টই জানিয়ে দিলেন, ২০২৬ বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর ৬৪ দলের বিশ্বকাপের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হবে। তার যুক্তি একটাই– বিশ্বকাপ শুধু ইউরোপ আর দক্ষিণ আমেরিকার জন্য নয়, এটি পুরো বিশ্বের জন্য। ইনফ্যান্তিনোর ভাষায়, ‘এসব বিষয় আমরা বিশ্বকাপের পর পর্যালোচনা করব। বিশ্বকাপ আয়োজনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি পুরো বিশ্বের জন্য আয়োজন করা– শুধু ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার জন্য নয়, কার্যত সমগ্র বিশ্বের জন্য। বিশ্বের প্রতিটি দেশেরই বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার স্বপ্ন দেখার সুযোগ থাকা উচিত।’
ফিফা সভাপতির বিশ্বাস, বিশ্ব ফুটবলের মান এখন আর কয়েকটি অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ছোট ছোট দেশও দ্রুত উন্নতি করছে। কিন্তু তাদের সামনে যদি বিশ্বকাপে খেলার দরজাই না খোলা থাকে, তা হলে উন্নতির প্রেরণাও কমে যাবে। তিনি বলেন, ‘আপনি দেখতে পাচ্ছেন, দলগুলোর মান অত্যন্ত উঁচু এবং বিশ্বজুড়ে সেই মান আরও বাড়ছে। আপনি যদি ছোট দেশগুলোকে বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার সুযোগ না দেন, তা হলে উন্নতি করে যাওয়ার প্রেরণাও তাদের থাকবে না।’
ইনফ্যান্তিনোর দাবি, ৪৮ দলের বিশ্বকাপ ইতোমধ্যেই সঠিক সিদ্ধান্ত বলে প্রমাণিত হয়েছে। তিনি উদাহরণ হিসেবে টেনে আনেন আফ্রিকার সাফল্য। এবার নকআউট পর্বে আফ্রিকার ১০ দলের মধ্যে ৯টিই জায়গা করে নিয়েছে। ফিফা সভাপতির বক্তব্য, ‘গত বিশ্বকাপে আফ্রিকা থেকে মাত্র পাঁচটি দল ছিল। এটিই প্রমাণ করে, সব দলকে অন্তর্ভুক্ত করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। তাদের অংশগ্রহণের এই সুযোগ করে দেওয়া কতটা জরুরি।’
বিশ্বকাপের সম্প্রসারণ অবশ্য নতুন কোনো ধারণা নয়। ২০১৭ সালে ফিফা কাউন্সিল ৩২ দলের বিশ্বকাপকে ৪৮ দলে উন্নীত করার অনুমোদন দেয়। সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়েছে ২০২৬ বিশ্বকাপে। এর পর থেকেই আলোচনা চলছিল, ফিফা কি এখানেই থামবে? ২০২৫ সালের এপ্রিলে দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা কনমেবল আনুষ্ঠানিকভাবে ২০৩০ বিশ্বকাপে ৬৪ দল রাখার প্রস্তাব দেয়। যদিও এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
২০৩০ সালের বিশ্বকাপ মূলত আয়োজন করবে স্পেন, পর্তুগাল ও মরক্কো। তবে শতবর্ষ উদ্যাপনের অংশ হিসেবে উদ্বোধনী তিনটি ম্যাচ হবে আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে ও প্যারাগুয়েতে। কারণ ১৯৩০ সালে প্রথম বিশ্বকাপের আয়োজক ছিল উরুগুয়ে।
সবাই অবশ্য একমত নন
ইনফ্যান্তিনো যেখানে বিশ্বকাপকে আরও বড় করতে চান, সেখানে ফুটবলের অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি এই ধারণার বিরোধিতা করছেন। উয়েফা সভাপতি আলেকজান্ডার চেফেরিনের মতে, ‘এটি টুর্নামেন্ট এবং বাছাইপর্ব– উভয়ের জন্যই খারাপ ধারণা।’ এএফসি সভাপতি শেখ সালমান বিন ইব্রাহিম আল খলিফাও মনে করেন, আরও সম্প্রসারণ ফুটবলে ‘বিশৃঙ্খলা’ তৈরি করবে। কনকাকাফ সভাপতি ভিক্টর মন্তাগলিয়ানিও সন্তুষ্ট নন। তার ভাষায়, ‘এই প্রস্তাবটি সঠিক বলে মনে হয় না।’ তার আশঙ্কা, এতে ‘সামগ্রিক ফুটবল ইকোসিস্টেমের’ ক্ষতি হতে পারে।
তবে ভিন্ন সুর শোনা গেছে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে। হোয়াইট হাউসের বিশ্বকাপ টাস্কফোর্সের নির্বাহী পরিচালক অ্যান্ড্রু জুলিয়ানি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ২০৩৮ সালের বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য বিড করার কথা ভাবতে পারে। এমনকি ৬৪ দলের টুর্নামেন্ট হলেও সেটি আয়োজন করার সক্ষমতা তাদের রয়েছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন– আয়োজন করবে কে?
৬৪ দলের বিশ্বকাপ মানেই শুধু আরও বেশি দল নয়। এর অর্থ আরও বেশি ম্যাচ, আরও বেশি স্টেডিয়াম, আরও বেশি শহর, আরও বেশি যাতায়াত এবং বিশাল আয়োজন। ফুটবলবিষয়ক সংবাদদাতা ডেল জনসন মনে করিয়ে দেন, ইনফ্যান্তিনো ২০১৬ সালে প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার সময় বিশ্বকাপকে ৪০ দলে উন্নীত করার কথা বলেছিলেন। কিন্তু এক বছরেরও কম সময়ে সেটি ৪৮ দলে পৌঁছে যায়। এর পর থেকেই ফিফা আরও সম্প্রসারণের পথ খুঁজছে।
২০২২ বিশ্বকাপেই ৪৮ দল রাখার আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু কাতার একা এত বড় আয়োজন করতে পারবে না বলেই সেটি সম্ভব হয়নি। জনসনের মতে, সমস্যার মূল জায়গাটা এখানেই। বিশ্বকাপ যত বড় হবে, সেটি আয়োজন করাও তত কঠিন হয়ে উঠবে। ২০২৬ বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হচ্ছে তিনটি দেশে। ২০৩০ সালে ম্যাচ হবে ছয়টি দেশে। আর ২০৩৪ সালে সৌদি আরবকে যদি ৬৪ দলের, ১২৮ ম্যাচের বিশ্বকাপ আয়োজন করতে হয়, তা হলে সেই বিশাল চ্যালেঞ্জ তারা কীভাবে সামাল দেবে– তার উত্তর এখনো অজানা।
তবু কেন এগোতে চাইছে ফিফা?
কারণ, এর লাভও কম নয়। প্রথমত, আরও বেশি দেশের বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ তৈরি হবে। ৬৪ দলের বিশ্বকাপ হলে ফিফার ২১১ সদস্য দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করবে। দ্বিতীয়ত, বড় টুর্নামেন্ট মানেই আরও বেশি ম্যাচ, আরও বেশি সম্প্রচারস্বত্ব, আরও বেশি স্পনসরশিপ এবং আরও বেশি আয়। সেই অর্থ আবার সদস্য ফুটবল সংস্থাগুলোর মধ্যেও বণ্টন করা যাবে।
তাই ৬৪ দলের বিশ্বকাপ এখনো বাস্তবতা না হলেও, এটি আর নিছক কল্পনা নয়। ইনফ্যান্তিনোর বক্তব্য পরিষ্কার–বিশ্বকাপকে আরও বড় করার আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। এখন দেখার বিষয়, ফুটবলবিশ্ব শেষ পর্যন্ত ‘সবার বিশ্বকাপ’-এর স্বপ্নকে বেছে নেয়, নাকি ঐতিহ্য ও বাস্তবতার যুক্তিকেই প্রাধান্য দেয়।