মৌসুমি রোগের মহামারি । খবরের কাগজ
ঢাকা ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, মঙ্গলবার, ২১ মে ২০২৪

মৌসুমি রোগের মহামারি

প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২৪, ১১:০৫ এএম
মৌসুমি রোগের মহামারি
প্রচণ্ড গরবে হাসপাতালে শিশু রােগীর সংখ্যা বাড়ছে। বুধবার রাজধানীর আইসিডিডিআর,বি থেকে তোলা। খবরের কাগজ

এবার দেশে মশা ও পানিবাহিত রোগ আগের চেয়ে ভয়ানকভাবে বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন জনস্বাস্থ্য ও রোগতত্ত্ববিদরা। এ ছাড়া মৌসুমি ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং ডায়রিয়া ও কলেরার স্থানীয় মহামারির শঙ্কাও করছেন কেউ কেউ। ইতোমধ্যেই জ্বর সর্দি কাশি দেখা দিয়েছে প্রায় ঘরে ঘরে। কলেরা-ডায়রিয়া দেখা দিয়েছে দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষের মধ্যে। একদিকে তাপমাত্রা বৃদ্ধি অন্যদিকে দেশজুড়ে এডিস মশার বিস্তারে এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে বলে এই আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর প্রভাবে দেশজুড়ে ডেঙ্গু, কলেরা, ডায়রিয়া, টাইফয়েড, জন্ডিসের পাশাপাশি নিউমোনিয়ারও বিস্তার ঘটতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে সারা বছরই কলেরার প্রকোপ থাকলেও সরকারি পর্যায় থেকে এটি এক ধরনের গোপন রাখা হয়। কিন্তু এবার কলেরার বড় আকারে বিস্তার ঘটতে পারে। ফলে এসব রোগের বিষয়ে দেরি না করে হাসপাতালগুলো প্রস্তুত রাখা জরুরি। প্রয়োজনমতো চিকিৎসাসামগ্রীও ঢাকাসহ মাঠপর্যায়ে যাতে রাখা যায় সেদিকেও নজর দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন কেউ কেউ। অন্যদিকে পাহাড়ি অঞ্চলে এবার ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাবের আশঙ্কা করা হচ্ছে। 

ইমেরিটাস অধ্যাপক ও প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ খবরের কাগজকে বলেন, ‘মৌসুমি রোগব্যাধি থেকে সুরক্ষায় সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। দূষিত পানি ও খাবার পরিহার করা, ছাতা নিয়ে বের হওয়া, রোদ এড়িয়ে চলা, ঘন ঘন পানি পান করা, লবণযুক্ত পানি পান করা জরুরি। বয়স্ক ও শিশুদের ব্যাপারে বেশি সতর্ক থাকতে হবে।’ 

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার আন্তর্জাতিক পর্যায়ের কয়েকটি টেকনিক্যাল কমিটির সদস্য ও বাংলাদেশের রোগতত্ত্ব রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. মাহামুদুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘বরাবরই গরমের সময় আমাদের দেশে পানিবাহিত ও খাদ্যবাহিত জীবাণুর প্রভাব বেশি। দূষিত পানি ও পচা বাসি খাবার থেকে এই জীবাণুর বিস্তার ঘটে। পথে ঘাটে চলাচলকারী মানুষ গরমে অতিষ্ঠ হয়ে অনেকেই যেখানে সেখানে জীবাণুযুক্ত পানি পান করে। আবার যেসব ঘরে ফ্রিজ নেই তারা পচা বাসি খাবার খেয়েও জীবাণুতে আক্রান্ত হয়। ঢাকার সাপ্লাই পানিতেও জীবাণু পাওয়া যায়।’ 

ওই রোগতত্ত্ববিদ বলেন, দেশে সারা বছরই কম-বেশি কলেরা লেগে থাকে। যা এখন দেশীয় মহামারির পর্যায়ে আছে। এখন আর এটা নিয়ে লুকোছাপা করার কিছু নেই। বরং কলেরা নিয়ন্ত্রণে আরও সতর্কতা ও নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। তা না হলে দ্রুত সময়ের মধ্যেই এটা আরও খারাপ হয়ে যাবে। পাশাপাশি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণেও আরও অনেক বেশি পদক্ষেপ নিতে হবে। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাবে এবার পরিস্থিতি জটিল হওয়ার আশঙ্কাই বেশি। এক দিকে গরমে মানুষের শরীর থেকে বেশি ঘাম বের হয়ে পানিশূন্যতা তৈরি হবে অন্যদিকে মানুষ পর্যাপ্ত নিরাপদ পানির অভাবে দূষিত পানি পান করে ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েড, জন্ডিস, হেপাটাইটিস এ ও সি সহ আরও কিছু রোগের জীবাণু ও ভাইরাসে আক্রান্ত হবে। অন্যদিকে তাপমাত্রার প্রভাবে এডিস মশার বিস্তার যেভাবে আছে তাতে ডেঙ্গু আরও বাড়বে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে তীব্র বায়ু দূষণের প্রভাবে শ্বাসতন্ত্রের সমস্যাও এবার তীব্র হওয়ার ঝুঁকি বেশি।

ওই রোগতত্ত্ববিদ বলেন, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা জোরদার ও জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি সিটি করপোরেশন ও ওয়াসার মতো সংস্থাগুলোকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। 

একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার কর্মকর্তা তুহিন সমদ্দার মায়ের সঙ্গে ঈদ ও বৈশাখীর ছুটি কাটাতে গিয়েছিলেন বরিশালের বাড়িতে। সেখানে রোদের মধ্যে দুদিন ঘোরাঘুরির পর তৃতীয় দিনেই তীব্র জ্বরে আক্রান্ত হন। সঙ্গে শরীর ও মাথাব্যথা। প্রথমে প্যারাসিটামল দিয়ে সামলানোর চেস্টা করেছিলেন। কিন্তু ৩ দিনেও পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। চিকিৎসক দিয়েছেন অ্যান্টিবায়োটিক। সঙ্গে ডেঙ্গু ও টাইফয়েডের টেস্ট করাতেও দিয়েছেন।’ 

তুহিন সমদ্দার গতকাল খবরের কাগজকে বলেন, ‘ঢাকায় আসা জরুরি কিন্তু একদিকে জ্বর কমছে না অন্যদিকে শরীরও প্রচণ্ড দুর্বল। একাধিকবার বমিও হয়েছে। এর মধ্যে বাইরে যে তাপ তাতে ঘর থেকে বের হওয়ার সাহস করি না।’

রাজধানীর কামরাঙ্গিরচরের অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক আজাহার আলী গতকাল সকালে জরুরি কাজে গিয়েছিলেন মিরপুরের শিক্ষা অফিসে। ফেরার পথে হেঁটে সনি সিনেমা হলের কাছে এক আত্মীয়র বাসায় রওনা করেন। মাঝামাঝি পথ যেতেই তিনি ফুটপাতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান। পথচারীরা ধরাধরি করে তাকে প্রথমে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনে নিয়ে যান, সেখান থেকে তাকে পাঠানো হয় শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। চিকিৎসকরা জানান, রোদের তাপে আজাহার আলী হিট সিনকোপে আক্রান্ত হয়েছিলেন। সেই সঙ্গে তিনি আগে থেকেই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত থাকায় তার অবস্থা জটিল হয়ে ওঠে।’ 

সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. মোস্তফা কামাল রউফ খবরের কাগজকে বলেন, ‘গত তিন চার দিন ধরে যে তাপপ্রবাহ চলছে কিংবা সামনে যদি এই গরম আরও বেড়ে যায় তবে হিট ক্রাম্প, হিট সিনকোপ কিংবা হিট স্ট্রোকের সমস্যা বাড়বে। ফলে ঘর থেকে খোলা আকাশের নিচে বের হতে হলে সবাইকে সতর্ক থাকা দরকার। যতটা সম্ভব ছায়া দেখে চলাচল করা, ছাতা ব্যবহার করা, নিরাপদ পানি সঙ্গে রাখা জরুরি। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে অবশ্যই সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।’

গত মঙ্গলবার দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল চুয়াডাঙ্গায় ৪০ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আগের দিন সোমবার দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল পটুয়াখালীর খেপুপাড়ায় ৪০ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গত ৪৩ বছরের মধ্যে খেপুপাড়ায় এটাই ছিল সর্বোচ্চ তাপমাত্রা। অন্যদিকে ঢাকায় মঙ্গলবার তাপমাত্রা ছিল ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে অনুভূত হচ্ছিল আরও বেশি। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুসারে এমন তাপমাত্রা আরও কিছুদিন অব্যাহত থাকতে পারে। আর তাপমাত্রা যত বেশি থাকবে মৌসুমি রোগব্যাধির ব্যাপ্তিও ততই বাড়বে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তেরর কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুসারে, এ বছর ইতোমধ্যেই দেশজুড়ে ডায়রিয়ার প্রাদুর্ভাব চলছে। ডেঙ্গুতেও প্রতি মাসেই আক্রান্ত ও মৃত্যু বাড়ছে। 

কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুসারে, চলতি বছরের প্রথম ৩ মাসেই দেশে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৪ লাখ ৭৩ হাজার ৩০২ জন। এর মধ্যে প্রতি মাসেই আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে (জানুয়ারিতে ১ লাখ ৫২ হাজার ৩২৮ জন, ফেব্রুয়ারিতে ১ লাখ ৫৩ হাজার ৪৩৪ জন ও মার্চে ১ লাখ ৬৭ হাজার ৫৪০ জন)। আর গত ৩ মাসে সর্বোচ্চ ডায়রিয়ার প্রকোপ ছিল খুলনা বিভাগে। সেখানেও প্রতি মাসে পর্যায়ক্রমে ডায়রিয়া রোগী বেড়েছে (জানুয়ারিতে ৪৩ হাজার ২১৪ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৪৩ হাজার ৯৭৩ জন ও মার্চে ৪৬ হাজার ৩৬৭ জন)। 

এদিকে সরকারি তথ্যে কলেরার বিষয়টি না থাকলেও আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র- আইসিডিডিআরবির সর্বশেষ গবেষণা প্রতিবেদন অনুসারে দেশে এখনো বছরে ১ লাখের বেশি মানুষ কলেরায় আক্রান্ত হন। গত বছর ১৯ এপ্রিল আন্তর্জাতিক গবেষণা জার্নাল ন্যাচারে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয় আইসিডিডিআরবির ঢাকা ও ঢাকার বাইরের হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের থেকে সংগ্রহ করা নমুনা পরীক্ষায় তারা উল্লেখযোগ্য হারে ভিব্রিও কলেরা শনাক্ত করেন। ২০২০-২০২১ সালে এই গবেষণা করা হয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বিশ্বে কলেরার উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোতে তুলনামূলক সবচেয়ে বেশি রোগী রয়েছে। যদিও জিটিএফসিসি (দ্য গ্লোবাল টাস্ক ফোর্স অন কলেরা কন্ট্রোল) রোডম্যাপের লক্ষ্য পূরণের জন্য বাংলাদেশ একটি দেশব্যাপী কলেরা-নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনা প্রণয়ন করছে। 

আইসিডিডিআরবির গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, ২০০০ সালে দেশের গ্রামাঞ্চলে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার রোগীদের মধ্যে ৩৯ দশমিক ৪১ শতাংশ ছিল কলেরায় আক্রান্ত। যে হার ২০২১ সালে বেড়ে হয়েছে ৬২ দশমিক ৪৩ শতাংশ। শহরের রোগীদের মধ্যে এই হার ২০০০ সালে ছিল ৪৯ দশমিক ১৫ শতাংশ যা ২০২১ সালে বেড়ে হয় ৭১ দশমিক ০৮ শতাংশ। 

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যালেরিয়া কার্যক্রম শাখার তথ্য অনুসারে, দেশের পাবর্ত্য অঞ্চলের এবারও ম্যালেরিয়ার প্রকোপ দেখা যাচ্ছে। গত বছর মোট ম্যালেরিয়া আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা ছিল ১৬ হাজার ৫৬৭ জন এবং মারা গেছেন ৬ জন। এ বছরে জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ৩ মাসে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ১৫৮ জন এবং মারা গেছেন ২ জন। 

ম্যালেরিয়া কর্মসূচির ব্যবস্থাপক ডা. শ্যামল সাহা খবরের কাগজকে বলেন, ‘দেশে যত ম্যালেরিয়া রোগী তার ৬৫ শতাংশই তিন পার্বত্য জেলার। এর মধ্যে আবার সবচেয়ে বেশি থাকে বান্দরবানে।’ 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, এ বছর ১ জানুয়ারি থেকে গতকাল পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৯১৬ জন ও মারা গেছেন ২৩ জন। গত বছর দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ১৬ হাজারের বেশি আক্রান্ত হয় ডেঙ্গুতে এবং মৃত্যু ঘটেছে ১ হাজার ৬৭৮ জনের। 

অপরদিকে চলতি মৌসুমের রোগব্যাধি নিয়ে গতকাল বুধবার রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) এবং আইসিডিডিআরবির গবেষকরা যৌথভাবে ইনফ্লুয়েঞ্জা সার্ভেইল্যান্স ইন বাংলাদেশ শীর্ষক এক সেমিনারের আয়োজন করে। এতে জানানো হয়, দেশের ১৯টি হাসপাতালে সার্ভেইল্যান্সের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায় এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশে ইনফ্লুয়েঞ্জা সংক্রমণের প্রকোপ বাড়ে তাই এই সময়টাকে গবেষকরা ফ্লু এর মৌসুম হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস থেকে সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশে প্রতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের টিকা বা ফ্লু-শট নেওয়ার সুপারিশ করেন গবেষকরা। এ ছাড়াও ইনফ্লুয়েঞ্জা টিকা গ্রহণের জন্য স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত রোগীদের অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত বলে তারা মনে করেন।

আইইডিসিআর এবং ন্যাশনাল ইনফ্লুয়েঞ্জা সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরিন বাংলাদেশে ইনফ্লুয়েঞ্জা সার্ভেইল্যান্স থেকে প্রাপ্ত ফলাফল তুলে ধরেন। স্বল্প সময়ের জ্বর এবং কাশির অভিযোগ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা ১ লাখ পনের হাজারের বেশি রোগীর মধ্যে প্রায় ১১ শতাংশের মাঝে ইনফ্লুয়েঞ্জার উপস্থিতি পাওয়া যায়। এ ছাড়াও, হাসপাতালে ভর্তি ইনফ্লুয়েঞ্জা পজিটিভ রোগীদের মধ্যে প্রায় প্রতি একশ জনে ১ জন মারা যান। তবে, ৬০ বছরের বেশি বয়স্ক ব্যক্তি এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে এই মৃত্যুর হার স্বাভাবিকের চেয়ে তিন গুণ বেশি দেখা যায়।

অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরিন বলেন, তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, বাংলাদেশে সারা বছরই ফ্লু শনাক্ত হয়ে থাকে তবে প্রতি বছরের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর মাসে ফ্লু শনাক্তের হার বৃদ্ধি পায় এবং জুন থেকে জুলাই মাসে এর প্রকোপ সর্বোচ্চ হয়। এই কারণে এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত বাংলাদেশে ইনফ্লুয়েঞ্জা মৌসুম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তিনি মৌসুম শুরুর আগেই ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে ইনফ্লুয়েঞ্জা টিকা নিয়ে সুরক্ষিত রাখার প্রতি এবং ইনফ্লুয়েঞ্জার মৌসুমে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বন করার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন।

সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা ইনফ্লুয়েঞ্জার একটা মহামারির সম্ভাবনা এবং অ্যান্টিবায়োটিকের অযৌক্তিক ব্যবহার প্রতিরোধের ওপর জোর দেন। 

তিনি বলেন, ‘চলমান এই ফ্লু এর মৌসুমে যদি জ্বর, সর্দি, কাশির মতো লক্ষণ দেখা দেয় তাহলে অ্যান্টিবায়োটিক নেওয়ার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে যেন ওষুধের প্রতি রেজিস্ট্যান্স তৈরি না হতে পারে। এ ছাড়াও হাত ধোয়া, মাস্ক পরা এবং কাশি দেওয়ার শিষ্টাচারগুলো সারা বছর মেনে চললে আমরা শুধু ইনফ্লুয়েঞ্জা বা শ্বাসতন্ত্রের অসুখ নয়, অন্যান্য সংক্রামক রোগও প্রতিরোধ করতে পারব।’

আইসিডিডিআরবির নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ বলেন ২০০৮ থেকে ২০১০ সালে আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানী ড. কে জামান গবেষণা করে দেখেছিলেন যে গর্ভাবস্থায় মাকে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভ্যাকসিন দিলে মায়ের পাশাপাশি নবজাতকেরও ৬৩% রোগের ঝুঁকি কমে যায়। এই গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গর্ভাবস্থায় মায়েদের ফ্লু ভ্যাকসিন দেওয়ার পরামর্শ দেয়।

আইসিডিডিআরবির অ্যাসোসিয়েট সায়েন্টিস্ট ডা. ফাহমিদা চৌধুরী জানান, বিশ্বে প্রতি বছর ২ লাখ ৯০ হাজার থেকে ৬ লাখ ৫০ হাজার মানুষ ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইন ডিরেক্টর (হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা) অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘হাসপাতালগুলোকে ইতোমধ্যেই সতর্ক করা হয়েছে। প্রয়োজনমতো প্রস্তুতি রাখতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া অধিদপ্তর থেকেও তদারকির ব্যবস্থা করা হয়েছে।’ 

রাজস্ব ঘাটতির কারণ জানতে চেয়েছে আইএমএফ

প্রকাশ: ২১ মে ২০২৪, ১২:৪১ পিএম
রাজস্ব ঘাটতির কারণ জানতে চেয়েছে আইএমএফ
ছবি: সংগৃহীত

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে রাজস্ব ঘাটতির কারণ জানতে চেয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। ঘাটতি এড়ানো সম্ভব হলো না কেন সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলের কাছেও তার ব্যাখা দিতে হবে এনবিআরকে। 

এনবিআর রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারবে, এমন অঙ্গীকার করেই আইএমএফের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছে বাংলাদেশ। অথচ এ শর্ত পূরণে ব্যর্থ হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। 

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এনবিআরের সক্ষমতা না বাড়িয়ে লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানোয় প্রতি অর্থবছরেই রাজস্ব ঘাটতি এড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। রাজস্ব ঘাটতি থাকায় দেশে অর্থনীতির ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। 

এনবিআর সাবেক চেয়ারম্যান ড. আবদুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেন, এখানে সরকারের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে যারা আছেন তারা বাজেটের আকার বড় করে কাগজেকলমে হিসাব মিলাতে এনবিআরের অঙ্কের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা চাপিয়ে দেন। ঋণ পরিশোধের জন্যও এনবিআরের ওপর আদায় বাড়ানোর চাপ দেওয়া হয়। কিন্তু এখানে শুধু লক্ষ্যমাত্রা বাড়ালেই হবে না। এনবিআরকে আদায়ের সক্ষমতা বাড়াতে মনোযোগী হতে হবে। এতে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলেও ঘাটতি কমবে। অর্থনীতিতে ভারসাম্য আসবে। 

এনবিআরের পরিসংখ্যান বিভাগ থেকে সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে বলা যায়, চলতি অর্থবছরের শুরুতে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের মোট লক্ষ্যমাত্রা ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় করতে না পারায় এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ৪ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। 

এ ক্ষেত্রে রাজস্ব আদায়ের বিভিন্ন খাতের লক্ষ্যমাত্রা সংশোধন করে কমিয়ে আমদানি শুল্ক ৪৩ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা, আমদানি পর্যায়ের ভ্যাট ৫২ হাজার ৩৮৮ কোটি টাকা, আমদানি পর্যায়ে সম্পূরক শুল্ক ১৪ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা, রপ্তানি শুল্ক ৬৩ কোটি টাকা, আবগারি শুল্ক ৪ হাজার ৯৫৮ কোটি টাকা, স্থানীয় পর্যায়ের ভ্যাট ১ লাখ ৫ হাজার ৬৮০ কোটি টাকা, স্থানীয় পর্যায়ের সম্পূরক শুল্ক ৪১ হাজার ৬১ কোটি টাকা, টার্নওভার কর ৪৫ লাখ টাকা করা হয়। একইভাবে আয়কর কমিয়ে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৮৬৫ কোটি টাকা এবং ভ্রমণ কর কমিয়ে ১ হাজার ৭৩৫ কোটি টাকা করা হয়। 

তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের গত ১০ মাসে যে সংশোধিত লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে, তার চেয়ে ২৬ হাজার ২৬৩ কোটি টাকা কম আদায় করতে পেরেছে এনবিআর। মূল লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে এই আদায় ৪৬ হাজার ২৬৩ কোটি টাকা কম। গত জুলাই-এপ্রিল পর্যন্ত সব মিলিয়ে দুই লাখ ৮৭ হাজার ৩২১ কোটি টাকার শুল্ক কর আদায় হয়েছে। এই সময় সংস্থাটির রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল ৩ লাখ ১৩ হাজার ৫৮৪ কোটি টাকা।

আমদানি কর, ভ্যাট ও আয়কর- এই তিন খাতের মধ্যে কোনোটিই গত ১০ মাসে লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি। এর মধ্যে আমদানি পর্যায়ে ৮২ হাজার ৬৪৮ কোটি টাকা, ভ্যাটে ১ লাখ ১১ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা ও আয়করে ৯৩ হাজার ১৪৩ কোটি টাকা আদায় করতে পেরেছে এনবিআর। 

চলতি অর্থবছর শেষ হতে চলতি মে এবং জুন মাস বাকি আছে। এনবিআর থেকে পাওয়া তথ্য খতিয়ে দেখে এবং এনবিআরের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চলতি অর্থবছরের শেষ মাস জুনে এনবিআরের পরিকল্পনামতো বা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি আদায় হলেও রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি এড়ানো যাবে না। বাকি দুই মাস মে ও জুনে এনবিআরকে ৪ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা আদায় করতে হলে এনবিআরকে আরও ১ লাখ ২২ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকা আদায় করতে হবে। যা অসম্ভব বলে মনে করেছেন বিশেষজ্ঞরা।     

ঘাটতির কারণ ব্যাখ্যা করে আইএমএফের কাছে পাঠানো এনবিআরের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, অর্থবছরের শেষ মাসে আদায় বাড়ার সম্ভাবনা আছে। বিশেষভাবে উৎসে কর খাতে বড় ধরনের আদায় হবে। রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে এমন সব প্রতিষ্ঠানে এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা শাখা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি), ভ্যাট গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর এবং শুল্ক নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর থেকে  অভিযান চালানো হচ্ছে। আর এতেও বড় অঙ্কের অর্থ আদায় হচ্ছে। সব কিছু মিলিয়ে রাজস্ব ঘাটতি কমবে বলে আশা করা যায়।
এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, এনবিআরের সঙ্গে আইএমএফের বৈঠকে চলতি অর্থবছরের জন্য আইএমএফ থেকে ৪ লাখ কোটি টাকার কম রাজস্ব আদায় করা যাবে না বলে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। 

রাজস্ব ঘাটতির কারণ হিসেবে ডলারসংকটকে দায়ী করে এনবিআরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে অর্থনৈতিক অস্থিরতা শুরু হয়। বিশ্বব্যাপী ডলারসংকট চলছে। ডলারসংকটের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে অন্য অনেক দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও নেতিবাচক ধারা রয়েছে। ব্যক্তি পর্যায়ে আয় বাড়েনি। বরং অনেকের আয় কমেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য ভালো যাচ্ছে না। বেশির ভাগ শিল্প মুনাফা করতে পারছে না। নিয়মিত রাজস্ব পরিশোধ করেছে এমন অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান ডলারসংকটের কারণে সঠিক হিসাবে এনবিআরের পাওনা পরিশোধ করতে পারছে না। এতে এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আদায় হচ্ছে না। ফলে রাজস্ব ঘাটতি হচ্ছে। তবে এমন প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও এনবিআরের অনেক খাতে প্রবৃদ্ধি আছে। 

সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম খবরের কাগজকে বলেন, ‘রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে দেশে রাজস্ব আদায়ে কিছুটা নেতিবাচক ধারা রয়েছে। তবে এনবিআর হতাশ না। যেকোনো পরিস্থিতির মধ্যেই রাজস্ব আদায় বাড়াতে কাজ করে যাচ্ছে। আশা করি ভালো ফল আসবে।    

এনবিআরের পাওনা ৩৫ হাজার কোটি টাকা পরিশোধের তাগিদ

প্রকাশ: ২১ মে ২০২৪, ১২:০৪ পিএম
এনবিআরের পাওনা ৩৫ হাজার কোটি টাকা পরিশোধের তাগিদ

অবশেষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশে বছরের পর বছর পেট্রোবাংলা ও বিপিসির কাছে আটকে থাকা ৩৫ হাজার কোটি টাকার বেশি বকেয়া রাজস্ব আদায়ে তিন চেয়ারম্যানকে নিয়ে বৈঠকে বসলেন অর্থ সচিব এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব। বৈঠকে ৩০ জুনের মধ্যে বকেয়া পরিশোধ করার বিষয়ে আলোচনা হয়। এনবিআর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, গতকাল সোমবার আগারগাঁওয়ে এনবিআরের প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের এ বৈঠকে এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম পেট্রোবাংলা ও বিপিসির কাছে বকেয়া রাজস্ব কত সময় থেকে পাওনা রয়েছে জানিয়ে তা চলতি অর্থবছরে পরিশোধের অনুরোধ জানান। কতবার এই দুই প্রতিষ্ঠানের কাছে বকেয়া পরিশোধে তাগাদা দেওয়া হয়েছে, তাও তিনি উল্লেখ করেন। বৈঠকে উপস্থিত এনবিআরের শুল্ক বিভাগের এক কর্মকর্তা দুই প্রতিষ্ঠানের কাছে কোন কোন খাতে রাজস্ব বকেয়া রয়েছে, তা তুলে ধরেন। তবে এনবিআরের দাবি করা রাজস্বের পরিমাণের সঙ্গে দ্বিমত করেন পেট্রোবাংলা ও বিপিসির চেয়ারম্যান। তারা এসব বকেয়ায় কিছু ছাড় পাবেন বলেন জানান। ফলে বকেয়ার পরিমাণ কমবে বলেও দাবি করেন। এ ক্ষেত্রে এনবিআরের সঙ্গে আবারও হিসাব করা প্রয়োজন বলেও জানান তারা। 

বৈঠকে আগামী অর্থবছরে জ্বালানি খাতের ভর্তুকির পরিমাণ নিয়েও আলোচনা হয়। এ ছাড়া আসছে বাজেটে জ্বালানি খাতের  শুল্ক কর ও ভ‍্যাট নির্ধারণের বিষয়েও আলোচনা করা হয়।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মো. নূরুল আলম খবরের কাগজকে বলেন, এ বৈঠকে বকেয়া রাজস্ব পাওনার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বকেয়া অবশ্যই পরিশোধ করা হবে। তবে যাদের কাছে পাওনা, তাদের কিছু বক্তব্য আছে। তা শোনা হয়েছে। বিষয়টি সমাধান করে চলতি অর্থবছরেই বকেয়া আদায়ের চেষ্টা করা হচ্ছে। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এনবিআরের এমন এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলেন, এনবিআর থেকে যে পরিমাণ রাজস্ব দাবি করা হয়েছে তা বিপিসি ও পেট্রোবাংলার হিসাবের চাইতে কিছু বেশি। অর্থবছরের শেষ সময়ে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি আছে। এনবিআর সরকারি এই দুই প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বকেয়া আদায়ে মরিয়া হয়ে উঠেছে। এখন দেখা যাক কতটা আদায় হয়। বছরের পর বছর এ বকেয়া আদায় করা সম্ভব হচ্ছে না। প্রতিষ্ঠান দুটি বিভিন্ন অজুহাতে বকেয়া পরিশোধ করছে না।

বৈঠকে উত্থাপিত এনবিআরের প্রতিবেদনে বলা হয়,‌ ‘পেট্রোবাংলা হাইকোর্টে রিট করলে আদালত এনবিআরের পক্ষে রায় দেন। পরে ২০২০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি সভায় বুক অ্যাডজাস্টমেন্টের মাধ্যমে এই রাজস্ব পরিশোধের সিদ্ধান্ত হলেও এখনো পরিশোধ করা হয়নি। ২০০৯ সালের জুলাই থেকে ২০১৮ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত গ্রাহকের কাছ থেকে ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক হিসেবে ১৫ হাজার ৬৯৮ কোটি ৮৬ লাখ টাকা আদায় করেও রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়া হয়নি। ২০১৫ সালের মার্চ থেকে ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত বিধিবহির্ভূতভাবে সমন্বয় করা ১ হাজার ৭৫ কোটি ৩৫ লাখ টাকা কর বাতিল করা হয়েছে। ২০১৭ সালের ১৪ মার্চ অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় এই দুটি খাতে পাওনা হিসেবে ১৬ হাজার ৭৭৪ কোটি ২৩ লাখ বুক অ্যাডজাস্টমেন্টের মাধ্যমে পরিশোধের সিদ্ধান্ত হলেও এখনো পরিশোধ করা হয়নি।’

বৈঠকের সারসংক্ষেপে উল্লেখ করা হয়েছে, ‍‘রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) পেট্রোলিয়ামজাতীয় পণ্য খাত থেকে রাজস্ব আদায় করে এনবিআরের কাছে জমা দিয়ে থাকে। এর পরিমাণ মোট রাজস্ব আদায়ের প্রায় ১০ শতাংশ। এ দুটি প্রতিষ্ঠানের কাছে আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস বিভাগে বকেয়া রাজস্বের পরিমাণ ৩৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক হিসেবে সবচেয়ে বেশি প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। বকেয়ার বাকিটা আয়কর ও শুল্ক। এসআরও শর্ত প্রতিপালন, অতিরিক্ত রেয়াত গ্রহণ, গ্যাসের বর্ধিত মূল্যের ওপর ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক পরিশোধ না করা, গ্রাহক থেকে ভ্যাট আদায় করে পরিশোধ না করা, ভর্তুকি মূল্যের ওপর ভ্যাট পরিশোধ না করা, আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে জেট ফুয়েল সরবরাহকে রপ্তানি হিসেবে গণ্য না করা, আয়কর অধ্যাদেশের ৮২সি ধারা বিতর্কসহ মামলা জটিলতায় এই বিপুল পরিমাণ রাজস্ব দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া। 

২০২০ সালের নভেম্বর পর্যন্ত পেট্রোবাংলার কাছে মোট পাওনা ২১ হাজার ৮০১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১ হাজার ৭ কোটি আট ৮ টাকা। রেয়াত গ্রহণের শর্ত পালন না করায় পেট্রোবাংলার কাছে পাওনা হয়। ২০২০ সালের মার্চ থেকে নভেম্বর পর্যন্ত আমদানি করা এলএনজি ভর্তুকি মূল্যে সরবরাহ এবং সুনির্দিষ্ট কর আরোপিত পণ্যে রেয়াত গ্রহণের সুযোগ না থাকায় ২ হাজার ১৯৪ কোটি ১২ লাখ টাকা ভ্যাট পাওনা রয়েছে। ২০১৭ সালের মার্চ থেকে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গ্যাসের বর্ধিত মূল্যের ওপর অপরিশোধিত ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক হিসেবে পাওনা হয় ১ হাজার ৮২৫ কোটি ৯২ লাখ টাকা। 

উপজেলায় স্বজনরা প্রার্থী দ্বিতীয় ধাপেও থামানো গেল না মন্ত্রী-এমপিদের

প্রকাশ: ২০ মে ২০২৪, ১২:৪২ পিএম
দ্বিতীয় ধাপেও থামানো গেল না মন্ত্রী-এমপিদের
খবরের কাগজ গ্রাফিকস

দ্বিতীয় ধাপের উপজেলা নির্বাচনেও থামানো গেল না মন্ত্রী-এমপিদের। আওয়ামী লীগের নির্দেশ অমান্য করে তাদের (মন্ত্রী-এমপির) পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এ নিয়ে দলটির হাইকমান্ড উদ্বিগ্ন। এদিকে মন্ত্রী-এমপিদের স্বজনরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় উপজেলা পরিষদ নির্বাচন প্রভাবমুক্ত ও সুষ্ঠু হওয়া নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবি। 

মঙ্গলবার (২১ মে) দ্বিতীয় এবং ২৯ মে তৃতীয় ধাপের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। টিআইবি জানিয়েছে, দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনে মন্ত্রী-এমপির পরিবারের ১৭ সদস্য ও স্বজনরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। খবরের কাগজে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রথম ধাপে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে এই সংখ্যা ছিল ১৭ জন। এর মধ্যে ১২ জন নির্বাচিত এবং ৫ জন পরাজিত হয়েছেন। তৃতীয় ধাপের নির্বাচনেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মন্ত্রী-এমপির পরিবারের বিপুলসংখ্যক সদস্য ও স্বজন। গত ১২ মে এই নির্বাচনে (তৃতীয় ধাপ) প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সময় অতিবাহিত হয়েছে। এ অবস্থায় সরকারি দলের একাধিক নীতি-নির্ধারক খবরের কাগজকে বলেছেন, মন্ত্রী-এমপিদের এই ভূমিকার কারণে নির্বাচনকে প্রভাবমুক্ত রাখার আওয়ামী লীগের সিদ্ধান্ত হোঁচট খাচ্ছে। 

টিআইবি রবিবার (১৯ মে) এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছে, দ্বিতীয় ধাপে অনুষ্ঠেয় উপজেলা নির্বাচনে লড়ছেন মন্ত্রী-এমপিদের ভাই, চাচাতো ভাই, পিতা, ভগ্নিপতি, শ্যালক, চাচাশ্বশুর ও খালু। বিভিন্ন উদ্যোগ ও হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মন্ত্রী-এমপির এই স্বজনদের থামাতে পারেনি ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। 

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘যারা দলের নির্দেশ অমান্য করে নির্বাচন করছেন, সময় হলেই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য যেকোনো শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে তাদের। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে কেউ পার পাবে না। এ বিষয়ে আগামীতে দলীয় ফোরামে আলোচনা হবে বলেও জানান তিনি।’ 

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের আগামী বৈঠকে দলের নির্দেশ অমান্যকারীদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে। তিনি জানান, নির্দেশ অমান্য করে যারা প্রার্থী হয়েছেন, তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করানোর চেষ্টা চলছে। প্রত্যাহার না করলে কী করবেন? জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেক্ষেত্রে ঘোষণা দিয়ে প্রার্থী যাতে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান, সে চেষ্টা করা হবে।’ 

সংবাদ সম্মেলনে টিআইবি মন্ত্রী-এমপি এবং তাদের স্বজনদের নাম প্রকাশ করেছে। তারা হলেন- নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলায় শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ হুমায়ুনের ছোট ভাই নজরুল মজিদ মাহবুব, লালমনিরহাটের কালিগঞ্জ উপজেলায় সাবেক মন্ত্রী ও এ আসনের এমপি নুরুজ্জামান আহমেদের ছোট ভাই মাহবুবুজ্জামান আহমেদ এবং ছেলে রাকিবুজ্জামান, কুমিল্লা সদরে সাবেক অর্থমন্ত্রী ও এ আসনের এমপি আ হ ম মুস্তফা কামাল লোটাসের ছোট ভাই গোলাম সারওয়ার, জামালপুরের বকশীগঞ্জে এমপি নূর মোহাম্মদের ভাই নজরুল ইসলাম, রাজবাড়ির বালিয়াকান্দি উপজেলায় রেলমন্ত্রী জিল্লুল হাকিমের চাচাতো ভাই এহসানুল হাকিম সাধন, কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে এমপি রেজাউল হক চৌধুরীর ভাই বুলবুল আহমেদ টোকন, নড়াইলের লোহাগড়ায় এমপি মাশরাফি বিন মুর্তজার চাচাশ্বশুর ফয়জুল হক রোম, চুয়াডাঙ্গা সদরে এমপি সোলায়মান হক জোয়ার্দারের ভাতিজা নঈম হাসান জোয়ার্দার, শরীয়তপুর সদরে এমপি ইকবাল হোসেন অপুর চাচাতো ভাই বিল্লাল হোসেন দিপু মিয়া, বগুড়ার আদমদীঘিতে এমপি খান মুহাম্মদ সাঈফুল্লাহ আল মেহেদীর পিতা সিরাজুল ইসলাম খান, নোয়াখালীর সেনবাগে এমপি মোর্শেদ আলমের পুত্র সাইফুল ইসলাম দীপু, ভোলার বোরহানউদ্দিনে এমপি আলী আজম মুকুলের ভগ্নিপতি মো. জাফর উল্লাহ, গাজীপুরের শ্রীপুরে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী রুমানা আলীর বড় ভাই জামিল হাসান দুর্জয়, হবিগঞ্জের বাহুবলে এমপি আবু জাহিরের শ্যালক আক্তারুজ্জামান, পাবনার ভাঙ্গুড়ায় এমপি মকবুল হোসেনের ছেলে গোলাম হাসনায়েন এবং লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে এমপি নূর উদ্দিন চৌধুরী নয়নের ভগ্নিপতি মামুনুর রশিদ। তারা প্রত্যেকেই উপজেলা পরিষদের নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। 

পাবনার ভাঙ্গুড়ায় ছেলে হাসনাইন রাসেলের প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য মকবুল হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘সারা দেশের চিত্র আপনারা জানেন। এর আগে আমার ছেলে দুইবার পৌর মেয়র ছিল। সে পৌরসভাকে গুছিয়ে দিয়েছে। তাই স্থানীয় জনগণ জোর করে তাকে (ছেলেকে) প্রার্থী বানিয়েছে। তবে আমি বলেছি, ছেলের জন্য ভোট চাইতে পারব না। এমপি মকবুল হোসেন দাবি করেন, তার পরিবার ৮০ বছর ধরে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। এরই ধারাবাহিকতায় ছেলে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।’ 

অবশ্য এর আগে এক সংবাদ সম্মেলনে উপজেলা পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান বাকী বিল্লাহ অভিযোগ করে বলেন, এমপি মকবুল হোসেন এবং তার ছেলে রাসেলের নির্দেশে দলের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের নির্যাতন করা হচ্ছে। থানায় অভিযোগ করেও লাভ হয়নি। তাই নেতা-কর্মীরা হতাশ হয়ে পড়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে তার পক্ষে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা সম্ভব হচ্ছে না। 

এদিকে তৃতীয় ধাপে (২৯ মে) নোয়াখালী সদর, কোম্পানীগঞ্জ ও বেগমগঞ্জে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কোম্পানীগঞ্জে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ছোট ভাই শাহাদাত হোসেন লড়ছেন। এখানে ওবায়দুল কাদেরের আরেক ছোট ভাই বসুরহাট পৌরসভার মেয়র আবদুল কাদের মির্জা সাবেক ছাত্রনেতা গোলাম শরীফ চৌধুরী পিপুলকে প্রার্থী দিয়ে মাঠে আছেন।

নরসংদী-৩ আসনের সংসদ সদস্য সিরাজুল ইসলাম মোল্লার স্ত্রী ফেরদৌসী ইসলাম শিবপুর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন আরেক এমপি ক্যাপ্টেন (অব.) এ বি তাজুল ইসলামের ভাতিজা আমিনুল ইসলাম তুষার। কক্সবাজারের রামু উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে লড়ছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমলের বড় ভাই সোহেল সরওয়ার কাজল। উখিয়া উপজেলায় মাঠে আছেন স্থানীয় এমপি শাহীন আক্তারের ভাই জাহাঙ্গীর কবির চৌধুরী।’

জাতীয় সংসদের হুইপ ও কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমল খবরের কাগজকে বলেন, ‘নির্বাচনে বড় ভাইয়ের প্রার্থী হওয়া নিয়ে আমার কোনো ভূমিকা নেই। আমি দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে চাই না। দল ও নেত্রী যে সিদ্ধান্ত দিয়েছে, তা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আওয়ামী লীগের সিদ্ধান্ত না মেনে সে (সোহেল সরওয়ার কাজল) নির্বাচন করলে দল তাকে বহিষ্কার করতে পারে।’ 

নরসিংদীর শিবপুরে চেয়ারম্যান পদে স্ত্রী ফেরদৌসী ইসলামের প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য সিরাজুল ইসলাম মোল্লা খবরের কাগজকে বলেন, ‍‘জনগণের আগ্রহের কারণে তার স্ত্রী উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন। তিনি বলেন, এটা ঠিক চেয়ারম্যান প্রার্থী তার স্ত্রী, তবে জনগণ ভোট দিলে জনপ্রতিনিধি হতে তো আর বাধা নেই।’ 

ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধে হাইকোর্টের নির্দেশনা বাস্তবায়ন হয়নি ১০ বছরেও

প্রকাশ: ২০ মে ২০২৪, ১২:৩৫ পিএম
ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধে হাইকোর্টের নির্দেশনা বাস্তবায়ন হয়নি ১০ বছরেও
হাইকোর্ট

ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধ করার জন্য ২০১৪ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত সাত বছরে মোট তিন দফা নির্দেশনা দিয়েছেন হাইকোর্ট। বিগত ১০ বছরেও এসব নির্দেশনা বাস্তবায়নে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যায়নি। মাঝেমধ্যে কিছু পুলিশি তৎপরতা দেখা গেলেও তদারকির অভাবে ক্রমান্বয়ে সড়ক-মহাসড়ক চলে গেছে তাদের দখলে। 

ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে এ ধরনের সব রিকশা বন্ধ করতে ২০১৪ সালে প্রথমবার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। ২০১৭ সালে এসব পরিবহন বন্ধে আরেক দফা নির্দেশনা দেওয়া হয় হাইকোর্ট থেকে। এরপর ২০২১ সালের ১৫ ডিসেম্বর ব্যাটারিচালিত রিকশাসহ থ্রি-হুইলার ও ইজিবাইক বন্ধ করতে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। আদেশে অটোরিকশার আমদানিও নিষিদ্ধ করা হয়। এ আদেশের সংশোধন চেয়ে বাংলাদেশ ইলেকট্রিক থ্রি-হুইলার ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যান্ড মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন আপিল বিভাগে আবেদন করে। আবেদনের শুনানি শেষে মহাসড়কে সব ধরনের থ্রি-হুইলার ও ইজিবাইক চলাচল নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর নেতৃত্বে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ। 

আদেশে ব্যাটারিচালিত রিকশা সর্বত্র বন্ধের আদেশ বহাল রাখেন সর্বোচ্চ আদালত। আদেশের ফলে ইজিবাইক ও থ্রি-হুইলার গ্রামাঞ্চলের সাধারণ রাস্তায় চলাচলের সুযোগ পায়। সর্বোচ্চ আদালতের আদেশ অনুযায়ী ২০১৫ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে সারা দেশে সব মহাসড়কে তিন চাকার ব্যাটারিচালিত রিকশা, থ্রি-হুইলার, ইজিবাইক, নছিমন, করিমন, ভটভটি চলাচল নিষিদ্ধ ঘোষণা করে কয়েক দফা বিজ্ঞপ্তি জারি করে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। 

বিজ্ঞপ্তি জারি করা হলেও প্রয়োজনীয় তদারকির অভাবে সড়কে আজও কোনো শৃঙ্খলা ফেরেনি বলে অভিমত ব্যক্ত করেন আইনজীবীরা। এ ব্যাপারে রিটের শুনানিতে অংশগ্রহণকারী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অমিত দাশগুপ্ত খবরের কাগজকে বলেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনা কমানো, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো, বিদ্যুতের অপচয় রোধসহ বিভিন্ন কারণে ওই রিট দায়ের করা হয়েছিল। আদালতের নির্দেশনা প্রতিপালনের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। শুনেছি নির্দেশনার আলোকে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। তবে প্রত্যেকটি পদক্ষেপ বাস্তবায়নে তদারকির প্রয়োজন, যা এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান নয়।’

রিটকারীর আইনজীবী আতিক তৌহিদুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের রায় অনুযায়ী ব্যাটারিচালিত রিকশা কোনো অবস্থাতেই দেশের কোথাও চলাচল করতে পারবে না। এ ছাড়া থ্রি-হুইলার, ইজিবাইকসহ এ ধরনের কোনো যানবাহন দেশের কোনো মহাসড়কে উঠতে পারবে না। কিন্তু অদ্যাবধি এ রায় বাস্তবায়ন করা হয়নি। কর্তৃপক্ষ রায় বাস্তবায়ন না করায় মূলত সর্বোচ্চ আদালতকে অবজ্ঞা করা হয়েছে।’

ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহাসড়কসহ সারা দেশে সড়ক-মহাসড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা, থ্রি-হুইলার, ইজিবাইকসহ এ ধরনের যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ চেয়ে ২০২১ সালে ১৩ ডিসেম্বর হাইকোর্টে রিট করেছিলেন বাঘ ইকো মোটরস লিমিটেডের সভাপতি কাজী জসিমুল ইসলাম। এতে শিল্পসচিব, সড়ক পরিবহনসচিব, পরিবেশসচিবসহ সাতজনকে বিবাদী করা হয়েছিল। রিটে বলা হয়, ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজিবাইক এবং এ ধরনের যানবাহনে অবৈধভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে ব্যাটারি চার্জ দেওয়া হয়। এ জন্য বিদ্যুৎ খাত থেকে সরকার প্রয়োজনীয় রাজস্ব হারাচ্ছে। এগুলো পরিবেশ ও মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। রুট পারমিট ছাড়াই রাস্তায় বেপরোয়া চলাচল করে। এতে দুর্ঘটনা বেড়েছে। মানুষের প্রাণহানির ঘটনা বেড়েই চলেছে। তাই এ ধরনের যানবাহন বন্ধ করা জরুরি। 

রিটের শুনানি শেষে ১৫ ডিসেম্বর এক আদেশে ব্যাটারিচালিত রিকশা, থ্রি-হুইলার, ইজিবাইকসহ এ ধরনের যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন হাইকোর্টের বিচারপতি মামনুন রহমান ও বিচারপতি খন্দকার দিলীরুজ্জামানের বেঞ্চ। একই সঙ্গে ব্যাটারিচালিত রিকশা, থ্রি-হুইলার, ইজিবাইকসহ এ ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধে কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, মর্মে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। শুনানিতে রিটের পক্ষে বক্তব্য উপস্থাপন করেন অ্যাডভোকেট আতিক তৌহিদুল ইসলাম। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অমিত দাশগুপ্ত।

এর আগে ২০১৪ এবং ২০১৭ সালে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরসহ দেশের সব মহাসড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা, থ্রি-হুইলার, ইজিবাইক, নছিমন, করিমন, ভটভটি চলাচল নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন হাইকোর্ট। এসব নির্দেশনার আলোকে প্রথম দিকে পুলিশি তৎপরতায় মহাসড়কে এসব যান চলাচল কমে গিয়েছিল। এ সময় সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যাও কমতে থাকে। তবে অল্প সময়ের মধ্যেই মহাসড়ক আবার তিন চাকার গাড়ির দখলে চলে যায়। এর ফলে সড়ক-মহাসড়কে দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর হার আবার উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে।

>ব্যাটারিচালিত রিকশা এখন গলার কাঁটা

ব্যাটারিচালিত রিকশা এখন গলার কাঁটা

ব্যাটারিচালিত রিকশা এখন গলার কাঁটা
ব্যাটারিচালিত রিকশা

ব্যাটারিচালিত রিকশা প্রথম ঢাকা শহরে চালু হয় অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের (ডিসিসি) আমলে, ২০০৯ সালের শেষের দিকে। তৎকালীন মেয়র সাদেক হোসেন খোকা এগুলোকে বৈধতা দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বাদ সাধে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। সেই সময় ডিসিসি ও বিআরটিএর মধ্যে বিরোধ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে নিয়মিত সংবাদ প্রকাশিত হয়। তখন পিছু হটে ডিসিসি। 

তারপর থেকে অবৈধভাবেই বিকশিত হতে থাকে এই রিকশা। বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ যেটাকে ‘বাংলার টেসলা’ বলছেন সেটাকেই এখন অবৈধ তকমা দিয়ে নিষিদ্ধ করতে চাইছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুরু থেকেই ক্ষমতাসীনরা না চাইলে তো এটি বিকশিত হতে পারত না। শুরুতেই যদি সরকার কঠোর হতো তাহলে আজ এই পরিস্থিতি দেখতে হতো না। এখন লাখ লাখ পরিবারের জীবিকা এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। সে ক্ষেত্রে এই বিপুলসংখ্যক মানুষকে বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। তারপর কঠোর সিদ্ধান্তে আসতে হবে। 

তখন অভিবক্ত ডিসিসি বৈধতা দিতে চাইলেও এখন বিভক্ত ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি ও ডিএসসিসি) চায় না এই রিকশা চলাচল করুক। কারণ হিসেবে সংস্থা দুটি নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা বলছে। 

ডিএনসিসির মেয়র আতিকুল ইসলাম বলছেন, সিদ্ধান্তে আসা দরকার যে ঢাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা, অটোরিকশা, ইজিবাইক চলবে না। এগুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

অন্যদিকে ডিএসসিসির মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস বলছেন, ভয়াবহ ব্যাপার, যখন ব্যাটারিচালিত রিকশার চালকরা দুই পা ওপরে উঠিয়ে বেপরোয়া গতিতে চালান। অনেক প্রতিবন্ধী চালক আছেন, যারা চোখে কিছুটা কম দেখেন, তারাও এই রিকশা নিয়ে নেমে পড়েন।

এ প্রসঙ্গে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) সভাপতি আবু নাসের খান খবরের কাগজকে বলেন, ‘প্রথম থেকেই এটা নিয়ন্ত্রণ করতে হতো, তা যখন করা যায়নি তাহলে বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে তারপর কঠোর হওয়া দরকার।’

‘বাংলার টেসলা’ নিয়ে শুরুর মতবিরোধ চলছে এখনো
অবিভক্ত ডিসিসি ও বিআরটিএর সেই পুরোনো মতবিরোধ এখনো বিদ্যমান। সরকারের একটি অংশ মনে করছে এটি বিপজ্জনক। তাই চলতে দেওয়া যাবে না। আরেকটি অংশ বলছে, এটি কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ হলেও রয়েছে ব্যাপক উপযোগিতা। 

টেসলা যুক্তরাষ্ট্রের একটি বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাণ কোম্পানি। ব্যাটারিচালিত রিকশাকে তাই বাংলার টেসলা বলে অভিহিত করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। তিনি বলছেন, ব্যাটারিচালিত রিকশা হলো ‘বাংলার টেসলা’। এসব যান যতটুকু বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে, তার চেয়ে রিটার্ন অনেক বেশি। অথচ যেসব কথা বলে এখন এসব রিকশা নিষিদ্ধ করার কথা বলা হচ্ছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো এসব রিকশার ব্যাটারি চার্জ দিতে বিপুল বিদ্যুৎ খরচ হয়। 

রিকশা, ব্যাটারি রিকশা-ভ্যান ও ইজিবাইক সংগ্রাম পরিষদের ঢাকা মহানগর শাখার আহ্বায়ক খালেকুজ্জামান রিপন খবরের কাগজকে বলেন, সম্প্রতি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী ব্যাটারিচালিত রিকশাকে বাংলার টেসলা বলেছেন। তিনি দ্রুত এসব রিকশার গতিসীমা ঠিক করে ও নীতিমালা প্রণয়ন করে লাইসেন্স দিতে বিআরটিএকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন। ব্যাটারিচালিত রিকশার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা বিদ্যুৎ অপচয় করছে। একটি বাসায় ৬ ঘণ্টা এসি চালাতে ১৬ ইউনিট বিদ্যুৎ লাগে; আর একটি ব্যাটারিচালিত রিকশার ব্যাটারি চার্জ দিতে সাড়ে ৩ থেকে ৪ ইউনিট বিদ্যুৎ লাগে। এ ছাড়া আবাসিকের চেয়ে বহুলাংশে বিল দিচ্ছে ব্যাটারিচালিত রিকশামালিকরা। আমাদের দাবি হলো, মোটরযান গতিসীমা নীতিমালা সংশোধন করে দ্রুত লাইসেন্স দেওয়া হোক। ব্যাটারিচালিত রিকশা কিন্তু মূল সড়কে চলে না, চলে অলিগলিতে। হুট করে এসব রিকশা বন্ধ হয়ে গেলে নগরবাসী যে বিপাকে পড়বেন, তার দায় নিতে হবে বিআরটিএ ও সড়ক মন্ত্রণালয়কে। 

সম্ভাব্য রাজস্ব যাচ্ছে চাঁদাবাজদের পেটে
নিবন্ধন দেওয়া, না দেওয়া নিয়ে সরকারের ভেতরে মতবিরোধের মধ্যেই বেড়ে ওঠা এই খাত থেকে বিপুল রাজস্ব পেতে পারত সরকার। নিবন্ধন দিলে বছরে হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আহরণ সম্ভব বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। অথচ পুরোটা চলে যাচ্ছে চাঁদাবাজদের পকেটে। 

বাংলাদেশ ইলেকট্রিক ব্যাটারি অ্যান্ড মোটরচালিত অটোরিকশা অটোবাইক সার্ভিস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবুল কালাম বলেন, আমদানিকারকরা বিভিন্নভাবে ইজিবাইক আমদানি করে রাস্তায় নামিয়েছেন। এর মাধ্যমে লাখ লাখ কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। সেখানে অনেক শিক্ষিত বেকার রয়েছে। ২০১৬ সালে সারা দেশে ইজিবাইক ও অটোরিকশার সংখ্যা ছিল দুই থেকে আড়াই লাখ। বর্তমানে সেটি ৫০ লাখে উন্নীত হয়েছে। বিশাল সেক্টরের আয়ের সিংহভাগ চাঁদাবাজরা বিভিন্নভাবে আদায় করে নিয়ে যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, অটোরিকশার চাঁদার ভাগ পায় ট্রাফিক পুলিশ, স্থানীয় সংসদ সদস্য ও কাউন্সিলররা। এ ছাড়া স্থানীয় অসাধু রাজনৈতিক নেতা ও পাড়ামহল্লার মাস্তানরাও চাঁদাবাজি করছে। বিনিময়ে এসব রিকশা চলতে দিচ্ছে তাদের এলাকায়। চাঁদা না দিলে অটোরিকশা চালকদের ধরে এনে নির্যাতন করে পুলিশ। এক হিসাবে রাজধানী ঢাকাতে টোকেনের নামে ৬০ কোটি টাকা চাঁদা দিতে হয় অটোরিকশা চালকদের। 

সূত্র জানায়, রিকশাপ্রতি রেকার বিল গুনতে হয় ১ হাজার থেকে ২ হাজার টাকা। আবার কোনো রিকশা ডাম্পিং স্টেশনে নেওয়া হলে দিতে হয় ২ হাজার থেকে ৫ হাজার পর্যন্ত। মাসিক চাঁদার টাকা পরিশোধ করে রাস্তায় নামাতে হয় রিকশা। রাজধানী ঢাকায় অন্তত ৩ থেকে ৪ লাখের মতো ব্যাটারিচালিত রিকশা রয়েছে। মাসে গড়ে রিকশাপ্রতি প্রায় ২ হাজার টাকা টোকেন নিতে হয়। এই হিসাবে মাসে অবৈধভাবে আদায় করা হয় ৬০ কোটি টাকা।

সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার ভিত্তিতে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচলের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ঢাকা মহানগর দক্ষিণ কমিটি। কমিটির সভাপতি জামসেদ আনোয়ার তপন ও সাধারণ সম্পাদক জলি তালুকদার স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে এই দাবি জানিয়ে বলা হয়, অবিলম্বে সব ধরনের চাঁদাবাজি বন্ধ করে ব্যাটারিচালিত রিকশাকে লাইসেন্স দিতে হবে বিআরটিএকে। বিবৃতিতে বলা হয়, ব্যাটারিচালিত রিকশাকে নিরাপদ ও উন্নত করার একাধিক মডেলের প্রস্তাব দেশের অন্তত দুটি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় করেছে। এই লোকায়ত প্রযুক্তিটি বিপুলসংখ্যক মানুষের কষ্ট লাঘব ও কর্মের সংস্থান করেছে। একটি টেকসই ব্যবস্থাপনার পরিবর্তে কর্তৃত্ববাদী ও আমলাতান্ত্রিক নির্দেশে বারবার এসব শ্রমজীবী মানুষের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।

তারা অভিযোগ করেন, ক্ষমতাসীন দলের মদদে ও প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের যৌথ অংশগ্রহণে ঢাকা শহরে ব্যাটারিচালিত রিকশা থেকে যারা এত দিন অবৈধ রুট পারমিট প্রদানের মাধ্যমে চাঁদাবাজি চক্র পরিচালনা করেছে তারাই গত দুই দিন ধরে গ্যারেজে গ্যারেজে হামলা চালিয়ে ব্যাটারিসহ মূল্যবান যন্ত্রাংশ আটকের নামে লুটতরাজ পরিচালনা করছে। কয়েকটি স্থানে সড়কে রিকশাচালকদের পিটিয়ে গুরুতর আহত করার ঘটনা ঘটেছে।

অনড় অবস্থানে সরকার
গত বুধবার রাজধানীর বনানীতে বিআরটিএ ভবনে সড়ক পরিবহন উপদেষ্টা পরিষদের প্রথম সভায় রাজধানীতে ব্যাটারি বা যন্ত্রচালিত কোনো রিকশা চলতে না দেওয়ার নির্দেশ দেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। ওই সভায় মন্ত্রী বলেন, ‘ঢাকায় কোনো ব্যাটারিচালিত রিকশা চালানো যাবে না। এটা আগে কার্যকর করুন। এ ছাড়া ২২ মহাসড়কে রিকশা ও ইজিবাইক নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সেটা বাস্তবায়ন করুন। আর ঢাকা সিটিতে ব্যাটারিচালিত রিকশা যাতে না চলে, সেই বিষয়ে শুধু নিষেধাজ্ঞা আরোপ নয়, এগুলো চলতে যাতে না পারে, সেটার ব্যবস্থা করুন।’

এর পরপরই এসব রিকশা নিষিদ্ধে তোড়জোড় শুরু করে প্রশাসন। বিআরটিএর এনফোর্সমেন্ট বিভাগসংশ্লিষ্টরা জানান, শুধু ঢাকা নয়, দেশের সব মহানগরীর সড়ক থেকে ও ২২টি মহাসড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল বন্ধে গতকাল থেকে তৎপরতা শুরু হয়েছে। মহানগর, জেলা ও হাইওয়ে পুলিশের পাশাপাশি সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেটরা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছেন। 

বিকল্প কর্মসংস্থান করে নিষিদ্ধের দাবি
যদি এসব রিকশা নিষিদ্ধই করতে হয় তাহলে বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে তারপর নিষিদ্ধ করা উচিত বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। না হলে লাখ লাখ মানুষের পথে বসার উপক্রম হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। 

রিকশা, ব্যাটারি রিকশা-ভ্যান ও ইজিবাইক সংগ্রাম পরিষদের ঢাকা মহানগর শাখার অর্থ সম্পাদক রোকশানা আফরোজ আশা খবরের কাগজকে বলেন, ‘হাইকোর্ট যে উদ্যোগ নিয়েছে সেটা নেওয়ার আগে ভাবা উচিত ছিল, এসব মানুষ যাবে কোথায়? বিকল্প ব্যবস্থা না করে গরিব মানুষের ওপর অত্যাচার করা হচ্ছে। বিকল্প ব্যবস্থা না হলে এই রিকশাচালকদের কিছুই করা যাবে না।’

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ও গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আরমানা সাবিহা হক খবরের কাগজকে বলেন, ‘ব্যাটারিচালিত রিকশাগুলো যখন সড়কে নামানো হয়েছিল, তখনই কিন্তু ওদের চলাচলের এলাকা আর গতিসীমা নির্ধারিত করে দেওয়ার দরকার ছিল। শুধু নিরাপত্তার ইস্যুকে প্রাধান্য দিয়ে ব্যাটারিচালিত রিকশা তুলে দিলে সড়কের সমস্যার সমাধান হবে না। এখানে অনেক শ্রমিকের রুটিরুজির ব্যাপার আছে। আর্থিক নিরাপত্তার দিক চিন্তা করে তাদের আগে পুনর্বাসন করা দরকার। ব্যাটারিচালিত রিকশা সড়ক থেকে তুলে দিলে সেখানে বিকল্প পরিবহন কী হবে, তা নিয়ে চিন্তা করতে হবে। 

>ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধে হাইকোর্টের নির্দেশনা বাস্তবায়ন হয়নি ১০ বছরেও